Breaking News

লাভজনক উপায়ে ব্রয়লার পালন পর্ব ১

লাভজনক ব্রয়লার পালন কৌশল
অঞ্জন মজুমদার,
এম এস ইন পোল্ট্রি সায়েন্স
পর্ব-১

ভূমিকা

পোল্ট্রির মধ্যে ব্রয়লার পালন বাংলাদেশে সর্বাধিক প্রচলিত।স্বল্প পূঁজি নিয়ে যে কেউ ব্রয়লার ফার্মিং ব্যবসা আরম্ভ করতে পারেন।আবার এই ব্যবসায় বিনিয়োগকৃত পূঁজি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ফেরত আসে। সে জন্য বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের উথ্যান পর্বে ব্রয়লার ফার্মিং এর দিকে অনেক স্বল্প ও উচ্চ শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতী যুক্ত হলেও নানান রকম ঝুঁকির মোকাবেলা করতে না পেরে তাদের অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।

কালের পরিক্রমায় দুই যুগ পরে এসে পোল্ট্রি ফার্মিং বর্তমানে শিল্প হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে, ফলে মাঝারি এবং বৃহদ কর্পোরেটরা এই শিল্পে বিনিয়োগ করতে আরম্ভ করেছেন এবং উৎপাদন সিস্টেমে নতুন নতুন উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত হতে হতে লাভের পরিমান পূর্বের তুলনায় ক্রমাগত কমে আসছে ,ফলে স্বল্প এবং মাঝারী পূঁজির খামারীদের পক্ষে দিনে দিনে টিকে থাকা অনেক কঠিন হয়ে উঠছে।
এমন পরিস্থিতিতে ব্রয়লার ফার্ম করে টিকে থাকতে হলে একজন খামারীর এই ব্রয়লার ফার্মিং ব্যবসার চরিত্র ভাল ভাবে অনুধাবন করা জরুরি। বুঝতে হবে ,টিকে থাকতে হলে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থেকে লাভ করতে হবে। আবেগ বা কাল্পনিক লাভের হিসেব করে নয়।

এখন পর্যন্ত মধ্যস্বত্ত ভোগী শ্রেনীর অস্ত্বিতের কারনে লাইভ ব্রয়লারের দামের উঠানামা, খাদ্যের দামের উচ্চ হার এবং রোগ ব্যাধির কারনে বেশীরভাগ ছোট খামারী পূঁজি খুইয়ে দায় দেনায় চক্রে পড়ে ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন।
অন্যদিকে বড় প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমে ক্রমে তাদের পোল্ট্রি অপারেশানকে ইন্টিগ্রেশান বা সমন্বিত ফার্মিং সিস্টেম করার কারনে তাদের প্রতি কেজি লাইভ ব্রয়লারের উৎপাদন খরচ ছোট খামারীর থেকে অনেক কম হচ্ছে, ফলে ছোট খামারী ক্রমাগত উচ্চ উৎপাদন খরচের কারনে লোকসান দিচ্ছেন।

এমন পরিস্থিতে ছোট এবং মাঝারী খামারীদের ব্রয়লার পালনের ব্যবহারিক এবং ব্যবসায়িক বাস্তব সম্মত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে নিজেদের ব্রয়লার ব্যবসায় উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে তাহলে শত ভাগ ঝুঁকির এই ব্যবসায় এক সময় লাভের মুখ দেখতে পাবেন।
লেখক অতি গুরত্বপূর্ন কিছু বিষয় সজহভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন আশা করা যায় এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান খামারীদের ব্রয়লার ফার্মিং ব্যবসায় অনেক কাজে আসবে।

খামারে বাচ্চা তোলার পূর্ব প্রস্তুতি ;

বাংলাদেশে সাধারনত ১.৫-২.০ কেজি ওজনের জীবন্ত ব্রয়লার মুরগীর চাহিদা সব চাইতে বেশী এবং ব্রয়লারের এই ওজন ২৮-৩০ দিনের মধ্যেই অর্জিত হয়,সে হিসাবে প্রতিটি ব্রয়লার ঘর থেকে(৩০-৩৫ দিন বয়স পর্যন্ত পালন করলে)বছরে ৬-৭ টি ব্যাচ ব্রয়লার উৎপাদন করা যায়।

প্রতিবার ব্রয়লার বিক্রির পরে লিটার পরিস্কার করা, ধোয়া মোছা, চুন লাগানো, পর্দা লাগানো থেকে শুরু করে নতুন বাচ্চা তোলার উপযুক্ত করতে, যাবতীয় কাজ শেষ করতে প্রায় ১৫ দিনের মত সময় লাগে,এছাড়া আছে কোন সময় বাচ্চার দাম বেশী এবং পছন্দের হ্যাচারির বাচ্চা পেতে বিলম্ব ইত্যাদি সমস্যা।
প্রতিবারে নতুন করে বাচ্চা তোলার আগে বায়ো-সিকিউরিটির বিষয়টা সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে, কারন পূর্বের ব্যাচের অনেক রোগ-জীবানু খামারের চারপাশে, ঘরের ভিতরে থেকেই যায় ।
সে জন্য যতটা পারা যায় জীবানু ধ্বংসের ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে, ঘরের চারপাশে চুন ছিটাতে হবে,ঘরের দেওয়াল এবং ফ্লোরে চুনকাম করাতে হবে,খাদ্যপাত্র-পানির পাত্র,ব্রুডার এবং অন্যান্ন যন্ত্রপাতি জীবাণুনাশক দিয়ে ধুয়ে জীবানুমূক্ত করতে হবে।পর্দায় এবং ঘরের ভিতরের দিকের চালে শক্তিশালী স্প্রে-মেশিন দিয়ে জীবাণুনাশক বার বার স্প্রে করতে হবে।যতটা পারা যায় জীবানুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে এবং এর পরও যে সকল জীবানু থেকে যাবে সে গুলো যেন রোগ সৃষ্ঠির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে সে দিকে অবশ্যই কড়া নজর দিতে হবে।বায়োসিকিউরিটির এই সকল কার্যক্রম গ্রহন করার মূল উদ্দেশ্য হল একদিন বয়সী বাচ্চার তেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না ফলে রোগজীবাণু সহজে এদের আক্রান্ত করে,এ জন্য একজন ব্রয়লার খামারীর মূল লক্ষ্য থাকতে হবে সদা সর্বদা নিজের স্বার্থে খামারকে সব সময় জীবানু মূক্ত রাখার চেস্টা করা।

লিটার হিসাবে তুষ উত্তম,কারন তুষে তেমন ফাংগাস জন্মায় না, যদি কাঠের ভূষি ব্যবহার করা হয় তাহলে যথা সম্ভব রোদে শুকিয়ে তার পরে ব্যবহার করা উচিৎ, অন্যথায় লিটার হিসাবে ব্যবহার করা কাঠের ভূষিতে যদি অধিক আদ্রতা থাকে তাহলে সেখানে ছত্রাক জন্মায়, যার প্রভাবে বাচ্চার বয়সের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ব্রুডার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাচ্চা খামারে আসার আগেই লিটারে কয়েক বার শক্তিশালী জীবাণুনাশক স্প্রে করে ওলট-পালট করে দিতে হবে যাতে লিটারের বেশীর ভাগ জীবানু মারা যায়।
বাচ্চার সংখ্যার অনুপাতে ৫০০ বাচ্চার জন্য এক একটি চিক গার্ডের মাধ্যমে ব্রুডিং এরিয়া প্রস্তুত করতে হবে।চিক গার্ডের উপর নির্দিষ্ট উচ্চতায় ব্রুডার ঝুলিয়ে দিতে হবে এবং প্রযোজনীয় সংখ্যক ইলেকট্রিক বাল্ব লাগাতে হবে। যদি ইনফ্রারেড গ্যাস ব্রুডার ব্যবহার করা হয় তাহলে তা হবে উত্তম ব্যবস্থা, কিন্তু আমাদের দেশের ব্রয়লার খামারীদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করলে অনেকের পক্ষেই গ্যাস ব্রুডার ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

অধিকশীতের সময় ঘরের তাপমাত্র ধরে রাখা সম্ভব না হলে, খামারীরা সাধারণত কাঠের ভূষির চুলা জ্বালিয়ে অথবা গ্যাসের চুলা দিয়ে তাপমাত্রা বাড়ানোর চেষ্ঠা করেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে ব্রয়লারের ঘরে প্রচুর ধোঁয়া সৃষ্ঠি হয় এবং কার্বন মনো অক্সাইড এবং কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস তৈরি হয়, ফলে ঘরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়, এই ধরনের পরিস্থিতিতে বাচ্চার তল পেটে পানি জমে, দৈহিক বৃদ্ধি বাধা প্রাপ্ত হয় এবং অধিক সংখ্যায় বাচ্চার মৃত্যু হয়।যদি বাধ্য হয়ে চুলা জ্বালাতে হয় তবে সব সময় পর্দার উপরের দিকে ফাঁক রাখতে হয় এবং এই ফাঁক দিয়ে দূষিত গ্যাস বেরিয়ে যায় এবং বিশুদ্ধ অক্সিজেন ঘরে প্রবেশ করে এবং বাচ্চা অবস্থায় তল পেটে পানি জমার আশংকা অনেক কমে যায়।

ঘরে বাচ্চা তোলার ২৪ ঘন্টা পূর্বে ব্রুডার জ্বালিয়ে ঘরের তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে এবং লিটারের উপরে যেন ৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।ঘরের পর্দায় কোন ফুটো থাকলে তা মেরামত করতে হবে,যারা বাচ্চার ঘরে ডিউটি করবে তাদের জন্য আলাদা জুতা, ড্রেসের ব্যবস্থা করতে হবে,এই সকল ড্রেস কোন ভাবেই ঘরের বাইরে নেওয়া যাবে না এবং বাইরের ড্রেস বা জুতা নিয়ে ছোট বাচ্চার ঘরে প্রবেশ করা যাবে না।

ব্রুডিং হাউজে বে-দরকারি লোকের প্রবেশ কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রন করতে হবে।ব্রুডিং ঘরে দিনে নূন্যতম তিনবার ভাল ও শক্তিশালী স্প্রে মেশিন দিয়ে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে এবং এই স্প্রে করা যেন গাফালতির কারনে বন্ধ না হয় সেদিকে খামারিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে ভাইরাস জনিতরোগ যেমন গাম্ববরো,রানিক্ষেত,বার্ড ফ্লু,ব্রংকাইটিস ইত্যাদি শুধুমাত্র জীবাণুনাশক স্প্রে,সঠিক বায়োসিকিউরিটি নিয়ন্ত্রন এবং ভ্যাক্সিনের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব।এটা সকল ব্রয়লার খামারীর মনে রাখতে হবে ভাইরাস জনিত রোগের কোন চিকিৎসা নাই।
বাংলাদেশের ব্রয়লার খামারীরা সাধারণত এই ভাইরাস জনিত রোগের কারনেই বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

যাদের সামর্থ আছে তাদের উচিৎ ব্রুডার হাউজ আলাদা করে ১৫ দিন সেখানে লালন পালন করে ব্রয়লার গ্রোয়িং হাউজে নিয়ে আসা এবং বিক্রি পর্যন্ত সেখানে লালন পালন করা।এই সিস্টেমে ব্রয়লার পালন করলে রোগের পাদূর্ভাব অনেকাংশে কমে যায়, ভাল ফলাফল পাওয়া যায় এবং সঠিক দৈহিক ওজন অর্জনের কারনে কমদামে ব্রয়লার বিক্রি করেও ভাল লাভের সম্ভাবনা থাকে।

পর্ব-২
বাচ্চার জন্য সঠিক সরবরাহকারী নির্বাচন

ব্রয়লার খামারে সফলতার প্রধান তিনটি নিয়ামক হল ভাল গুনের রোগমূক্ত একদিন বয়সী ব্রয়লার বাচ্চা,পুষ্টিকর গুনগত মানসম্পন্ন খাদ্য এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা।
বাচ্চা ক্রয়ের জন্য পছন্দের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের খামারীদের অনেক সময় তেমন একটা প্রভাব থাকে না।মূল ভূমিকা পালন করেন বিভিন্ন হ্যাচারির ডিলারগন।
পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে কোন কোন হ্যাচারির বাচ্চা নিজের খামারে অতীতে ভাল ফলাফল (কম মৃত্যু হার, খামারে ব্রুডিং থেকে শুরু করে দিন অনুসারে দৈহিক ওজন অর্জন এবং ভাল এফ সি আর) দিয়েছে, সে সকল হ্যাচারির বাচ্চা ক্রয় করাই একজন ব্রয়লার খামারীর জন্য উত্তম এবং খামারকে লাভের ধারায় ধরে রাখার জন্য সঠিক পন্থা।

একজন বুদ্ধিমান খামারী যে হ্যাচারীর অবস্থান তার ব্রয়লার খামারের কাছাকাছি সে হ্যাচারি থেকে বাচ্চা নেওয়া অধিক উত্তম মনে করেন,বেশী দূরত্বের হ্যাচারির বাচ্চা পরিবহনে অধিক সময় লাগে,(দূরত্ব,রাস্তা ঘাটে নানান প্রতিবন্ধকতা,রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক দূর্যোগ) ফলে বাচ্চা পরিবহন জনিত ধকলে পড়ার সম্ভাবনা থাকে এবং এ রূপ পরিস্থিতিতে অনেক সময় বাচ্চা ডি-হাইড্রেশানের কারনে শুরুতেই দূর্বল হয়,খোড়া হয় এবং প্রথম ৩-৪ দিন অনেক বাচ্চা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

যে সকল হ্যাচারির বাচ্চায় বেশী নাভি কাঁচা থাকে,প্রথম দিনেই বাচ্চায় ছোট বড় অনেক সাইজের বাচ্চা থাকে,ব্রুডিং এর প্রথম এক দুই দিনের মধ্যেই বাচ্চা ব্রুডার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় তাদের বাচ্চা যত সহজ লভ্য এবং কম দামেরই হউক তাদের বাচ্চা ক্রয় থেকে দূরে থাকাই নিজের ব্যবসায়িক সুরক্ষার জন্য উত্তম পন্থা।

যদি নির্ভর যোগ্য সূত্রে তথ্য থাকে যে আপনি যে হ্যাচারির বাচ্চা ক্রয় করবেন বলে মন স্থির করেছেন তাদের প্যারেন্ট স্টক ইতিমধ্যে বার্ড ফ্লু,রানিক্ষেত,ম্যারেক্স,অথবা সালমোনেলা জনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে তাহলে সে সকল হ্যাচারীকে এড়িয়ে চলাই উত্তম
কারন এ সকল রোগ কে হ্যাচারি বর্ন বা হ্যাচারি থেকে উৎপাদিত রোগ বলে, আক্রান্ত প্যারেন্টের বাচ্চা এই রোগ বহন করে এবং আপনার খামারে আসার পরে সহজে এ সকল মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার অধিক সম্ভাবনা থাকে, এ ধরনের হ্যাচারিকে এড়িয়ে চলাই আপনার লাভজনক ভাবে ফার্ম পরিচালনার জন্য উত্তম।

বর্তমানে দেশে সহজলভ্য বিভিন্ন ব্রয়লারের ব্রিড বা স্ট্রেইনের (জাত) প্রতি প্রায় সকল খামারীরই পছন্দ-অপছন্দ থাকে, কোন জাত অধিক তাপ সহনীয়, কোন কোন জাত রোগ ব্যাধিতে তেমন আক্রান্ত হয় না, কোনটিতে দ্রুত ওজন আসে,আবার কোনটির দ্রুত ওজন আসলেও মৃত্যুহার বেশি সে কারনে ব্রয়লার ব্রিডের বিভিন্ন জাতের ভাল গুনাগুন গুলো খামারিদের বাচ্চা পছন্দের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

অনেক সময় অভিজ্ঞ এবং পুরাতন ব্রয়লার খামারীর পরামর্শে নতুন খামারী ব্রয়লারের জাত পছন্দ করেন।যে হ্যাচারির বাচ্চাই খামারী ক্রয়ের জন্য নির্ধারন করেন অবশ্যই সে হ্যাচারি সম্পর্কে সঠিক তথ্য উপাত্ত নিয়ে একদিন বয়সী ব্রয়লার বাচ্চা ক্রয় করা উচিৎ।অন্যথায় ভাল খাদ্য, ভাল ব্যবস্থাপনা দিয়েও ভাল এফ সি আর পাওয়া যায় না । ভাল ফলাফলের জন্য উন্নত গুনের বাচ্চা ক্রয় জরুরী।

পর্ব-৩

ব্রয়লার বাচ্চার ১-৩ দিন বয়সের যত্ন

ব্রয়লার মুরগীর বয়সের প্রথম ৩ দিনেই একজন খামারীর ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারিত হয়ে যায়,আমরা জানি ডি ও সি বা একদিন বয়সী ব্রয়লার বাচ্চা কেন বলা হয়, মূলত ইনকুবেটর থেকে বাচ্চা ফুটার পরে ৭২ ঘন্টা বয়স পর্যন্ত বাচ্চাকে এক দিন বয়সী বাচ্চা বা Day old chick (DOC) বলা হয়। প্রাকৃতিক ভাবে বাচ্চাকে ফুটার প্রথম ৭২ ঘন্টা কোন খাবার না দিলেও বেঁচে থাকবে, এই সময় হ্যাচিং ডিমের (যে ডিম থেকে বাচ্চাটি ফুটে বেরিয়েছে) কুসুমের অবশিষ্ঠাংশ সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চার পেটের ভিতর থাকে, এই কুসুমে উচ্চমাত্রায় চর্বি এবং আমিষ থাকে যা দিয়ে একটি সদ্যজাত বাচ্চা অবলীলায় তিন দিন বেঁচে থাকতে পারবে, কিন্তু তার কাঙ্ক্ষিত দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে না।

ব্রয়লার বাচ্চার জীবনে দিন অনুসারে দৈহিক ওজন অর্জন অনেকটাই একটি ছুটে চলা ট্রেনের মত,ট্রেনকে নির্দিষ্ট সময়ে সুনির্দিষ্ট স্টেশনে পৌঁছাতে হবে অন্যথায় ট্রেন সিডিউলে বিপর্যয় ঘটবে।তেমনি একজন খামারী তার ব্রয়লার খামার থেকে লাভ করতে চাইলে বাচ্চা খামারে আসার দিন থেকে বিক্রির দিন পর্যন্ত প্রতিদিন ব্রয়লারের জাতের বৈশিষ্ঠ অনুসারে দৈহিক ওজন অর্জন করাতে হবে।

কি ভাবে সম্ভব দিন অনুসারে ব্রয়লারের দৈহিক অর্জন?

পানিঃ

পানির নাম জীবন,পানি একদিকে যেমন বাঁচায় তেমনি কোন কোন সময় পানি মৃত্যুর কারন হয়ে দাঁড়ায়। পরিস্কার জীবানুমূক্ত পানি ব্রয়লার বাচ্চা আসার প্রথম দিন থেকে বিক্রির দিন পর্যন্ত সরবরাহ করতে হবে।

শীতকালে সামান্য গরম করে বাচ্চাকে প্রথম কয়েক ঘন্টা পানি সরবরাহ করতে হবে।

পানিতে জীবানুনাশক ট্যাবলেট অথবা ব্লিচিং পাউডার অথবা লিকুইড ক্লোরিন দিয়ে জীবানুমূক্ত করে সেই পানিই শুধু ব্রয়লারকে খাওয়াতে হবে। অনেকে ভাবেন আমি তো সরাসরি ডিপ টিউবয়েল থেকে পানি তুলে মুরগীকে খাওয়াচ্ছি তাহলে এ পানি তো পুরোপুরি জীবানুমূক্ত আসলে বিষয়টা তেমন নয়, আপনি যে ড্রামে তুলে পানি রাখছেন তাতো জীবানুমূক্ত নয় যে পাত্রে পানি দিচ্ছেন তাও পুরোপুরি জীবানুমূক্ত নয়। কিছু জীবানুতো থাকেই আর এই জীবানু উপযুক্ত পরিবেশে এক দিনেই কোটি কোটি জীবানু জন্ম দিতে বা বানাতে পারে। যদি পানিতে ৩ পি পি এম মাত্রায় ক্লোরিন থাকে তাহলে এই জীবানুগুলো বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। খাবার পানি ক্লোরিন দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে প্রতি ১০০ লিটার পানিতে ৫ গ্রাম করে ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে ভাল ভাবে নেড়ে দিতে হবে এবং এই পানি ২-৩ তিন ঘন্টা পর ব্যবহার করলে খাবার পানি জীবানুমূক্ত হয়ে যাবে । এভাবে প্রতিবারের খাবার পানিতে ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে তা ২-৩ ঘন্টা পর ব্যবহার করতে হবে।

পানির পাত্রঃ

বাচ্চা আসার আগেই পানির পাত্রকে জীবানুনাশক দিয়ে প্রথমে ধুয়ে নিতে হবে,তারপরে টিউবওয়েল থেকে সরাসরি উত্তোলন করা পানি দিয়ে অথবা জীবানুমূক্ত পরিস্কার পানি দিয়ে ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। বাচ্চা আসলে প্রতি ৫০ টি বাচ্চার জন্য একটি চিক ড্রিংকারের অর্ধেক পরিমান পানি ভর্তি করে প্রথম তিনদিন বারে বারে পানি দিতে হবে। পাত্রে বেশী পানি দিলে পানি নোংরা হয়ে নস্ট হয়ে যায়। সে কারনে বাচ্চা বয়সের প্রথম তিনদিন একবারে পাত্র ভর্তি করে পানি দেওয়া থেকে খামারীকে বিরত থাকতে হবে। ব্রুডিং কালে দৈনিক চার বার করে কম পরিমানে বারে বারে পরিস্কার ও জীবানুমুক্ত পানি পাত্রে দিতে হবে।

খাদ্য পাত্রঃ

প্রথম চব্বিশ ঘন্টা চিক প্লেট এবং চিক পেপারের উপর খাদ্য দিতে হবে তাহলে খুব অল্প সময়ে বাচ্চা খাদ্য চিনে যায় এবং অধিকাংশ বাচ্চা খাদ্য গ্রহন শুরু করে। এক দিন পার হলে চিক ট্রেতে ( লম্বা খাদ্য পাত্রে )খাদ্য দেওয়া আরম্ভ করতে হবে, এক সপ্তাহ পার হলে কিছু কিছু চিক ট্রে সরিয়ে তার স্থলে কিছু কিছু গোল খাদ্য পাত্র দিতে হবে, সাত দিন পরে সব লম্বা খাদ্যপাত্র ( চিক ট্রে) সরিয়ে গোল খাদ্য পাত্র দিতে হবে।

খাদ্য পাত্রের সংখ্যা নির্ভর করবে একজন খামারীর পর্যবেক্ষনের উপর । তাকে দেখতে হবে সব মুরগী একসাথে কোন প্রতিযোগিতা ছাড়া খেতে পারছে কিনা। যদি দেখা যায় সব মুরগী এক সাথে খাবার খেতে পারছে না পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে তাহলে খাদ্য পাত্র বাড়াতে হবে।

২০ দিন বয়স পর্যন্ত গোল মাঝারী খাদ্য পাত্র এবং ২১ দিন থেকে গোল বড় খাদ্য পাত্রে ব্রয়লার মুরগীকে খাদ্য দিতে হবে। এ সময় খাদ্য পাত্র মুরগীর পিঠের উচ্চতায় ঝুলিয়ে দিতে হবে তাহলে খাওয়ার সময় খাদ্য কম অপচয় হবে।

একজন খামারীকে মনে রাখতে হবে মুরগীর সংখ্যা অনুসারে পর্যাপ্ত খাবার এবং পানির পাত্র না থাকলে মুরগী ছোট বড় হয়ে যাবে ফলে বিক্রির সময় দেখা যাবে গড় ওজন অনেক কম আসছে। এ কারনে ভাল এফ সি আর পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।

খাদ্য প্রদান কৌশলঃ

১-২০ সাত দিন বয়স পর্যন্ত সাধারনত ক্রাম্বল ফিড দেওয়া হয়। এ সময় প্রতিটি বাচ্চা দৈনিক খুব কম পরিমানে খাবার খায়। তাই পাত্রে খুব বেশি খাদ্য দেওয়া যাবে না, দিলে খাদ্যে লিটার পড়ে এবং বাচ্চা পায়খানা করে খাবার নষ্ট করে। এমন হলে পায়খানা যুক্ত খাবার খেয়ে বাচ্চা ব্যাকটেরিয়াজনিত, টক্সিসিটি বা এস্পারজিলোসিস রোগে আক্রান্ত হতে পারে অন্যদিকে অনেক খাদ্যের অপচয় হয়, খাদ্য অপচয় হলে এফ সি আর ভাল হবে না।

এক সপ্তাহ বয়স হলে ধাপে ধাপে লম্বা খাদ্য পাত্র তুলে পরে গোল খাদ্য পাত্রে অনেকটা বেশী পরিমানে খাবার দেওয়া যায়। ক্রাম্বল ফিড থেকে পিলেট ফিড দেওয়া শুরু করার সময় প্রথম দুই তিন দিন প্রতিবারে দেওয়া খাদ্যে অর্ধেক ক্রাম্বল এবং অর্ধেক পিলেট ফিড দিতে হয়, না হলে হঠাৎ খাদের আকার/ গঠনের পরিবর্তন হলে ২/৩ দিন বাচ্চা খাদ্য খাওয়া কমিয়ে দেয়, এর প্রভাবে এই কয়দিন দৈহিক ওজন বৃদ্ধি থেমে যায়,এমন পরিস্থিত হলে শেষ পর্যন্ত ভাল এফ সি আর অর্জনে প্রভাব ফেলে।

২০ দিন বয়সের পরে যদি দিনে উচ্চ তাপমাত্রা থাকে তাহলে দিনের বেলায় কম পরিমানে খাবার দিয়ে রাতে বেশী করে খাবার খাওয়ানোর চেস্টা করতে হবে। গরমের সময় বেশী খাবার খেলে ব্রয়লার মুরগী গরমের ধকলে পড়ে, স্ট্রোক করে অনেক মুরগী মারা যায়, মুরগী বেশী বেশী হাঁপানোর কারনে ল্যাংড়া হয়ে যায় এবং বসে পড়ে।

অতিরিক্ত মেটাবলিক হীট উৎপাদনের কারনে ব্রয়লার মুরগী গরমের ধকলে পড়ে খাদ্য খাওয়া ছেড়ে দেয়। হীট স্ট্রেসে মুরগী যেমন খাবার খাওয়া কমিয়ে দেয় তেমনি গ্রোথ থেমে যায় এবং ধকলে মৃত্যু হার বেড়ে যায়। গরমের ধকল থেকে বাঁচতে হলে ব্রয়লারের ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা জরুরি।

দিনে অন্তত একবার খাদ্যপাত্র পরিস্কার করে নিতে হয়, তা না হলে খাদ্য পাত্রের তলানিতে থাকা পাউডার খাদ্যে ছত্রাক জন্মায় এবং ছত্রাকের কারনে ব্রয়লারে দেহে বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে। খাদ্যে বিষ ক্রিয়া দেখা দিলে লিভার নষ্ট হয়ে যাবে এবং অনেক বার্ড মারা যাবে। যে বার্ডের লিভার ঠিক মত কাজ করে না সেই বার্ড চর্বি বা ফ্যাট মেটাবলিজম করতে পারে না ফলে খাদ্যে উচ্চ এনার্জি দেওয়া সত্বেও কোষ পর্যায়ে এনার্জির ঘাটতি দেখা দেয়। অন্য দিকে লিভার নস্ট হয়ে গেলে শরীরে যে সকল বিষ প্রবেশ করে যেমন নিঃশ্বাসের বাতাসের মাধ্যমে, খাবার পানির মাধ্যমে এবং খাদ্যের মাধ্যমে সেই বিষ,নিউট্রাল বা নির্বিষ করে শরীর থেকে বের করতে পারে না, ফলে রক্তে বিষাক্ত পদার্থের পরিমান বাড়ে এবং বার্ড নানান প্রকার মেটাবলিক বা অন্যান্ন রোগে আক্রান্ত হয়, স্নায়ু দূর্বলতা দেখা দেয় , বাচ্চা বসে পড়ে এক সময় মারা যায়।

সে কারনে বার্ড কে সুস্থ রাখতে হলে এবং ব্রয়লার থেকে উচ্চ হারে এফ সি আর বা খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা পাওয়ার জন্য বিষ মুক্ত পানি এবং খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করতে হবে।

সব সময় নজরদারিতে রাখতে হবে যেন মুরগী কোন ভাবে খাদ্য পাত্র থেকে লিটারে খাদ্য ফেলে দিতে না পারে। লিটারে পড়ে থাকা খাদ্য খেলে ব্রয়লার মুরগী অনেক রকম ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগে আক্রান্ত হতে পারে এবং এ ভাবে যদি লিটারে পড়ে খাদ্য অপচয় হয়, ভেবে দেখুন সে খাদ্যের মূল্য কিন্তু আপনি পরিশোধ করেও বাস্তবে মুরগীর পেটে না গিয়ে অপচয় হওয়ার কারনে এফ সি আর কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পাবেন না।

পানির ড্রাম, পানির পাত্র, পানি সরবরাহের লাইন যেন দূষন মূক্ত থাকে, এবং নিয়মিত জীবানু নাশক দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার করা হয়।
বর্তমানে ব্রয়লারের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি কিন্তু বিক্রি করতে গেলে দেখা যায় অনেক সময় উৎপাদন খরচ থেকেও কম দামে ব্রয়লার বিক্রি করতে হচ্ছে। অনেকে এভাবে লোকসান দিয়ে দিয়ে এক সময় দেনার দায়ে এই ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ছোট বা মাঝারী খামারীরা দিনে দিনে আরো সংকটের মধ্যে পড়বেন, কারন বড় বড় উদ্যোগতারা অনেক আধুনিক খামার প্রতিষ্ঠা করছেন, যদিও তাদের শুরুতে বিনিয়োগ অনেক বেশি কিন্তু এই সকল প্রযুক্তির বদৌলতে তাদের ম্যানেজম্যামেন্ট খরচ অনেক কমে যাচ্ছে- যেমন তাঁরা কম দামে বাচ্চা,খাদ্য মেডিসিন ভিটামিন ক্রয় করতে পারছেন। আর তাদের প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাত্রি কারনে লোকবল একদিকে কম লাগছে তেমনি রোগ ব্যাধি কম হচ্ছে, খাদ্যের অপচয় কম হয়, ঘরে কোন দূষিত গ্যাস থাকে না, পানির পাত্র বা খাদ্যের যে সিস্টেম তাতে খাদ্য বা পানি কম অপচয় হয়। ঘরে সব সময় একই রকম তাপমাত্রা এবং আদ্রতা বজায় থাকে, ফলে ব্রয়লার কে কোন রূপ ঠান্ডা বা গরমের ধকলে পড়তে হয় না এবং ব্রয়লারের দৈহিক ওজন অর্জনে কোন বাধার সম্মুখীন হতে হয় না।

সে তুলনায় ছোট বা মাঝারী খামারীদের ডিলার নির্ভর খাদ্য,বাচ্চা, মেডিসিন ভিটামিন ক্রয় করার কারনে শুরুতেই অনেক বেশি প্রতি ব্যাচে বিনিয়োগ করতে হয়। এছাড়া ঠান্ডা গরমের প্রভাব, দামের উঠানামা এবং রোগব্যাধির কারনে সব সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়।
ছোট বা মাঝারী খামারীদের যদি লাভ করতে হয় ক্রয়

অতিরিক্ত মেটাবলিক হীট উৎপাদনের কারনে ব্রয়লার মুরগী গরমের ধকলে পড়ে খাদ্য খাওয়া ছেড়ে দেয়। হীট স্ট্রেসে মুরগী যেমন খাবার খাওয়া কমিয়ে দেয় তেমনি গ্রোথ থেমে যায় এবং ধকলে মৃত্যু হার বেড়ে যায়। গরমের ধকল থেকে বাঁচতে হলে ব্রয়লারের ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা জরুরি।

দিনে অন্তত একবার খাদ্যপাত্র পরিস্কার করে নিতে হয়, তা না হলে খাদ্য পাত্রের তলানিতে থাকা পাউডার খাদ্যে ছত্রাক জন্মায় এবং ছত্রাকের কারনে ব্রয়লারে দেহে বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে। খাদ্যে বিষ ক্রিয়া দেখা দিলে লিভার নষ্ট হয়ে যাবে এবং অনেক বার্ড মারা যাবে। যে বার্ডের লিভার ঠিক মত কাজ করে না সেই বার্ড চর্বি বা ফ্যাট মেটাবলিজম করতে পারে না ফলে খাদ্যে উচ্চ এনার্জি দেওয়া সত্বেও কোষ পর্যায়ে এনার্জির ঘাটতি দেখা দেয়। অন্য দিকে লিভার নস্ট হয়ে গেলে শরীরে যে সকল বিষ প্রবেশ করে যেমন নিঃশ্বাসের বাতাসের মাধ্যমে, খাবার পানির মাধ্যমে এবং খাদ্যের মাধ্যমে সেই বিষ,নিউট্রাল বা নির্বিষ করে শরীর থেকে বের করতে পারে না, ফলে রক্তে বিষাক্ত পদার্থের পরিমান বাড়ে এবং বার্ড নানান প্রকার মেটাবলিক বা অন্যান্ন রোগে আক্রান্ত হয়, স্নায়ু দূর্বলতা দেখা দেয় , বাচ্চা বসে পড়ে এক সময় মারা যায়।

সে কারনে বার্ড কে সুস্থ রাখতে হলে এবং ব্রয়লার থেকে উচ্চ হারে এফ সি আর বা খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা পাওয়ার জন্য বিষ মুক্ত পানি এবং খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করতে হবে।

সব সময় নজরদারিতে রাখতে হবে যেন মুরগী কোন ভাবে খাদ্য পাত্র থেকে লিটারে খাদ্য ফেলে দিতে না পারে। লিটারে পড়ে থাকা খাদ্য খেলে ব্রয়লার মুরগী অনেক রকম ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগে আক্রান্ত হতে পারে এবং এ ভাবে যদি লিটারে পড়ে খাদ্য অপচয় হয়, ভেবে দেখুন সে খাদ্যের মূল্য কিন্তু আপনি পরিশোধ করেও বাস্তবে মুরগীর পেটে না গিয়ে অপচয় হওয়ার কারনে এফ সি আর কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পাবেন না।

পানির ড্রাম, পানির পাত্র, পানি সরবরাহের লাইন যেন দূষন মূক্ত থাকে, এবং নিয়মিত জীবানু নাশক দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার করা হয়।
বর্তমানে ব্রয়লারের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি কিন্তু বিক্রি করতে গেলে দেখা যায় অনেক সময় উৎপাদন খরচ থেকেও কম দামে ব্রয়লার বিক্রি করতে হচ্ছে। অনেকে এভাবে লোকসান দিয়ে দিয়ে এক সময় দেনার দায়ে এই ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ছোট বা মাঝারী খামারীরা দিনে দিনে আরো সংকটের মধ্যে পড়বেন, কারন বড় বড় উদ্যোগতারা অনেক আধুনিক খামার প্রতিষ্ঠা করছেন, যদিও তাদের শুরুতে বিনিয়োগ অনেক বেশি কিন্তু এই সকল প্রযুক্তির বদৌলতে তাদের ম্যানেজম্যামেন্ট খরচ অনেক কমে যাচ্ছে- যেমন তাঁরা কম দামে বাচ্চা,খাদ্য মেডিসিন ভিটামিন ক্রয় করতে পারছেন। আর তাদের প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাত্রি কারনে লোকবল একদিকে কম লাগছে তেমনি রোগ ব্যাধি কম হচ্ছে, খাদ্যের অপচয় কম হয়, ঘরে কোন দূষিত গ্যাস থাকে না, পানির পাত্র বা খাদ্যের যে সিস্টেম তাতে খাদ্য বা পানি কম অপচয় হয়। ঘরে সব সময় একই রকম তাপমাত্রা এবং আদ্রতা বজায় থাকে, ফলে ব্রয়লার কে কোন রূপ ঠান্ডা বা গরমের ধকলে পড়তে হয় না এবং ব্রয়লারের দৈহিক ওজন অর্জনে কোন বাধার সম্মুখীন হতে হয় না।

সে তুলনায় ছোট বা মাঝারী খামারীদের ডিলার নির্ভর খাদ্য,বাচ্চা, মেডিসিন ভিটামিন ক্রয় করার কারনে শুরুতেই অনেক বেশি প্রতি ব্যাচে বিনিয়োগ করতে হয়। এছাড়া ঠান্ডা গরমের প্রভাব, দামের উঠানামা এবং রোগব্যাধির কারনে সব সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়।
ছোট বা মাঝারী খামারীদের যদি লাভ করতে হয় ক্রয় বিক্রয় এবং ম্যানেজমেন্ট প্রত্যেকটি স্তরে অনেক বেশি সচেতন এবং আন্তরিক থাকতে হবে।

৪র্থ পর্বঃ-

চিক গার্ড এবং চিক পেপার চিক গার্ড-

বাচ্চা ব্রুডিং এর জন্য যে চিক গার্ড বানানো হবে তা যেন গোলাকৃতি হয়। চিক গার্ড বাকা হলে বা যদি কোন কারনে কোনাকৃতি হয় তাহলে সেই কোনার ভিতরে বাচ্চা যখন ফাইলিং বা গাদাগাদি করে, সে সময় চাপাচাপিতে অনেক বাচ্চা মারা যাওয়ার অনেক বেশী ঝুঁকি থাকে।
চিক গার্ডের উচ্চতা ১৮” ইঞ্চির বেশী হওয়া উচিৎ নয়। উচ্চতা বেশী হলে যারা খামারে কাজ করে তাদের খাদ্য বা পানি দিতে সমস্যা হয়। চিক গার্ড প্লাস্টিক টিন বা হার্ড বোর্ড বা বাজারে পাওয়া প্লাস্টিক বোর্ড দিয়ে বানানো যায়। কেউ কেউ গরম কালে তারের বা প্লাস্টিক নেট দিয়েও চিক গার্ড বানায়। যা দিয়েই চিক গার্ড বানানো হউক চিক গার্ড স্থাপনের আগে তাতে জীবানু নাশক স্প্রে করে নিতে হবে, অন্যথায় এই চিক গার্ডের মাধ্যমে প্রথম দিন থেকেই একদিন বয়সী বাচ্চাতে ক্ষতিকর জীবানু ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।

চিক পেপার

লিটারের উপর চিক পেপার বিছানোর আগে লিটার বা কাঠের ভুঁষি বা তুষে কয়েক বার জীবানু নাশক স্প্রে করে নিতে হবে এটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে লিটারের মধ্যে কোন জীবানু নেই। লিটারে যদি কোন জীবানু থাকে তাহলে তা প্রথম দিন থেকেই বাচ্চাতে সংক্রমিত হবে।
বাচ্চা আসার কয়েক ঘন্টা আগে চিক পেপার বিছিয়ে দিতে হবে। পেপার বিছানোর পরে পেপারের উপর আরেক দফা জীবানু নাশক স্প্রে করে ব্রুডার জ্বালিয়ে পেপার শুকিয়ে নিতে হবে।
বাচ্চা চিক গার্ডে ছাড়ার কয়েক ঘন্টা আগে সব ব্রুডার জ্বালিয়ে ঘর গরম করে নিতে হবে। যেন বাচ্চা চিক গার্ডে ছাড়লে পরিবেশগত ধকলে না পড়ে। বাচ্চাকে প্রথমে পানি দিতে হবে,পানিতে
মাল্টি ভিটামিন ভিটামিন-সি ইলেক্টোলাইটস দেওয়া উত্তম এতে বাচ্চা জার্নিতে এবং ডি-হাইড্রেশানের জন্য যদি কোন ধকলে পড়ে থাকে তাহলে দ্রুত চাংগা বা সচল হয়ে যাবে।

বাচ্চা ব্রুডারে ছেড়ে দেওয়ার পর কিছু সময় পানি খাওয়ার পরে ট্রাফ ফিডার বা লম্বা খাদ্য পাত্রে অল্প পরিমান করে খাদ্য দিতে হবে আর চিক পেপারের উপর কিছু পরিমান খাদ্য ছিটিয়ে দিতে হবে। বর্তমানে একদিন বয়সী বাচ্চার জন্য উপযুক্ত বিশেষ ভাবে তৈরি খাবার পাত্র পাওয়া যায় এই পাত্রে খাদ্য দিলে বাচ্চা সহজে খেতে পারে এবং খাবার কম নষ্ট হয় ।

লম্বা খাদ্য পাত্র এবং পানির পাত্র চিক গার্ডের ভিতর এমন ভাবে স্থাপন করতে হবে যেন বাচ্চার চলাচলে কোন ব্যঘাত না হয়।যদি বিশৃঙ্খল ভাবে খাদ্যপাত্র এবং পানির পাত্র স্থাপন করা হয় তাহলে বাচ্চা তেমন চলাচল করবে না, খাদ্য এবং পানি কম খাবে, বেশিরভাগ সময় ব্রুডারের নিচে জড়ো হয়ে বসে থাকবে। ফলে বাচ্চা প্রথন দিন থেকে কাং্খিত দৈহিক ওজন বৃদ্ধি থেকে পিছনে থাকবে।
এই ধরনের পরিস্থিতে বাচ্চা খাদ্য খাওয়া ছেড়ে দিয়ে শুধু মাত্র তাপ প্রাপ্তির জন্য ব্রুডারের নীচে জড় হবে এবং খাদ্য গ্রহন না করার কারনে তার নিজের দেহের ভিতর থেকে কোন তাপ উৎপাদন হবে না। দেহের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত তাপ উৎপাদন না হলে ২/৩ দিনের মধ্য বাচ্চা পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারবে না,এক দিকে কাত হয়ে পড়ে যাবে ও অনেক বাচ্চা মরতে থাকবে।

চিত্রঃ ব্রয়লার বাচ্চার ব্রুডিং
ব্রুডারের মাধ্যমে তাপ প্রদানের গুরুত্ব

তাপ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হল বাচ্চার ঘরের তাপমাত্রা এমন লেভেলে রাখা যেন বাচ্চা আরাম অনুভব করে এবং ছোটাছুটি করে, জীবনের প্রথম দিন থেকে বারে বারে খাবার পানি খায়। খাবার পানি প্রথম দিন থেকে খেলেই বাচ্চার নিজস্ব দৈহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদিত হবে যা বাচ্চা কে অনেক কম তাপমাত্রার ঘরের ভিতরেও বেচে থাকতে সাহায্য করবে এবং দ্রুত সময়ে দৈহিক ওজন বৃদ্ধিতে অনেক সাহায্য করবে।

বিভিন্ন বয়সে ব্রুডিং তাপমাত্রা-

১-৩ দিন
কেইজ ব্রুডিং ৩৩-৩৪ সেন্টিগ্রেড /৯১-৯৩ ফারেনহাইট
ফ্লোর ব্রুডিং ৩৫ সেন্টিগ্রেড /৯৫ ফারেনহাইট

৪-৭ দিন
কেইজ ব্রুডিং ৩২-৩৪ সেন্টিগ্রেড /৯০-৯৩ ফারেনহাইট
ফ্লোর ব্রুডিং ৩৩ সেন্টিগ্রেড /৯২ ফারেনহাইট

৮-১৪ দিন
কেইজ ব্রুডিং ২৯-৩১ সেন্টিগ্রেড /৮৫-৮৯ ফারেনহাইট
ফ্লোর ব্রুডিং ৩১সেন্টিগ্রেড /৮৯ ফারেনহাইট

১৫-২১ দিন
কেইজ ব্রুডিং ২৬-২৯ সেন্টিগ্রেড /৮০-৮৪ ফারেনহাইট
ফ্লোর ব্রুডিং ২৯ সেন্টিগ্রেড /৮৪ ফারেনহাইট

২২-২৮ দিন
কেইজ ব্রুডিং ২৪-২৬ সেন্টিগ্রেড /৭৫-৭৯ ফারেনহাইট
ফ্লোর ব্রুডিং ২৬ সেন্টিগ্রেড /৭৯ ফারেনহাইট

২৯-৩৫ দিন
কেইজ ব্রুডিং ২১-২৩ সেন্টিগ্রেড /৭০-৭৪ ফারেনহাইট
ফ্লোর ব্রুডিং ২৩ সেন্টিগ্রেড /৭৪ ফারেনহাইট

৩৬ দিনের উদ্ধে
কেইজ ব্রুডিং ১৭-২১ সেন্টিগ্রেড / ৭০ বা কম ফারেনহাইট
ফ্লোর ব্রুডিং ২১ সেন্টিগ্রেড /৭০ ফারেনহাইট

উল্লেখ্য যে বাচ্চা ব্রুডারে ছাড়ার পর থেকে নিয়মিত খাবার পানি খাবে সে বাচ্চা বিক্রির সময় অন্য বাচ্চা যারা প্রথম দিন খাবার পানি গ্রহন করতে দেরি করেছিল তাদের থেকে অনেক বেশী দৈহিক ওজন অর্জন করবে।
আগে আমাদের দেশের খামারীরা পুরাতন খবরের কাগজ ব্রুডিং এ চিক পেপার হিসাবে ব্যবহার করতেন,পুরাতন পেপার সহজে নষ্ট হয়ে যায় এবং ছত্রাকের সৃষ্টি করে যা থেকে পরে ব্রুডার নিউমোনিয়ার মত রোগ ছড়ায়।

বর্তমানে বাজারে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত চিক পেপার রোল আকারে পাওয়া যায়। এই চিক পেপারের একটি বিশেষ গুন আছে, বাচ্চা পেপারের উপর দিয়ে হাটার সময় মচমচ আওয়াজ হয় এই মচমচ শব্দে অন্য বাচ্চারা সচেতন হয়ে উঠে দোড় ঝাপ করে এবং বেশী করে খাদ্য গ্রহনে উৎসাহিত হয় । মনে রাখতে হবে বাচ্চা বেশি খেলে দ্রুত বেশী ওজন আসবে এবং কাঙ্ক্ষিত এফ সি আর পাওয়া যাবে যা চুড়ান্ত বিক্রির পরে লাভ লোকসানে অনেক প্রভাব ফেলে।

চিক পেপার দেওয়া হয় এ কারনে যে, বাচ্চা প্রথন দিন থেকে যেন খাদ্য চিনে এবং খাদ্য ও লিটারের মধ্যে পার্থক্য বুঝে। যদি চিক পেপার না দিয়ে সরাসরি লিটারের উপর পাত্রে খাদ্য দেওয়া হয় তাহলে অনেক বাচ্চা লিটার খেয়ে ফেলে। তাতে বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে জন্য চিক পেপারের উপর প্রথমে খাদ্য দিয়ে বাচ্চাকে খাদ্যের সাথে প্রথম দিন থেকেই পরিচিত করা হয়।
চিক পেপার ভিজে গেলে ভিজা পেপার বদলিয়ে শুকনো নতুন পেপার দিতে হয়।চিক পেপার চব্বিশ ঘন্টার বেশী রাখা উচিৎ নয়, বেশী সময় রাখলে পেপারে ছত্রাক জন্মে যা থেকে বাচ্চায় ব্রুডার নিউমোনিয়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

প্রথম দিন নূন্যতম চারবার করে পানি দিতে হয়।এতে পানি ও পানির পাত্র নোংরা হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।তেমনি খাদ্য অল্প করে বারে বারে দিতে হয় এতে খাদ্য কম অপচয় হয় এবং খাদ্যে তেমন লিটার পড়ার আগেই বাচ্চা খেয়ে নেয়।

মনে রাখা জরুরী চিক গার্ডের ভিতর যেন বাচ্চা অনুসারে পর্যাপ্ত পরিমানে খাদ্য পাত্র থাকে অন্যথায় বাচ্চাদের মধ্যে খাদ্য খাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা হবে।ফলে যারা যুদ্ধকরে খেতে পারবে তারা দ্রুত বড় হবে, যারা খেতে পারবে না তারা ছোট থেকে যাবে এবং অপুস্টিতে ভুগে খোড়া হয়ে যেতে পারে এমন কি দূর্বল হয়ে মরে যেতে পারে।

বাচ্চা ভালভাবে বেড়ে উঠার জন্য প্রথম তিন দিনের পানিতে দরকারি ভিটামিন,ইলেক্ট্রোলাইট দিতে হয় । যদি বাচ্চার নাভি কাঁচা থাকে তবে প্রানি চিকিৎসকের পরামর্শে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উত্তম। খামারীদের ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এন্টিবায়োটিক বা যে কোন ড্রাগ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিৎ। আন্দাজে অথবা অন্য খামারীর পরামর্শে ড্রাগ ব্যবহার ব্রয়লার বাচ্চার দীর্ঘ মেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং যারা ব্রয়লার মাংস খায় তাদেরও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলে।

ব্রুডারের তাপমাত্রা যেন বাচ্চার জন্য আরামদায়ক থাকে তার দিকে নজর দিতে হবে। কম আলো এবং তাপে বাচ্চা কম নড়াচড়া করবে, খাদ্য পানি কম খাবে এবং পরিনামে বিক্রির সময় বাচ্চার ওজন কম আসবে।অন্যদিকে প্রযোজনের অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং অধিক তীব্রতার বিরক্তিকর আলোতে বাচ্চা অস্বস্তি বোধ করবে এবং খাদ্য পানি খাওয়া ছেড়ে দেবে এতেও বাচ্চার ওজন বৃদ্ধি হবে না।মোদ্দাকথা হল বাচ্চার ব্রুডিংকালীন সঠিক তাপমাত্রা এবং গ্রহনযোগ্য আলোর উজ্বলতা বজায় রাখতে হবে যা বাচ্চাকে বেশী করে খাদ্য এবং পানি খেতে উৎসাহিত করে। প্রতি দিন সঠিক পরিমানে খাদ্য পানি খাওয়া মানে প্রতিদিন গড়ে সঠিক পরিমানে ব্রয়লার বাচ্চার দৈহিক ওজন লাভ করা। ভাল ভাবে শুরু করা মানে অর্ধেক কাজ শেষ হয়ে যাওয়া তাই বাচ্চা বয়সের প্রথম তিন দিনের সঠিক যত্ন বাচ্চাকে ভাল ভাবে জীবন শুরুতে সাহায্য করে।

ব্রয়লারে আলোক দান কর্মসূচী এবং আলোর তীব্রতা( লাক্স)

ব্রয়লার মুরগী পালনে আলোর তীব্রতা অতিব গুরুত্বপূর্ন বিষয় । আমাদের দেশে ছোট বা মাঝারী খামারীরা সাধারনত ইলেকট্রিক বাল্বের মাধ্যমে ব্রুডিং করেন। তার জন্য ১০০/২০০ ওয়াটের বাল্ব ব্যবহার করেন, এর ফলে আলোর উজ্জ্বলতা অনেক বেশি থাকে , এতে বাচ্চা অস্বস্তি বোধ করে। গ্যাস ব্রুডার বা ইনফ্রারেড বাল্বের মাধ্যমে ব্রুডিং করলে উজ্জ্বলতা কম থাকে এবং বাচ্চা জন্য তাপ এবং আলোর একটা আরামদায়ক পরিবেশ বজায় থাকে। আরামদায়ক পরিবেশে বাচ্চার মুভমেন্ট ভাল থাকে, গাদাগাদি কম করে পর্যাপ্ত পরিমানে খাবার গ্রহন করে এবং প্রতিদিন কাঙ্ক্ষিত দৈহিক অর্জন করে।

পর্ব-৫
ব্রয়লারের ১২ থেকে ১৮ দিন বয়সের যত্ন (ক্রিটিক্যাল সময়।

ব্রয়লার মুরগী জন্মের দিন থেকে ৩০ দিন বয়সের মধ্যে যে পরিমান ওজন লাভ করে তা এই দুনিয়ার আর কোন প্রানী পক্ষে সম্ভব নয়। যেমন একটি হাতির বাচ্চা জন্মের সময় তার ওজন থাকে প্রায় ৩০০ কেজি এবং ১২ বছর পরে চুড়ান্ত হাতিতে পরিনত হয়। অথচ মাত্র ৪৫-৫০ গ্রামের একটি ব্রয়লার বাচ্চা ৩০ দিনে ১৬০০-১৮০০ গ্রাম ওজন লাভ করে। যা তার জন্মের ওজনের ৩২০০%!! ভেবে দেখুন বিষয়টা ।। এই ওজন পেতে হলে কি করতে হবে তার অনেকটাই আগের পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। বার তলা একটা বিল্ডিং বানানোর জন্য যেমন একটা শক্ত ফ্রেম দরকার যা উক্ত বিল্ডিঙের সব ওজন বহনের সামর্থ্য রাখে এবং নির্মান করতে হবে প্রযোজন অনুসারে সঠিক মাপের কলাম এবং ভীম; অন্যথায় যেকোন সময় উক্ত ভবনে ধ্বস নামতে পারে।

তেমনি ভাবে ১৬০০-১৮০০ গ্রাম দৈহিক ওজন বহনের জন্য ব্রয়লার মুরগীর দরকার শক্ত ও বড় স্কেলিটাল বা হাঁড়গোড় বা অস্তিতন্ত্র। ব্রয়লার মুরগীর অস্তিতন্ত্র বা হাড্ডির গঠন বাড়ে মূলত ১২-১৮ দিন বয়সের মধ্যে। এই সময়ে নির্ধারন হয়ে যায় কোন মুরগীটা কতটুকু বড় হবে ,লম্বা গঠনের মুরগী বেশী মাংসের ওজন বহন করতে পারবে আর ছোট সাইজের অস্তিতন্ত্র কম মাংসের ওজন বহন করতে পারবে। সুতরাং আমাদের বড় সাইজের ব্রয়লার মুরগী পেতে হলে যা করার এই ১২ থেকে ১৮ দিন বয়স অর্থাৎ সাত দিনের মধ্যেই করতে হবে। এই বয়সের খাদ্যে খনিজ পদার্থ যেমন-ক্যালসিয়াম,ফস্ফরাস,জিংক,ম্যাগনেশিয়াম আয়রন ইত্যাদির আধিক্য থাকতে হবে পাশাপাশি ভিটামিন ডি এবং এ খাদ্যের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমানে থাকা বাঞ্চনীয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে যেহেতু প্রায় সকল ব্রয়লার খামারী বিভিন্ন কোম্পানীর রেডি খাদ্য খাওয়ান তাই তাদের পক্ষে অনুমান করা বাস্তবেই কঠিন খাদ্যে কি পরিমাণে এই সময়ের জন্য দরকারি মিনারেল বা ভিটামিন আছে। ঝুঁকি এড়ানোর জন্য ব্রয়লারের জীবন চক্রের এই ১২-১৮ দিন বয়সের ব্রয়লার মুরগীর খাবার পানির সাথে সে সকল মিনারেল ও ভিটামিন অর্থাৎ যেগুলো হাড়ের গঠন এবং দ্রুত ওজন বাড়তে সাহায্য করে তা এই সাত দিন পর্যন্ত প্রতিদিন উৎপাদনকারী কোম্পানীর নির্দেশনা অনুসারে ব্যবহার করা। এই বয়সে যদি সঠিক পরিমানে ভিটামিন ও মিনারেল মুরগীর রক্তে না থাকে তাহলে চূড়ান্ত ভাবে ভাল ওজন ও বড় সাইজের ব্রয়লার প্রাপ্তি আশা করা যায় না।
ব্রয়লারের ২৪ থেকে ২৮ দিন বয়সের যত্ন (দ্রুত মাংস বাড়ার সময়)

ভালভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ২৪ দিন বয়সের আগে যদি মুরগী কোনভাবে রোগব্যাধি বা অন্যান্ন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মারাত্মক ভুক্তভুগি না হয় তাহলে ২৪-২৮ দিন বয়সে প্রতিদিন ১০০-১২০ গ্রাম হারে দৈহিক ওজন লাভ করছে। এটা সম্ভব যদি খাদ্যে দরকারি পুস্টি উপাদন থাকে এবং সঠিক মাপের অস্তিতন্ত্র গঠিত হয়।
ব্রয়লারের জীবনের এই ৫ দিন দৈহিক ওজন দ্রুত বাড়ার কারনে মুরগীর মেটাবলিক রেট( বিপাকীয় হার) অনেক বেড়ে যায় ফলে মুরগীর দেহ থেকে আগের তুলনায় অনেক বেশি তাপ নির্গত হয় এবং মুরগীর গরমজনিত ধকলের কারনে মৃত্যু হতে পারে। অন্যদিকে রক্ত সংবহনতন্ত্র (রক্তনালী হার্ট ফুসফুস) যদি অতিরিক্ত রক্ত বহনের উপযোগী না থাকে তাহলে অতিরিক্ত ওজনের জন্য ব্রয়লার মুরগী হার্টফেল করতে পারে।

উল্লেখিত বয়সে এই সকল সমস্যা এড়ানোর জন্য ঘর খোলামেলা রাখতে হবে,গরমের সময় ফ্যানের ব্যবস্থা থাকতে হবে, লিটার যতটা সম্ভব শুকনা রাখার চেস্টা করতে হবে যেন উচ্চ তাপমাত্রার সাথে সাথে উচ্চ আদ্রতার মধ্যে ব্রয়লার মুরগীকে ধকলে ফেলতে না পারে। মুরগীর অধিক ঘনত্ব পরিহার করতে হবে। গরমজনিত ধকল ,হার্টস্টোক এড়ানোর জন্য ২৪-২৮ বয়সে পানিতে ইলেক্ট্রোলাইট,ভিটামিন ই এবং সি ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ব্রয়লার মুরগীর ওজন যখন দ্রুত বাড়ে তখন মুরগী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় কিছুটা ভাটা পড়ে এ কারনে এ সময় যে কোন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস বা অন্যান্ন ব্যবস্থাপনা ত্রুটির জন্য রোগাক্রান্ত হয়ে পড়তে পারে, এ সময় যদি কোন কারনে ব্রয়লার রোগাক্রান্ত হয় তাহলে খামারী মারাত্মক লোকসানের ঝুকিতে পড়বেন। বাজারে অনেক রকমের ইমুইউন এনহ্যান্সার বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপাদান পাওয়া যায় যা সঠিক এবং পরিমিত পরিমানে ব্যবহার করলে রোগ থেকে যেমন নিস্কৃতি পাওয়া যায় তেমনি দৈহিক ওজন বৃদ্ধিতে কোন ভাটা পড়ে না।

বাংলাদেশে ব্রয়লার খামারের ব্যবস্থাপনা অতটা বিজ্ঞান ভিত্তিক নয়, পুরাতন খামারীকে নতুন খামারী অনুসরন করে ব্রয়লার পালন করে, ফলে অন্ধ অনুসরনের কারনে অনেক রকম ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারনে সঠিক বৈজ্ঞানিক পন্থায় ব্রয়লার পালন করা হয় না।
বাস্তবে ব্রয়লার পালন একটি উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর বলতে এখানে যন্ত্রপাতিকে বুঝানো হচ্ছে না, যা বলতে চাওয়া হচ্ছে তা হল ব্রয়লার মুরগীর শারীরিক চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে খাদ্য পানি পরিবেশ এবং বায়োসিকিউরিটি সঠিক ব্যবস্থা করা এবং এর জন্য দরকারি তথ্য এবং ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করা পাশাপাশি নিজের নিয়মিত পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান।

আমাদের দেশে ব্রয়লারের যে সকল জাতের খামারীদের নিকট অধিক চাহিদা আছে সেগুলো দ্রুত বাড়ে এবং দ্রুত বর্ধনশীল জাতের ব্রয়লার মুরগী পরিবেশ এবং রোগব্যাধির প্রতি অত্যাধিক সংবেদনশীল। ব্রয়লার মুরগীর জন্য উচ্চ তাপমাত্রা যেমন ক্ষতিকারক তার চেয়ে অধিক ক্ষতিকারক উচ্চ আদ্রতা, অধিক আদ্রতায় ব্রয়লার মুরগী বেশি হাঁপায় যার কারনে দেহ থেকে অনেক আদ্রতা বেরিয়ে যায়, এ রকম পরিস্থিতে ব্রয়লার ডিহাইড্রেশানের কবলে পড়ে এবং খোঁড়া হয়ে যায়, যখন তাপমাত্রা এবং আদ্রতা যুগপৎ ভাবে বাড়তে থাকে তখন ব্রয়লারের জীবনের শেষ দিকে অধিক ওজনের কারনে মৃত্যহার অত্যাধিক হয়। বিশেষ করে গরমের সময় বিক্রির আগে আগে এমন পরিস্থির সৃষ্ঠি হয়।
২৮ দিন বয়স থেকে বিক্রি পর্যন্ত পানিতে ভিটামিন ই, সি এবং ইলেট্রোলাইট নিয়মিত দিলে এ ধরনের উচ্চ তাপমাত্রা এবং উচ্চ আদ্র পরিস্থিতে ভাল ফলাফল পাওয় যায় এবং দৈহিক ওজন ধরে রাখতে সহায়ক হয়।।
একটি ব্রয়লার খামারকে কোন ভাবেই এন্টিবায়োটিকের উপর নির্ভর করে বেশি দিন টিকিয়ে রাখা যায় না, টিকে থাকতে হলে যতটা সম্ভব ভাল ব্যবস্থাপনার দিকে ঝুকতে হবে।
ভাল ব্যবস্থাপনা বলতে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন খামার, জীবানুমুক্ত পানি,খামারে সিডিউল করে নিয়মিত কার্য্যকরী জীবানুনাশক ব্যবহার, খামারে কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট পোশাক-জুতার ব্যবস্থা করা, লোকালয় থেকে নিরিবিলি পরিবেশে উঁচু স্থানে যেখানে দ্রুত পানি নেমে যায় সেখানে খামার করা। কুকুর বিড়াল পাখি ইদুর এবং খামারে যেন বাইরের কোন লোক আসতে না পারে তা ঠেকিয়ে রাখা, ব্রয়লার বিক্রির সময় মুরগী পরিহনের গাড়ি খামার থেকে দূরে রেখে প্লাস্টিকের খাঁচার করে খামার থেকে বাইয়ে নিয়ে ওজন করে গাড়িতে মুরগী ডেলিভারী দেওয়া। বাইরের থেকে এসে খামারে প্রবেশের আগে গোসল করে খামারে প্রবেশের জন্য সুনিদৃষ্ট পোশাক এবং জুতা পরে ভালভাবে গায়ে জীবানুনাশক স্প্রে করে মুরগীর কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা করা।
বাচ্চার বয়সের প্রথম দিন থেকে ভ্যাক্সিনের একটি সিডিউল করা,যেখানে কত দিন বয়সে,কোন তারিখে কি ভাবে ভ্যাক্সিন প্রয়োগ করা হবে তার একটি হাতে লেখা বা প্রিন্টেড সিডিউলে বিস্তারিত উল্ল্যেখ থাকা। এর বাইরে কোন কোন বয়সে কি কি ভিটামিন বা দরকারী অন্যান্ন উপাদান পানিতে ব্যবহার করা হবে তার মাত্রা এবং পন্যের নামেরও একটি সিডিউল করতে হবে।
একটি লাভজনক ব্রয়লার খামার পরিচালনার জন্য খামারের সকল কার্য্যক্রমের রেকর্ড রাখা জরুরী। প্রতিদিন খাদ্য ভিটামিন মেডিসিন ও অন্যান্ন উপাদানের ক্রয় এবং ব্যবহার, মুরগীর দৈহিক ওজনের রেকর্ড এবং মৃত্যু ও ছাটাইয়ের রেকর্ড লাভ লোকসান হিসাব রাখতে অনেক সহায়ক হয়। একটি সঠিক খামার রেকর্ড কোন সময়ে ব্রয়লার বিক্রি করলে লাভ বা লোকসান হবে তা মূল্যায়ন করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। সঠিক রেকর্ড বিহীন খামার কোন ভাবেই ব্যবসায়িকভাবে সফলতা আনতে পারে না।
নিয়মিত প্রশিক্ষন গ্রহন এবং নতুন নতুন প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হতে না পারলে পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে একজন খামারীর পক্ষে কোন ভাবেই লাভজনক ভাবে খামার পরিচালনা অন্তত বাংলদেশের বর্তমান খামার ব্যবসায় সম্ভব নয়। তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগে ব্যবসায় সফলতা আনতে হলে ইন্ট্রারনেটের দিকে ঝুঁকতে হবে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেক দরকারি আধুনিক তথ্য পাওয়া যায় যা একজন খামারিকে আধুনিক পদ্দতিতে লাভজনক ভাবে খামার ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক সহায়তা করতে পারে।

Please follow and like us:

About admin

Check Also

খামারীর কৃপণতা এবং অপচয় যা ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়।

খামারীর কৃপণতা যা তাকে লসে ফেলে দেয়,খামারীর অপচয় যা লসে ফেলে দেয় বা ক্ষতির কারণ …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Translate »
error: Content is protected !!