বাংলাদেশের সরকারি পোল্ট্রি টিকা গাইড (পর্ব-১): মারেক্স, বাচ্চা মুরগির রানীক্ষেত (BCRDV) ও রানীক্ষেত (RDV) টিকা
পোল্ট্রি খামারে লাভজনক উৎপাদনের অন্যতম শর্ত হলো সঠিক সময়ে সঠিক টিকা প্রদান। উন্নত ব্যবস্থাপনা, ভালো খাবার ও বায়োসিকিউরিটির পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচি সঠিকভাবে অনুসরণ না করলে ভাইরাসজনিত রোগে পুরো ফ্লক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে উৎপাদিত বিভিন্ন পোল্ট্রি টিকা দীর্ঘদিন ধরে খামারিদের কাছে নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই পর্বে সরকারি মারেক্স টিকা, বাচ্চা মুরগির রানীক্ষেত (BCRDV) এবং বড় মুরগির রানীক্ষেত (RDV) টিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. মারেক্স টিকা (Marek’s Disease Vaccine)
মারেক্স রোগ কী?
মারেক্স ডিজিজ (Marek’s Disease) মুরগির একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি প্রধানত স্নায়ুতন্ত্র, চোখ, ত্বক, পেশী এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গ আক্রান্ত করে। আক্রান্ত মুরগিতে পক্ষাঘাত, ওজন কমে যাওয়া এবং মৃত্যুর ঝুঁকি দেখা দেয়।
টিকার মাস্টার সিড
উৎপত্তি
কখন টিকা দিতে হবে?
প্রয়োগ পদ্ধতি
- ২০০ মিলি ডাইলুয়েন্টে টিকা মিশাতে হবে।
- প্রতিটি বাচ্চাকে ০.২ মিলি করে চামড়ার নিচে (Subcutaneous) ইনজেকশন দিতে হবে।
সরবরাহ
- প্রতি ভায়াল = ১০০০ ডোজ
- ২০০ মিলি ডাইলুয়েন্টসহ
সরকারি মূল্য
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- টিকা গুলানোর পর দ্রুত ব্যবহার করতে হবে।
- কোল্ড চেইন বজায় রাখতে হবে।
- অসুস্থ বাচ্চাকে টিকা দেওয়া যাবে না।
২. বাচ্চা মুরগির রানীক্ষেত টিকা (BCRDV)
রোগ পরিচিতি
রানীক্ষেত বা নিউক্যাসেল ডিজিজ (Newcastle Disease) পোল্ট্রির অন্যতম ভয়ংকর ভাইরাসজনিত রোগ। এটি শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত করে।
সাধারণ লক্ষণ—
- সবুজ বা সাদা পাতলা পায়খানা
- শ্বাসকষ্ট
- দুর্বলতা
- মৃত্যুহার বৃদ্ধি
টিকার মাস্টার সিড
উৎপত্তি
কখন টিকা দিতে হবে?
মাতৃ অ্যান্টিবডির প্রভাব কমে আসার সময় টিকা দিলে ভালো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।
কীভাবে টিকা দিতে হবে?
- ৬ মিলি জীবাণুমুক্ত পানিতে টিকা গুলাতে হবে।
- আই ড্রপারের সাহায্যে দুই চোখে ১ ফোঁটা করে দিতে হবে।
- টিকা দেওয়ার পর বাচ্চা ঢোক গিলেছে কিনা নিশ্চিত হতে হবে।
পুনরায় টিকা
- প্রথম ডোজের ২১ দিন পরে পুনরায় দিতে হবে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
সরবরাহ
সরকারি মূল্য
৩. রানীক্ষেত টিকা (RDV)
রোগ পরিচিতি
বড় মুরগির নিউক্যাসেল ডিজিজ প্রতিরোধে এই টিকা ব্যবহার করা হয়।
রোগের লক্ষণ—
- ঘাড় বাঁকা
- সবুজ বা সাদা ডায়রিয়া
- শ্বাসকষ্ট
- স্নায়বিক সমস্যা
- মৃত্যুহার বৃদ্ধি
টিকার মাস্টার সিড
উৎপত্তি
কখন দিতে হবে?
প্রয়োগ পদ্ধতি
- ১০০ মিলি জীবাণুমুক্ত পানিতে টিকা গুলাতে হবে।
- প্রতিটি মুরগির পায়ের মাংসে ১ মিলি করে ইনজেকশন দিতে হবে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
তাই প্রতি ৬ মাস পরপর পুনরায় টিকা দেওয়া প্রয়োজন।
সরকারি মূল্য
RDV টিকা দেওয়ার আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
- অসুস্থ মুরগিকে টিকা দেওয়া যাবে না।
- ককসিডিওসিস, গাম্বোরো, কৃমি বা অপুষ্টিতে আক্রান্ত মুরগি আগে সুস্থ করতে হবে।
- টিকা সবসময় ঠান্ডা অবস্থায় বহন ও সংরক্ষণ করতে হবে।
- নির্ধারিত ডোজ মেনে টিকা দিতে হবে।
উপসংহার
মারেক্স, BCRDV এবং RDV—এই তিনটি টিকা একটি সফল পোল্ট্রি খামারের মৌলিক প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির অংশ। সঠিক বয়সে, সঠিক নিয়মে এবং কোল্ড চেইন বজায় রেখে টিকা প্রয়োগ করলে মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
FAQ
১. মারেক্স টিকা কখন দিতে হয়?
১ দিন বয়সী বাচ্চাকে চামড়ার নিচে ০.২ মিলি করে দিতে হয়।
২. BCRDV টিকা কত দিন বয়সে দেওয়া উচিত?
সাধারণত ৪–৭ দিন বয়সে চোখে ড্রপ হিসেবে দেওয়া হয়।
৩. BCRDV টিকার বুস্টার কবে দিতে হয়?
প্রথম ডোজের ২১ দিন পরে।
৪. RDV টিকা কোন বয়সে দেওয়া হয়?
২ মাস বা তার বেশি বয়সী মুরগিকে।
৫. RDV টিকা কতদিন সুরক্ষা দেয়?
প্রায় ৬ মাস, তাই প্রতি ৬ মাস অন্তর পুনরায় টিকা দেওয়া উচিত।
৬. অসুস্থ মুরগিকে কি RDV টিকা দেওয়া যাবে?
না। আগে মুরগিকে সুস্থ করে তারপর টিকা দিতে হবে।
৭. টিকা দেওয়ার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?
কোল্ড চেইন বজায় রাখা, সঠিক ডোজ অনুসরণ করা এবং জীবাণুমুক্ত পদ্ধতিতে টিকা প্রয়োগ করা।