লাম্পি স্কিন ডিজিস (এল এস ডি) এ টু জেট

 

গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ (LSD): কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

লাম্পি স্কিন ডিজিজ (LSD) কী?

লাম্পি স্কিন ডিজিজ (Lumpy Skin Disease-LSD) গরুর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাসজনিত চর্মরোগ। এটি Capripoxvirus দ্বারা সৃষ্ট হয় এবং গরুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) দুর্বল করে দেয়। রোগটির কারণে দুধ উৎপাদন কমে যায়, গাভীর গর্ভপাত হতে পারে, চামড়া নষ্ট হয় এবং খামার মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এজন্য এটিকে অনেক সময় “Economic Disease” বলা হয়।

১৯২৯ সালে আফ্রিকার জাম্বিয়ায় প্রথম রোগটি শনাক্ত হয়। পরবর্তীতে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ২০২০ সাল থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে রোগটির উপস্থিতি দেখা যায়।


রোগের কারণ

LSD ভাইরাস (Capripoxvirus) দ্বারা এ রোগ হয়।


কখন রোগ বেশি দেখা যায়?

  • বর্ষার শেষভাগে
  • শরৎকালে
  • বসন্তের শুরুতে

যখন মশা, মাছি ও অন্যান্য রক্তচোষা পোকামাকড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় তখন রোগের বিস্তারও বেড়ে যায়।


রোগ কিভাবে ছড়ায়?

লাম্পি স্কিন ডিজিজ অত্যন্ত সংক্রামক। প্রধান বাহক হলো মশা ও মাছি।

সংক্রমণের মাধ্যম

  • মশা, মাছি ও অন্যান্য পোকামাকড়
  • আক্রান্ত পশুর লালা
  • আক্রান্ত গাভীর দুধ
  • একই সিরিঞ্জ ও নিডল ব্যবহার
  • খামার কর্মীর পোশাক
  • চিকিৎসা যন্ত্রপাতি
  • মোটরসাইকেল, পরিবহন ও দর্শনার্থী
  • আক্রান্ত ষাঁড়ের বীর্য (Semen)
  • কুকুর ও বিড়াল
  • বাতাসের মাধ্যমেও কিছু ক্ষেত্রে বিস্তারে সহায়তা করতে পারে

রোগের লক্ষণ

প্রাথমিক লক্ষণ

  • ১০৪°-১০৬°F পর্যন্ত জ্বর
  • খাদ্যে অরুচি
  • অবসাদ
  • চোখ ও নাক দিয়ে পানি বা লালা বের হওয়া

চামড়ার লক্ষণ

  • শরীরজুড়ে গোলাকার শক্ত গুটি
  • ঘাড়, মুখ, চোখের পাতা, ওলান, অণ্ডকোষ, যোনিপথ ও পায়ুর চারপাশে বড় বড় গুটি
  • লোম উঠে যাওয়া
  • ক্ষত ও ঘা সৃষ্টি
  • ক্ষতস্থান থেকে রক্ত বা পুঁজ বের হওয়া

অন্যান্য লক্ষণ

  • হাঁটু বা জয়েন্ট ফুলে যাওয়া
  • খোঁড়াতে হাঁটা
  • শুয়ে থাকতে অনীহা
  • মুখের ভেতরে ক্ষত হওয়ায় খাওয়া কমে যাওয়া
  • পানিশূন্যতা
  • গাভীর গর্ভপাত
  • দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া

অর্থনৈতিক ক্ষতি

LSD রোগে মৃত্যুহার সাধারণত কম হলেও—

  • দুধ উৎপাদন কমে যায়
  • গর্ভপাত হতে পারে
  • চামড়ার মান নষ্ট হয়
  • বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে
  • ওজন কমে যায়
  • চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়

ফলে খামার অর্থনৈতিকভাবে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়।


প্রতিরোধ ব্যবস্থা

১. আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা

  • আক্রান্ত গরুকে দ্রুত পাল থেকে সরিয়ে আলাদা স্থানে রাখতে হবে।
  • মশারি দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।

২. মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণ

  • শেড পরিষ্কার রাখতে হবে।
  • সপ্তাহে অন্তত ২ দিন জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে হবে।
  • মশারি বা মশা তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. বায়োসিকিউরিটি

  • আক্রান্ত খামারে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত বন্ধ করতে হবে।
  • আক্রান্ত খামারের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে না।
  • একই সিরিঞ্জ পুনরায় ব্যবহার করা যাবে না।
  • আক্রান্ত পশুর পরিচর্যার পর পোশাক পরিবর্তন করতে হবে।

৪. আক্রান্ত গাভীর দুধ

বাছুরকে আক্রান্ত গাভীর দুধ না খাওয়ানো উত্তম।

৫. ক্ষত পরিষ্কার রাখা

ক্ষতস্থান পভিডোন আয়োডিন বা টিংচার আয়োডিন দিয়ে পরিষ্কার রাখতে হবে।

৬. টিকা প্রদান

যেসব এলাকায় LSD দেখা যায় সেখানে নিয়মিত টিকা প্রদান রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।


চিকিৎসা

যেহেতু এটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই ভাইরাস ধ্বংস করার নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। চিকিৎসার উদ্দেশ্য হলো—

  • জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা।
  • সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ প্রতিরোধ করা।
  • পানিশূন্যতা দূর করা।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

১. অ্যান্টিবায়োটিক

অবস্থাভেদে যেকোনো একটি ব্যবহার করা যেতে পারে—

  • Penicillin + Streptomycin (Pronapen, Streptopen)
  • Amoxicillin
  • Ceftriaxone
  • Ceftiofur
  • Oxytetracycline
  • Marbofloxacin
  • Penicillin + Gentamicin (High Dose)
  • Penicillin + Ciprofloxacin (High Dose)

২. জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণ

  • Ketoprofen
  • Tolfenamic acid
  • Paracetamol
  • Paracetamol + Meloxicam

ব্যবহারের সময় গর্ভাবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।


৩. অ্যান্টিহিস্টামিন

  • Pheniramine maleate
  • Promethazine
  • Chlorpheniramine maleate (গর্ভবতী গাভীতে তুলনামূলক নিরাপদ)

৪. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী

  • Andopan Powder
  • FRA-C 12
  • Lysovit
  • Vitamin-C
  • Amino acid + Vitamin + Mineral Supplement

৫. পানিশূন্যতা প্রতিরোধ

  • Oral Saline
  • Normal Saline
  • Dextrose Saline

প্রয়োজনে ৫০০-৫০০০ মিলি পর্যন্ত শিরায় স্যালাইন দিতে হতে পারে।


৬. শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া হলে

Mucolytic

  • Bromhexine
  • Ambroxol Hydrochloride

Respiratory stimulant

  • Aminophylline

৭. ক্ষত ব্যবস্থাপনা

ক্ষত পরিষ্কার

  • Povidone iodine
  • Tincture iodine

ক্ষত শুকানোর জন্য

  • Skin Care Spray
  • Antibiotic powder
  • Desiccant

ম্যাগট বা মাছির লার্ভা প্রতিরোধ

  • Fly repellent
  • Larva killer

Sumid Vet Powder বা Negutox Powder

ক্ষতস্থানে ব্যবহার করা যেতে পারে।


৮. ফরমালিন স্প্রে

৯৯ মিলি পানির সঙ্গে ১ মিলি ফরমালিন মিশিয়ে ১% দ্রবণ তৈরি করে ক্ষতস্থানে দিনে দুইবার স্প্রে করলে পুঁজ ও সেকেন্ডারি সংক্রমণ কমানো যায়।


৯. আইভারমেকটিন

প্রয়োজনে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী Ivermectin ব্যবহার করা যেতে পারে।


লোকজ সহায়ক পদ্ধতি

প্রতি ১০০ কেজি ওজনের জন্য—

  • প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ২টি
  • খাবার সোডা ৫০ গ্রাম
  • লবণ ২৫ গ্রাম
  • নিমপাতা বাটা ২৫ গ্রাম
  • গুড় ৫০ গ্রাম

১ লিটার পানিতে মিশিয়ে সকাল-বিকাল ৭ দিন খাওয়ানো যেতে পারে।


গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

  • অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত নয়।
  • একই নিডল একাধিক পশুতে ব্যবহার করা যাবে না।
  • আক্রান্ত পশুর শরীরের সব নিঃসরণ ভাইরাস বহন করতে পারে।
  • দ্রুত নিবন্ধিত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মানুষ কি আক্রান্ত হয়?

না। বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী লাম্পি স্কিন ডিজিজ মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয় না।


উপসংহার

লাম্পি স্কিন ডিজিজ গরুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাসজনিত রোগ, যা মৃত্যুর চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ। তাই রোগ প্রতিরোধ, বায়োসিকিউরিটি, মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো চিকিৎসাই এ রোগ মোকাবিলার মূল কৌশল।

FAQ

১. লাম্পি স্কিন ডিজিজ কী?
এটি Capripoxvirus দ্বারা সৃষ্ট গরুর একটি ভাইরাসজনিত চর্মরোগ।

২. LSD কি মানুষে সংক্রমিত হয়?
না, বর্তমানে মানুষের মধ্যে এ রোগ সংক্রমণের প্রমাণ নেই।

৩. LSD কীভাবে ছড়ায়?
মূলত মশা, মাছি, সিরিঞ্জ, লালা, দুধ, পোশাক ও যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ছড়ায়।

৪. LSD রোগে গরুর মৃত্যুহার কত?
সাধারণত মৃত্যুহার কম হলেও সেকেন্ডারি সংক্রমণ ও জটিলতার কারণে ক্ষতি অনেক বেশি হতে পারে।

৫. LSD রোগের নির্দিষ্ট ওষুধ আছে কি?
না। এটি ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। সহায়ক চিকিৎসা ও সেকেন্ডারি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণই প্রধান ব্যবস্থা।

৬. LSD রোগের টিকা কি পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, বর্তমানে বিভিন্ন দেশে LSD প্রতিরোধের জন্য টিকা ব্যবহার করা হয় এবং এটি রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

৭. আক্রান্ত গাভীর দুধ কি বাছুরকে খাওয়ানো উচিত?
সাধারণত আক্রান্ত গাভীর দুধ বাছুরকে না খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

৮. LSD রোগে মশারি ব্যবহার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মশা ও মাছি রোগ ছড়ানোর প্রধান বাহক হওয়ায় আক্রান্ত গরুকে মশারির মধ্যে রাখলে সংক্রমণ কমানো যায়।

 
 
 

 

Scroll to Top