বাংলাদেশের তিতির পাখি: মেটে তিতির, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ও সংরক্ষণের গুরুত্ব (শেষ পর্ব)

বাংলাদেশের তিতির পাখি: মেটে তিতির, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ও সংরক্ষণের গুরুত্ব (শেষ পর্ব)

আগের দুই পর্বে আমরা কালো তিতির, জলার তিতির ও চিনা তিতির সম্পর্কে জেনেছি। এই শেষ পর্বে আলোচনা করা হবে মেটে তিতির (Grey Francolin), এর স্বভাব, খাদ্য, প্রজনন, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং তিতির সংরক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে।


মেটে তিতির (Grey Francolin)

মেটে তিতির (Grey Francolin) একটি ছোট মুরগির মতো দেখতে ভূচর পাখি। ধূসর-বাদামি রঙের পালক এবং দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতার জন্য এটি সহজেই পরিচিত।


শারীরিক বৈশিষ্ট্য

মেটে তিতিরের গড় বৈশিষ্ট্য—

বৈশিষ্ট্যপরিমাপ
দৈর্ঘ্যপ্রায় ৩৩ সেন্টিমিটার
ওজনপ্রায় ২৭৫ গ্রাম
ডানার দৈর্ঘ্য১৪.৬ সেন্টিমিটার
ঠোঁট২.৫ সেন্টিমিটার
পা৪ সেন্টিমিটার
লেজ৮.৫ সেন্টিমিটার

এর শরীরে হালকা পীত, তামাটে, ধূসর-বাদামি ও বাদামি রঙের ডোরা থাকে। মুখে কালো চক্ষুরেখা, গলায় সরু কালো মালা এবং পা অনুজ্জ্বল লাল বর্ণের। পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে প্রায় একই রকম হলেও পুরুষের পায়ের পেছনে ধারালো স্পার (গজাল) থাকে, যা লড়াইয়ের সময় ব্যবহৃত হয়।


আবাসস্থল

মেটে তিতির সাধারণত নিচের এলাকায় বসবাস করে—

  • শুকনো তৃণভূমি
  • কৃষিজমি
  • ক্ষেত-খামার
  • ঝোপঝাড়
  • বালিয়াড়ি
  • শুষ্ক খোলা এলাকা

কালো তিতিরের মতো আর্দ্র পরিবেশের পরিবর্তে এটি অপেক্ষাকৃত শুষ্ক এলাকা বেশি পছন্দ করে।


স্বভাব ও আচরণ

মেটে তিতির সাধারণত—

  • জোড়ায় জোড়ায় বা ছোট দলে চলাফেরা করে।
  • ঠোঁট ও পা দিয়ে মাটি আঁচড়ে খাদ্য খুঁজে।
  • দীর্ঘ সময় উড়ার পরিবর্তে দৌড়াতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
  • রাতে কাঁটাঝোপ বা ঘন ঝোপের নিচে আশ্রয় নেয়।

ভয় পেলে দ্রুত ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে।


খাদ্যাভ্যাস

মেটে তিতিরের খাদ্যের মধ্যে রয়েছে—

  • আগাছার বীজ
  • বিভিন্ন শস্য
  • ঘাসের বীজ
  • কচি ঘাস
  • রসালো ফল
  • পোকামাকড়
  • উইপোকা
  • পিঁপড়া

কৃষিজমির অনেক ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে এরা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।


ডাক

মেটে তিতিরের ডাক বেশ স্বতন্ত্র।

অনেকটা—

“খাতি-তার… খাতি-তার…”

ভয় পেলে আবার—

“ক্ষিরর… ক্ষিরর…”

ধরনের শব্দ করে।


প্রজনন

মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাধারণত প্রজনন মৌসুম থাকে।

বাসা তৈরি করে—

  • কাঁটাঝোপের নিচে
  • পাথরের ফাঁকে
  • ঘাসের আড়ালে

শুকনো ঘাস ও পাতা দিয়ে বাসা তৈরি করার পর স্ত্রী পাখি সাধারণত ৪–৯টি ডিম দেয়।

ডিমের রঙ ফিকে হালকা পীত এবং গড় আকার ৩.২ × ২.৬ সেন্টিমিটার

শুধুমাত্র স্ত্রী পাখি ডিমে তা দেয় এবং সাধারণত ২১–২৩ দিনে ছানা ফুটে বের হয়।


মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক

ভারতীয় উপমহাদেশে বহু বছর ধরে কিছু এলাকায় তিতির পোষ মানানোর প্রচলন রয়েছে।

অতীতে পোষা তিতির ব্যবহার করে বুনো তিতিরকে আকর্ষণ করে ধরার প্রথাও ছিল।

কিছু অঞ্চলে পুরুষ তিতিরের লড়াইকে বিনোদনের অংশ হিসেবে দেখা হতো। তবে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার কারণে বর্তমানে এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিরুৎসাহিত করা হয় এবং অনেক স্থানে আইনগতভাবেও সীমাবদ্ধ।


তিতির সংরক্ষণের গুরুত্ব

বর্তমানে তিতিরের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—

  • আবাসস্থল ধ্বংস
  • অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার
  • অবৈধ শিকার
  • বন ও তৃণভূমি কমে যাওয়া
  • পরিবেশগত পরিবর্তন

তিতির সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন—

  • প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা
  • জলাভূমি ও তৃণভূমি সংরক্ষণ
  • অবৈধ শিকার বন্ধ
  • জনসচেতনতা বৃদ্ধি
  • বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন মেনে চলা

কৃষিতে তিতিরের উপকারিতা

তিতির শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, কৃষির জন্যও উপকারী।

এরা—

  • ক্ষতিকর পোকামাকড় খায়।
  • কিছু আগাছার বীজ খেয়ে আগাছা বিস্তার কমাতে সহায়তা করে।
  • প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।

উপসংহার

বাংলাদেশের কালো তিতির, জলার তিতির, চিনা তিতির ও মেটে তিতির—সব প্রজাতিই আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের সংরক্ষণ মানে শুধু একটি পাখিকে রক্ষা করা নয়; বরং আমাদের জীববৈচিত্র্য, কৃষি পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।

আসুন, অবৈধ শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংস রোধ করে তিতিরসহ সকল বন্য পাখি সংরক্ষণে সচেতন হই।

Scroll to Top