কৃমি সমাচার (Worm Infestation in Cattle)
বাংলাদেশের আবহাওয়া কৃমির বংশবিস্তার ও সংক্রমণের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ফলে প্রায় সব গবাদিপশুই জীবনের কোনো না কোনো সময় কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হয়। কৃমি পশুর শরীর থেকে পুষ্টি শোষণ করে, রক্তস্বল্পতা সৃষ্টি করে, বৃদ্ধি ব্যাহত করে, দুধ ও মাংস উৎপাদন কমিয়ে দেয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে।
পরজীবী বা বহিঃপরজীবী এবং কৃমির ডিম দ্বারা দূষিত খাদ্য, ঘাস ও পানি গ্রহণের মাধ্যমে গবাদিপশু কৃমিতে আক্রান্ত হয়।
সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো মল (Faecal Examination) পরীক্ষা করে কোন ধরনের কৃমি রয়েছে তা নিশ্চিত করে চিকিৎসা প্রদান করা। তবে নিয়মিত প্রতিরোধমূলক কৃমিনাশক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।
গরুর প্রধান কৃমির প্রকারভেদ
১. পাতাকৃমি (Flukes / Trematodes)
পাতাকৃমি দেখতে পাতার মতো এবং প্রধানত কলিজা, রুমেন ও রক্তনালীতে বসবাস করে। বর্ষাকালের মাঝামাঝি থেকে শীতের শুরু পর্যন্ত এদের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়।
প্রধান রোগজীবাণু
- Fasciola spp. (কলিজার পাতাকৃমি)
- Paramphistomum spp. (রুমেন ফ্লুক)
- Schistosoma spp. (রক্তের পাতাকৃমি)
ব্যবহৃত কৃমিনাশক
- ট্রাইক্লাবেনডাজল (Triclabendazole) : ৯০০ মি.গ্রা./৫০-৭৫ কেজি ওজন
- নাইট্রোক্সিনিল (Nitroxynil) : ১.৫ মি.লি./৫০ কেজি ওজন
- হেক্সাক্লোরোফেন (Hexachlorophene) : ১০ মি.গ্রা./কেজি
- অক্সিক্লোসানাইড (Oxyclozanide) : ১০ মি.গ্রা./কেজি
২. গোলকৃমি (Round Worms / Nematodes)
গোলকৃমি প্রধানত পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, ফুসফুস ও অন্যান্য অঙ্গে বাস করে এবং পশুর পুষ্টির বড় অংশ শোষণ করে। ফলে বৃদ্ধি কমে যায়, রক্তশূন্যতা ও দুর্বলতা দেখা দেয়।
প্রধান রোগজীবাণু
- Ascaris spp.
- Haemonchus spp.
- Ancylostomum spp.
- Bunostomum spp.
- Strongylus spp.
- Strongyloides spp.
- Dictyocaulus spp.
- Thelazia spp.
- Stephanofilaria spp.
ব্যবহৃত কৃমিনাশক
- লিভামিসল (Levamisole) : ৬০০ মি.গ্রা./৫০-৭৫ কেজি
- টেট্রামিসোল (Tetramisole) : ১ ট্যাবলেট/১০০-১৫০ কেজি
- আইভারমেকটিন (Ivermectin) : ১ মি.লি./৫০ কেজি ওজন
৩. ফিতাকৃমি (Tape Worms / Cestodes)
ফিতাকৃমি সাধারণত বাছুর ও অল্পবয়সী গরুকে বেশি আক্রান্ত করে। আক্রান্ত পশুর মলের সঙ্গে সাদা ভাতের মতো কৃমির খণ্ড বের হতে দেখা যায়।
কুকুর ও অন্যান্য মাংসাশী প্রাণী এ রোগ ছড়াতে ভূমিকা রাখে।
প্রধান রোগজীবাণু
- Moniezia spp.
- Taenia spp.
ব্যবহৃত কৃমিনাশক
- অ্যালবেনডাজল (Albendazole) : ১৫ মি.গ্রা./কেজি
- ফেনবেনডাজল (Fenbendazole) : ৫ মি.গ্রা./কেজি
- পাইপারাজিন (Piperazine) : ১০ মি.গ্রা./কেজি
কৃমির সাধারণ লক্ষণ
- রক্তস্বল্পতা
- শরীর শুকিয়ে যাওয়া
- বৃদ্ধি কমে যাওয়া
- অরুচি
- পাতলা পায়খানা
- চোয়ালের নিচে পানি জমে ফোলা (Bottle Jaw)
- পশম রুক্ষ ও উজ্জ্বলতা হারানো
- দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া
- দুর্বলতা
- প্রজনন সমস্যা
কৃমিনাশক ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
✔ গরু আক্রান্ত না হলেও নিয়মিত কৃমিনাশক খাওয়ানো যায়।
✔ সর্বোত্তম ফল পাওয়ার জন্য সকালে খালি পেটে কৃমিনাশক খাওয়ানো উত্তম।
✔ কৃমিনাশক খাওয়ানোর পর কমপক্ষে ১ ঘণ্টা খাবার না দেওয়াই ভালো।
✔ ট্যাবলেট গুঁড়া করে চিটাগুড় বা কলার পাতার সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।
✔ মাত্রার চেয়ে কম ডোজ দিলে কৃমি সম্পূর্ণ ধ্বংস না হয়ে ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা (Resistance) তৈরি করতে পারে।
✔ অসুস্থ, অতিরিক্ত দুর্বল বা উচ্চ জ্বরযুক্ত পশুকে কৃমিনাশক দেওয়া উচিত নয়।
✔ অত্যধিক গরমের সময় কৃমিনাশক প্রয়োগ এড়িয়ে চলা ভালো।
✔ নিয়মিত ৩-৪ মাস পরপর কৃমিনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে, তবে সবচেয়ে ভালো হয় মল পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা।
গর্ভবতী গাভীতে কৃমিনাশক
- গর্ভের শেষ দুই মাসে (৮ মাসের পর) কৃমিনাশক ব্যবহার সাধারণত এড়িয়ে চলা উচিত।
- বাচ্চা প্রসবের পর পশুর অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃমিনাশক ব্যবহার করা যায়।
- প্রজননের পর প্রথম ৪৫ দিন অপ্রয়োজনীয় কৃমিনাশক ব্যবহার না করাই ভালো।
বাছুরে কৃমি নিয়ন্ত্রণ
- সদ্য জন্মানো বাছুরে সাধারণত ৫-৭ দিনের মধ্যে কৃমিনাশক দেওয়া প্রয়োজন হয় না।
- ১-২ মাস বয়স থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু করা যেতে পারে।
- ৬ মাস বয়স পর্যন্ত নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।
কৃমিনাশক দেওয়ার পরে
কৃমিনাশক প্রয়োগের পর কিছু পশুর অরুচি দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায়—
- রুচিবর্ধক ওষুধ
- ভিটামিন-মিনারেল
- লিভার টনিক
- প্রোবায়োটিক
ব্যবহার করলে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
কৃমি নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা
- গোয়ালঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।
- মল দ্রুত অপসারণ করা।
- জলাবদ্ধতা দূর করা।
- বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা।
- অতিরিক্ত ঘনত্বে পশু না রাখা।
- নতুন পশু খামারে আনার আগে কোয়ারেন্টাইনে রাখা।
- নিয়মিত মল পরীক্ষা করা।
- একই গ্রুপের কৃমিনাশক বারবার ব্যবহার না করে প্রয়োজনে গ্রুপ পরিবর্তন করা (Anthelmintic Rotation)।
উপসংহার
গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে কৃমি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু নিয়মিত কৃমিনাশক ব্যবহার নয়, সঠিক ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং প্রয়োজনে মল পরীক্ষার মাধ্যমে কৃমি নিয়ন্ত্রণ করলে অধিক কার্যকর ফল পাওয়া যায় এবং ওষুধের প্রতি প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির ঝুঁকিও কমে।
১. গরুর কৃমি কত প্রকার?
গরুর কৃমি প্রধানত তিন প্রকার—
- পাতাকৃমি (Flukes/Trematodes)
- গোলকৃমি (Roundworms/Nematodes)
- ফিতাকৃমি (Tapeworms/Cestodes)
২. গরু কিভাবে কৃমিতে আক্রান্ত হয়?
দূষিত ঘাস, খাদ্য, পানি, কৃমির ডিম এবং বিভিন্ন পরজীবীর মাধ্যমে গরু কৃমিতে আক্রান্ত হয়।
৩. গরুর কৃমির লক্ষণ কী কী?
কৃমি আক্রান্ত গরুতে সাধারণত দেখা যায়—
- শরীর শুকিয়ে যাওয়া
- রক্তশূন্যতা
- অরুচি
- পাতলা পায়খানা
- পশম রুক্ষ হয়ে যাওয়া
- দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া
- ওজন বৃদ্ধি কমে যাওয়া
- দুর্বলতা
- চোয়ালের নিচে ফোলা (Bottle Jaw)
৪. গরুকে কতদিন পর পর কৃমিনাশক খাওয়ানো উচিত?
সাধারণভাবে প্রতি ৩-৪ মাস পরপর কৃমিনাশক খাওয়ানো ভালো। তবে সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো মল (Faecal Examination) পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী কৃমিনাশক ব্যবহার করা।
৫. খালি পেটে কৃমিনাশক খাওয়ানো কি ভালো?
হ্যাঁ। সকালে খালি পেটে কৃমিনাশক খাওয়ালে সাধারণত ভালো ফল পাওয়া যায়।
৬. কৃমিনাশক খাওয়ানোর পর কতক্ষণ খাবার দেওয়া উচিত নয়?
কৃমিনাশক খাওয়ানোর পর কমপক্ষে ১ ঘণ্টা খাবার না দেওয়াই ভালো।
৭. গরু সুস্থ থাকলেও কি কৃমিনাশক খাওয়ানো যায়?
হ্যাঁ। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সুস্থ গরুকেও কৃমিনাশক খাওয়ানো যায়।
৮. একই কৃমিনাশক বারবার ব্যবহার করা কি ঠিক?
না। একই গ্রুপের ওষুধ বারবার ব্যবহার করলে কৃমির মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Anthelmintic Resistance) তৈরি হতে পারে। তাই প্রয়োজনে গ্রুপ পরিবর্তন করা উচিত।
৯. গর্ভবতী গাভীকে কৃমিনাশক খাওয়ানো যায় কি?
হ্যাঁ, তবে গর্ভের শেষ দুই মাসে (৮ মাসের পর) অপ্রয়োজনীয় কৃমিনাশক ব্যবহার এড়িয়ে চলা ভালো। প্রয়োজনে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।
১০. বাছুরকে কখন প্রথম কৃমিনাশক দেওয়া উচিত?
সাধারণত ১-২ মাস বয়স থেকে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু করা যায়।
১১. পাতাকৃমির জন্য কোন ওষুধ বেশি কার্যকর?
পাতাকৃমির জন্য সাধারণত—
- Triclabendazole
- Oxyclozanide
- Nitroxynil
গ্রুপের ওষুধ কার্যকর।
১২. গোলকৃমির জন্য কোন কৃমিনাশক ব্যবহার করা হয়?
গোলকৃমির ক্ষেত্রে সাধারণত—
- Levamisole
- Tetramisole
- Ivermectin
গ্রুপের ওষুধ ব্যবহার করা হয়।




