কবুতর পালন: খাদ্য, পুষ্টি ও সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা (৩য় পর্ব)
কবুতর পালনে লাভজনক উৎপাদনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সুষম খাদ্য। অনেক খামারি শুধু গম বা ধান খাইয়ে কবুতর পালন করেন। এতে কবুতর বেঁচে থাকলেও ডিম উৎপাদন, বাচ্চার বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বয়স ও উৎপাদন অনুযায়ী সুষম খাদ্য প্রদান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কবুতরের দৈনিক খাদ্যের চাহিদা
জাত ও ওজনভেদে একটি প্রাপ্তবয়স্ক কবুতর দৈনিক গড়ে ৩৫–৬০ গ্রাম খাদ্য গ্রহণ করে।
- ছোট জাত: ২০–৩০ গ্রাম
- মাঝারি জাত: ৩৫–৫০ গ্রাম
- বড় জাত: ৫০–৬০ গ্রাম
পানির চাহিদা সাধারণত ৩০–৬০ মিলিলিটার। গরমকালে এর পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সুষম খাদ্যে কী কী থাকা উচিত?
একটি ভালো খাদ্যে নিম্নোক্ত পুষ্টি উপাদান থাকতে হবে—
- আমিষ (Protein): ১৫–১৬%
- চর্বি (Fat): ৩–৪%
- শর্করা (Carbohydrate): শক্তির প্রধান উৎস
- ভিটামিন
- খনিজ পদার্থ
- বিশুদ্ধ পানি
দানাদার খাদ্য
দানাদার খাদ্য মোট খাদ্যের প্রায় ৬০–৭০% হওয়া উচিত।
উপযুক্ত দানাদার খাদ্য—
- গম
- ভুট্টা
- ধান
- কাউন
- বাজরা
- বার্লি
- সরগম
শুধু গম খাওয়ানো উচিত নয়, কারণ এতে অনেক সময় হজমের সমস্যা ও আঠালো বিষ্ঠা হতে পারে।
আমিষের উৎস
মোট খাদ্যের ৩০–৩৫% ডাল বা আমিষজাতীয় উপাদান রাখা ভালো।
যেমন—
- মটরশুঁটি
- খেসারি
- মুগ
- ছোলা
- মসুর
- সয়াবিন খৈল
মিনারেল ও গ্রিট
কবুতরের পরিপাকতন্ত্রে দাঁত নেই। তাই খাদ্য হজমে গ্রিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত দিতে হবে—
- ঝিনুকের গুঁড়া
- পাথরের কুচি
- ইটের কণা
- মিনারেল মিক্স
- লবণ (পরিমিত)
- ডিমের খোসার গুঁড়া
এগুলো বিশেষ করে ডিমের খোসা শক্ত করতে এবং ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে।
সবুজ খাদ্য
প্রতিদিন অল্প পরিমাণে দিতে পারেন—
- কলমি শাক
- পালং শাক
- লাল শাক
- ধনেপাতা
- বিভিন্ন নরম সবুজ পাতা
এতে ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি কমে।
খাদ্য প্রদানের সময়
প্রতিদিন দুইবার খাদ্য দেওয়া উত্তম।
- সকাল
- বিকাল
খাবার সবসময় পরিষ্কার পাত্রে দিতে হবে এবং বাসি বা ছত্রাকযুক্ত খাদ্য কখনো ব্যবহার করা যাবে না।
একটি উদাহরণ খাদ্য মিশ্রণ (১০ কেজি)
- গম – ৪.০ কেজি
- ভুট্টা – ১.৫ কেজি
- ডাল – ১.০ কেজি
- বাজরা – ০.৫ কেজি
- কাউন – ০.৫ কেজি
- সরিষা – ০.৫ কেজি
- ডাবলি – ০.৫ কেজি
- মুগ – ০.৫ কেজি
- রেজা (ছোট ও বড়) – ১.০ কেজি
প্রয়োজনে ভালো মানের ভিটামিন-মিনারেল প্রিমিক্স প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী মেশানো যেতে পারে।
বাচ্চা কবুতরের খাদ্য
জন্মের পর প্রথম ৪–৭ দিন মা-বাবা কবুতর খাদ্যথলি (Crop) থেকে উৎপাদিত ক্রপ মিল্ক খাওয়ায়।
এরপর ধীরে ধীরে আধা হজম করা দানাদার খাদ্য খাওয়ানো শুরু করে এবং ২৫–৩০ দিনের মধ্যে বাচ্চা সম্পূর্ণ দানাদার খাদ্য গ্রহণে সক্ষম হয়।
যে ভুলগুলো করা যাবে না
- শুধু এক ধরনের খাদ্য খাওয়ানো।
- ছত্রাকযুক্ত বা ভেজা খাদ্য ব্যবহার।
- নোংরা পানির পাত্র ব্যবহার।
- গ্রিট বা ক্যালসিয়াম না দেওয়া।
- দীর্ঘ সময় খাদ্য ফিডারে জমিয়ে রাখা।
- অতিরিক্ত তেলযুক্ত বা পচা খাদ্য ব্যবহার।
উপসংহার
সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা গেলে কবুতরের বৃদ্ধি, প্রজনন, ডিম উৎপাদন, বাচ্চার বেঁচে থাকার হার এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাই লাভজনক খামারের ভিত্তি হলো সুষম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি।
১। একটি প্রাপ্তবয়স্ক কবুতর দিনে কতটুকু খাবার খায়?
জাত ও ওজনভেদে একটি প্রাপ্তবয়স্ক কবুতর সাধারণত ৩৫–৬০ গ্রাম খাদ্য গ্রহণ করে।
২। কবুতরের খাদ্যে কত শতাংশ প্রোটিন থাকা উচিত?
সাধারণভাবে ১৫–১৬% প্রোটিনযুক্ত খাদ্য প্রজনন ও সুস্থ বৃদ্ধির জন্য উপযোগী।
৩। কবুতরকে দিনে কয়বার খাবার দেওয়া উচিত?
প্রতিদিন দুইবার—সকাল ও বিকেলে—খাবার দেওয়া উত্তম।
৪। গ্রিট কেন প্রয়োজন?
গ্রিট খাদ্য হজমে সাহায্য করে এবং ঝিনুকের গুঁড়া ও ক্যালসিয়াম ডিমের খোসা শক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৫। শুধু গম খাওয়ালে কি সমস্যা হয়?
হ্যাঁ। শুধু গম খাওয়ালে পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং অনেক সময় হজমের সমস্যা ও উৎপাদন কমে যেতে পারে।
৬। বাচ্চা কবুতর প্রথম কী খায়?
জন্মের পর প্রথম ৪–৭ দিন মা-বাবা কবুতর খাদ্যথলি থেকে উৎপাদিত ক্রপ মিল্ক খাওয়ায়। এরপর ধীরে ধীরে দানাদার খাদ্যে অভ্যস্ত হয়।




