গবাদিপশুর রক্ত-প্রস্রাব (ব্যাবেসিওসিস):  কারন ও প্রতিকার

ব্যাবেসিওসিস (Babesiosis) বা গবাদিপশুর রক্ত-প্রস্রাব রোগ: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

ব্যাবেসিওসিস (Babesiosis) গবাদিপশুর একটি আঁঠালী (Tick) বাহিত রক্তবাহিত প্রোটোজোয়াজনিত রোগ। এ রোগকে রেড ওয়াটার ফিভার (Red Water Fever), টেক্সাস ফিভার (Texas Fever), টিক ফিভার (Tick Fever), পাইরোপ্লাজমোসিস (Piroplasmosis) নামেও পরিচিত।

রোগে আক্রান্ত হলে গরুর লোহিত রক্তকণিকা (RBC) ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে রক্তশূন্যতা, জ্বর, কফি বা লালচে রঙের প্রস্রাব এবং চিকিৎসায় বিলম্ব হলে মৃত্যুও হতে পারে। উন্নত ও সংকর জাতের গরু এ রোগে বেশি সংবেদনশীল।


ব্যাবেসিওসিস কী?

ব্যাবেসিয়া (Babesia) গণভুক্ত প্রোটোজোয়া গরুর রক্তের লোহিত কণিকার ভিতরে বংশবিস্তার করে এবং ধীরে ধীরে সেগুলো ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে শরীরে তীব্র রক্তস্বল্পতা সৃষ্টি হয় এবং প্রস্রাবের রং কফি বা লালচে হয়ে যায়।

বাংলাদেশসহ উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঁঠালীবাহিত রোগ।


রোগের কারণ

ব্যাবেসিওসিস প্রধানত নিচের জীবাণুর কারণে হয়—

  • Babesia bovis
  • Babesia bigemina

রোগটি সাধারণত নিম্নোক্ত আঁঠালীর মাধ্যমে ছড়ায়—

  • Rhipicephalus (Boophilus) microplus
  • Rhipicephalus (Boophilus) annulatus

এছাড়াও রোগ ছড়াতে পারে—

  • একই সিরিঞ্জ বা সূঁচ একাধিক গরুতে ব্যবহার করলে
  • দূষিত অস্ত্রোপচার বা ট্যাগ লাগানোর যন্ত্র ব্যবহার করলে
  • রক্তচোষা মাছি (Biting fly) দ্বারা
  • আক্রান্ত গরুর রক্ত সুস্থ গরুর শরীরে প্রবেশ করলে

রোগের বিস্তার (সংক্রমণ)

আঁঠালী আক্রান্ত গরুর রক্ত পান করার সময় জীবাণু গ্রহণ করে।

পরে সেই আঁঠালী অন্য সুস্থ গরুর শরীরে রক্ত খাওয়ার সময় জীবাণু প্রবেশ করিয়ে দেয়।

আঁঠালীর ডিমের মাধ্যমেও জীবাণু পরবর্তী প্রজন্মে ছড়াতে পারে (Transovarial transmission)।


কোন সময় রোগ বেশি হয়?

  • বর্ষাকাল
  • বিশেষ করে জুলাই-আগস্ট মাসে
  • যেখানে আঁঠালীর উপদ্রব বেশি
  • সংকর ও বিদেশি জাতের গরুতে
  • গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী গাভীতে

রোগের লক্ষণ

ব্যাবেসিওসিসে সাধারণত নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখা যায়—

  • ১০৩–১০৭° ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর
  • ক্ষুধামন্দা
  • ঝিমিয়ে থাকা
  • দুর্বলতা
  • পাল থেকে আলাদা হয়ে থাকা
  • রুমেনের গতি কমে যাওয়া
  • দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া
  • দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস
  • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
  • চোখ ও মাড়ি ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
  • তীব্র রক্তশূন্যতা
  • কফি বা লালচে রঙের প্রস্রাব (Hemoglobinuria)
  • জন্ডিস
  • পাতলা পায়খানা বা কোষ্ঠকাঠিন্য
  • গর্ভবতী গাভীর গর্ভপাত
  • স্নায়বিক লক্ষণ (দাঁত কড়মড় করা, ভারসাম্য হারানো, শুয়ে পড়া)
  • চিকিৎসা না করলে ৪–৮ দিনের মধ্যে মৃত্যু হতে পারে

পোস্টমর্টেমে যা দেখা যায়

  • রক্ত পানির মতো পাতলা
  • প্লীহা বড় ও ভঙ্গুর
  • যকৃত বড় হয়ে যাওয়া
  • জন্ডিস
  • পিত্তথলিতে ঘন পিত্ত
  • ফুসফুসে পানি জমা (Pulmonary edema)
  • চর্বি ও টিস্যু হলুদাভ

রোগ নির্ণয়

ক্লিনিক্যাল লক্ষণের ভিত্তিতে

  • জ্বর
  • রক্তশূন্যতা
  • কফি রঙের প্রস্রাব
  • জন্ডিস

ল্যাবরেটরি পরীক্ষা

  • Giemsa stained blood smear
  • Acridine Orange stain
  • PCR
  • ELISA
  • IFA (Indirect Fluorescent Antibody Test)

যেসব রোগের সাথে মিল রয়েছে

  • এনাপ্লাজমোসিস
  • থাইলেরিওসিস
  • ট্রাইপানোসোমিয়াসিস
  • লেপ্টোস্পাইরোসিস
  • ব্যাসিলারি হিমোগ্লোবিনিউরিয়া
  • কপার বিষক্রিয়া

চিকিৎসা

সতর্কতা: ব্যাবেসিওসিস একটি গুরুতর রোগ। চিকিৎসা অবশ্যই রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করতে হবে।

সম্ভাব্য চিকিৎসা—

১. Diminazene Aceturate

যেমন—

  • Berenil
  • Babcop Vet

২. Imidocarb Dipropionate

যেমন—

  • Imicarb
  • Babcure

এটি ব্যাবেসিওসিসের অন্যতম কার্যকর ওষুধ।

৩. সহায়ক চিকিৎসা

  • প্রয়োজনে রক্ত সঞ্চালন
  • IV Fluid Therapy
  • ভিটামিন ও হেমাটিনিক
  • লিভার সাপোর্ট
  • জ্বর নিয়ন্ত্রণ
  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পরিচর্যা

প্রতিরোধ

ব্যাবেসিওসিস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আঁঠালী নিয়ন্ত্রণ

নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন—

  • প্রতি ৩–৪ মাস অন্তর আঁঠালীনাশক ব্যবহার করুন।
  • বর্ষার শুরু ও শেষে টিক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গ্রহণ করুন।
  • নতুন কেনা গরুকে অন্তত ১৪ দিন পৃথক (Quarantine) রাখুন।
  • একই সিরিঞ্জ ও সূঁচ একাধিক গরুতে ব্যবহার করবেন না।
  • গোয়ালঘর পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।
  • নিয়মিত গরুর শরীরে আঁঠালী আছে কিনা পরীক্ষা করুন।
  • আক্রান্ত গরুকে দ্রুত পৃথক করুন।
  • উন্নত পুষ্টি ও সুষম খাদ্য নিশ্চিত করুন।

খামারিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

  • কফি বা লালচে রঙের প্রস্রাব দেখলেই দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।
  • চিকিৎসায় বিলম্ব হলে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
  • সংকর ও বিদেশি জাতের গরুতে বিশেষ নজর রাখুন।
  • বর্ষাকালে নিয়মিত আঁঠালী নিয়ন্ত্রণ করুন।
  • একই সূঁচ, সিরিঞ্জ বা অস্ত্রোপচারের যন্ত্র একাধিক পশুতে ব্যবহার করবেন না।

FAQ (সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন)

ব্যাবেসিওসিস কী?

এটি আঁঠালীবাহিত রক্তবাহিত প্রোটোজোয়াজনিত একটি মারাত্মক রোগ, যেখানে লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হয়ে রক্তশূন্যতা সৃষ্টি হয়।

কেন প্রস্রাব কফি বা লাল হয়?

রক্তের লোহিত কণিকা ভেঙে যাওয়ায় হিমোগ্লোবিন প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়, ফলে প্রস্রাব কফি বা লালচে দেখায়।

কোন গরু বেশি আক্রান্ত হয়?

সংকর, বিদেশি জাতের, দুগ্ধবতী ও গর্ভবতী গাভী বেশি আক্রান্ত হয়।

রোগটি কীভাবে ছড়ায়?

মূলত আঁঠালীর মাধ্যমে, এছাড়া একই সিরিঞ্জ, দূষিত যন্ত্র এবং আক্রান্ত রক্তের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।

প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?

নিয়মিত আঁঠালী নিয়ন্ত্রণ, কোয়ারেন্টাইন, পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থাপনা এবং একই সূঁচ পুনঃব্যবহার না করা।

 
Scroll to Top