বিভিন্ন প্রজাতির পোল্ট্রিতে কোন কোন রোগ হয়? (২য় পর্ব): ব্রয়লার মুরগির গুরুত্বপূর্ণ রোগসমূহ

বিভিন্ন প্রজাতির পোল্ট্রিতে কোন কোন রোগ হয়? (২য় পর্ব): ব্রয়লার মুরগির গুরুত্বপূর্ণ রোগসমূহ

ব্রয়লার মুরগি খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারজাত করা হয়। এই দ্রুত বৃদ্ধি, উচ্চ খাদ্য গ্রহণ, নিবিড় খামার ব্যবস্থাপনা এবং জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ব্রয়লারে কিছু রোগ লেয়ারের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়। আবার কিছু রোগ প্রায় শুধুমাত্র ব্রয়লারেই বেশি হয়।

একজন ভেটেরিনারিয়ানের জন্য এটি জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, সব রোগ সব প্রজাতিতে সমানভাবে হয় না। তাই রোগ নির্ণয়ের প্রথম ধাপগুলোর একটি হলো—মুরগির প্রজাতি (Species) জানা।

এই পর্বে ব্রয়লার মুরগির প্রধান রোগসমূহ, ব্রয়লারে বেশি দেখা যায় এমন রোগ, তুলনামূলক কম দেখা যায় এমন রোগ এবং প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো।


ব্রয়লার মুরগির রোগ কেন বেশি হয়?

ব্রয়লার সাধারণত ৩০–৪৫ দিনের মধ্যে বাজারজাত করা হয়। এই স্বল্প সময়ে দ্রুত ওজন বাড়ানোর জন্য—

  • খাদ্য গ্রহণ অনেক বেশি হয়।
  • বিপাকীয় হার (Metabolism) বেশি থাকে।
  • ঘনত্ব বেশি থাকলে রোগ দ্রুত ছড়ায়।
  • পরিবেশগত স্ট্রেসের প্রভাব বেশি পড়ে।
  • অন্ত্র, লিভার, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের উপর চাপ বৃদ্ধি পায়।

ফলে সংক্রামক, পুষ্টিগত এবং ব্যবস্থাপনাজনিত রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।


ব্রয়লারে প্রধানত দেখা যায় এমন রোগ

নিচের রোগগুলো ব্রয়লারে তুলনামূলক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

১. ইনক্লুশন বডি হেপাটাইটিস (IBH)

ব্রয়লারে গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাল রোগ। সাধারণত গ্রোয়িং পিরিয়ডে দেখা যায় এবং হঠাৎ মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেতে পারে। পোস্টমর্টেমে লিভার ফ্যাকাশে, বড় এবং ভঙ্গুর হতে পারে।


২. রিওভাইরাস সংক্রমণ (Viral Arthritis/Reovirus)

রিওভাইরাস টেন্ডন, জয়েন্ট ও পায়ে প্রদাহ সৃষ্টি করে। আক্রান্ত মুরগি খুঁড়িয়ে হাঁটে, বসে থাকে এবং ওজন কম বাড়ে।


৩. অ্যাসাইটিস (Ascites)

দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া ব্রয়লারে বেশি দেখা যায়। শরীরে অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ না হলে পেটে পানি জমে যায়। ঠান্ডা আবহাওয়া, দুর্বল ভেন্টিলেশন ও দ্রুত বৃদ্ধির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।


৪. নেক্রোটিক এন্টারাইটিস

অন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। সাধারণত Clostridium perfringens ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। কক্সিডিওসিস থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।


৫. সাডেন ডেথ সিনড্রোম (Flip-over Disease)

ভালো বৃদ্ধি পাওয়া সুস্থ ব্রয়লার হঠাৎ মারা যেতে পারে। দ্রুত বৃদ্ধি, উচ্চ শক্তিসম্পন্ন খাদ্য ও বিপাকীয় চাপ এ রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।


৬. রান্টিং-স্টান্টিং সিনড্রোম (RSS)

একই ব্যাচে কিছু মুরগির বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকে, আবার কিছু মুরগি ছোট ও দুর্বল হয়ে যায়। ফলে ওজনের তারতম্য দেখা দেয়।


৭. চিকেন ইনফেকশাস অ্যানিমিয়া (CIA)

এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে সেকেন্ডারি সংক্রমণ বৃদ্ধি পায় এবং টিকার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।


৮. গাউট

কিডনির কার্যকারিতা ব্যাহত হলে শরীরে ইউরিক এসিড জমে গাউট হয়। ভুল খাদ্য, অতিরিক্ত খনিজ, কিডনি আক্রান্তকারী রোগ এবং পানির ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।


৯. অর্নিথোব্যাকটেরিয়াম রাইনোট্রাকিয়ালে (ORT)

এটি শ্বাসতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। এককভাবে অথবা E. coliMycoplasma-এর সঙ্গে মিশ্র সংক্রমণ হিসেবে দেখা যায়।


ব্রয়লারে সাধারণত দেখা যায় এমন অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রোগ

ব্রয়লারে নিচের রোগগুলোও নিয়মিত দেখা যায়—

  • গাম্বোরো (IBD)
  • মাইকোপ্লাজমোসিস (CRD)
  • রানীক্ষেত (Newcastle Disease)
  • ইনফেকশাস ব্রংকাইটিস (IB)
  • এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (AI)
  • কোলিব্যাসিলোসিস (E. coli)
  • নিউমোনিয়া
  • কক্সিডিওসিস
  • মাইকোটক্সিকোসিস
  • পুলোরাম রোগ
  • সালমোনেলোসিস
  • ইয়ক স্যাক ইনফেকশন (Omphalitis)

ব্রয়লারে তুলনামূলক কম বা প্রায় দেখা যায় না এমন রোগ

বাণিজ্যিক ব্রয়লারে সাধারণত নিচের রোগগুলো খুব কম দেখা যায়, কারণ এগুলো প্রকাশ পাওয়ার আগেই ব্রয়লার বাজারজাত হয়ে যায়।

  • মেরেকস ডিজিজ
  • লিম্ফয়েড লিউকোসিস
  • এগ ড্রপ সিনড্রোম (EDS)
  • ফাউল কলেরা (সাধারণত বয়স্ক পাখিতে বেশি)

তবে দীর্ঘদিন পালন করা ব্রিডার ব্রয়লার বা বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম হতে পারে।


ব্রয়লারে মৃত্যুর প্রধান কারণ

ব্রয়লারে মৃত্যুহারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • গাম্বোরো
  • এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা
  • রানীক্ষেত
  • নেক্রোটিক এন্টারাইটিস
  • কোলিব্যাসিলোসিস
  • অ্যাসাইটিস
  • সাডেন ডেথ সিনড্রোম
  • IBH
  • মাইকোটক্সিকোসিস
  • কক্সিডিওসিস

ব্রয়লারে রোগ প্রতিরোধের মূলনীতি

রোগ প্রতিরোধের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—

  • মানসম্মত বাচ্চা সংগ্রহ।
  • খামার সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা।
  • ব্যাচের মাঝে অন্তত ১৪ দিন খালি রাখা (All-in All-out পদ্ধতি)।
  • সঠিক ব্রুডিং নিশ্চিত করা।
  • মানসম্মত খাদ্য ও পরিষ্কার পানি সরবরাহ করা।
  • কক্সিডিওসিস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর রোটেশন বা শাটল প্রোগ্রাম অনুসরণ করা।
  • মাইকোটক্সিন নিয়ন্ত্রণে ভালো মানের টক্সিন বাইন্ডার ব্যবহার করা।
  • সঠিক ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রাম অনুসরণ করা।
  • ঘনত্ব, ভেন্টিলেশন, তাপমাত্রা ও লিটার সঠিকভাবে পরিচালনা করা।
  • নিয়মিত খামার পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত রোগ নির্ণয় করা।

উপসংহার

ব্রয়লার মুরগির রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার কমানো এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ব্রয়লারে দ্রুত বৃদ্ধি হওয়ায় রোগও দ্রুত ছড়াতে পারে। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনা, উন্নত বায়োসিকিউরিটি, সঠিক ভ্যাকসিনেশন এবং সময়মতো ভেটেরিনারি পরামর্শই সফল ব্রয়লার খামারের মূল চাবিকাঠি।

Scroll to Top