লেপ্টোস্পাইরোসিস LEPTOSPIROSIS

লেপ্টোস্পাইরোসিস (Leptospirosis) রোগ: গরুর গর্ভপাতের অন্যতম কারণ | কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

গবাদিপশুর প্রজননজনিত রোগগুলোর মধ্যে লেপ্টোস্পাইরোসিস (Leptospirosis) একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়াজনিত জুনোটিক (Zoonotic) রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হলে গাভীর গর্ভপাত, বাচ্চা দুর্বল জন্মানো, বন্ধ্যাত্ব, দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়া এটি মানুষেরও সংক্রমিত হতে পারে, তাই রোগটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


লেপ্টোস্পাইরোসিস কী?

লেপ্টোস্পাইরোসিস হলো Leptospira গণভুক্ত ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট একটি সংক্রামক রোগ। এটি গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, কুকুর, শূকর, ঘোড়া, বিড়ালসহ মানুষেরও হতে পারে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এই রোগের উপস্থিতি রয়েছে।


রোগের কারণ

Leptospira গণের বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার কারণে এই রোগ হয়। এসব জীবাণু রক্তে সংক্রমণ (Septicemia), কিডনির প্রদাহ (Nephritis), রক্তকণিকা ধ্বংস (Hemolytic anemia), গর্ভপাত এবং প্রজননজনিত বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করে।

Leptospira প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত—

১. Leptospira biflexa

  • অ-প্যাথোজেনিক (Non-pathogenic)
  • সাধারণত রোগ সৃষ্টি করে না।

২. Leptospira interrogans

  • প্যাথোজেনিক (Pathogenic)
  • গবাদিপশু ও মানুষের রোগের প্রধান কারণ।

গুরুত্বপূর্ণ Serovar

কিছু গুরুত্বপূর্ণ রোগ সৃষ্টিকারী Serovar হলো—

  • L. interrogans serovar Pomona – গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, কুকুর, শূকর, ঘোড়া, বিড়াল ও মানুষ।
  • L. interrogans serovar Hardjo – গরু, মহিষ ও মানুষ।
  • L. interrogans serovar Tarassovi – গরু ও শূকর।
  • L. interrogans serovar Canicola – কুকুর, মানুষ ও শূকর।
  • L. interrogans serovar Grippotyphosa – গরু, ছাগল, ঘোড়া, শূকর ও বিড়াল।

কীভাবে রোগ ছড়ায়?

রোগটি সাধারণত ছড়ায়—

  • আক্রান্ত প্রাণীর প্রস্রাবের মাধ্যমে।
  • দূষিত পানি ও কাদার মাধ্যমে।
  • গর্ভপাত হওয়া ভ্রূণ ও প্লাসেন্টার সংস্পর্শে।
  • আক্রান্ত প্রাণীর জরায়ুর নিঃসরণ দ্বারা।
  • ইঁদুর, কুকুরসহ বিভিন্ন বাহক প্রাণীর মাধ্যমে।

গরুতে লেপ্টোস্পাইরোসিসের লক্ষণ

গরুতে রোগের লক্ষণ সব সময় একই রকম হয় না। তবে সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

  • গর্ভধারণের ৬–৯ মাসের মধ্যে গর্ভপাত।
  • মৃত বা দুর্বল বাছুর জন্মানো।
  • জ্বর।
  • জন্ডিস।
  • ডায়রিয়া।
  • ক্ষুধামন্দা।
  • অতিরিক্ত পানি পান করা।
  • প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া।
  • দুর্বলতা ও অবসন্নতা।
  • দুধ উৎপাদন হঠাৎ কমে যাওয়া।

রোগ নির্ণয়

শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

রোগ নির্ণয়ের জন্য—

  • রোগের ইতিহাস জানতে হবে।
  • গর্ভপাতের ইতিহাস মূল্যায়ন করতে হবে।
  • রক্ত পরীক্ষা (Serology/MAT/ELISA)।
  • PCR বা কালচার পরীক্ষার মাধ্যমে জীবাণু শনাক্ত করা যেতে পারে।

চিকিৎসা

সতর্কতা: নিচের চিকিৎসাগুলো অবশ্যই নিবন্ধিত ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী করতে হবে।

অ্যান্টিবায়োটিক

অক্সিটেট্রাসাইক্লিন গ্রুপের ওষুধ যেমন—

  • Renamycin-100 (Oxytetracycline)

প্রয়োজন অনুযায়ী ৩–৫ দিন ব্যবহার করা যেতে পারে।


জরায়ু পরিষ্কার

গর্ভপাতের পর প্রয়োজনে জীবাণুনাশক দ্রবণ দিয়ে জরায়ু পরিষ্কার (Uterine lavage) করা যেতে পারে।


মেট্রোনিডাজল

কিছু ক্ষেত্রে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী Metronidazole ব্যবহার করা হয়।

সতর্কতা: গর্ভাবস্থায় ও দুধ উৎপাদনকালীন সময়ে Metronidazole ব্যবহার করা উচিত নয়।


প্রতিরোধ ব্যবস্থা

লেপ্টোস্পাইরোসিস প্রতিরোধে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি—

  • খামারে কুকুর ও ইঁদুরের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা।
  • আক্রান্ত প্রাণী দ্রুত আলাদা রাখা।
  • গর্ভপাত হওয়া ভ্রূণ, প্লাসেন্টা ও জরায়ুর নিঃসরণ নিরাপদভাবে মাটিতে পুঁতে ফেলা বা পুড়িয়ে ধ্বংস করা।
  • গর্ভপাতের স্থান জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা।
  • খামারের পানি ও পরিবেশ পরিষ্কার রাখা।
  • যেখানে ভ্যাকসিন পাওয়া যায় সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদান বিবেচনা করা।
  • নতুন গবাদিপশু খামারে আনার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা।

মানুষ কি আক্রান্ত হতে পারে?

হ্যাঁ।

লেপ্টোস্পাইরোসিস একটি Zoonotic disease। আক্রান্ত প্রাণীর প্রস্রাব, গর্ভপাতের নিঃসরণ বা দূষিত পানির সংস্পর্শে মানুষও আক্রান্ত হতে পারে। তাই আক্রান্ত পশু পরিচালনার সময় অবশ্যই গ্লাভস, বুট ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করা উচিত।


খামারিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

  • বারবার গর্ভপাত হলে শুধু চিকিৎসা না করে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করান।
  • গর্ভপাত হওয়া ভ্রূণ কখনো খোলা স্থানে ফেলে রাখবেন না।
  • আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখুন।
  • নিজে ও খামারের কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করুন।
  • নিবন্ধিত ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করবেন না।

FAQ

১. লেপ্টোস্পাইরোসিস কী?

এটি Leptospira ব্যাকটেরিয়ার কারণে হওয়া একটি সংক্রামক জুনোটিক রোগ।

২. গাভীর গর্ভপাতের অন্যতম কারণ কি লেপ্টোস্পাইরোসিস?

হ্যাঁ। বিশেষ করে গর্ভধারণের শেষার্ধে গর্ভপাতের অন্যতম কারণ এটি।

৩. এই রোগ কি মানুষের হয়?

হ্যাঁ। এটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে।

৪. কোন প্রাণী রোগটি বেশি ছড়ায়?

কুকুর ও ইঁদুরসহ বিভিন্ন বন্য ও গৃহপালিত প্রাণী জীবাণু বহন করতে পারে।

৫. আক্রান্ত গাভীর দুধ কমে যায় কি?

হ্যাঁ। অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ দুধ উৎপাদন কমে যায়।

৬. গর্ভপাতের পর কী করতে হবে?

ভ্রূণ ও প্লাসেন্টা নিরাপদভাবে ধ্বংস করতে হবে এবং স্থান জীবাণুমুক্ত করতে হবে।

৭. রোগটি কি সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব?

সঠিক বায়োসিকিউরিটি, বাহক প্রাণী নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় টিকাদানের মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো যায়।

Scroll to Top