ইমোনিটি কি,কিভাবে তৈরি হয়,টিকা দেয়ার পরও কেন কাজ করেনা।

রোগ অনাক্রম্যতা (ইমিউনিটি), রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, টিকা ও ভ্যাক্সিনেশন (পর্ব–১)

রোগ অনাক্রম্যতা (Immunity) কী? এবং শরীর কীভাবে রোগ প্রতিরোধ করে?

পোল্ট্রি খামারে রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইমিউনিটি (Immunity)। অনেক খামারি মনে করেন শুধু টিকা দিলেই মুরগি সব রোগ থেকে নিরাপদ থাকবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। টিকা তখনই কার্যকর হয় যখন মুরগির স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune System) ভালো থাকে।

তাই একজন সফল খামারির প্রথমেই জানা উচিত ইমিউনিটি কী, শরীর কীভাবে রোগ প্রতিরোধ করে এবং টিকার সাথে ইমিউনিটির সম্পর্ক কী।


রোগ অনাক্রম্যতা (Immunity) কী?

রোগ অনাক্রম্যতা (Immunity) হলো প্রাণীর শরীরের এমন একটি স্বাভাবিক বা অর্জিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে শরীর নিজের কোষ এবং বহিরাগত ক্ষতিকর জীবাণু বা পদার্থকে আলাদা করে শনাক্ত করতে পারে এবং সেগুলোকে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে নিজেকে রোগ থেকে রক্ষা করে।

অর্থাৎ,

শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ক্ষমতাই হলো ইমিউনিটি।


শরীর কীভাবে রোগ প্রতিরোধ করে?

মুরগির শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একাধিক ধাপে কাজ করে।

১. শারীরিক প্রতিবন্ধক (Physical Barrier)

রোগজীবাণু প্রথমে শরীরে প্রবেশ করতে বাধার সম্মুখীন হয়।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • চামড়া (Skin)
  • মিউকাস মেমব্রেন (Mucous membrane)
  • চোখের পানি
  • শ্বাসনালীর মিউকাস

এগুলো জীবাণুকে শরীরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়।


২. রাসায়নিক প্রতিরক্ষা (Chemical Barrier)

কিছু প্রাকৃতিক রাসায়নিক পদার্থ জীবাণু ধ্বংস করে।

যেমন—

  • পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক এসিড
  • বিভিন্ন এনজাইম
  • লালারস
  • অন্ত্রের বিভিন্ন নিঃসরণ

এসব জীবাণুর সংখ্যা কমিয়ে দেয়।


৩. কোষীয় প্রতিরক্ষা (Cellular Defense)

যদি জীবাণু শরীরে প্রবেশ করেই ফেলে, তখন কাজ শুরু করে শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Cell)।

বিশেষ করে—

  • Macrophage
  • Heterophil
  • Monocyte

এরা জীবাণুকে গিলে ফেলে (Phagocytosis) এবং ধ্বংস করে।


৪. এন্টিবডি দ্বারা প্রতিরোধ

কিছু জীবাণুর বিরুদ্ধে শরীর বিশেষ ধরনের প্রোটিন তৈরি করে, যাকে এন্টিবডি (Antibody) বলা হয়।

এই এন্টিবডি নির্দিষ্ট জীবাণুকে চিনে দ্রুত আক্রমণ করে এবং রোগ প্রতিরোধ করে।


রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune System) কী?

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হলো শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, কোষ ও রাসায়নিক পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা—

  • বহিরাগত জীবাণু শনাক্ত করে
  • ক্ষতিকর জীবাণুকে ধ্বংস করে
  • ভবিষ্যতে একই জীবাণু আবার আক্রমণ করলে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলে

কোন জীবাণুর বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয়?

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সাধারণত কাজ করে—

  • ভাইরাস (Virus)
  • ব্যাকটেরিয়া (Bacteria)
  • প্রোটোজোয়া (Protozoa)
  • ছত্রাক (Fungus)
  • কিছু পরজীবীর বিরুদ্ধে

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রধান সৈনিক কারা?

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোষ হলো লিম্ফোসাইট (Lymphocyte)।

এই কোষ দুই ধরনের—

  • T-Lymphocyte (টি লিম্ফোসাইট)
  • B-Lymphocyte (বি লিম্ফোসাইট)

এই দুই কোষই পরবর্তীতে শরীরে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।


ভালো ইমিউনিটির জন্য কী কী দরকার?

শুধু টিকা দিলেই ভালো ইমিউনিটি হয় না। নিচের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ—

  • সুষম খাদ্য
  • পর্যাপ্ত প্রোটিন
  • ভিটামিন A, D, E
  • সেলেনিয়াম
  • জিংক
  • পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি
  • কম স্ট্রেস
  • ভালো বায়োসিকিউরিটি
  • কম মাইকোটক্সিনযুক্ত খাদ্য

খামারিদের সাধারণ ভুল

অনেকেই মনে করেন—

  • বেশি টিকা = বেশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

এটি সঠিক নয়।

কারণ—

  • অসুস্থ মুরগিতে টিকা ভালো কাজ করে না।
  • অপুষ্টিতে এন্টিবডি কম তৈরি হয়।
  • অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডায় ইমিউনিটি কমে যায়।
  • মাইকোটক্সিন ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে।

মনে রাখবেন

শুধু ভ্যাক্সিন নয়, শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেমই একটি সফল পোল্ট্রি খামারের মূল ভিত্তি।

 

Scroll to Top