ব্রুসেলোসিস (Brucellosis)

গাভীর সংক্রামক গর্ভপাত (Brucellosis): কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয়, প্রতিরোধ ও করণীয়

গাভীন গরু অনেক সময় ৩, ৪, ৫ বা ৬ মাসে গর্ভপাত (Abortion) করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে যোনিপথ দিয়ে কুস বা আঠালো স্রাব বের হতে দেখা যায়। অনেক খামারি এটিকে সাধারণ সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে ব্রুসেলোসিস (Brucellosis)

ব্রুসেলোসিস একটি জুনোটিক (Zoonotic) রোগ, অর্থাৎ এটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হতে পারে। তাই এই রোগ সম্পর্কে প্রতিটি খামারির সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।


ব্রুসেলোসিস (Brucellosis) কী?

ব্রুসেলোসিস হলো Brucella গণভুক্ত ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট একটি সংক্রামক রোগ। এটি গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, শূকরসহ বিভিন্ন প্রাণীতে দেখা যায় এবং মানুষের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

গাভীর ক্ষেত্রে এ রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—

  • গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে গর্ভপাত
  • গর্ভফুল (Placenta) আটকে যাওয়া
  • জরায়ুর প্রদাহ
  • বন্ধ্যাত্ব
  • পুনঃপুন গর্ভপাত

অন্যদিকে ষাঁড়ের ক্ষেত্রে—

  • অণ্ডকোষের প্রদাহ (Orchitis)
  • এপিডিডাইমাইটিস (Epididymitis)
  • বীর্যের মান কমে যাওয়া
  • প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস

রোগের কারণ

গরুতে প্রধানত Brucella abortus ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এই রোগ হয়।

এছাড়া—

  • Brucella melitensis — ছাগল ও ভেড়ায় বেশি দেখা যায়
  • Brucella suis — শূকরে
  • Brucella canis — কুকুরে

কীভাবে রোগ ছড়ায়?

ব্রুসেলোসিস অত্যন্ত সংক্রামক রোগ।

সংক্রমণের প্রধান উৎস—

  • গর্ভপাত হওয়া ভ্রূণ (Fetus)
  • গর্ভফুল (Placenta)
  • জরায়ুর নিঃসরণ
  • আক্রান্ত গাভীর দুধ
  • দূষিত খাদ্য ও পানি
  • আক্রান্ত ষাঁড়ের বীর্য
  • দুধ দোহনের সময় এক গাভী থেকে অন্য গাভীতে
  • দূষিত যন্ত্রপাতি, হাত ও কাপড়ের মাধ্যমে

কোন গরু বেশি আক্রান্ত হয়?

  • গর্ভবতী গাভী
  • দুগ্ধবতী গাভী
  • প্রজনন খামারের গরু
  • নতুন কেনা গরু
  • যেসব খামারে আগে গর্ভপাতের ইতিহাস রয়েছে

ব্রুসেলোসিসের লক্ষণ

গাভীতে

  • গর্ভধারণের ৫–৯ মাসের মধ্যে গর্ভপাত হওয়া
  • গর্ভপাতের আগে যোনিপথ দিয়ে লালচে বা আঠালো স্রাব (কুস) বের হওয়া
  • গর্ভফুল আটকে যাওয়া (Retained placenta)
  • জরায়ুর প্রদাহ (Metritis)
  • পুনঃপুন গর্ভপাত
  • বন্ধ্যাত্ব
  • দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া
  • দুর্বল বা অপরিপক্ব বাছুর জন্ম নেওয়া
  • জন্মের কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে বাছুর মারা যাওয়া

ষাঁড়ে

  • অণ্ডকোষ ফুলে যাওয়া
  • অণ্ডকোষে ব্যথা
  • এপিডিডাইমাইটিস
  • বীর্যের গুণগত মান কমে যাওয়া
  • প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস

রোগ নির্ণয়

শুধু লক্ষণ দেখে ব্রুসেলোসিস নিশ্চিত হওয়া যায় না।

নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন—

  • Rose Bengal Plate Test (RBPT)
  • ELISA
  • Serum Agglutination Test (SAT)
  • PCR
  • ব্যাকটেরিয়া কালচার (বিশেষ ক্ষেত্রে)

চিকিৎসা

গুরুত্বপূর্ণ: ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত প্রাণীর শরীরে জীবাণু কোষের ভেতরে অবস্থান করে। তাই শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সম্পূর্ণ রোগ নির্মূল করা সাধারণত সম্ভব হয় না।

প্রাণীর অবস্থা অনুযায়ী নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসক সহায়ক চিকিৎসা দিতে পারেন। তবে আক্রান্ত প্রাণীকে প্রজননের জন্য ব্যবহার না করাই উত্তম।


আক্রান্ত গাভী গর্ভপাত করলে কী করবেন?

  • আক্রান্ত গাভীকে দ্রুত আলাদা করুন।
  • গর্ভপাত হওয়া বাচ্চা ও গর্ভফুল খোলা জায়গায় ফেলে রাখবেন না।
  • মাটির গভীরে পুঁতে ফেলুন অথবা পুড়িয়ে ধ্বংস করুন।
  • গোয়ালঘর জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করুন।
  • গ্লাভস পরে কাজ করুন।
  • হাত ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
  • দ্রুত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

প্রতিরোধ

ব্রুসেলোসিস প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা।

করণীয়

  • নতুন গরু কেনার আগে ব্রুসেলোসিস পরীক্ষা করুন।
  • আক্রান্ত প্রাণীকে আলাদা রাখুন।
  • গর্ভপাত হওয়া গাভীকে পরীক্ষা করুন।
  • গর্ভফুল ও ভ্রূণ দ্রুত ধ্বংস করুন।
  • গোয়ালঘর নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করুন।
  • দুধ দোহনের আগে ও পরে হাত পরিষ্কার করুন।
  • একই দোহনের যন্ত্র পরিষ্কার না করে অন্য গাভীতে ব্যবহার করবেন না।
  • আক্রান্ত প্রাণী প্রজননে ব্যবহার করবেন না।
  • খামারে বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করুন।

মানুষের জন্য সতর্কতা

ব্রুসেলোসিস মানুষেরও হতে পারে।

তাই—

  • গ্লাভস ব্যবহার করুন।
  • কাঁচা দুধ পান করবেন না।
  • গর্ভপাত হওয়া প্রাণীর নিঃসরণ খালি হাতে স্পর্শ করবেন না।
  • জ্বর, দুর্বলতা বা শরীর ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

উপসংহার

গাভীর বারবার গর্ভপাত, যোনিপথ দিয়ে কুস বের হওয়া, গর্ভফুল আটকে যাওয়া বা দুর্বল বাছুর জন্ম নেওয়াকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। এগুলো ব্রুসেলোসিসের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত, আক্রান্ত প্রাণী পৃথকীকরণ, পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত রোগ নির্ণয় এবং কঠোর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।


FAQ

১। ব্রুসেলোসিস কী?

এটি Brucella ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট গবাদিপশুর একটি সংক্রামক রোগ, যা মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হতে পারে।

২। গাভীর কত মাসে গর্ভপাত হয়?

সাধারণত গর্ভধারণের ৫–৯ মাসের মধ্যে গর্ভপাত হয়।

৩। গর্ভপাতের আগে কি লক্ষণ দেখা যায়?

অনেক ক্ষেত্রে যোনিপথ দিয়ে লালচে বা আঠালো কুস বের হয়।

৪। ব্রুসেলোসিস কি মানুষে ছড়ায়?

হ্যাঁ। এটি একটি জুনোটিক রোগ।

৫। রোগটি কীভাবে নিশ্চিত করা হয়?

RBPT, ELISA, SAT অথবা PCR পরীক্ষার মাধ্যমে।

৬। আক্রান্ত গাভী কি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়?

সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করা কঠিন। তাই আক্রান্ত প্রাণীকে প্রজননে ব্যবহার না করাই নিরাপদ।

৭। প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?

নতুন প্রাণী পরীক্ষা করা, আক্রান্ত প্রাণী পৃথক রাখা, গর্ভপাতের বর্জ্য সঠিকভাবে ধ্বংস করা এবং খামারের বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করা।

Scroll to Top