গবাদিপ্রাণীর বাহ্য পরজীবী (External Parasites): প্রকারভেদ, ক্ষতি, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
গবাদিপ্রাণীর শরীরের বাইরে বসবাস করে রক্ত, টিস্যু বা অন্যান্য পুষ্টি শোষণ করে জীবনধারণকারী পরজীবীগুলোকে বাহ্য পরজীবী (External Parasites) বলা হয়। এর মধ্যে উকুন, আটালি (Tick), মাইট, মেঞ্জ, মশা-মাছি এবং অন্যান্য রক্তচোষা কীটপতঙ্গ উল্লেখযোগ্য।
গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, শূকর এবং মুরগির খামারে উৎপাদন হ্রাস ও অর্থনৈতিক ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাহ্য পরজীবী।
বাহ্য পরজীবীর কারণে কী ধরনের ক্ষতি হয়?
বাহ্য পরজীবী প্রাণীর ওপর প্রত্যক্ষ (Direct) ও পরোক্ষ (Indirect)—উভয় ধরনের ক্ষতি করে।
প্রত্যক্ষ ক্ষতি
১. রক্তশূন্যতা ও উৎপাদন হ্রাস
উকুন, আটালি, মশা ও মাছি সরাসরি রক্ত চুষে খায়। ফলে প্রাণী রক্তস্বল্পতায় ভোগে এবং দুধ, মাংস ও অন্যান্য উৎপাদন কমে যায়।
২. অস্থিরতা ও খাদ্য গ্রহণ কমে যাওয়া
দংশনের কারণে প্রাণী অস্বস্তি ও অস্থিরতায় ভোগে। ফলে ঠিকমতো খাবার খেতে পারে না এবং উৎপাদনশীলতা কমে যায়।
৩. চামড়া ও লোমের ক্ষতি
অতিরিক্ত চুলকানোর কারণে প্রাণী শরীর বিভিন্ন স্থানে ঘষাঘষি করে, ফলে চামড়া ও লোম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৪. অ্যালার্জি ও চুলকানি
পরজীবীর কামড়ের কারণে তীব্র চুলকানি (Pruritus) এবং অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
৫. নবজাতক প্রাণীর মৃত্যু
শীতকালে অতিরিক্ত উকুন বা আটালির আক্রমণে বাছুর ও ছাগলছানা মারাত্মক রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারে।
৬. টিক প্যারালাইসিস (Tick Paralysis)
কিছু প্রজাতির আটালির লালাগ্রন্থি থেকে বিষাক্ত পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা প্রাণীর পক্ষাঘাত (Paralysis) সৃষ্টি করতে পারে।
৭. চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি
একটি খামারে বাহ্য পরজীবীর আক্রমণ হলে সাধারণত সব প্রাণীকেই চিকিৎসার আওতায় আনতে হয়, ফলে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়।
বাহ্য পরজীবীর মাধ্যমে ছড়ানো রোগ
বিভিন্ন বাহ্য পরজীবী রোগের বাহক (Vector) হিসেবে কাজ করে।
আটালি (Tick) দ্বারা ছড়ানো রোগ
- বেবেসিওসিস (Babesiosis)
- অ্যানাপ্লাজমোসিস (Anaplasmosis)
- থাইলেরিওসিস (Theileriosis)
- ডার্মাটোফিলোসিস (Dermatophilosis)
- হার্টওয়াটার ডিজিজ (Heartwater Disease)
মাছি ও ফ্লি (Fly and Flea) দ্বারা ছড়ানো রোগ
- ওলান প্রদাহ (Mastitis)
- কেরাটোকনজাংটিভাইটিস (Keratoconjunctivitis)
- ট্রাইপানোসোমিয়াসিস (Trypanosomiasis)
Culicoides Midges দ্বারা ছড়ানো রোগ
- ব্লুটাং (Bluetongue)
- আফ্রিকান হর্স সিকনেস (African Horse Sickness)
ভাইরাসজনিত রোগের বাহক হিসেবে
কিছু বাহ্য পরজীবী নিম্নোক্ত ভাইরাস রোগ ছড়াতে সাহায্য করে—
- Bluetongue
- African Horse Sickness
- Epizootic Hemorrhagic Disease
- Akabane Disease
- Bovine Ephemeral Fever (তিন দিনের জ্বর)
অন্তঃপরজীবীর বাহক হিসেবে
বাহ্য পরজীবী অনেক অভ্যন্তরীণ পরজীবীর মধ্যবর্তী বাহক হিসেবেও কাজ করে। যেমন—
- Haemoproteus
- Leucocytozoon
- Onchocerca
- Mansonella
উকুন (Lice)
বাংলাদেশে সাধারণত শীতের শেষের দিকে গরু, ছাগল, ভেড়া এবং মুরগিতে উকুনের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়।
বেশি আক্রান্ত হওয়ার স্থান
- তলপেট
- কান
- গলা
- বগল
- লেজের মাথা
- থুতনির নিচে
- কুঁচকি
অল্পবয়সী প্রাণী বয়স্ক প্রাণীর তুলনায় বেশি আক্রান্ত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
এক প্রজাতির প্রাণীর উকুন অন্য প্রজাতির প্রাণীতে সাধারণত সংক্রমিত হয় না। অর্থাৎ গরুর উকুন মুরগিকে আক্রান্ত করবে না।
উকুনের প্রকারভেদ
ক) শোষক উকুন (Sucking Lice)
- কামড়ায়
- রক্ত শোষণ করে
খ) দংশনকারী উকুন (Biting Lice)
- কামড়ায়
- রক্ত শোষণ করে না
আটালি (Ticks)
বাংলাদেশে গরমকালে আটালির আক্রমণ বেশি দেখা যায়।
সাধারণত যেসব স্থানে বেশি থাকে
- কান
- ওলান
- তলপেট
- কুঁচকি
- পা
- মলদ্বারের চারপাশ
- লেজের গোড়া
সব সময় আটালি প্রাণীর শরীরে থাকে না। রক্ত খাওয়ার পর অনেক সময় গোয়ালঘরের ফাটল, গর্ত বা আবর্জনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে।
একটি পূর্ণবয়স্ক আটালি পোষক প্রাণী ছাড়াও প্রায় দুই বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
আটালির প্রকারভেদ
১. হার্ড টিক (Hard Tick)
- Ixodidae
২. সফট টিক (Soft Tick)
- Argasidae
পোষক সংখ্যার ভিত্তিতে
একক পোষক আটালি (One-host Tick)
বহু পোষক আটালি (Multi-host Tick)
আটালির জীবনচক্র
ডিম → লার্ভা → নিম্ফ → পূর্ণবয়স্ক আটালি
মাইট ও মেঞ্জ (Mites and Mange)
মাইট অত্যন্ত ক্ষুদ্র হওয়ায় খালি চোখে দেখা যায় না।
এরা প্রাণীর—
- লোমের ফলিকল
- সেবাসিয়াস গ্রন্থি
- ত্বকের উপরিভাগ
আক্রান্ত করে।
মাইট দ্বারা সৃষ্ট চর্মরোগকে সাধারণভাবে মেঞ্জ (Mange) বলা হয়।
লক্ষণ
- তীব্র চুলকানি
- অস্বস্তি
- খাদ্য গ্রহণ কমে যাওয়া
- লোম পড়ে যাওয়া
- চামড়া মোটা ও শক্ত হয়ে যাওয়া
- ছোট ছোট নডিউল সৃষ্টি
- প্রদাহ
- উৎপাদন কমে যাওয়া
ছাগল ও ভেড়ায় আক্রান্ত স্থানের চামড়া পুরু ও লোমহীন হয়ে যায়।
গরুতে সাধারণত—
- লেজ
- উরু
- ওলান
এবং ঘোড়ার পায়ে এ রোগ বেশি দেখা যায়।
কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের কানে মাইটের সংক্রমণ বেশি হয়।
রোগ নির্ণয়
আক্রান্ত স্থান থেকে Skin Scraping সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে পরীক্ষা করা হয়।
সংক্রমণ
- প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে
- পরোক্ষ সংস্পর্শে
রোগটি ছড়াতে পারে।
চিকিৎসা
১. আইভারমেকটিন (Ivermectin)
Inj. Ivertin / Ivermectin
ডোজ:
১ মি.লি./৫০ কেজি ওজন
(Subcutaneous বা S/C পথে)
Ivermectin Pour-on
প্রাণীর মেরুদণ্ড বরাবর ফোঁটা ফোঁটা করে প্রয়োগ করতে হয়।
২. বাহ্যিক কীটনাশক
নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।
- Cypermethrin
- Permethrin
- Bifenthrin
- Carbaryl
- Neguvon/Negutox
ব্যবহারের সময় ডোজ ও নিরাপত্তা নির্দেশনা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।
প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
✓ গোয়ালঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
✓ শেডের ভেতর ও বাইরে ঝোপঝাড় ও আবর্জনা পরিষ্কার রাখতে হবে।
✓ গরমকালে মশা, মাছি, উকুন ও আটালির আক্রমণ বেশি হয়, তাই এ সময় নিয়মিত নজরদারি করতে হবে।
✓ আক্রমণ দেখা মাত্র দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
✓ গোবরের স্তূপ মূল শেড থেকে দূরে রাখতে হবে।
✓ প্রয়োজনে শেডে Acaricide জাতীয় ওষুধ স্প্রে করা যেতে পারে।
✓ আক্রান্ত খামারে সব প্রাণীর একসঙ্গে চিকিৎসা করা উত্তম।
✓ নতুন প্রাণী খামারে আনার আগে কোয়ারেন্টাইনে রাখা উচিত।
✓ নিয়মিত ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উপসংহার
গবাদিপ্রাণীর বাহ্য পরজীবী শুধু রক্ত চুষে ক্ষতি করে না, বরং অনেক মারাত্মক রোগের বাহক হিসেবেও কাজ করে। তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থাপনা, সময়মতো চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বাহ্য পরজীবী নিয়ন্ত্রণ করে খামারের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।




