কবুতরের ডিম: ডিম পাড়া, তা দেওয়া, ডিম পরীক্ষা ও বাচ্চা ফোটানোর সম্পূর্ণ গাইড
কবুতর পালনে সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে ডিমের সঠিক পরিচর্যা, ইনকিউবেশন (তা দেওয়া) এবং বাচ্চা ফোটানোর সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর। অনেক সময় সামান্য অসাবধানতার কারণে উর্বর (Fertile) ডিম থেকেও বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়।
এই লেখায় কবুতরের ডিম সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।
কবুতর সাধারণত কখন ডিম পাড়ে?
সাধারণভাবে সফলভাবে জোড়া বাঁধার ৮–১৫ দিনের মধ্যে স্ত্রী কবুতর প্রথম ডিম পাড়ে। তবে জাত, বয়স, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের কারণে এই সময় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
ডিম পাড়ার ১–২ দিন আগে স্ত্রী কবুতর বাসায় বেশি সময় অবস্থান করে এবং অস্থির আচরণ করতে পারে।
যদি মুক্তভাবে পালন করা হয়, তাহলে নর ও মাদি উভয়েই—
- খড়
- শুকনো পাতা
- ছোট ডাল
দিয়ে বাসা তৈরি করে।
সাধারণত স্ত্রী কবুতর দুটি ডিম পাড়ে এবং দ্বিতীয় ডিমটি প্রথম ডিমের প্রায় ৪০–৪৮ ঘণ্টা পরে দেয়।
ডিমে তা দেওয়া
ডিম পাড়ার পর নর ও মাদি উভয় কবুতর পালাক্রমে তা দেয়।
সাধারণত ১৭–১৯ দিনের মধ্যে বাচ্চা ফুটে।
১. পরিষ্কার বাসা বা নেস্ট বক্স ব্যবহার করুন
ডিম দেওয়ার আগে—
- পরিষ্কার নেস্ট বাটি ব্যবহার করুন।
- নরম কাপড়, নারিকেলের ছোবড়া, কাঠের গুঁড়া বা পরিষ্কার খড় ব্যবহার করা যেতে পারে।
- নেস্টের মাঝখান সামান্য নিচু রাখুন যাতে ডিম গড়িয়ে না যায়।
২. ডিম পাড়ার তারিখ লিখে রাখুন
প্রতিটি ডিম পাড়ার তারিখ লিখে রাখলে—
- হ্যাচিং তারিখ অনুমান করা সহজ হয়।
- ডিম পরীক্ষা করার সময় জানা যায়।
- সমস্যা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
৩. দুটি ডিম একসঙ্গে তা দেওয়া
অনেক খামারি প্রথম ডিমটি সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করে দ্বিতীয় ডিম পাড়ার পর আবার নেস্টে ফিরিয়ে দেন।
এর ফলে দুটি ডিম থেকে বাচ্চা প্রায় একই সময়ে ফুটতে পারে এবং বড়-ছোট বাচ্চার পার্থক্য কম হয়।
তবে—
- ডিম সংরক্ষণের সময় সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে।
- ভুলভাবে সংরক্ষণ করলে ডিম নষ্ট হতে পারে।
শখের পালনকারীরা অভিজ্ঞতা না থাকলে এই পদ্ধতি না অনুসরণ করাই ভালো।
৪. পাতলা খোসার ডিম
পাতলা খোসার ডিম সাধারণত হতে পারে—
- ক্যালসিয়ামের ঘাটতি
- ভিটামিন D₃-এর অভাব
- বয়সজনিত সমস্যা
- অতিরিক্ত স্ট্রেস
- প্রথমবার ডিম দেওয়া
এ ধরনের ডিম সহজেই ভেঙে যেতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চা ফুটে না।
৫. তিনটি ডিম দিলে কী করবেন?
কিছু ক্ষেত্রে স্ত্রী কবুতর তিনটি ডিম দিতে পারে, যদিও এটি খুবই বিরল।
যদি তিনটি ডিমই উর্বর হয়, তাহলে বাচ্চা ফুটতে পারে। তবে তিনটি বাচ্চা সফলভাবে বড় করতে অতিরিক্ত পরিচর্যা প্রয়োজন হতে পারে।
৬. চারটি ডিম কেন দেখা যায়?
যদি একটি নেস্টে চারটি ডিম পাওয়া যায়, তাহলে সম্ভাব্য কারণ—
- একই নেস্টে দুইটি স্ত্রী কবুতর ডিম দিয়েছে।
- নেস্ট ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হয়েছে।
শুধুমাত্র চারটি ডিম দেখেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে দুইটিই স্ত্রী কবুতর।
৭. ডিম উর্বর (Fertile) কি না পরীক্ষা করবেন কীভাবে?
ডিম পাড়ার ৫–৭ দিন পরে ক্যান্ডলিং (Candling) করুন।
যদি দেখা যায়—
- লাল রক্তনালী রয়েছে
- ভ্রূণ দেখা যাচ্ছে
তাহলে ডিমটি উর্বর।
যদি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ থাকে এবং কোনো পরিবর্তন না দেখা যায়, তাহলে সেটি অনুর্বর (Infertile) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
৮. ডিম পরীক্ষা করার সময় সতর্কতা
ডিম পরীক্ষা করার সময়—
- কবুতরকে ভয় দেখাবেন না।
- পরিষ্কার হাতে ডিম ধরুন।
- ডিম ঝাঁকাবেন না।
- দীর্ঘ সময় বাইরে রাখবেন না।
৯. ১৬–১৭ দিনে কী করবেন?
এই সময় বাচ্চা ডিমের ভেতরে সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে যায়।
অনেক সময় ডিমে হালকা শব্দ শোনা যেতে পারে, তবে সব ডিমে এটি শোনা যায় না।
১০. বাচ্চা ফুটলে কী করবেন?
বাচ্চা স্বাভাবিকভাবে ডিম ভেঙে বের হলে কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয় না।
খালি ডিমের খোসা নেস্ট থেকে সরিয়ে ফেলুন।
১১. বাচ্চা বের হতে দেরি হলে
যদি দীর্ঘ সময় ধরে বাচ্চা বের হতে না পারে, তখন জোর করে ডিম ভাঙা উচিত নয়।
শুধুমাত্র তখনই সহায়তা করা উচিত যখন—
- বাচ্চা জীবিত আছে,
- দীর্ঘ সময় ধরে একই অবস্থায় রয়েছে,
- এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ পাওয়া যায়।
অপ্রয়োজনীয়ভাবে ডিম ভাঙলে বাচ্চার মৃত্যু হতে পারে।
১২. নাভির যত্ন
যদি সহায়তার মাধ্যমে বাচ্চা বের করা হয় এবং নাভি খোলা থাকে, তাহলে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করা যেতে পারে।
উপসংহার
কবুতরের ডিমের সফল হ্যাচিং নিশ্চিত করতে হলে পরিষ্কার বাসা, সঠিক পুষ্টি, পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং অযথা ডিম না নাড়াচাড়া করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কবুতর নিজেরাই সফলভাবে ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটাতে সক্ষম হয়। তাই অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ না করে শুধু প্রয়োজনীয় সময়ে সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করাই উত্তম।
১। কবুতর সাধারণত কয়টি ডিম পাড়ে?
সাধারণত একটি ক্লাচে ২টি ডিম পাড়ে।
২। কবুতরের ডিম ফুটতে কত দিন লাগে?
সাধারণত ১৭–১৯ দিন সময় লাগে।
৩। ডিম উর্বর কি না কীভাবে বুঝবেন?
ডিম পাড়ার ৫–৭ দিন পরে ক্যান্ডলিং করলে রক্তনালী বা ভ্রূণ দেখা গেলে সেটি উর্বর ডিম।
৪। পাতলা খোসার ডিম কেন হয়?
ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন D₃-এর ঘাটতি, স্ট্রেস, বয়স বা প্রথমবার ডিম দেওয়ার কারণে হতে পারে।
৫। ডিম ফুটতে দেরি হলে কি জোর করে বাচ্চা বের করা উচিত?
না। প্রয়োজন ছাড়া ডিম ভাঙা উচিত নয়। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী সহায়তা করতে হবে।




