বিভিন্ন প্রজাতির পোল্ট্রিতে কোন কোন রোগ হয়? (৩য় পর্ব): সোনালি মুরগির গুরুত্বপূর্ণ রোগসমূহ
সোনালি (Sonali) মুরগি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় বাণিজ্যিক পোল্ট্রি। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্রয়লারের তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও এটি সম্পূর্ণ রোগমুক্ত নয়। বরং সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে সোনালি খামারে ভাইরাল, ব্যাকটেরিয়াল, পরজীবী ও পুষ্টিগত রোগের কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
অনেক খামারি মনে করেন, “সোনালি মুরগির রোগ কম হয়।” বাস্তবে এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। সোনালি মুরগিরও বহু গুরুত্বপূর্ণ রোগ হয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পালন করা, অপর্যাপ্ত বায়োসিকিউরিটি, বিভিন্ন বয়সের মুরগি একসঙ্গে পালন এবং ভুল ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রামের কারণে রোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
এই পর্বে সোনালি মুরগির প্রধান রোগ, কেন এসব রোগ বেশি হয় এবং প্রতিরোধের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
সোনালি মুরগিতে রোগ কেন বেশি হতে পারে?
সোনালি সাধারণত ব্রয়লারের তুলনায় বেশি সময় পালন করা হয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন জীবাণুর সংস্পর্শে থাকে। এছাড়া অনেক খামারে—
- একই ফার্মে বিভিন্ন বয়সের মুরগি পালন করা হয়।
- বায়োসিকিউরিটি দুর্বল থাকে।
- ভ্যাকসিন সময়মতো দেওয়া হয় না।
- খাদ্য ও লিটার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকে।
- কৃমিনাশক ও বহিঃপরজীবী নিয়ন্ত্রণ নিয়মিত করা হয় না।
এসব কারণে রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
সোনালি মুরগির গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাল রোগ
১। রানীক্ষেত (Newcastle Disease)
সোনালি খামারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাল রোগগুলোর একটি। আক্রান্ত মুরগিতে শ্বাসকষ্ট, সবুজ পায়খানা, ঘাড় বেঁকে যাওয়া, পক্ষাঘাত এবং মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেতে পারে।
২। গাম্বোরো (Infectious Bursal Disease)
বিশেষ করে কম বয়সী সোনালিতে বেশি দেখা যায়। এ রোগ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৩। মেরেকস ডিজিজ
স্নায়ুতন্ত্র, চোখ এবং বিভিন্ন অঙ্গ আক্রান্ত হতে পারে। পা বা ডানা অবশ হয়ে যাওয়া এ রোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৪। ফাউল পক্স
মশার মাধ্যমে ছড়ায়। মুখ, ঝুঁটি, চোখের চারপাশ ও ঠোঁটে ক্ষত সৃষ্টি হয়। ডিফথেরিটিক (ভেজা) পক্স হলে মুখগহ্বর ও শ্বাসনালিও আক্রান্ত হতে পারে।
৫। ইনফেকশাস ব্রংকাইটিস (IB)
শ্বাসতন্ত্র ও কিডনি আক্রান্ত করতে পারে। ডিমপাড়া সোনালিতে ডিমের উৎপাদন ও গুণগত মান কমে যায়।
৬। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (AI)
বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রোগ। আক্রান্ত খামারে উচ্চ মৃত্যুহার এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ
১। কোলিব্যাসিলোসিস (E. coli)
সোনালি খামারে অন্যতম সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। প্রায়ই এটি অন্য রোগের সঙ্গে মিশ্র সংক্রমণ হিসেবে দেখা যায়।
২। পুলোরাম রোগ
বিশেষ করে বাচ্চা ও অল্প বয়সী সোনালিতে বেশি দেখা যায়। দুর্বলতা, সাদা ডায়রিয়া এবং মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেতে পারে।
৩। মাইকোপ্লাজমোসিস (CRD)
দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ। অনেক ক্ষেত্রে E. coli-এর সঙ্গে মিশে জটিল সংক্রমণ সৃষ্টি করে।
পরজীবীজনিত রোগ
কৃমির আক্রমণ
সোনালি দীর্ঘদিন পালন করা হয় বলে কৃমির সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
এর ফলে—
- ওজন কমে যায়।
- খাদ্যের রূপান্তর দক্ষতা (FCR) খারাপ হয়।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
- ডিম উৎপাদন হ্রাস পায়।
ছত্রাকজনিত রোগ
অ্যাসপারজিলোসিস (Brooder Pneumonia)
স্যাঁতসেঁতে লিটার, ছত্রাকযুক্ত খাদ্য এবং অপর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের কারণে এ রোগ হতে পারে।
ডিমপাড়া সোনালিতে অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ রোগ
যেসব সোনালি ব্রিডার বা ডিম উৎপাদনের জন্য পালন করা হয়, সেগুলোতে নিচের রোগগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
ফাউল কলেরা
সাধারণত বয়স্ক মুরগিতে বেশি দেখা যায়। হঠাৎ মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেতে পারে।
লিম্ফয়েড লিউকোসিস
দীর্ঘদিন পালন করা মুরগিতে টিউমার সৃষ্টি করতে পারে।
ইনফেকশাস কোরাইজা
চোখ ও মুখ ফুলে যাওয়া, নাক দিয়ে স্রাব এবং খাদ্য গ্রহণ কমে যাওয়া এ রোগের সাধারণ লক্ষণ।
ফাউল টাইফয়েড
উৎপাদন কমে যায় এবং দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতা চলতে পারে।
ফ্যাটি লিভার সিনড্রোম
বিশেষ করে অতিরিক্ত শক্তিসমৃদ্ধ খাদ্য, কম ব্যায়াম এবং স্থূল মুরগিতে বেশি দেখা যায়।
সোনালি মুরগির রোগ প্রতিরোধে করণীয়
- মানসম্মত বাচ্চা সংগ্রহ করুন।
- সঠিক ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রাম অনুসরণ করুন।
- নিয়মিত কৃমিনাশক ব্যবহার করুন।
- বহিঃপরজীবী নিয়ন্ত্রণ করুন।
- উন্নত বায়োসিকিউরিটি বজায় রাখুন।
- একই শেডে বিভিন্ন বয়সের মুরগি পালন এড়িয়ে চলুন।
- পরিষ্কার খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করুন।
- লিটার শুকনো রাখুন।
- অসুস্থ মুরগি দ্রুত আলাদা করুন।
- প্রয়োজনে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নিশ্চিত করুন।
সোনালি খামারে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি করে কোন রোগ?
বাংলাদেশের অধিকাংশ সোনালি খামারে সাধারণত নিচের রোগগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ—
- রানীক্ষেত (Newcastle Disease)
- গাম্বোরো
- এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা
- মাইকোপ্লাজমোসিস (CRD)
- কোলিব্যাসিলোসিস
- পুলোরাম
- কোরাইজা
- ফাউল কলেরা
- ফাউল টাইফয়েড
- কৃমির আক্রমণ
উপসংহার
সোনালি মুরগির রোগ ব্যবস্থাপনা ব্রয়লার ও লেয়ারের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। কারণ সোনালি সাধারণত দীর্ঘদিন পালন করা হয় এবং একই খামারে বিভিন্ন বয়সের মুরগি থাকার প্রবণতা বেশি থাকে। তাই শুধু চিকিৎসা নয়, উন্নত বায়োসিকিউরিটি, সঠিক ভ্যাকসিনেশন, নিয়মিত কৃমিনাশক ব্যবহার, উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো রোগ নির্ণয়ই সফল সোনালি খামারের মূল ভিত্তি।




