Breaking News
গবাদী প্রাণীর রোগ ও স্বাস্থ্যবিধি
গবাদী প্রাণীর রোগ ও স্বাস্থ্যবিধি

গবাদি পশুর রোগ ও স্বাস্থ্যবিধি

গবাদি পশুর রোগ ও স্বাস্থ্যবিধি

১. গবাদি পশু সুস্থ থাকার লক্ষণ
· পশু তার পারিপার্শিবক অবস্থার প্রতি সর্তক থাকবে ও স্বাভাবিক ভাবে নড়াচড়া করবে।
· নাক, মুখ, চোখ পরিষ্কার ও উজ্জল থাকবে।
· শরীরের লোম মসৃণ ও চকচকে থাকবে।
· নাকের অগ্রভাগ ভেজা ভেজা ও বিন্দু বিন্দু ঘাম থাকবে।
· কান ও ওলান নড়াচড়া করে মশা-মাছি তাড়াবে।
· স্বাভাবিকভাবে খাওয়া দাওয়া করবে।
· জাবর কাটবে।
· পিপাসা স্বাভাবিক থাকবে।
· মল-মূত্র স্বাভাবিক থাকবে।
· শরীরের তাপ স্বাভাবিক থাকবে।
পশু অসুস্থ হলে উপরোক্ত অবস্থার ব্যাতিক্রম দেখা যাবে এবং যে রোগে আক্রান্ত হবে সেই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাবে।

২. রোগ জীবাণু ছড়ানোর মাধ্যম
পশুর দেহে বিভিন্ন ভাবে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে।

সাধারণতঃ মুখ-গহবর, নাসারন্ধ্র, চামড়ার ক্ষত, যোনি পথ, মল-মূত্র ত্যাগের রাস্তা, বাঁটের ছিদ্র, চোখ ইত্যাদির মাধ্যমে রোগের জীবাণু দেহের মধ্যে প্রবেশ করে।

গবাদি পশুর রোগ প্রতিরোধ করার জন্য রোগ জীবাণু ছড়ানোর উপায় সর্ম্পকে ধারণা থাকা দরকার।

সাধারণতঃ নিম্নোক্তভাবে রোগ জীবাণু ছড়িয়ে থাকে।
১। বাতাসের মাধ্যমেঃঅনেক মারাত্মক রোগের জীবাণু বাতাসের মাধ্যমে একস্থান থেকে অন্যস্থানে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন- ক্ষুরা রোগের জীবাণু ।
২। জীব জন্তু ও কীট পতঙ্গের মাধ্যমেঃকুকুর, বিড়াল, শৃগাল, বেজী, ইঁদুর, মশা, মাছি, বিভিন্ন কীট পতঙ্গ ইত্যাদি দ্বারা রোগ জীবাণু ছড়াতে পারে।
৩। বিভিন্ন ধরনের পাখীর মাধ্যমেঃকাক, চিল, শকুন ইত্যাদি নানা রকমের পাখীর মাধ্যমে রোগ জীবাণু ছড়াতে পারে।
৪। নদী, জলাশয়, বৃষ্টির পানি দ্বারাঃপ্রাণীর মৃতদেহ বা সংস্পর্শযুক্ত দ্রব্যাদি নদী, জলাশয় বা মাটিতে ফেলে রাখলে মৃতদেহ থেকে নিঃসৃত পদার্থ বা অন্যান্য দ্রব্যাদিতে লেগে থাকা রোগ জীবাণু পানির স্রোতে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
৫। হাট বাজারের পশু পাখী বা পশুজাত দ্রব্যাদির মাধ্যমেঃ অনেক সময় রোগাক্রান্ত বা সংস্পর্শযুক্ত পশুপাখি বিক্রয়ের জন্য হাট বাজারে নেওয়া হয়। এ সকল পশু পাখী পরিবহনের রাস্তা এবং বিক্রয় স্থলে রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। হাটে বাজারের অন্যান্য সুস্থ পশু পাখী রোগাক্রান্তদের সংস্পর্শে এসে সংক্রামিত হয় এবং এইভাবে রোগ বিস্তার লাভ করে। তাছাড়াও আমাদের দেশের লোকজনের অজ্ঞতার কারণে হাট বাজার ও অন্যান্য স্থানে রোগাক্রান্ত পশু পাখীর মাংশ বিক্রি হয়, এসবের মাধ্যমেও রোগ জীবাণু ছড়ায়।
৬। পশু পাখী বহনকারী যানবাহনের মাধ্যমেঃবাস, ট্রেন,লঞ্চ , ষ্টীমার, নৌকা, প্রভৃতি যোগে পশু পাখী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করার সময় রোগাক্রান্ত বা রোগের বাহক থেকে ঐ সব যান বাহনে রোগের জীবাণু লেগে যায় পরে অন্যান্য মালামাল, পশু পাখী বা মানুষের মাধ্যমে তা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
৭। পশুর চামড়া বা অন্যান্য দ্রব্য দ্বারাঃআমাদের দেশে রোগে মৃত পশু পাখী সাধারণতঃ মাঠে ঘাটে ফেলে দেওয়া হয় যা কোন ক্রমেই উচিত নয়। এ সব পশুর চামড়া, হাড় ও অন্যান্য দ্রব্যাদি মুচি বা অন্য লোকজন বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়, মৃত পশু যে রোগে মারা গাছে সে রোগের জীবাণু চামড়া, হাড় ও অন্যান্য দ্রব্যাদির মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে বিস্তার লাভ করে।
৮। পশু পাখীর পরিচর্যাকারী দ্বারাঃরোগাক্রান্ত পশুর পরিচর্যাকারী তার দেহ, পোষাক পরিচ্ছদ ও আনুসংগিক সরঞ্জামাদি দ্বারা রোগের জীবাণু অন্যত্র ছড়াতে পারে।
৯। পরিদর্শক দ্বারাঃখামার দেখতে বা বেড়াতে আসা লোকজনের মাধ্যমেও রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। যেখান থেকে তারা এসেছেন সেখানে সংক্রমক রোগের প্রাদুর্ভাব থাকলে সে সকল রোগের জীবাণু বিভিন্নভাবে তাদের সাথে আসে।
৩. সংক্রামক রোগের প্রতিরোধ ব্যবস্থা
সংক্রামক রোগের প্রতিরোধ করার জন্য নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১। নতুন ক্রয় করা বা অন্য কোন ভাবে সংগৃহীত পশুকে এনেই খামারের অন্যান্য পশুর সঙ্গে রাখা যাবে না। তিন সপ্তাহ সময় সেগুলোকে পৃথকভাবে রেখে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে যদি নতুন পশুর কোন রোগ লক্ষণ প্রকাশ না পায় তবেই খামারের পুরানো পশুর সঙ্গে রাখা যাবে।
২। বহিরাগত দর্শকদের খামারে প্রবেশের সময় পা জুতার তলা জীবাণুনাশক পদার্থ গুলানো পানিতে ডুবিয়ে নিতে হবে।
৩। যে সকল সংক্রামক রোগের প্রতিষেধক টিকা পাওয়া যায় সে সকল রোগের টিকা সঠিক সময়ে নিয়ম মত দিতে হবে। নিজের খামারে টিকা প্রদানের সাথে সাথে পার্শ্ববতী খামার বা পশু সমূহকেও একই টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪। পশুর খাদ্য টাটকা, নির্ভেজাল হতে হবে ও স্বাস্থ্য সম্মতভাবে নিজ খামারেই মিশ্রিত করতে হবে।
৫। কোন এলাকাতে সংক্রামক রোগ দেখা দিলে সে এলাকার পশু পাখী বা পশু পাখী জাত দ্রব্যাদি হাটে বাজারে বা ঐ এলাকার বাইরে যাতে যেতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৬। খামারে বন্য জন্তু প্রবেশ ও চলাচল বন্ধ করতে হবে। তাছাড়া মশা-মাছি ইঁদুর ও অন্যান্য কীট পতঙ্গ ধ্বংস করতে হবে।
৭। খামারের রোগাক্রান্ত পশুর চিকিৎসা করতে হবে, ভাল হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে তা জবাই করে পশু চিকিৎসকের মতে মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলে পশুর মরদেহ মাটির নীচে পুঁতে রাখতে হবে বা পুঁড়িয়ে ফেলতে হবে।

৪. সংক্রামক রোগ দেখা দিলে গৃহীত ব্যবস্থা সমূহ

১। পৃথক করণঃখামারে বা কোন বাড়িতে রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে রোগাক্রান্ত পশু পৃথক করতে হবে ও চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পশুর কাজ কর্ম করার জন্য যদি একজন লোকই থাকে তবে প্রথমে সুস্থ পশুর কাজ কর্ম ও খাদ্য প্রদান করে অসুস্থ বা আক্রান্ত পশুর সেবা করতে হবে। যদি কোন পশু রোগাক্রান্ত বলে সন্দেহ হয় তাকে পৃথক করে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
২। আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা অথবা নির্মূল করণঃযে সকল রোগের চিকিৎসা আছে এবং চিকিৎসা করলে ভাল হয়ে যায় সে সকল ক্ষেত্রে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে, কিন্তু যে রোগের চিকিৎসা করলেও পরিপূর্ণভাবে ভাল হয় না এবং রোগের বাহক হিসাবে পশুটির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে সে সব পশুকে জবাই করে মৃতদেহ পুঁড়িয়ে অথবা মাটির নীচে পুঁতে রাখতে হবে।
৩। রোগাক্রান্ত এলাকার পশু বিক্রয় না করাঃরোগ দেখা দিলেই অনেক লোকের মধ্যে রোগাক্রান্ত পশু পাখী বাজারে বিক্রয়ের প্রবণতা দেখা যায়, এর ফলে রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এ প্রবণতা অবশ্যই রোধ করতে হবে। রোগাক্রান্ত এলাকার পশু পাখী যেন বাজারে বা রাস্তায় বের না হতে পারে সেদিকে সবার দৃষ্টি রাখতে হবে।
৪। রোগাক্রান্ত পশু ও তার পরিচর্যাঃরোগাক্রান্ত পশুর সেবা বা আনুসাংগিক ব্যবস্থাপনা ভিন্ন লোক দ্বারা করানোই ভাল। রোগাক্রান্ত পশুর ঘরের সমস্ত কিছু পৃথক থাকতে হবে এবং তা সুস্থ পশুর ঘরে কখনই আনা যাবে না। রোগাক্রান্ত পশুর ঘরের ময়লা, আবর্জনা, খড়-কুটা সবই পুড়িয়ে ফেলাই উত্তম না হলে মাটিতে পুঁতে রাখতে হবে। প্রতিদিন ঘরে সুবিধাজনক কোন জীবাণু নাশক যেমন-স্যাভলন, আইওসান, ফিনাইল বা ডেটল ব্যবহার করতে হবে।
৫। মৃত দেহের সৎকারঃসংক্রামক রোগে আক্রান্ত পশু মারা গেলে তার দেহে প্রচুর পরিমাণে সংশি­ষ্ট রোগের জীবাণু থাকে। রোগে মরা পশুর মৃতদেহ পুঁড়িয়ে ফেলাই উত্তম না পারলে অবশ্যই মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। মৃত পশুর ঘরের সকল আসবাবপত্র সহ সংশি­ষ্ট অন্যান্য সকল কিছু এমনকি ঘরের দেওয়াল, বেড়া, সিলিং, সব কিছু জীবাণুনাশক মিশ্রিত পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে এবং এই ঘরে সঙ্গে সঙ্গে অন্য কোন সুস্থ পশু না তুলে কমপক্ষে ২-৩ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। মৃত পশু ঘর থেকে বের করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন পশুর দেহ থেকে কোন পদার্থ না পড়ে। এই সকল পদার্থে প্রচুর জীবাণু থাকে। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত মৃত পশুর চামড়া ছাড়ানো যাবে না। মৃত দেহ মাটিতে পোঁতার পর খেয়াল রাখতে হবে যেন কুকুর, শেয়াল বা অন্য কোন বন্য জন্তু তা তুলে না ফেলে। মাটি চাপা দেওয়ার আগে মৃত দেহের উপর চুন, সোডা অথবা ব্লি­চিং পাউডার ছিটিয়ে দিতে পারলে ভাল হয়।
৬। প্রচারঃসংক্রামক রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে এলাকার জন সাধারণকে সে রোগ সম্পর্কে সচেতন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য ঢোল, মাইক, প্রয়োজনে পত্র-পত্রিকায়, বেতার বা টেলিভিশনে প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে।

টিকার সঠিক ব্যবহারের জন্য বিবেচ্য বিষয়
১। যথাযথ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা
২। ভ্যাকসিনের শিশি বা ভায়াল কখনোই সরাসরি সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসবে না।
৩। সকালে অথবা সন্ধ্যায় যখন সূর্যের আলোর তীব্রতা কম থাকে তখনই টিকা প্রদান কর্মসূচি শুরু করতে হবে।
৪। সূর্যের আলোর সংস্পর্শে এড়িয়ে প্রস্ত্ততকারক কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের নির্দেশ মতো টিকা তৈরি করতে হবে।
৫। টিকা গোলানোর পর অতিদ্রুত ছায়াযুক্ত স্থানে বসে টিকা সঠিক পদ্ধতিতে ও সঠিক মাত্রায় স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে প্রয়োগ করা উচিত।
৬। অসুস্থ গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগিকে কখনোই টিকা প্রদান করা উচিত নয়।
৭। শীতকালে ভ্যাকসিন তৈরির ২ ঘন্টার ও গরম কালে ১ ঘন্টার ভিতর প্রয়োগ করতে হয়। টিকা প্রদানের বিলম্ব হলে গোলানো টিকার পাত্রের পাশে কিছুক্ষণ পর পর ঠান্ডা পানি অথবা বরফের টুকরা রাখতে হবে।

সারণী ২৫.১ গবাদি পশুর বিভিন্ন রোগের টিকা প্রদানের শিডিউল
টিকার নাম মাত্রা কতদিন পর পর কোন বয়সে প্রয়োগ সংরক্ষণ তাপমাত্রা
১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬
তড়কা 

গরু/মহিষ/ ঘোড়া ১ সিসি ১ বছর ৪ মাস ত্বকের নিচে ৪০ সে.
বাদলা ()

বাছুর ৫ সিসি, ভেড়া/ছাগল ২ সিসি ৬ মাস ৪ মাস ত্বকের নিচে ৪-৮০ সে.

ক্ষুরারোগ

ক) মনোভ্যালেন্ট
খ) বাই ভ্যালেট
৩২ মাত্রা ভায়েল

১৬ মাত্রা ভায়েল ৪ মাস ৪ মাস ত্বকের নিচে ৪-৮০ সে.

গলাফুলা

গরু ও মহিষ ২ সিসি ১ বছর ৬ মাস ত্বকের নিচে ২-৪০ সে.
রিল্ডারপেস্ট

গরু ও মহিষ ১ সিসি কয়েক বছর প্রতি বছর ত্বকের নিচে ৪-৮০ সে.
জলাতঙ্ক

কুকুর ৩ সিসি; গরু, মহিষ, বানর-৬ সিসি; বিড়াল-১.৫ সিসি ১ বছর
মাংসে -২০০ সে.
অ্যান্টি র‌্যাবিস

ক) কুকুর/বিড়াল (৩০ পাঃ ওজন)-৫ সিসি/দিন-৭ দিন
খ) কুকুর/বাছুর/ভেড়া/ছাগল-১০ সিসি/দিন-৭ দিন
গ) ঘোড়া/গাভী/মহিষ-৩০ সিসি/দিন ১৪ দিন
ঘ) বকনা/গাধা-২০ সিসি/দিন-১৪ দিন
ঙ) হাতি/উট-৬০ সিসি/দিন-১৪ দিন ১ বছর (১ মাস পর বুষ্টার ডোজ)
মাংসে -২০০ সে.

সংগ্রহিত।

Please follow and like us:

About admin

Check Also

নবজাতক বাছুরের যত্ন ও করণীয় :

নবজাতক বাছুরের যত্ন ও করণীয় : স্তন্যপায়ী প্রায় সকল প্রাণীর জন্মপ্রক্রিয়া প্রায় একই হলেও কিছু …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Translate »
error: Content is protected !!