বাংলাদেশের তিতির পাখি: জলার তিতির ও চিনা তিতিরের পরিচিতি, স্বভাব, খাদ্য ও প্রজনন (২য় পর্ব)

বাংলাদেশের তিতির পাখি: জলার তিতির ও চিনা তিতিরের পরিচিতি, স্বভাব, খাদ্য ও প্রজনন (২য় পর্ব)

প্রথম পর্বে আমরা কালো তিতির (Black Francolin) সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছি। এই পর্বে আলোচনা করা হবে জলার তিতির (Swamp Francolin) এবং চিনা তিতির সম্পর্কে। আবাসস্থল, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস, আচরণ ও প্রজননের দিক থেকে এই দুই প্রজাতির রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।


জলার তিতির (Swamp Francolin)

জলার তিতিরের বৈজ্ঞানিক নাম Francolinus gularis। এটি এশিয়ার অন্যতম বড় আকারের তিতির প্রজাতি।

বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা এবং নদীসংলগ্ন জলাভূমি এদের প্রধান আবাসস্থল। নেপালে এদের বেশি দেখা যায় তরাই অঞ্চলে।


শারীরিক বৈশিষ্ট্য

জলার তিতিরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৭ সেন্টিমিটার, যা অন্যান্য তিতিরের তুলনায় কিছুটা বড়।

এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—

  • পিঠ ও ডানা কালচে-বাদামি।
  • পিঠে অসংখ্য সূক্ষ্ম সাদা ডোরা থাকে।
  • বুক ও পেটে বড় বড় সাদা দাগ থাকে।
  • গলা লালচে-কমলা।
  • চোখের চারপাশ ও ঠোঁটের গোড়া সাদা।
  • পা লালচে।
  • স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে প্রায় একই রকম।

তবে পুরুষের পা অপেক্ষাকৃত গাঢ় এবং পায়ের স্পার (গজাল) বেশি স্পষ্ট।


আবাসস্থল

জলার তিতির সাধারণত বসবাস করে—

  • জলাভূমি
  • নদীর তীরবর্তী তৃণভূমি
  • ধানক্ষেত
  • আখক্ষেত
  • বনসংলগ্ন ঘাসভূমি
  • ঝোপঝাড়

লম্বা পা থাকায় কাদামাটি ও জলাভূমিতে সহজে চলাফেরা করতে পারে।


খাদ্যাভ্যাস

জলার তিতির সর্বভুক স্বভাবের।

এদের প্রধান খাদ্য—

  • বিভিন্ন বীজ
  • কচি উদ্ভিদ
  • ঘাস
  • পোকামাকড়
  • কেঁচো
  • শামুক
  • ঝিনুক
  • ছোট চিংড়ি
  • ছোট মাছ
  • ছোট কাঁকড়া

স্বভাব ও আচরণ

জলার তিতির সাধারণত ভোর ও বিকেলে বেশি সক্রিয় থাকে।

এদের ডাক অনেকটা—

“চুঁইল… চুঁইল… চুঁইল…”

খুব দ্রুত পরপর এই ডাক শোনা যায়, যা সহজেই অন্য পাখির ডাক থেকে আলাদা করা যায়।


প্রজনন

অঞ্চলভেদে ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এদের প্রজনন মৌসুম।

ঘাস ও আগাছা দিয়ে মাটির কাছাকাছি শক্ত বাসা তৈরি করে।

একটি স্ত্রী জলার তিতির সাধারণত ২–৮টি ডিম দেয়, তবে গড়ে ৪টি ডিম বেশি দেখা যায়।


চিনা তিতির

চিনা তিতির সৌন্দর্যের জন্য তিতির প্রজাতির মধ্যে বিশেষভাবে পরিচিত। আকারে এটি ছোট মুরগির মতো হলেও রঙিন পালক এবং সুন্দর নকশার জন্য সহজেই আলাদা করা যায়।


শারীরিক বৈশিষ্ট্য

চিনা তিতিরের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য—

  • থুতনি ও গাল সাদা।
  • মাঝখানে কালো বিভাজক দাগ।
  • কালো ভ্রু।
  • লালচে-বাদামি মাথা।
  • কালো-সাদা ফোঁটাযুক্ত শরীর।
  • বাদামি বগল।
  • সাদা পিঠে সূক্ষ্ম কালো দাগ।
  • ছোট কালো লেজ।
  • হলদে-কমলা পা।
  • কালো চোখ।
  • সীসা রঙের ঠোঁট।

পুরুষ ও স্ত্রী চিনা তিতিরের পার্থক্য

পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে অনেকটাই একই রকম।

তবে—

  • স্ত্রী পাখির রঙ কিছুটা ফ্যাকাসে।
  • পুরুষের পায়ে স্পার (গজাল) থাকে।
  • স্ত্রী পাখির পায়ে স্পার থাকে না।

খাদ্যাভ্যাস

চিনা তিতিরের খাদ্যের মধ্যে রয়েছে—

  • বিভিন্ন বীজ
  • শস্য
  • কচি ঘাস
  • ছোট পোকামাকড়
  • উইপোকা
  • পিঁপড়া
  • ছোট লার্ভা

সংরক্ষণের গুরুত্ব

জলাভূমি ধ্বংস, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং অবৈধ শিকারের কারণে অনেক এলাকায় তিতিরের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

এই মূল্যবান বন্য পাখি সংরক্ষণে প্রয়োজন—

  • জলাভূমি রক্ষা
  • তৃণভূমি সংরক্ষণ
  • অবৈধ শিকার বন্ধ
  • জনসচেতনতা বৃদ্ধি

উপসংহার

জলার তিতির ও চিনা তিতির উভয়ই বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং অবৈধ শিকার প্রতিরোধের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই সুন্দর পাখিগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব।

Scroll to Top