মুরগির এভিয়ান এনসেফালোমাইলাইটিস (Avian Encephalomyelitis-AE): কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, প্রতিরোধ ও টিকা
এভিয়ান এনসেফালোমাইলাইটিস (Avian Encephalomyelitis, AE) মুরগির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত অল্প বয়সী বাচ্চায় স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। রোগটি Epidemic Tremor বা Star Gazing Syndrome নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে রোগটি অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেলেও সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় (Diagnosis) না হওয়ায় এটি প্রায়ই নিউক্যাসল, মেরেক্স বা ভিটামিনের ঘাটতিজনিত রোগ হিসেবে ভুল ধরা হয়।
এপিডেমিওলজি (Epidemiology)
১৯৩০ সালে প্রথমবারের মতো ২ সপ্তাহ বয়সী মুরগিতে রোগটি শনাক্ত হয়। ১৯৪৭ সালে গবেষক Baumster ও তাঁর সহকর্মীরা প্রমাণ করেন যে রোগটি একটি ভাইরাস দ্বারা সংঘটিত হয়।
১৯৬০ সালের আগে কার্যকর টিকা না থাকায় এ রোগে ব্যাপক মৃত্যুহার দেখা যেত। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এ রোগ বিদ্যমান। তবে সঠিক টিকাদান কর্মসূচি অনুসরণ করলে রোগটি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ব্রিডার ফ্লকে টিকা না থাকলে প্রায় ১০০% বাচ্চা আক্রান্ত হতে পারে।
রোগের কারণ (Etiology)
এ রোগের কারণ Avian Encephalomyelitis Virus (AEV)।
- Enterovirus
- Family: Picornaviridae
- Genome: Single-stranded RNA virus
- মাত্র একটি প্রধান Serotype রয়েছে।
- বিভিন্ন Field strain থাকলেও Antigenic variation খুবই কম।
এই কারণেই টিকা সাধারণত ভালো কার্যকারিতা প্রদান করে।
আক্রান্ত পাখি (Host)
রোগটি প্রধানত—
- মুরগি
- কোয়েল
- কবুতর
- তিতির
এ দেখা যায়।
টার্কিতে খুব কম দেখা যায়।
আক্রান্ত হওয়ার বয়স
- ১-২ সপ্তাহ বয়সী বাচ্চায় সবচেয়ে বেশি।
- ৭-১০ দিনের মধ্যে লক্ষণ সবচেয়ে স্পষ্ট হয়।
- ৪ সপ্তাহের পর স্বাভাবিকভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
ব্রিডার আক্রান্ত হলে
- ডিম উৎপাদন প্রায় ১০% কমে যায়।
- ১০-১৪ দিন পর্যন্ত উৎপাদন কম থাকতে পারে।
- Hatchability প্রায় ৫% পর্যন্ত কমে যায়।
- Late embryonic death বৃদ্ধি পায়।
এ কারণে আক্রান্ত ব্রিডারের ডিম অন্তত ২ সপ্তাহ হ্যাচিং না করাই উত্তম।
সংক্রমণের উপায় (Transmission)
এ রোগ দুইভাবে ছড়ায়।
১. Vertical Transmission
- আক্রান্ত ব্রিডারের ডিমের মাধ্যমে বাচ্চায়।
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংক্রমণ পদ্ধতি।
২. Horizontal Transmission
- আক্রান্ত মুরগির বিষ্ঠা
- খাদ্য
- পানি
- ইনকিউবেটর
- দূষিত সরঞ্জাম
- খামারের কর্মচারী
আক্রান্ত পাখি কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ভাইরাস নির্গত করতে পারে।
রোগের বিকাশ (Pathogenesis)
ভাইরাস মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে।
প্রথমে—
- অন্ত্রে (Intestine) বৃদ্ধি পায়
তারপর
- রক্তে প্রবেশ করে (Viremia)
এরপর
- মস্তিষ্ক
- স্পাইনাল কর্ড
- কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র
আক্রান্ত করে।
অন্ত্রে থাকা ভাইরাস বিষ্ঠার মাধ্যমে বের হয়ে অন্য পাখিতে সংক্রমণ ঘটায়।
বড় মুরগিতে ভাইরাস সাধারণত স্নায়ুতন্ত্রে বিস্তার লাভ করে না, তাই প্রাপ্তবয়স্ক মুরগিতে পক্ষাঘাত খুব কম দেখা যায়।
রোগের লক্ষণ (Clinical Signs)
বাচ্চায়
- মাথা ও ঘাড় কাঁপা (Fine tremor)
- চলাফেরায় ভারসাম্যহীনতা (Ataxia)
- পা দুর্বল হয়ে যাওয়া
- বসে থাকা
- পরে পক্ষাঘাত
- পালক এলোমেলো
- বৃদ্ধি কমে যাওয়া
- খাদ্য গ্রহণ কমে যাওয়া
- শরীর শুকিয়ে যাওয়া
- অনেক সময় মাথা একদিকে বাঁকা থাকে
- শব্দে চমকে উঠে শরীর কাঁপা (Characteristic finding)
অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করেন।
প্রাপ্তবয়স্ক মুরগিতে
- ডিম উৎপাদন কমে যায়
- Hatchability কমে
- Late embryonic death বৃদ্ধি পায়
জটিল অবস্থায়
- চোখে ছানি (Cataract)
- অন্ধত্ব
হতে পারে।
পোস্টমর্টেম (Postmortem Lesions)
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান লেশন খুব বেশি থাকে না।
তবে দেখা যেতে পারে—
- Gizzard muscle-এ ধূসর বা সাদা ফোকাস
- হৃদপিণ্ডের দেয়ালে Lymphocytic infiltration
- Brain ও spinal cord-এ নডিউল
- Lens অস্বচ্ছ (Cataract)
হিস্টোপ্যাথোলজিতে Non-suppurative encephalomyelitis সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
রোগ নির্ণয় (Diagnosis)
রোগ নির্ণয়ে ব্যবহার করা হয়—
- ক্লিনিক্যাল লক্ষণ
- পোস্টমর্টেম
- Histopathology
- ELISA
- PCR
- Virus Neutralization Test
- Agar Gel Immunodiffusion (AGID)
যেসব রোগের সাথে মিল রয়েছে (Differential Diagnosis)
এভিয়ান এনসেফালোমাইলাইটিসকে নিম্নোক্ত রোগ থেকে আলাদা করতে হবে—
- নিউক্যাসল রোগ (ND)
- মেরেক্স রোগ
- রিকেটস
- Riboflavin deficiency
- Thiamine deficiency
- Vitamin E deficiency (Encephalomalacia)
- Vitamin A deficiency
গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
Vitamin E deficiency
- Cerebellar hemorrhage থাকে
- সাধারণত ১৫–৩০ দিন বয়সে হয়
- AE-এর মতো ব্যাপক সংক্রমণ হয় না।
Thiamine deficiency
- Star-gazing posture দেখা যায়।
- কিন্তু এটি পুষ্টিজনিত রোগ।
Riboflavin deficiency
- Curled toe paralysis হয়।
- Embryonic mortality বৃদ্ধি পায়।
চিকিৎসা (Treatment)
এটি ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় নির্দিষ্ট কার্যকর চিকিৎসা নেই।
তবে—
- সাপোর্টিভ চিকিৎসা
- ইলেক্ট্রোলাইট
- মাল্টিভিটামিন
- ভিটামিন E + Selenium
- Secondary bacterial infection থাকলে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক (ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শে)
- উন্নত ব্যবস্থাপনা
ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে।
প্রতিরোধ (Prevention)
- ব্রিডার ফ্লকে নিয়মিত টিকা দিতে হবে।
- আক্রান্ত বাচ্চা আলাদা রাখতে হবে।
- Biosecurity কঠোরভাবে মানতে হবে।
- পরিষ্কার খাদ্য ও পানি নিশ্চিত করতে হবে।
- Hatchery hygiene বজায় রাখতে হবে।
- আক্রান্ত ব্রিডারের ডিম সাময়িকভাবে হ্যাচিংয়ে ব্যবহার না করাই ভালো।
টিকা (Vaccination)
বর্তমানে Live এবং Killed—উভয় ধরনের টিকা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে সাধারণত AE + Fowl Pox যৌথ টিকা ডানার ঝিল্লিতে (Wing Web Method) দেওয়া হয়।
টিকা দেওয়ার সময়
- ৮–১৬ সপ্তাহ বয়সে
- বিশেষ করে ব্রিডার মুরগিতে
প্রচলিত টিকা
- Nobilis AE + Pox
- Cevac Poximune AE
- Provac AE + Pox
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
এভিয়ান এনসেফালোমাইলাইটিসের কারণে—
- বাচ্চার মৃত্যুহার বৃদ্ধি পায়
- ডিম উৎপাদন কমে যায়
- হ্যাচাবিলিটি কমে যায়
- Late embryonic death বৃদ্ধি পায়
- দুর্বল বাচ্চা উৎপন্ন হয়
- খামারের উৎপাদনশীলতা ও লাভজনকতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়
সঠিক সময়ে ব্রিডার টিকাদান, উন্নত বায়োসিকিউরিটি এবং মানসম্মত হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে এ রোগ সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
১. এভিয়ান এনসেফালোমাইলাইটিস (AE) কী?
এভিয়ান এনসেফালোমাইলাইটিস (AE) মুরগির একটি ভাইরাসজনিত স্নায়বিক রোগ, যা প্রধানত বাচ্চা মুরগির মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। এটি Epidemic Tremor বা Star Gazing Syndrome নামেও পরিচিত।
২. এভিয়ান এনসেফালোমাইলাইটিস কোন ভাইরাস দ্বারা হয়?
এ রোগের কারণ Avian Encephalomyelitis Virus (AEV), যা Picornaviridae পরিবারের Enterovirus গণের একটি RNA ভাইরাস।
৩. কোন বয়সের মুরগিতে AE রোগ বেশি হয়?
সাধারণত ১–৩ সপ্তাহ বয়সী বাচ্চায় বেশি দেখা যায়। তবে যেকোনো বয়সের মুরগি আক্রান্ত হতে পারে। ৪ সপ্তাহের পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
৪. AE রোগ কীভাবে ছড়ায়?
রোগটি দুইভাবে ছড়ায়—
- আক্রান্ত ব্রিডারের ডিমের মাধ্যমে (Vertical transmission)
- আক্রান্ত মুরগির বিষ্ঠা, খাদ্য, পানি ও দূষিত সরঞ্জামের মাধ্যমে (Horizontal transmission)
৫. AE রোগের প্রধান লক্ষণ কী?
- মাথা ও ঘাড় কাঁপা (Tremor)
- ভারসাম্যহীনভাবে হাঁটা (Ataxia)
- পা দুর্বল হয়ে যাওয়া
- পক্ষাঘাত (Paralysis)
- বসে থাকা বা কাত হয়ে পড়ে থাকা
- বৃদ্ধি কমে যাওয়া
- চোখে ছানি ও অন্ধত্ব (কিছু ক্ষেত্রে)
৬. AE রোগে ডিম উৎপাদনে কী প্রভাব পড়ে?
ব্রিডার ও লেয়ার মুরগিতে ডিম উৎপাদন প্রায় ১০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এছাড়া হ্যাচাবিলিটি কমে এবং Late embryonic death বৃদ্ধি পায়।
৭. AE রোগের পোস্টমর্টেমে কী দেখা যায়?
- গিজার্ডের মাংসে ধূসর বা সাদা ফোকাস
- হৃদপিণ্ডের দেয়ালে লিম্ফোসাইট জমা
- মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডে ক্ষুদ্র নডিউল
- চোখের লেন্স অস্বচ্ছ (Cataract)
৮. AE রোগ কীভাবে নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা হয়?
রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়—
- ক্লিনিক্যাল লক্ষণ
- হিস্টোপ্যাথোলজি
- ELISA
- PCR
- Virus Neutralization Test
- Agar Gel Immunodiffusion (AGID)
৯. AE রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা আছে কি?
না। এটি ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে সাপোর্টিভ চিকিৎসা, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষতি কমানো যায়।
১০. AE রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?
সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ব্রিডার মুরগিকে সময়মতো টিকা প্রদান, কঠোর বায়োসিকিউরিটি অনুসরণ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা।
১১. AE রোগের টিকা কখন দিতে হয়?
সাধারণত ৮–১৬ সপ্তাহ বয়সে ব্রিডার মুরগিকে AE বা AE+Pox লাইভ টিকা দেওয়া হয়।
১২. AE রোগে মৃত্যুহার কত হতে পারে?
সাধারণ অবস্থায় মৃত্যুহার ১০–২০% হতে পারে। তবে তীব্র সংক্রমণে ৭০% পর্যন্ত এবং আক্রান্তের হার ১০০% পর্যন্ত হতে পারে।
।




