মুরগির শেড নির্মাণ ও জীবাণুমুক্তকরণ (ধারাবাহিকভাবে বিস্তারিত) – ২য় পর্ব
শেড জীবাণুমুক্তকরণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অনেক খামারি মনে করেন শুধুমাত্র জীবাণুনাশক স্প্রে করলেই শেড পরিষ্কার হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি ফার্মে নতুন বাচ্চা তোলার আগে সঠিকভাবে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্তকরণ (Cleaning & Disinfection) করা হলে প্রায় ৮০% রোগজীবাণু ধ্বংস করা সম্ভব। ফলে পরবর্তী ব্যাচে রোগের ঝুঁকি, মৃত্যুহার এবং ওষুধের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
সফল পোল্ট্রি খামারের অন্যতম ভিত্তি হলো ভালো বায়োসিকিউরিটি এবং তার প্রথম ধাপ হচ্ছে সঠিকভাবে শেড জীবাণুমুক্ত করা।
ধাপ–১: উপরের অংশ থেকে নিচ পর্যন্ত সম্পূর্ণ পরিষ্কার
পরিষ্কারের কাজ সব সময় উপর থেকে নিচের দিকে করতে হবে।
পরিষ্কার করতে হবে—
- সিলিং
- ছাদ
- নেট
- জানালা
- দরজা
- ফ্যান
- পর্দা
- সাইডওয়াল
- মেঝে
প্রথমে পরিষ্কার পানি দিয়ে সমস্ত ধুলো, ময়লা, পালক ও মল ধুয়ে ফেলতে হবে।
ধাপ–২: ডিটারজেন্ট দিয়ে ধোয়া
শুধু পানি দিয়ে ধুলে অনেক জৈব পদার্থ (Organic Matter) থেকে যায়। এগুলো জীবাণুনাশকের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
তাই পানি দিয়ে ধোয়ার পর ডিটারজেন্ট ব্যবহার করতে হবে।
মাত্রা (প্রতি ১০০০ বর্গফুট):
- ডিটারজেন্ট = প্রায় ৬ কেজি
ডিটারজেন্ট দিয়ে ঘষে ধোয়ার পর পরিষ্কার পানি দিয়ে আবার ধুয়ে ফেলতে হবে।
ধাপ–৩: কস্টিক সোডা ব্যবহার (পাকা মেঝের ক্ষেত্রে)
যদি শেডের মেঝে সম্পূর্ণ সিমেন্টের হয় তাহলে কস্টিক সোডা ব্যবহার করা যায়।
ব্যবহারবিধি
- কস্টিক সোডা ২–২.৫ কেজি
- প্রয়োজনীয় পানিতে মিশিয়ে
- প্রতি ১০০০ বর্গফুট মেঝেতে প্রয়োগ করতে হবে।
- ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে।
- এরপর প্রচুর পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
সতর্কতা:
- হাতে গ্লাভস ব্যবহার করুন।
- চোখে গগলস ব্যবহার করুন।
- শিশু ও প্রাণীকে দূরে রাখুন।
যেসব শেডে মাঝখানে ড্রেন রয়েছে সেখানে এই পদ্ধতি অনেক সময় ব্যবহার করা কঠিন হয়।
ধাপ–৪: শেড সম্পূর্ণ শুকানো
অনেক খামারি এখানেই ভুল করেন।
ভেজা শেডে কখনই জীবাণুনাশক বা হোয়াইট ওয়াশ করা উচিত নয়।
ঘর সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে।
ধাপ–৫: হোয়াইট ওয়াশ (White Wash)
শেড শুকানোর পরে মেঝে ও নিচের দেয়াল চুনের মিশ্রণ দিয়ে লেপে দিলে জীবাণুর সংখ্যা আরও কমে যায়।
প্রতি ১০০০ বর্গফুটের জন্য
- চুন – ১.৫ কেজি
- ফরমালিন – ৫০০ মিলি
- কেরোসিন – ৫০০ মিলি
- ব্লিচিং পাউডার – ৫০০ গ্রাম
- তুঁতে – ৫০০ গ্রাম
- লবণ – ১ কেজি
- পানি – ১০ লিটার
এই মিশ্রণটি মেঝে, নিচের দেয়াল ও আশপাশে ব্যবহার করা যায়।
ধাপ–৬: যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করা
শুধু শেড পরিষ্কার করলেই হবে না।
নিম্নোক্ত যন্ত্রপাতিও পরিষ্কার করতে হবে—
- ফিডার
- ড্রিংকার
- ব্রুডার
- চিক গার্ড
- পানির পাইপ
- অন্যান্য সরঞ্জাম
প্রথমে ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে তারপর অনুমোদিত জীবাণুনাশক স্প্রে করে সম্পূর্ণ শুকিয়ে শেডে রাখতে হবে।
ধাপ–৭: মশা, মাছি ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ
অনেক রোগই পোকামাকড়ের মাধ্যমে ছড়ায়।
তাই—
- মাছি
- মশা
- বিটল
- মাইট
- উকুন
নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত।
এটি বায়োসিকিউরিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাধারণ ভুল যেগুলো করা উচিত নয়
❌ শুধু জীবাণুনাশক স্প্রে করা।
❌ ময়লা পরিষ্কার না করেই ডিসইনফেক্ট্যান্ট ব্যবহার করা।
❌ ভেজা মেঝেতে হোয়াইট ওয়াশ করা।
❌ ভেজা যন্ত্রপাতি শেডে ঢুকিয়ে রাখা।
❌ পানি লাইনের পরিষ্কার না করা।
❌ ডিটারজেন্ট ব্যবহার না করা।
মনে রাখবেন
Cleaning আগে, Disinfection পরে।
অর্থাৎ আগে জৈব ময়লা সরাতে হবে, তারপর জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে হবে। এটাই কার্যকর জীবাণুমুক্তকরণের মূলনীতি।
পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে ফিউমিগেশন, শেড রেস্ট, রোগ অনুযায়ী কতদিন খালি রাখা উচিত এবং নতুন বাচ্চা তোলার পূর্ব প্রস্তুতি।




