টিপসঃ ১৪

গরমে মুরগির উৎপাদন কমে কেন? করণীয়, কক্সিডিওসিস নিয়ন্ত্রণ, IB, ডিমের রং ও গুরুত্বপূর্ণ পোল্ট্রি টিপস

গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ার কারণে পোল্ট্রি খামারে উৎপাদন, ওজন বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে লিটার ব্যবস্থাপনা, খাদ্য, পানি ও পরিবেশ ঠিক না থাকলে কক্সিডিওসিস, শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং ডিমের গুণগত মানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

নিচে খামারিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যবহারিক টিপস তুলে ধরা হলো।


১. গরমে মুরগির উৎপাদন কমে কেন?

উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় মুরগি Panting করে শরীর ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে।

এর ফলে—

  • এনার্জির অপচয় হয়।
  • খাবার গ্রহণ কমে যায়।
  • উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি অবশিষ্ট থাকে না।
  • ডিম উৎপাদন ও ওজন কমে যায়।
  • ব্রয়লারের বৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়।

গরমে করণীয়

  • খাদ্যে ফ্যাটের পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো যেতে পারে (পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী)।
  • পর্যাপ্ত পটাশিয়াম নিশ্চিত করতে হবে।
  • বায়োটিন ও ফলিক এসিডের ঘাটতি পূরণ করতে হবে।
  • জিংক ও কপার পর্যাপ্ত রাখতে হবে।
  • খাদ্যের পার্টিকেল সাইজ কিছুটা বড় রাখা যেতে পারে।
  • পর্যাপ্ত ঠান্ডা ও পরিষ্কার পানি সরবরাহ করতে হবে।

শেড ঠান্ডা রাখার উপায়

  • ছাদে নিয়মিত পানি স্প্রে করুন।
  • ছাদের উপর পাইপ বসিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি প্রবাহ দিন।
  • শেডের পাশে ভেজা চট ঝুলিয়ে রাখতে পারেন।
  • শেডের বাইরে অতিরিক্ত ৩ ফুট ছাউনি দিলে সরাসরি রোদ কম লাগে।
  • পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করুন।

২. কক্সিডিওসিস নিয়ন্ত্রণে লিটার ব্যবস্থাপনা

ক্রনিক কক্সিডিওসিস নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ নয়, ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

করণীয়

  • পুরাতন লিটার সম্পূর্ণ অপসারণ।
  • ফ্লোর শুকিয়ে জীবাণুমুক্ত করা।
  • প্রয়োজনে ফ্লেম গান ব্যবহার করে জীবাণু ধ্বংস।
  • অনুমোদিত জীবাণুনাশক ব্যবহার।
  • লিটার শুকনো রাখা।
  • পানি লিকেজ বন্ধ করা।

দ্রষ্টব্য: সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড বা হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহারে অবশ্যই নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করতে হবে।


৩. ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB)-এর প্রভাব

বয়সভেদে IB-এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।

বাচ্চা

  • সাধারণত মৃত্যুহার কম।
  • তবে CRD, ORT বা কোরাইজা থাকলে জটিলতা বাড়ে।

গ্রোয়ার

  • শ্বাসতন্ত্রের রোগের সাথে জটিলতা বৃদ্ধি পায়।

লেয়ার

  • উৎপাদনের পিক নাও আসতে পারে।
  • ডিম উৎপাদন দীর্ঘদিন কম থাকতে পারে।

৪. ব্রয়লারের আলো ব্যবস্থাপনা

সঠিক লাইটিং প্রোগ্রাম—

  • বৃদ্ধি উন্নত করে।
  • স্ট্রেস কমায়।
  • Feed Conversion Ratio (FCR) উন্নত করতে সাহায্য করে।

লাইটিং প্রোগ্রাম নির্বাচন কোম্পানির গাইডলাইন অনুযায়ী হওয়া উচিত।


৫. ডিমের রং কোথা থেকে আসে?

ডিমের খোসার রং মূলত দুই ধরনের পিগমেন্ট দ্বারা নির্ধারিত হয়।

  • Protoporphyrin → বাদামী ডিম
  • Biliverdin → নীল বা সবুজ ডিম

হিমোগ্লোবিনের সমস্যা, অসুস্থতা বা কিছু ভাইরাসজনিত রোগে ডিমের রং ফ্যাকাসে হতে পারে।


৬. গরমে বাজরা ব্যবহারের সুবিধা

বাজরার এনার্জি ধীরে ধীরে সরবরাহ হয়।

তবে এতে ট্যানিন থাকার কারণে অতিরিক্ত ব্যবহার করলে খনিজ শোষণে প্রভাব পড়তে পারে।


৭. লিটারে চুন ব্যবহারের সুবিধা

চুন ব্যবহারে—

  • অ্যামোনিয়া কমে
  • লিটার শুকনো থাকে
  • মাছি কমে
  • কিছু রোগজীবাণুর বৃদ্ধি কমতে পারে

তবে অতিরিক্ত ব্যবহার করা উচিত নয়।


৮. বিক্রির আগে ওজন বাড়ানোর কৌশল

ভালো ব্যবস্থাপনা, সুষম খাদ্য এবং পর্যাপ্ত পানি ওজন বৃদ্ধির মূল উপায়।

শুধুমাত্র বিক্রির আগে কোনো নির্দিষ্ট উপাদান ব্যবহার করে দ্রুত ওজন বাড়ানোর পরিবর্তে সম্পূর্ণ উৎপাদনকাল জুড়ে সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা উচিত।


৯. গরমে ডিমের আকার ছোট হয় কেন?

কারণগুলো—

  • এনার্জির ঘাটতি
  • অতিরিক্ত তাপমাত্রা
  • লিনোলেইক এসিডের ঘাটতি
  • ক্যালসিয়ামের ঘাটতি
  • খাদ্য গ্রহণ কমে যাওয়া

১০. ইলেক্ট্রোলাইট ব্যবহারে সতর্কতা

ইলেক্ট্রোলাইট প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।

অতিরিক্ত ব্যবহার করলে—

  • পাতলা পায়খানা
  • লিটার ভেজা
  • মাছির উপদ্রব

বেড়ে যেতে পারে।


১১. পালক পড়ার কারণ

শুধু মেথিওনিনের অভাব নয়।

এছাড়াও—

  • লাইসিনের ঘাটতি
  • ফ্যাটি এসিডের সমস্যা
  • নিম্নমানের প্রোটিন
  • ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি

পালক পড়ার কারণ হতে পারে।


১২. প্রোটিন ও এনার্জির ভারসাম্য

সুষম খাদ্যে—

  • পর্যাপ্ত এনার্জি
  • সঠিক মাত্রার প্রোটিন
  • Methionine ও Lysine-এর সঠিক অনুপাত

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


১৩. ভুট্টা কেনার সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন

ভুট্টায় থাকতে পারে—

  • মাইকোটক্সিন
  • পোকা
  • অতিরিক্ত আর্দ্রতা
  • ফাঙ্গাস
  • পেস্টিসাইডের অবশিষ্টাংশ
  • ভাঙা বা ক্ষতিগ্রস্ত দানা

ব্যবহারের আগে ভালোভাবে শুকিয়ে পরিষ্কার করা উচিত।


১৪. পানির গুরুত্ব

  • শরীরের মাত্র ১০% পানি কমে গেলে ডিহাইড্রেশন শুরু হতে পারে।
  • গুরুতর পানিশূন্যতা প্রাণঘাতী হতে পারে।

তাই সব সময় পরিষ্কার, ঠান্ডা ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।


উপসংহার

পোল্ট্রি খামারে লাভজনক উৎপাদনের জন্য শুধু ওষুধ নয়, সঠিক খাদ্য, পানি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, লিটার ব্যবস্থাপনা, বায়োসিকিউরিটি এবং ভ্যাকসিনেশন—এই পাঁচটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। গরমের সময় বিশেষ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করলে উৎপাদন কমে যাওয়া, ওজন হ্রাস এবং রোগের প্রকোপ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

Scroll to Top