হাঁস এর খাদ্য(বয়স অনুযায়ী,বিভিন্ন জাতের),পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও দৈনিক কার্যক্রম সূচিঃ

 

 

হাঁসের খাদ্য (বয়সভিত্তিক ও বিভিন্ন জাতের), পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য খাওয়ানোর নিয়ম (১ম পর্ব)

হাঁস পালন বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও পারিবারিক পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উন্নত জাতের হাঁস যেমন খাকি ক্যাম্পবেল, জিন্ডিং, বেইজিং এবং মাসকোভি থেকে ভালো উৎপাদন পেতে হলে সঠিক খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

এই পর্বে হাঁসের খাদ্যের ধরন, বয়সভিত্তিক পুষ্টির চাহিদা, বিভিন্ন জাতের খাদ্যের পরিমাণ এবং সঠিক খাওয়ানোর নিয়ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


হাঁসের খাদ্যের ধরন

হাঁস সাধারণত দুই ধরনের খাদ্য গ্রহণ করে।

১. প্রাকৃতিক খাদ্য

মুক্ত বা অর্ধ-আবদ্ধ অবস্থায় হাঁস বিভিন্ন প্রাকৃতিক খাদ্য সংগ্রহ করে খায়। যেমন—

  • শামুক
  • ঝিনুক
  • কাঁকড়া
  • কেঁচো
  • ছোট মাছ
  • ক্ষুদে পানা
  • শাপলা
  • জলজ শেওলা
  • বিভিন্ন কীটপতঙ্গ
  • ধান ও আগাছার বীজ

পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য থাকলে সম্পূরক খাদ্যের প্রয়োজন অনেকটাই কমে যায়।


২. সম্পূরক খাদ্য

বাণিজ্যিক বা উন্নত জাতের হাঁসের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক খাদ্যের ওপর নির্ভর করলে ভালো ফল পাওয়া যায় না। তাই প্রতিদিন সুষম সম্পূরক খাদ্য সরবরাহ করতে হয়।

যদি হাঁস জলাশয়ে পর্যাপ্ত খাদ্য পায়, তাহলে দিনে অন্তত দুইবার খাদ্য দিলেই যথেষ্ট। অন্যথায় তিনবার সুষম খাদ্য সরবরাহ করা ভালো।


হাঁসের খাদ্যের সঙ্গে পানির গুরুত্ব

হাঁস খাবার খাওয়ার সময় এবং খাওয়ার পরপরই পানি পান করে। এছাড়া ঠোঁট ও চোখ পরিষ্কার রাখার জন্যও পর্যাপ্ত পানি প্রয়োজন।

তাই—

  • কখনো শুকনো খাদ্য একা দেবেন না।
  • ভেজা বা হালকা স্যাঁতসেঁতে গুঁড়ো খাদ্য খাওয়ানো উত্তম।
  • সবসময় পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

বয়সভিত্তিক পুষ্টির চাহিদা

১–৩ সপ্তাহ বয়স

এই সময় বাচ্চার দ্রুত বৃদ্ধি হয়। তাই খাদ্যে থাকতে হবে—

  • আমিষ (প্রোটিন) : ১৯.৫%
  • স্নেহ (ফ্যাট) : ৪.৫%
  • আঁশ : ৪.৮%
  • ক্যালসিয়াম : ১.৭%
  • ফসফরাস : ০.৮৬%

৩ সপ্তাহের বেশি বয়স

বাড়ন্ত হাঁসের জন্য সাধারণত—

  • প্রোটিন : ১৭%
  • পর্যাপ্ত শক্তি (এনার্জি)
  • সুষম ভিটামিন ও মিনারেল

থাকলেই ভালো বৃদ্ধি হয়।


বয়সভিত্তিক খাদ্যের মান

বয়সপ্রোটিনক্যালরি (কিলোক্যালরি/কেজি)
১–৬ সপ্তাহ১৮%২,৮০০
৭–১৮ সপ্তাহ১৭%২,৮৫০
ডিম উৎপাদনকাল১৮%২,৭৫০–২,৮০০

বিভিন্ন জাতের হাঁসের দৈনিক খাদ্যের পরিমাণ

বয়সজিন্ডিং/খাকি ক্যাম্পবেল/দেশিবেইজিং/মাসকোভি
১ম সপ্তাহ১৫ গ্রাম১৫ গ্রাম
৫ম সপ্তাহ৫৫ গ্রাম৬৫ গ্রাম
১০ম সপ্তাহ১১০ গ্রাম১২৫ গ্রাম
১৫তম সপ্তাহ১৪০ গ্রাম১৫৫ গ্রাম
২০তম সপ্তাহ১৫০ গ্রাম১৭৫ গ্রাম
২৫তম সপ্তাহ১৬০ গ্রাম১৯০ গ্রাম

বেইজিং ও মাসকোভি হাঁসের দেহের আকার বড় হওয়ায় এদের খাদ্যের চাহিদাও তুলনামূলক বেশি।


মোট খাদ্য গ্রহণ

জিন্ডিং/খাকি ক্যাম্পবেল/দেশি হাঁস

  • ৪ সপ্তাহে : প্রায় ৮০০ গ্রাম
  • ৮ সপ্তাহে : ২.৭৫ কেজি
  • ১২ সপ্তাহে : ৬ কেজি
  • ২০ সপ্তাহে : ১৪ কেজি

বেইজিং/মাসকোভি

  • ৪ সপ্তাহে : ১ কেজি
  • ৮ সপ্তাহে : ৩.২৫ কেজি
  • ১২ সপ্তাহে : ৭ কেজি
  • ২০ সপ্তাহে : ১৬ কেজি

বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে খাদ্য ব্যবস্থাপনা

বর্ষাকাল

অর্ধ-আবদ্ধ অবস্থায়—

  • বাচ্চা হাঁস : প্রায় ৫০ গ্রাম
  • বড় হাঁস : প্রায় ৬০ গ্রাম সম্পূরক খাদ্য

শুষ্ক মৌসুম

প্রাকৃতিক খাদ্য কম থাকায় প্রতিটি হাঁসকে দৈনিক ৭০–৮০ গ্রাম সুষম খাদ্য সরবরাহ করা উচিত।


ভালো খাদ্য নির্বাচনের নিয়ম

সুষম খাদ্য তৈরির আগে নিশ্চিত করতে হবে—

  • খাদ্য টাটকা হতে হবে।
  • ছত্রাক (ফাঙ্গাস) মুক্ত হতে হবে।
  • বাসি বা দুর্গন্ধযুক্ত খাদ্য ব্যবহার করা যাবে না।
  • সব উপাদান সঠিক অনুপাতে মেশাতে হবে।
  • খাদ্যে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল থাকতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

  • হাঁসকে কখনো শুধু শুকনো খাদ্য দেবেন না।
  • পর্যাপ্ত পানি ছাড়া হাঁস ঠিকভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না।
  • প্রাকৃতিক খাদ্য যত বেশি পাবে, সম্পূরক খাদ্যের প্রয়োজন তত কমবে।
  • তিল বা বাদাম ছাড়া অন্যান্য অনেক খৈল হাঁসের জন্য উপযুক্ত নয়।
  • সুযোগ থাকলে শামুক, গুগলি, ছোট মাছ, ভাতের মাড়, চাল ধোয়া পানি ও সবজির খোসা ব্যবহার করা যেতে পারে।

উপসংহার

হাঁসের সঠিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ডিম উৎপাদনের জন্য সুষম খাদ্য ও পর্যাপ্ত পানির বিকল্প নেই। বয়সভেদে খাদ্যের পরিমাণ ও পুষ্টি উপাদান পরিবর্তন করলে খাদ্যের অপচয় কমে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

FAQ

১। হাঁসের প্রধান খাদ্য কী?
হাঁস প্রাকৃতিক খাদ্য (শামুক, ঝিনুক, কেঁচো, ছোট মাছ, জলজ উদ্ভিদ) এবং সম্পূরক সুষম খাদ্য—উভয়ই খায়।

২। বাচ্চা হাঁসের খাদ্যে কত শতাংশ প্রোটিন প্রয়োজন?
১–৩ সপ্তাহ বয়সী বাচ্চা হাঁসের খাদ্যে প্রায় ১৯.৫% প্রোটিন থাকা উচিত।

৩। বড় হাঁসকে দিনে কতবার খাবার দিতে হবে?
সাধারণত দিনে ২–৩ বার খাবার দেওয়া ভালো। প্রাকৃতিক খাদ্য কম থাকলে ৩ বার দেওয়া উত্তম।

৪। হাঁসকে শুকনো খাদ্য দেওয়া উচিত কি?
না। হাঁসের জন্য ভেজা বা হালকা স্যাঁতসেঁতে খাদ্য এবং পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানি সরবরাহ করা উচিত।

৫। বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে খাদ্যের পরিমাণ কি একই থাকে?
না। শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক খাদ্য কম থাকায় সম্পূরক খাদ্যের পরিমাণ বাড়াতে হয়।

৬। হাঁসের জন্য কোন খৈল বেশি উপযোগী?
তিলের খৈল ও বাদামের খৈল সাধারণত উপযোগী। তবে খাদ্য তৈরির সময় সুষম ফর্মুলা অনুসরণ করা উচিত।

 

Scroll to Top