লাম্পি স্কিন ডিজিজ (LSD) গরুর রোগ: লক্ষণ, চিকিৎসা, টিকা ও প্রতিরোধ

লাম্পি স্কিন ডিজিজ (Lumpy Skin Disease – LSD) | গরুর ত্বকে গুটি রোগ: লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

 


লাম্পি স্কিন ডিজিজ (LSD) কী?

লাম্পি স্কিন ডিজিজ (Lumpy Skin Disease বা LSD) গরুর একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা মূলত ত্বকে শক্ত শক্ত গুটি (Lump/Nodule) সৃষ্টি করে। এটি শুধু ত্বকের রোগ নয়, বরং পুরো শরীরের রোগ। আক্রান্ত গরুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, দুধ উৎপাদন হ্রাস পায়, প্রজনন সমস্যা দেখা দেয় এবং চামড়া নষ্ট হওয়ায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।


রোগের ইতিহাস

  • ১৯২৯ সালে প্রথম জাম্বিয়ায় মহামারী আকারে রোগটি শনাক্ত হয়।
  • পরে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে এবং আফ্রিকার অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
  • পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে।
  • বর্তমানে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে এটি গুরুত্বপূর্ণ গবাদিপশুর রোগ।

রোগের কারণ

লাম্পি স্কিন ডিজিজের কারণ Lumpy Skin Disease Virus (LSDV)

  • পরিবার: Poxviridae
  • গণ: Capripoxvirus

একই গণের অন্তর্ভুক্ত আরও দুটি ভাইরাস হলো—

  • Sheep Pox Virus
  • Goat Pox Virus

এটি একটি Double-stranded DNA Virus


কোন গরু বেশি আক্রান্ত হয়?

সব বয়সের গরু আক্রান্ত হতে পারে। তবে ঝুঁকি বেশি থাকে—

  • বাছুর
  • দুগ্ধবতী গাভী
  • উচ্চ উৎপাদনশীল বিদেশি জাত (Friesian, Jersey)

দেশি (Bos indicus) গরু তুলনামূলক কম আক্রান্ত হয়।


কীভাবে রোগ ছড়ায়?

লাম্পি স্কিন ডিজিজ প্রধানত রক্তচোষা পোকামাকড়ের মাধ্যমে ছড়ায়।

বিশেষ করে—

  • মশা
  • মাছি
  • স্টেবল ফ্লাই (Stomoxys calcitrans)

এছাড়াও—

  • আক্রান্ত প্রাণীর লালা
  • ক্ষতস্থান
  • দুধ
  • বীর্য

থেকেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।


ইনকিউবেশন পিরিয়ড

ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ৪–১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে ৭–১৯ দিন পর ত্বকে গুটি দেখা যায়।


লক্ষণ

লাম্পি স্কিন ডিজিজের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

✔ জ্বর

  • ৪০–৪১° সেলসিয়াস পর্যন্ত জ্বর
  • ৫–৭ দিন স্থায়ী হতে পারে

✔ ত্বকে শক্ত গুটি (Nodule)

বিশেষ করে—

  • মাথা
  • ঘাড়
  • কাঁধ
  • পিঠ
  • ওলান
  • অণ্ডকোষ
  • ভালভা
  • পেরিনিয়াম

এগুলোতে বেশি দেখা যায়।


✔ লিম্ফ নোড ফুলে যায়

বিশেষ করে বাহ্যিক লিম্ফ নোড বড় হয়ে যায়।


✔ চোখ ও নাক

  • চোখ দিয়ে পানি পড়ে
  • কনজাংকটিভাইটিস
  • কেরাটাইটিস
  • নাক দিয়ে মিউকাস বা পরে পুঁজ বের হতে পারে

✔ মুখের ভেতরে ক্ষত

মুখের মিউকাস ঝিল্লিতে গুটি হলে—

  • খেতে কষ্ট হয়
  • চিবাতে ব্যথা হয়
  • ক্ষুধা কমে যায়

✔ পা ফুলে যাওয়া

Plasma জমে—

  • পা ফুলে যায়
  • Brisket ফুলে যেতে পারে
  • গরু খুঁড়িয়ে হাঁটে

✔ উৎপাদন কমে যায়

  • দুধ কমে যায়
  • ওজন কমে যায়
  • দুর্বল হয়ে পড়ে
  • উর্বরতা কমে যায়
  • গর্ভপাত হতে পারে

নোডিউলের পরিবর্তন

প্রথমে—

  • শক্ত গুটি

পরে—

  • ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে পুঁজ হয়

২–৩ সপ্তাহ পরে—

  • মৃত টিস্যু তৈরি হয়
  • খোসা উঠে যায়
  • গভীর গর্তের মতো ক্ষত তৈরি হয়

এটিকে Sitfast lesion বলা হয়।


মৃত্যুহার

  • আক্রান্ত হওয়ার হার: ৫–৫০%
  • মৃত্যুহার সাধারণত কম

তবে দুর্বল গরু ও বাছুরে জটিলতা বেশি হতে পারে।


অর্থনৈতিক ক্ষতি

LSD-কে অর্থনৈতিক রোগ বলা হয় কারণ—

  • দুধ কমে যায়
  • চামড়ার মান নষ্ট হয়
  • প্রজনন কমে যায়
  • চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে
  • বাজার মূল্য কমে যায়

রোগ নির্ণয়

লক্ষণ দেখে সন্দেহ করা গেলেও নিশ্চিত হওয়ার জন্য—

  • Skin nodule sample
  • PCR
  • Virus isolation
  • Laboratory diagnosis

করা উচিত।


সিউডো লাম্পি স্কিন ডিজিজ

অনেক সময় Bovine Herpesvirus-2 দ্বারা সৃষ্ট রোগকে ভুল করে LSD মনে করা হয়।

এটি সাধারণত—

  • বাঁট
  • ওলান

এ বেশি হয়।

তাই পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।


চিকিৎসা

LSD একটি ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হলো জটিলতা কমানো, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা।

১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

  • Andopan Powder
  • FRA-C 12
  • Lysovit
  • Vitamin C

২. Secondary bacterial infection নিয়ন্ত্রণ

প্রয়োজনে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী—

  • Amoxicillin
  • Ceftriaxone
  • Ceftiofur
  • Penicillin

এর মধ্যে যেকোনো একটি ব্যবহার করা যেতে পারে।


৩. Antihistaminic

অ্যালার্জি ও ফোলাভাব কমাতে ব্যবহার করা যেতে পারে।


৪. জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণ

প্রয়োজনে—

  • Tolfenamic Acid
  • Ketoprofen
  • Paracetamol + Meloxicam

ব্যবহার করা যায়।


৫. ক্ষতস্থানের পরিচর্যা

যদি গুটি ফেটে যায়—

  • Sumid Vet Powder
  • Negutox Powder

ব্যবহার করা যেতে পারে।


৬. পরজীবী নিয়ন্ত্রণ

প্রয়োজনে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী Ivermectin ব্যবহার করা যেতে পারে।


শেড ব্যবস্থাপনা

  • নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করুন।
  • Potassium permanganate (পটাশ) মিশ্রিত পানি দিয়ে পরিষ্কার করা যেতে পারে।
  • সপ্তাহে অন্তত ২ বার জীবাণুনাশক ব্যবহার করুন।
  • মশা ও মাছি নিয়ন্ত্রণ করুন।
  • আক্রান্ত গরুকে আলাদা রাখুন।
  • মশারি ব্যবহার করলে রোগ ছড়ানো অনেক কমে।

খাবার ও পানি

  • পরিষ্কার পানি দিন।
  • সুষম খাদ্য দিন।
  • কিছু খামারি প্রতি লিটার পানিতে ১০–১৫ গ্রাম খাবার সোডা ব্যবহার করে ভালো ফল পান, তবে এটি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত।

টিকা

বর্তমানে অনেক দেশে LSD প্রতিরোধে নির্দিষ্ট টিকা ব্যবহৃত হয়।

  • বছরে ১ বার টিকা দেওয়া উত্তম।
  • আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়া গরুতে দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
  • আক্রান্ত গাভীর বাছুরে মাতৃ অ্যান্টিবডি থাকার কারণে প্রথম কয়েক মাস টিকার সময়সূচি ভিন্ন হতে পারে।

স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী টিকাদান করা উচিত।


প্রতিরোধ

✔ নিয়মিত টিকা দিন।

✔ মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণ করুন।

✔ আক্রান্ত গরুকে আলাদা রাখুন।

✔ খামার জীবাণুমুক্ত রাখুন।

✔ নতুন গরু আনার আগে কোয়ারেন্টাইনে রাখুন।

✔ সুষম খাদ্য ও পরিষ্কার পানি নিশ্চিত করুন।

✔ দ্রুত ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নিন।


উপসংহার

লাম্পি স্কিন ডিজিজ বর্তমানে গরুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাসজনিত রোগ। রোগটি সাধারণত মৃত্যুর চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি করে। তাই সময়মতো রোগ শনাক্ত করা, আক্রান্ত গরুকে আলাদা রাখা, মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণ, সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত টিকাদানই এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

FAQ

১। লাম্পি স্কিন ডিজিজ (LSD) কী?

লাম্পি স্কিন ডিজিজ (LSD) গরুর একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যেখানে শরীরের বিভিন্ন স্থানে শক্ত গুটি (Nodule) তৈরি হয় এবং দুধ উৎপাদন, প্রজনন ও চামড়ার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


২। লাম্পি স্কিন ডিজিজের কারণ কী?

এই রোগের কারণ Lumpy Skin Disease Virus (LSDV), যা Capripoxvirus গণ এবং Poxviridae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।


৩। কীভাবে রোগটি ছড়ায়?

প্রধানত মশা, মাছি ও অন্যান্য রক্তচোষা পোকামাকড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এছাড়া আক্রান্ত প্রাণীর লালা, ক্ষতস্থান, দুধ ও বীর্যের মাধ্যমেও সংক্রমণ হতে পারে।


৪। লাম্পি স্কিন ডিজিজের প্রধান লক্ষণ কী?

উচ্চ জ্বর, শরীরে শক্ত গুটি, লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া, চোখ ও নাক দিয়ে স্রাব, পা ফুলে যাওয়া, খুঁড়িয়ে হাঁটা, ক্ষুধামন্দা এবং দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া।


৫। কোন গরু বেশি আক্রান্ত হয়?

সব বয়সের গরু আক্রান্ত হতে পারে, তবে বাছুর, দুগ্ধবতী গাভী এবং উচ্চ উৎপাদনশীল বিদেশি জাতের গরুতে ঝুঁকি বেশি।


৬। লাম্পি স্কিন ডিজিজের নির্দিষ্ট চিকিৎসা আছে কি?

এটি ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। সহায়ক চিকিৎসা, সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষত পরিচর্যা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থাই মূল চিকিৎসা।


৭। লাম্পি স্কিন ডিজিজে কোন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়?

অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসকে মারে না। তবে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হলে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী Amoxicillin, Ceftriaxone, Ceftiofur বা Penicillin ব্যবহার করা যেতে পারে।


৮। লাম্পি স্কিন ডিজিজে টিকা কতটা কার্যকর?

নিয়মিত টিকাদান রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে টিকা দেওয়া উচিত।


৯। আক্রান্ত গরুকে কীভাবে আলাদা রাখতে হবে?

আক্রান্ত গরুকে পৃথক শেডে রাখতে হবে, মশা-মাছি থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং একই সরঞ্জাম অন্য গরুর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত নয়।


১০। লাম্পি স্কিন ডিজিজ কি মানুষের মধ্যে ছড়ায়?

বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী লাম্পি স্কিন ডিজিজ মানুষের রোগ নয় এবং সাধারণত মানুষে সংক্রমিত হয় না। তবে অসুস্থ প্রাণী পরিচালনার সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উচিত।


১১। লাম্পি স্কিন ডিজিজে মৃত্যুহার কত?

সাধারণত মৃত্যুহার কম হলেও দুর্বল, অপুষ্ট বা জটিল সংক্রমণে আক্রান্ত গরুর ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।


১২। লাম্পি স্কিন ডিজিজ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?

নিয়মিত টিকাদান, মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণ, আক্রান্ত গরু আলাদা রাখা, খামার জীবাণুমুক্ত রাখা, সুষম খাদ্য প্রদান এবং দ্রুত ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ গ্রহণই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

Scroll to Top