ফার্মে মাছি ও ইঁদুর,মশা,জোক কেন হয়,কি কি রোগ ছড়ায় এবং করণীয় (বিস্তারিত)

ফার্মে মাছি কেন হয়, কী কী রোগ ছড়ায় এবং নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায় (পর্ব–১)

পোল্ট্রি, ডেইরি, ছাগল কিংবা হাঁসের খামারে মাছি শুধু বিরক্তির কারণ নয়, এটি অসংখ্য রোগের বাহক (Vector)। মাছির সংখ্যা বেড়ে গেলে খামারের বায়োসিকিউরিটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উৎপাদন কমে যায় এবং চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়।

অনেক খামারি শুধুমাত্র মাছি তাড়ানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু মাছি কেন জন্মায় সেই মূল কারণগুলো দূর করেন না। ফলে কয়েকদিন পর আবার একই সমস্যা ফিরে আসে।


খামারে মাছি কেন হয়?

১. তাপমাত্রা

মাছি ১৬-৪০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে।

১২° সেলসিয়াসের নিচে ডিম দেওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

৪৫° সেলসিয়াসের উপরে মাছির ডিম ও লার্ভা মারা যায়।

বাংলাদেশের গরম ও বর্ষাকাল মাছি বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে অনুকূল।


২. ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে লিটার

এটি মাছি জন্মানোর সবচেয়ে বড় কারণ।

বিশেষ করে—

  • ভেজা লিটার
  • দলা পাকানো লিটার
  • অ্যামোনিয়া বেশি হওয়া
  • দীর্ঘদিন লিটার পরিবর্তন না করা

এসব অবস্থায় মাছি খুব দ্রুত ডিম দেয়।


৩. পুরাতন লিটার খামারের পাশে রাখা

অনেক খামারি পুরাতন লিটার শেডের পাশেই রেখে দেন।

এটি মাছির জন্য বিশাল প্রজনন কেন্দ্র তৈরি করে।


৪. বর্ষাকালের আর্দ্রতা

বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যায়।

ফলে—

  • লিটার শুকায় না
  • মল নরম থাকে
  • মাছির ডিম সহজে ফুটে যায়

৫. মৃত মুরগি খোলা জায়গায় ফেলে রাখা

মৃত মুরগি যদি খামারের আশেপাশে ফেলে রাখা হয় তাহলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মাছি সেখানে ডিম দিতে শুরু করে।

এটি পুরো খামারে মাছি ছড়িয়ে দেয়।


৬. মুরগির পাতলা পায়খানা

ডায়রিয়া, কক্সিডিওসিস, এন্টারাইটিস বা খাদ্যজনিত সমস্যায় পাতলা পায়খানা হলে মাছি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।


৭. খামারের আশেপাশে আবর্জনা

যেমন—

  • ফলের খোসা
  • পচা সবজি
  • নোংরা ডাস্টবিন
  • গোবরের স্তূপ

এসব মাছির জন্য আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র।


মাছি কীভাবে রোগ ছড়ায়?

মাছি এক খামার থেকে অন্য খামারে রোগজীবাণু বহন করে নিয়ে যায়।

এরা পা, মুখ এবং শরীরের মাধ্যমে জীবাণু পরিবহন করে।


মাছির মাধ্যমে যেসব রোগ ছড়াতে পারে

  • নিউক্যাসল ডিজিজ (রানীক্ষেত)
  • ফাউল পক্স
  • সালমোনেলোসিস
  • ই-কোলাই সংক্রমণ
  • এন্টারাইটিস
  • কক্সিডিওসিসের ওসিস্ট বহনে সাহায্য করে
  • ফিতা কৃমির সংক্রমণে ভূমিকা রাখে

মাছির কারণে আরও যেসব ক্ষতি হয়

  • মুরগি অস্থির হয়ে যায়
  • খাদ্য গ্রহণ কমে যায়
  • ডিম উৎপাদন কমে
  • ওজন বৃদ্ধি ব্যাহত হয়
  • বায়োসিকিউরিটি ভেঙে যায়

ভেন্টে পোকা (Maggot) হওয়ার কারণ

অনেক সময় মুরগির পায়ুপথে ক্ষত হলে মাছি সেখানে ডিম দেয়।

কয়েক দিনের মধ্যে লার্ভা তৈরি হয়।

এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।


মনে রাখবেন

মাছি মারাই সমাধান নয়।

মাছির জন্মানোর পরিবেশ ধ্বংস করতে পারলেই দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে।


উপসংহার

খামারে মাছি দেখা মানেই কোথাও না কোথাও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি রয়েছে। ভেজা লিটার, মৃত মুরগি, মল-মূত্র, আবর্জনা ও আর্দ্র পরিবেশ মাছির সংখ্যা বাড়ায়। তাই মাছি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমে এর উৎস খুঁজে বের করে তা দূর করতে হবে।

পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে মাছি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা, অর্গানিক ও রাসায়নিক পদ্ধতি, যাতে খামার দীর্ঘমেয়াদে মাছিমুক্ত রাখা যায়।


FAQ

১. খামারে মাছি সবচেয়ে বেশি কেন হয়?

ভেজা লিটার, পাতলা পায়খানা, মৃত মুরগি ও নোংরা পরিবেশের কারণে।

২. মাছি কি রোগ ছড়ায়?

হ্যাঁ। মাছি বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী ও কৃমির ডিম বহন করতে পারে।

৩. বর্ষাকালে মাছি কেন বাড়ে?

আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় লিটার ভিজে যায় এবং মাছির ডিম সহজে ফুটে।

৪. মাছি কি কক্সিডিওসিস ছড়াতে সাহায্য করে?

হ্যাঁ। মাছি কক্সিডিওসিসের ওসিস্ট এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করতে পারে।

৫. মাছি কি ডিম উৎপাদন কমায়?

পরোক্ষভাবে হ্যাঁ। মাছির উপদ্রবে মুরগি বিরক্ত হয়, স্ট্রেস বাড়ে এবং উৎপাদন কমতে পারে।

 

Scroll to Top