গবাদিপশুর গলাফুলা (Hemorrhagic Septicemia) রোগ: লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
গলাফুলা (Hemorrhagic Septicemia বা HS) গরু ও মহিষের একটি অত্যন্ত মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ। রোগটি দ্রুত ছড়ায় এবং সময়মতো চিকিৎসা না করলে মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি হতে পারে। বাংলাদেশে বর্ষার শুরু ও শেষের দিকে এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
গলাফুলা রোগ কী?
গলাফুলা হলো Pasteurella multocida ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট একটি তীব্র সেপটিসেমিক (Septicemic) রোগ। আক্রান্ত পশুর গলা, বুক ও নিচের অংশে দ্রুত ফোলা (Edema) দেখা দেয় এবং শ্বাসকষ্টের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যু হতে পারে।
এ রোগকে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাংগা, ঘটু, গলগটু বা গলবেরা নামেও ডাকা হয়।
কোন প্রাণীতে গলাফুলা রোগ হয়?
গলাফুলা প্রধানত দেখা যায়—
- গরু
- মহিষ (সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল)
- ছাগল
- ভেড়া
- শুকর
- ঘোড়া
- উট
- বাইসন
- হাতি
- বিরল ক্ষেত্রে বানর
রোগের কারণ
গলাফুলা রোগের মূল কারণ Pasteurella multocida ব্যাকটেরিয়া।
অনেক সুস্থ পশুর টনসিল ও নাসোফ্যারিনজিয়াল অংশে এ জীবাণু সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। কিন্তু নিম্নোক্ত কারণে রোগটি হঠাৎ দেখা দিতে পারে—
- আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন
- অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা
- দীর্ঘ ভ্রমণ
- অপুষ্টি
- পরিবহনজনিত চাপ (Stress)
- অতিরিক্ত পরিশ্রম
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া
রোগ কীভাবে হয়?
স্ট্রেসের কারণে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবিস্তার করে রক্তে ছড়িয়ে পড়ে (Septicemia)।
ব্যাকটেরিয়া থেকে নির্গত এন্ডোটক্সিন—
- রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করে
- টিস্যুতে তরল জমায়
- গলা ও চোয়ালের নিচে ফোলা সৃষ্টি করে
- শ্বাসকষ্ট তৈরি করে
- অল্প সময়ের মধ্যে মৃত্যুর কারণ হতে পারে
গলাফুলা রোগের লক্ষণ
অতিতীব্র (Peracute) অবস্থায়
- হঠাৎ ১০৬–১০৭° ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর
- খাওয়া বন্ধ
- অবসাদ
- নাক ও মুখ দিয়ে তরল নির্গমন
- ১২–২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু
তীব্র (Acute) অবস্থায়
- গলার নিচে দ্রুত ফোলা
- ফোলা চোয়াল, বুক, তলপেট ও মাথায় ছড়িয়ে পড়া
- শ্বাস নিতে কষ্ট
- গলা দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ
- নাক দিয়ে ঘন সাদা শ্লেষ্মা
- চোখে পিচুটি
- কাশি
- আক্রান্ত স্থানে ব্যথা ও তাপ
- সূঁচ ফোটালে হলুদাভ তরল বের হওয়া
- ২৪–৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু
পোস্টমর্টেমে যা দেখা যায়
- হৃদপিণ্ডের আবরণে (Pericardium) রক্তমিশ্রিত তরল
- বুক ও পেটের গহ্বরে তরল জমা
- ফ্যারিনজিয়াল ও সার্ভাইক্যাল লিম্ফনোডে রক্তক্ষরণ
- গলার নিচে ব্যাপক এডিমা
রোগ নির্ণয়
নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করে রোগ নির্ণয় করা হয়—
- আকস্মিক জ্বর
- গলার নিচে ফোলা
- দ্রুত মৃত্যুর ইতিহাস
- বর্ষাকালে রোগের প্রাদুর্ভাব
- ল্যাবরেটরি পরীক্ষা (ব্যাকটেরিয়া কালচার বা সেরোলজিক্যাল পরীক্ষা)
এ রোগকে এনথ্রাক্স, ব্ল্যাক কোয়ার্টার (বাদলা), রিন্ডারপেস্ট, বজ্রপাতে মৃত্যু বা সাপে কাটার ঘটনা থেকে আলাদা করে শনাক্ত করতে হয়।
চিকিৎসা
গলাফুলা রোগে যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, বাঁচার সম্ভাবনা তত বেশি।
রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী—
- উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক
- প্রদাহনাশক ও সহায়ক চিকিৎসা
- তরল (Fluid therapy)
- জ্বর নিয়ন্ত্রণ
- শ্বাসকষ্ট ব্যবস্থাপনা
দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে চিকিৎসার সফলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
প্রতিরোধ
গলাফুলা প্রতিরোধে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
- বর্ষা শুরুর আগে নিয়মিত টিকা প্রদান।
- অসুস্থ পশুকে দ্রুত আলাদা করা।
- খামারে নতুন পশু আনার আগে কোয়ারেন্টাইনে রাখা।
- পরিবহন বা আবহাওয়াজনিত স্ট্রেস কমানো।
- গোয়ালঘর পরিষ্কার ও শুকনো রাখা।
- সুষম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা।
- রোগ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ ভেটেরিনারিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করা।
গলাফুলা রোগের টিকা
বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অনুমোদিত গলাফুলা (HS) ভ্যাকসিন ব্যবহৃত হয়।
সাধারণ নির্দেশনা—
- ৬ মাস বা তার বেশি বয়সী পশুকে টিকা প্রদান।
- ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রতিবছর নিয়মিত টিকা।
- বর্ষা শুরু হওয়ার ২–৩ সপ্তাহ আগে টিকা দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
গলাফুলা রোগের কারণে—
- পশুর আকস্মিক মৃত্যু
- দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া
- ওজন হ্রাস
- চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি
- প্রজনন ক্ষতি
- কৃষকের বড় ধরনের আর্থিক লোকসান
হতে পারে। তাই নিয়মিত টিকাদানই এ রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
উপসংহার
গলাফুলা গরু ও মহিষের একটি প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। রোগটি খুব দ্রুত অগ্রসর হয় এবং চিকিৎসায় দেরি হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাণী মারা যায়। তাই বর্ষা শুরুর আগে নিয়মিত টিকা, সঠিক খামার ব্যবস্থাপনা এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ গ্রহণই এ রোগ নিয়ন্ত্রণের সর্বোত্তম উপায়।
১. গলাফুলা রোগ কী?
এটি Pasteurella multocida ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট গরু ও মহিষের একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ।
২. কোন সময় এ রোগ বেশি হয়?
বাংলাদেশে বর্ষার শুরু ও শেষের দিকে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
৩. গলাফুলা রোগের প্রধান লক্ষণ কী?
উচ্চ জ্বর, গলার নিচে ফোলা, শ্বাসকষ্ট, নাক দিয়ে শ্লেষ্মা বের হওয়া এবং দ্রুত মৃত্যু।
৪. এ রোগ কি মানুষে সংক্রমিত হয়?
গলাফুলা মূলত গবাদিপশুর রোগ। তবে অসুস্থ প্রাণী পরিচালনার সময় সবসময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উচিত।
৫. গলাফুলা রোগের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ কী?
বর্ষা শুরুর আগে নিয়মিত ভ্যাকসিন প্রদান এবং সঠিক খামার ব্যবস্থাপনা।
৬. গলাফুলা হলে কী করবেন?
আক্রান্ত পশুকে দ্রুত আলাদা করুন এবং অবিলম্বে একজন রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নিন।




