কবুতর পালন: প্রজনন, ডিম ব্যবস্থাপনা ও বাচ্চা পালন (৪র্থ পর্ব)

কবুতর পালন: প্রজনন, ডিম ব্যবস্থাপনা ও বাচ্চা পালন (৪র্থ পর্ব)

কবুতর পালনে লাভের মূল ভিত্তি হলো ভালো প্রজনন ব্যবস্থাপনা। সঠিক সময়ে জোড়া নির্বাচন, ডিমের যত্ন, বাচ্চা ফোটানো এবং বাচ্চার পরিচর্যা সঠিকভাবে করতে পারলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং বাচ্চার মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

কবুতরের প্রজনন চক্র

  • সাধারণত ৫–৬ মাস বয়সে প্রজননক্ষম হয়।
  • প্রতি ২৮–৩০ দিন পরপর একটি জোড়া কবুতর ২টি ডিম দেয়।
  • প্রথম ডিম দেওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরে দ্বিতীয় ডিম দেয়।
  • নর ও মাদি উভয়েই পালাক্রমে ডিমে তা দেয়।
  • সাধারণত ১৭–১৯ দিনে বাচ্চা ফুটে।

ডিম দেওয়ার আগে করণীয়

ডিম দেওয়ার ১–২ দিন আগে মাদি কবুতর বাসায় বেশি সময় অবস্থান করে। এ সময়—

  • পরিষ্কার নেস্ট বোল বা মাটির হাঁড়ি দিন।
  • খড়, ঝুট বা শুকনো ঘাস দিয়ে নরম বিছানা তৈরি করুন।
  • পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম, মিনারেল ও বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করুন।
  • অপ্রয়োজনীয় ধরাধরি বা ভয় দেখানো থেকে বিরত থাকুন।

ডিমের যত্ন

ডিম পাড়ার তারিখ লিখে রাখুন। এতে বাচ্চা ফোটার সম্ভাব্য সময় সহজে জানা যায়।

ডিম ধরার সময়—

  • পরিষ্কার হাত ব্যবহার করুন।
  • ঝাঁকুনি দেবেন না।
  • বেশি সময় বাসার বাইরে রাখবেন না।

ডিম পরীক্ষা (Candling)

ডিম পাড়ার ৪–৫ দিন পরে টর্চের আলো দিয়ে পরীক্ষা করলে বোঝা যায় ডিমে ভ্রূণ তৈরি হয়েছে কি না।

যদি রক্তনালীর মতো শিরা দেখা যায়, তাহলে ডিমটি নিষিক্ত (Fertile)।

যদি ভেতরে কোনো পরিবর্তন না দেখা যায়, তাহলে সেটি অনিষিক্ত (Infertile) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

একই সময়ে দুই ডিমে তা দেওয়ার সুবিধা

প্রথম ডিম পাড়ার পর অনেক খামারি সেটি সাময়িকভাবে সরিয়ে রেখে কৃত্রিম ডিম ব্যবহার করেন।

দ্বিতীয় ডিম দেওয়ার পরে প্রথম ডিমটি আবার বাসায় রাখা হয়।

এর ফলে—

  • দুটি বাচ্চাই একই সময়ে ফোটে।
  • বড়-ছোট হওয়ার সমস্যা কমে।
  • উভয় বাচ্চাই সমান খাবার পায়।
  • বাচ্চার মৃত্যুহার কমে।

বাচ্চার পরিচর্যা

জন্মের পর প্রথম ৪–৭ দিন মা-বাবা কবুতর ক্রপ মিল্ক খাওয়ায়।

এরপর ধীরে ধীরে আধা হজম করা দানাদার খাদ্য দেয়।

  • ৪–৫ দিনে চোখ খুলে।
  • ১০–১২ দিনে পালক গজাতে শুরু করে।
  • ২৮–৩০ দিনে বিক্রির উপযোগী হয়।

বাচ্চা না ফুটলে করণীয়

যদি নির্ধারিত সময় পার হয়ে যায়—

  • ডিমে বাচ্চার নড়াচড়া আছে কিনা পরীক্ষা করুন।
  • প্রয়োজনে অভিজ্ঞ ব্যক্তির সহায়তা নিন।
  • অপ্রয়োজনীয়ভাবে ডিম ভাঙবেন না।

কেন ডিমে তা দেয় না?

নিচের কারণগুলোতে কবুতর ডিমে বসতে অনীহা দেখাতে পারে—

  • নতুন জায়গায় স্থানান্তর
  • অতিরিক্ত ভয় বা শব্দ
  • খোপের অভাব
  • শরীরে উকুন বা মাইট
  • ক্যালসিয়াম ও ভিটামিনের ঘাটতি
  • অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা
  • প্রথমবার ডিম দেওয়া

প্রজনন বাড়ানোর উপায়

  • সুষম খাদ্য দিন।
  • নিয়মিত ক্যালসিয়াম ও মিনারেল দিন।
  • খোপ পরিষ্কার রাখুন।
  • রোগমুক্ত ব্রিডার নির্বাচন করুন।
  • অতিরিক্ত মোটা বা দুর্বল কবুতর ব্রিডিংয়ে ব্যবহার করবেন না।
  • পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করুন।

উপসংহার

সঠিক প্রজনন ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে কবুতরের উর্বরতা বৃদ্ধি পায়, বাচ্চা ফোটার হার বাড়ে এবং খামারের লাভজনকতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাই ডিম ও বাচ্চার প্রতিটি ধাপেই যত্নশীল হওয়া জরুরি।

১। কবুতর কত মাস বয়সে ডিম দেয়?

সাধারণত ৫–৬ মাস বয়সে কবুতর ডিম দেওয়া শুরু করে।

২। কবুতরের ডিম কত দিনে ফুটে?

সাধারণত ১৭–১৯ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।

৩। ডিম ফার্টাইল কিনা কীভাবে বুঝবেন?

ডিম দেওয়ার ৪–৫ দিন পর টর্চের আলো (Candling) দিয়ে পরীক্ষা করলে রক্তনালীর মতো শিরা দেখা গেলে ডিমটি ফার্টাইল বলে ধরে নেওয়া যায়।

৪। বাচ্চা কবুতর প্রথম কী খায়?

জন্মের পর প্রথম ৪–৭ দিন মা-বাবা কবুতরের খাদ্যথলি থেকে উৎপাদিত ক্রপ মিল্ক (Crop Milk) খায়।

৫। কেন কবুতর ডিমে তা দেয় না?

স্থান পরিবর্তন, অতিরিক্ত ভয়, উকুন বা মাইট, ক্যালসিয়ামের ঘাটতি, খোপের সমস্যা বা প্রথমবার ডিম দেওয়ার কারণে এমন হতে পারে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top