মুরগির ইনফেকশাস ল্যারিঙ্গোট্রাকাইটিস (ILT): কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা, টিকা ও প্রতিরোধ
ইনফেকশাস ল্যারিঙ্গোট্রাকাইটিস (ILT) কী?
ইনফেকশাস ল্যারিঙ্গোট্রাকাইটিস (Infectious Laryngotracheitis বা ILT) হলো মুরগির একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের রোগ। এটি মূলত ল্যারিংস (স্বরযন্ত্র) ও ট্রাকিয়া (শ্বাসনালী) আক্রান্ত করে। রোগটি অনেক সময় এতটাই মারাত্মক হয় যে আক্রান্ত মুরগি শ্বাসরোধে মারা যেতে পারে।
এ রোগকে অনেক সময় Avian Diphtheria নামেও ডাকা হয়। একবার কোনো খামারে ILT প্রবেশ করলে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা অত্যন্ত কঠিন, কারণ সুস্থ হয়ে যাওয়া মুরগিও দীর্ঘদিন ভাইরাসের বাহক (Carrier) হিসেবে থাকে।
রোগের ইতিহাস
- ১৯২৫ সালে May ও Tittsler প্রথম রোগটি বর্ণনা করেন।
- ১৯৩০ সালে Beach ও Graham রোগটির নামকরণ করেন Infectious Laryngotracheitis (ILT)।
রোগের কারণ (Agent)
রোগটির কারণ Gallid alphaherpesvirus 1, যা Herpesviridae পরিবারের একটি Enveloped Double-stranded DNA Virus।
এর বৈশিষ্ট্য:
- মাত্র একটি Serotype রয়েছে।
- ভাইরাসের আকার প্রায় ১৯৫–২৫০ ন্যানোমিটার।
- সাধারণ জীবাণুনাশকে সহজেই ধ্বংস হয়।
- মৃত মুরগির দেহে প্রায় ২ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
- আক্রান্ত মুরগিতে ২ বছর পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।
কোন মুরগিতে বেশি হয়?
- মুরগি (Chicken) প্রধান প্রাকৃতিক হোস্ট।
- ফিজ্যান্ট (Pheasant) আক্রান্ত হতে পারে।
- ২০–৪০ সপ্তাহ বয়সে বেশি দেখা যায়।
- ১০ সপ্তাহের নিচে তুলনামূলক কম হয়।
- ভারী জাতের ব্রিডার ও প্রাপ্তবয়স্ক মুরগিতে বেশি দেখা যায়।
- শীতকালে রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।
রোগের ইনকিউবেশন পিরিয়ড
- সাধারণত ৬–১২ দিন।
- অনেক ক্ষেত্রে ৪–১২ দিনের মধ্যেই লক্ষণ প্রকাশ পায়।
রোগ কীভাবে ছড়ায়?
ILT Vertical Transmission (ডিমের মাধ্যমে) ছড়ায় না।
প্রধানত Horizontal Transmission এর মাধ্যমে ছড়ায়।
সংক্রমণের উৎস:
- শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে (Inhalation)
- চোখ ও মুখের মাধ্যমে
- আক্রান্ত মুরগি
- টিকাপ্রাপ্ত মুরগি (বিশেষ করে CEO ভ্যাকসিনের পর প্রায় ১১ দিন ভাইরাস ছড়াতে পারে)
- বাতাস (প্রায় ৫০০ মিটার পর্যন্ত)
- ধুলাবালি
- লিটার
- পালক
- খাঁচা
- ক্রেট
- খাবার ও পানির পাত্র
- জুতা
- কাপড়
- কর্মচারী
- খামারের সরঞ্জাম
রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া (Pathogenesis)
ভাইরাসটি প্রথমে শ্বাসনালী বা চোখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে।
এরপর—
- ল্যারিংস ও ট্রাকিয়ার মিউকোসায় প্রদাহ সৃষ্টি করে।
- টিস্যু ফুলে যায় (Edema)।
- পরে রক্তক্ষরণ হয়।
- শ্বাসনালীতে মিউকাস, ফাইব্রিন ও রক্ত জমে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যায়।
- অনেক ক্ষেত্রে শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু ঘটে।
রোগের লক্ষণ
রোগের তীব্রতা নির্ভর করে—
- মুরগির বয়স
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
- ভাইরাসের স্ট্রেইন
- পরিবেশ
- অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগের উপস্থিতির উপর
১. Peracute Form
সবচেয়ে মারাত্মক রূপ।
লক্ষণ:
- হঠাৎ খামারে রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
- তীব্র শ্বাসকষ্ট।
- মুখ হাঁ করে শ্বাস নেওয়া।
- গলা লম্বা করে শ্বাস নেওয়া।
- গড়গড় শব্দ।
- কাশি দিলে রক্ত বের হওয়া।
- ঠোঁট, পালক ও লিটারে রক্তের দাগ।
- দ্রুত মৃত্যুহার বৃদ্ধি।
- Mortality ৩০–৭০% পর্যন্ত হতে পারে।
২. Acute Form
সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
লক্ষণ:
- শ্বাসকষ্ট
- কাশি
- হাঁচি
- চোখ দিয়ে পানি পড়া
- নাক দিয়ে সাদা স্রাব
- চোখ ফুলে যাওয়া
- চোখের পাতা লেগে যাওয়া
- ট্রাকিয়ায় Cheesy plug
- ট্রাকিয়ায় রক্তক্ষরণ
- মাথা উঁচু করে শ্বাস নেওয়া
- শ্বাসরোধে মৃত্যু
- ডিম উৎপাদন ১০–৫০% পর্যন্ত কমে যায়
- ২–৪ সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়
৩. Mild Form
লক্ষণ:
- চোখ দিয়ে পানি পড়া
- নাক দিয়ে স্রাব
- চোখের নিচে ফোলা
- হালকা শ্বাসকষ্ট
- ডিম উৎপাদন কিছুটা কমে যায়
- Mortality সাধারণত ১–২%
৪. Chronic Form
লক্ষণ:
- দীর্ঘদিন অবসাদ
- এক জায়গায় বসে থাকা
- চোখ ছোট হয়ে যাওয়া
- শ্বাসনালীতে কফ
- ডিম উৎপাদন প্রায় ১০% কমে যাওয়া
পোস্টমর্টেমে যা দেখা যায়
ILT-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পোস্টমর্টেম বৈশিষ্ট্য হলো—
- ট্রাকিয়ায় জমাট বাঁধা রক্ত
- রক্তমিশ্রিত মিউকাস
- ল্যারিংসে হলুদ Diphtheritic membrane
- Cheesy plug
- ট্রাকিয়ার তীব্র Congestion
- শ্বাসনালীতে প্রদাহ
- ল্যারিংসে Caseous পদার্থ
- শ্বাসনালী আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া
রোগ নির্ণয়
রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত পদ্ধতি—
- রোগের ইতিহাস
- ক্লিনিক্যাল লক্ষণ
- পোস্টমর্টেম
- ELISA
- RT-PCR
- Virus Neutralization Test
- Embryonated Egg Inoculation
চিকিৎসা
ILT একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই নির্দিষ্ট কার্যকর চিকিৎসা নেই।
তবে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং সাপোর্টিভ চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ব্যবস্থাপনা:
- আক্রান্ত মুরগি আলাদা রাখা।
- পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা।
- ধুলাবালি কমানো।
- ভিটামিন ও ইলেক্ট্রোলাইট প্রদান।
- সেকেন্ডারি সংক্রমণে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার।
- কফ কমানোর সাপোর্টিভ ওষুধ ব্যবহার।
প্রতিরোধ
ILT নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বায়োসিকিউরিটি ও সঠিক টিকাদান।
প্রতিরোধে—
- খামারে কঠোর বায়োসিকিউরিটি বজায় রাখা।
- দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ।
- জীবাণুনাশক স্প্রে করা।
- আক্রান্ত খামার থেকে মুরগি আনা-নেওয়া বন্ধ রাখা।
- আক্রান্ত শেড পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করার পর কমপক্ষে ৩ সপ্তাহ খালি রাখা।
- আক্রান্ত ও সুস্থ ঝাঁক আলাদা রাখা।
ILT ভ্যাকসিন
বর্তমানে ILT-এর তিন ধরনের ভ্যাকসিন ব্যবহৃত হয়।
১. Recombinant ILT Vaccine
- ১ দিন বয়সে
- মেরেক্স ভ্যাকসিনের সাথে
- চামড়ার নিচে
- প্রায় ৬০ সপ্তাহ পর্যন্ত সুরক্ষা
- ভাইরাস ছড়ায় না
- দাম তুলনামূলক বেশি
২. CEO (Chicken Embryo Origin)
প্রয়োগ:
- চোখে ড্রপ
- স্প্রে
- পানির মাধ্যমে
সময়সূচি:
- ৬–৮ সপ্তাহ
- ১২–১৫ সপ্তাহ
সুবিধা:
- শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে।
অসুবিধা:
- ভ্যাকসিন ভাইরাস ছড়াতে পারে।
- টিকাবিহীন আশপাশের খামারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
৩. TCO (Tissue Culture Origin)
প্রয়োগ:
- চোখে ড্রপ
সময়সূচি:
- ৪–৬ সপ্তাহ
- ১০–১৬ সপ্তাহ
অথবা
- ৬, ১২ ও ১৫ সপ্তাহ (ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়)
সুবিধা:
- নিরাপদ
- রিয়াকশন কম
- ভ্যাকসিন ভাইরাস ছড়ায় না
টিকার পর টাইটার পরীক্ষা
- লাইভ ভ্যাকসিনের ৩–৫ সপ্তাহ পরে ELISA করে টাইটার পরীক্ষা করা উচিত।
- কাঙ্ক্ষিত টাইটার: ২০০০–৬০০০
- কিল্ড ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে ৫–৮ সপ্তাহ পরে ELISA করে ৭০০০–২০০০০ টাইটারকে সন্তোষজনক ধরা হয়।
উপসংহার
ইনফেকশাস ল্যারিঙ্গোট্রাকাইটিস (ILT) মুরগির একটি অত্যন্ত সংক্রামক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শ্বাসতন্ত্রের রোগ। একবার খামারে প্রবেশ করলে এটি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে এবং সুস্থ হয়ে যাওয়া মুরগিও ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করে। তাই চিকিৎসার চেয়ে বায়োসিকিউরিটি, সঠিক ভ্যাকসিনেশন, আক্রান্ত ঝাঁক দ্রুত পৃথক করা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ-ই ILT নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
১. ইনফেকশাস ল্যারিঙ্গোট্র্যাকাইটিস (ILT) কী?
ILT হলো মুরগির একটি অত্যন্ত সংক্রামক হারপিস ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের রোগ, যা প্রধানত ট্রাকিয়া ও ল্যারিংসকে আক্রান্ত করে।
২. ILT রোগের কারণ কী?
এটি Gallid alphaherpesvirus 1 দ্বারা হয়, যা Herpesviridae পরিবারের একটি DNA ভাইরাস।
৩. ILT কীভাবে ছড়ায়?
আক্রান্ত মুরগির শ্বাসনালীর নিঃসরণ, কাশি, হাঁচি, ধুলাবালি, লিটার, খাবার-পানির পাত্র, খাঁচা, জুতা, কাপড় ও মানুষের মাধ্যমে রোগ ছড়ায়। ডিমের মাধ্যমে (Vertical transmission) সাধারণত ছড়ায় না।
৪. কোন বয়সের মুরগিতে ILT বেশি হয়?
সাধারণত ১০–৪০ সপ্তাহ বয়সের মুরগিতে বেশি দেখা যায় এবং ২০–৪০ সপ্তাহে ঝুঁকি সর্বাধিক থাকে।
৫. ILT রোগের প্রধান লক্ষণ কী?
- প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট
- মুখ হাঁ করে শ্বাস নেওয়া
- কাশি ও হাঁচি
- কফের সাথে রক্ত বের হওয়া
- চোখ ও মুখ ফুলে যাওয়া
- ডিম উৎপাদন কমে যাওয়া
৬. ILT রোগে মৃত্যুহার কত?
সাধারণত ৫–৩০% হলেও তীব্র সংক্রমণ বা মিশ্র সংক্রমণে ৭০–৮০% পর্যন্ত হতে পারে।
৭. ILT রোগের পোস্টমর্টেমে কী দেখা যায়?
- ট্রাকিয়ায় রক্তক্ষরণ
- জমাট বাঁধা রক্ত (Blood cast)
- Cheesy plug
- ডিপথেরিক মেমব্রেন
- ট্রাকিয়া ও ল্যারিংসে তীব্র প্রদাহ
৮. ILT রোগ কীভাবে নিশ্চিত করা হয়?
ক্লিনিক্যাল লক্ষণ, পোস্টমর্টেম, ELISA, PCR, Virus Neutralization Test এবং Embryo Inoculation-এর মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়।
৯. ILT রোগের চিকিৎসা আছে কি?
ভাইরাসের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, সাপোর্টিভ কেয়ার এবং ব্যবস্থাপনা রোগের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে।
১০. ILT প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?
সঠিক বায়োসিকিউরিটি, নিয়মিত জীবাণুমুক্তকরণ, আক্রান্ত ঝাঁক আলাদা রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে ILT টিকা প্রদানই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
১১. ILT-এর জন্য কোন কোন টিকা ব্যবহার করা হয়?
- CEO Vaccine
- TCO Vaccine
- Recombinant ILT Vaccine
১২. ILT হলে ডিম উৎপাদন কতটা কমতে পারে?
সাধারণত ১০–৫০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ৩–৪ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।





