Breaking News

করোনার প্রভাবে পোল্ট্রি শিল্পে নিন্মমুখী ধারা অব্যাহত- জরুরি প্রয়োজন বহুপক্ষীয় উদ্যোগ।

করোনার প্রভাবে পোল্ট্রি শিল্পে নিন্মমুখী ধারা অব্যাহত- জরুরি প্রয়োজন বহুপক্ষীয় উদ্যোগ।

করোনার দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবে অন্যান্ন পেশার মত পোল্ট্রি পেশায় ব্যপক ধ্বস নেমেছে। মার্চ মাসের শুরুতে যখন প্রথম দেশে কোভিড ১৯ রোগী সনাক্ত হয় এবং তার প্রতিক্রিয়ায় দুইমাসাধিক কাল লক ডাউনের কারনে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ে। ডিমের দাম ৪ টাকা ব্রয়লারের দাম প্রতি কেজি ৪০ টাকা নেমে আসে এবং একদিন বয়সী ব্রয়লার বাচ্চা এবং লেয়ার বাচ্চা কেউ কিনতেই চায় নি।
পরিবহনের সমস্যা এবং করোনার প্রভাবে ভোক্তার মনে বিরুপ প্রতিক্রিয়া,হাট বাজারে ক্রেতা সমাগম নিয়ন্ত্রন সামগ্রিকভাবে এই ইন্ডাস্ট্রি কে প্রায় ৫০% সংকুচিত করেছে। বড় ছোট সব হ্যাচারি বাচ্চা উৎপাদন বাধ্য হয়ে কমিয়ে দিয়েছেন- এর প্রভাব পড়েছে ফিড ইন্ডাস্ট্রিতে, বড় বিনিয়োগের ফিড ইন্ডাস্ট্রি এখন ব্যাংক সুদ আর প্রতিদিনের ম্যানেজমেন্ট খরচ তুলে আনতে হিমশিম খাচ্ছে।বর্তমানে মাছ চাষের মৌসুম থাকার কারনে কিছু টা সামাল দেওয়া যাচ্ছে কিন্তু মাছের সিজন শেষ হলে ফিড মিলগুলোকে আরো কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে ফিডের সংকুচিত বাজারে নিজেদের শেয়ার ধরে রাখার জন্য।
বাংলাদেশে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির পরেই বৃহৎ আকারে প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথিকৃৎ হিসাবে পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি আশার আলো জাগিয়েছে। পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিরতে ভর করে বৃদ্ধি পেয়েছে গ্রামীন অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ।
এ দেশের পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি গত দুই যুগে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কর্মের সুযোগ সৃষ্টি করেছে প্রায় কোটি মানুষের। গুটি কয় আইটেমের পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামাল সামান্য হারে দেশে উৎপাদন হলেও পোল্ট্রির জন্য দরকারি ভ্যাক্সিন, মেডিসিন ভিটামিন এবং খাদ্যের কাঁচামাল সবই আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে পন্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারনে দেশে পোল্ট্রি পন্যের উৎপাদন খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে- কিন্তু সে হারে বাড়েনি লাইভ ব্রয়লার,ডিম বা মুরগির দাম বরং গত কয়েক মাসে অনেক কমেছে, বিগত কয়েক বছরে পোল্ট্রি পন্যের ভোক্তা বৃদ্ধির হার নেগেটিভ ছিল- প্রভাবক হিসাবে কাজ করেছে নিয়মিত মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমগুলোর মন গড়া রিপোর্ট এবং নিয়ন্ত্রনহীন গুজবের বিস্তার।
গত সাত আট মাস ব্রয়লারের বিক্রিত দাম প্রতি কেজি উৎপাদনের দাম থেকে অনেক কম( মাঝে এক মাসের দাম বৃদ্ধি বাদ দিলে) ,অন্যদিকে বর্তমানে অনেক রোগ ব্যাধির চ্যালেঞ্জের কারনে প্রান্তিক খামারিদের অবস্থা বড়ই করুন।
দায় দেনায় জর্জরিত- পুঁজি খুইয়ে পথে বসছে দেশের হাজার হাজার খামারী। স্থবির হয়ে আসছে এই পেশার প্রান চাঞ্চল্য- শুধু প্রান্তিক খামারী নয় ফিড এবং বাচ্চা উৎপাদনকারী অনেক ছোট এবং মাঝারি উদ্যোতা লোকসান দিয়ে ইতিমধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। এই শিল্পে অর্থের প্রবাহ দিনে দিনে কমে আসছে- ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আর এই পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
এ দেশের প্রান্তিক খামার গড়ে উঠেছে ডিলার নির্ভর একটা সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে, কিন্তু প্রান্তিক খামারিদের লোকসানের কারনে ডিলারের বিনিয়োগকৃত টাকা মাঠ পর্যায় থেকে ফেরত আসছে না, ডিলার আবার নগদে বাকিতে বাচ্চা ফিড মেডিসিন উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে ক্রয় করেন।
ডিলার নির্ভর এই সিস্টেম এখন অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়েছে- ডিলারের কাছ থেকে টাকা নিয়মিত ফিড মিলার এবং হ্যাচারি ও মেডিসিন ভিটামিন সাপ্লাইকারীর নিকট না আসাতে ডিলার প্রান্তিক খামারির নিকট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে নয়তো বাকি দেওয়া সীমিত করে এনেছেন।
বড় বড় উৎপাদনকারীদের ব্যাংক লোন পাওয়া অনেকটাই সহজ হলেও প্রান্তিক খামারিদের ভরসা ডিলারেরাই, কিন্তু এই প্রথা এখন সংকটে- ফলে প্রান্তিক খামারী নতুন করে বাচ্চা তুলে খামার পরিচালনা করতে পারছেন না।
এমন পরিস্থিতিতে খামার সচল রেখেই বা লাভ কি?
উৎপাদিত পন্যের উপযুক্ত লাভজনক দাম না পাওয়ার কারনে দিনে দিনে দায় দেনা বাড়ছে, অনেকেই ভিটে মাটি বিক্রি করে দায় দেনা পরিশোধ করে নাকে খৎ দিয়ে এই ব্যবসায় খ্যান্ত দিচ্ছেন।
করোনার প্রভাবে শুরুতে ডিম মুরগী বিক্রি বলতে গেলে শুন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল খামারীরা বর্তমানে মুরগী কে খাওয়ানোর জন্য খাদ্য পাচ্ছেন না,ওষধ নেই হাতের কাছে, হ্যাচারি গুলো লোকসান দিয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাচ্চা বিক্রি করে যাচ্ছেন।
পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির পুঁজি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, এই খাতে টাকার প্রবাহ দিনে দিনে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, বেকার – মানুষের কাফেলা দিন দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
এমনিতে করোনার প্রভাবে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা কোন জাগায় গিয়ে দাঁড়ায় তা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন, এমন পরিস্থিতিতে যদি পোল্ট্রি শিল্পের সাথে যুক্ত প্রায় এক কোটি লোকের অর্ধেক লোক কর্ম হারায়, কি ভাবে সামলাবে দেশ।
আজ এই ফিচার টি যখন লিখছি তখন দেশে ৬ মাসের করোনার প্রভাবে ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদন ধারা বিগত ২০১৯ সালের জুলাই মাসের তুলনায় ব্রয়লার বাচ্চার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে তবুও লাইভ ব্রয়লারের দাম ১০০ টাকার নীচে অন্যদিকে তথাকথিত দেশি মুরগীর নামে সোনালী মুরগির দাম এ মুহূর্তে ২০০-২২০ টাকায় খামারী পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে। করোনা শুরুর আগে এবং বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে বর্তমানে ৪০/৫০ লক্ষ সোনালী মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে যা জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারিতে ছিল প্রায় পঁচাশি লক্ষের কাছাকাছি।
ব্রয়লার এবং সোনালী বাচ্চার উৎপাদন কমে গেলেও দেশে নতুন ভাবে কালার ব্রয়লার বা বার্ড উৎপাদনের একটা নতুন টেন্ডেন্সি শুরু হয়েছে, তথ্য মতে দেশে ইতিমধ্যে প্রায় ৩৫০০০০ কালার বার্ডের প্যারেন্ট এসেছে বিদেশ থেকে।
একদিন বয়সী বাচ্চার উৎপাদন ব্রয়লার সোনালী মিলিয়ে ১৯ সালের ডিসেম্বরের উৎপাদন বিবেচনা করলে সোনালী উৎপাদন কমেছে ৪০ লক্ষ এবং ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদন কমেছে ১ কোটিরও বেশি।
বাচ্চা উৎপাদন কে প্যারামিটার ধরলে খাদ্য উৎপাদনও কমেছে প্রায় ৫০% এর কাছাকাছি। বাচ্চা খাদ্য উৎপাদন এত কমার পরও সে ভাবে প্রান্তিক খামারীদের উৎপাদিত মুরগীর দাম উৎপাদন খরচের চেয়েও কম মূল্যে বর্তমানে বাজারে বিক্রি হচ্ছে।
বাংলাদেশে পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিতে এ মুহুর্তে বড় ছোট মাঝারি যে কোন উৎপাদনকারী ভাল নেই তাঁদের মূল সমস্যা হচ্ছে কেউ তার পন্যের লাভজনক দাম পাচ্ছেন না- যা চলছে তা হল টিকে থাকার প্রচেস্টা মাত্র।
এমন পরিস্থিতির মূল বিশ্লেষণ করতে গেলে কয়েকটি বিষয় সামনে চলে আসে-
প্রথমতঃ
বারে বারে সৃষ্টি হওয়া গুজব, যা ভোক্তাদের ডিম এবং ফার্মের মুরগীর মাংসের প্রতি বিরুপ প্রতিক্রিয়া এবং আতংক, এর প্রভাবে যে শতাংশ হারে ভোক্তা বাড়ার কথা তাতো বাড়েই নি বরং কমেছে।
দ্বিতীয়তঃ
আমাদের বাংলাদেশের পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিতে গ্রহনযোগ্য কোন ডাটাবেইজ না থাকার কারনে আমরা বাজারে প্রকৃত চাহিদার তুলনার মাঝে মাঝে বেশি উৎপাদন করি- অবধারিত ভাবে চাহিদার অধিক পন্য উৎপাদনের কারনে উৎপাদন খরচের তুলনায় ডিম মুরগী কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।
চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদনের ধকল সামলাতে কয়েক মাস থেকে বছর অধিক সময় লেগে যায়, এর প্রভাব হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদী পুরাতন প্রান্তিক খামারী হারিয়ে যায় এবং দক্ষ খামারী সৃষ্টি ব্যহত হয়।
তৃতীয়তঃ
বাংলাদেশে স্থিতিশীল পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যবস্থা আনতে হলে একটি দক্ষ যুগোপযোগী সাপ্লাই বা বিপনণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একটি দক্ষ বিপনণ ব্যবস্থাই পারে উৎপাদনকারী যে কোন পন্যের লাভজনক দাম এনে দিতে।
চতুর্থতঃ
খামারে উৎপাদিত ডিম মাংসের ভোক্তা উদ্ভুদ্ধ করনে সম্মিলিত কর্মসূচি গ্রহন এবং প্রচার প্রচারনা ব্যাপক ভাবে বাড়ানো।
উপরোক্ত উদ্যোগুলোর সাথে লাইভ স্টক এক্সটেনশন প্রতিষ্ঠান ( যেমন ডি এল এস) এবং পোল্ট্রির সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ক্রিয়াশীল সংগঠন, প্রান্তিক পর্যায়ের খামারী,বিভিন্ন লাইভ স্টক সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ভলান্টিয়ার টিম একসাথে কাজ করতে হবে। এই ধরনের ভোক্তা উদ্ভুদ্ধ করন কর্মসূচি গুলোর জন্য দাতা সংস্থা গুলোর কাছে অর্থ সাহায্যের জন্য দেনদরবার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি তে প্রান্তিক খামারীরা হল গিনিপিগ- দায়, লোকসান সব তাঁদের, বড় উৎপাদনকারী বড় ঝুঁকি নিতে পারেন, প্রান্তিক চিরকালই প্রান্ত জনা-
রোগব্যাধির ঝুঁকি,ক্রয় বিক্রয়ে প্রান্তিক খামারিদের নিজের প্রভাব খাটানোর কোন ক্ষমতা না থাকা, সকল ঝুঁকি এড়িয়ে মুরগী বা ডিম যা বিক্রি করতে যাক সেখানে আরেক মাফিয়া- তারাই বাজার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণ করে।
এভাবে নিয়ন্ত্রণহীন একটা বাজার ব্যবস্থায় পোল্ট্রির মত সংবেদনশীল উৎপাদন সিস্টেম দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থেকে লাভজনক ভাবে চলতে পারে না, ঝুঁকি থেকেই যায়, যেমন রোগবালাই, বাচ্চা খাদ্যের দাম, উৎপাদিত ডিম বা ব্রয়লারের দাম কোনটা নিয়েই পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।
এই শিল্পের ফাইনাল প্রোডাক্ট ডিম বা ব্রয়লার উৎপাদনের দিনেই বিক্রি করার নিয়ম- বর্তমানে করোনার প্রভাব পোল্ট্রি শিল্পে অন্যান্ন শিল্পের থেকে আগে আগে এবং প্রকটভাবে পড়েছে- খামারী ব্রয়লার কমদামে বিক্রি করছে, আমদানি করা পোল্ট্রি খাদ্য উপাদান পোর্ট থেকে সময় মত ছাড় করতে দীর্ঘ সূত্রিতা,এ অবস্থা চলতে থাকলে খামারী খাদ্য উচ্চ মূল্যে কিনতে হবে, ইতিমধ্যে অনেক দরকারি ফিড এডিটিভসের বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে, কোন কোনটির করোনাকালীন আমদানি ঘাটতির কারনে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
বিগত মাসগুলোতে সারা পৃথিবী লক ডাউনের কবলে পড়ার কারনে বিদেশ থেকে সহজে এবং স্বল্প সময়ে পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামালের সাপ্লাই স্বাভাবিক হবে অবস্থাদৃষ্টে তা মনে হয় না। এভাবে চলতে থাকলে সামনে এ দেশের পোল্ট্রি শিল্পের জন্য আরো বিরুপ অবস্থা আসন্ন।
করোনার এই প্রভাব কাটিয়ে ইন্ডাস্ট্রিকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনা একক কোন পক্ষের জন্য অনেক কঠিন কর্ম হবে। সরকার কে উদ্যোগ নিতে হবে সবার আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়,অধিদপ্তর এবং পোল্ট্রির ক্রিয়াশীল সকল জাতীয় ও জেলা ভিত্তিক সংগঠন গুলোকে নিয়ে করোনা পরবর্তী ঢাকায় একটি কনভেনশন এর উদ্যোগ নিতে হবে, সেই কনভেনশন এ সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে তাঁদের নিকট পোল্ট্রি শিল্পের করুন দশা তুলে ধরতে হবে।
পোল্ট্রি শিল্পের নানান স্তরে যুক্ত মানুষেরা শুধু নিজেদের টাকা কামানোর জন্য কাজ করে না, দেশের জন্য দেশের জনগনের জন্যও নিরলস কাজ করে যায় যদিও ঝুঁকিটা পুরোপুরি নিজেদের কাঁধে নিয়ে।
এই শিল্প একদিকে যেমন লক্ষ লক্ষ লোকের কর্মের সুযোগ সৃষ্টি করেছে অন্যদিকে দেশের মানুষের জন্য স্বল্প মূল্যের ডিম এবং পোল্ট্রি মাংসের উন্নত মানের প্রোটিনের নিরবিচ্ছিন্ন যোগান দিয়ে দেশে মেধাবী এবং সুস্থ সবল প্রজন্ম সৃষ্টি তে অবদান রেখে যাচ্ছে,অথচ এখন করোনার প্রভাবে নিজেরা দিনে দিনে নিঃসহ হচ্ছেন।
সরকারের কাছে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান তুলে ধরতে আমাদের পোল্ট্রি শিল্পের নেতারা বিগত বছরগুলোতে বারে বারে ব্যর্থ হয়েছেন, এখন আর নিশ্চুপ থাকলে চলবে না সামনে সংকট আরো চরম আকার ধারন করবে, যদি এবারো আমরা ব্যর্থ হই তাহলে ঘাপটি মেরে থাকা কায়েমি স্বার্থবাদী মহল সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং তাদের জন্য সামনে ডিম এবং প্রসেস ব্রয়লার আমদানি সহজ হয়ে যাবে।
বিষয় টা খোলাসা করে বলতে গেলে এভাবে পূর্বাভাস দেওয়া যায় ,পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি এখন যে ভাবে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাতে টিকে থাকতে উৎপাদন কমাতে হবে, অনেকে পুঁজি খুইয়ে ব্যবসা বন্ধ করবে, কিন্তু সব শেষ হলে এক সময় না এক সময় ঘাটতি দেখা দিবে তখন আর বিদেশ থেকে ডিম এবং মাংস আমদানি কোন ভাবে ঠেকানো যাবে না, মাংস এবং ডিমের সরবরাহ থেকে চাহিদা বেশি থাকবে, তারা সরকারকে বুঝাতে সক্ষম হবে দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য বিদেশ থেকে আমদানি ছাড়া বিকল্প নেই।
সামনের দিনে অবস্থা যাই থাকুক যতক্ষন পর্যন্ত পুঁজি নিঃশেষ না হয়ে যায় খামার চালু রাখতে হয়, না হলে ব্যাংক কিস্তি আর সুদের জন্য চেপে ধরবে, মহাজন রক্তচক্ষু নিয়ে দরজায় হামলে পড়বে, ডিলার বার বার বকেয়া টাকার জন্য তাগিদ দিবে।
কেউ সুখে নেই, হয়তো কেউ কেউ সুখের ভান করে, গত দু বছরে বাংলাদেশের পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি থেকে ক্রমাগত লোকসানের কারনে হাজার হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, বড় থেকে ছোট সবার ভান্ডার শুন্য।
তাহলে চলছে কি করে?
পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির এত বড় দক্ষযজ্ঞ কারবার, ১৬০ টা বড় আর মাঝারি ফিড মিল, এর বাইরে আছে ছোট ছোট অনেক ফিড মিল, যাঁরা একত্রে বছরে গড়ে ৩৯ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন করে, ১৪৫ টা মাঝারি বড় হ্যাচারি- এ প্রতিষ্ঠানগুলো চলে না ঠেলে ঠুলে চালাতে হচ্ছে এখন,এক জন আরেক জন কে ঠেকিয়ে – সাপ্লাইয়ার কে ঠেকায় ফিড মিল আর হ্যাচারী ওয়ালা, সাপ্লাইয়ার ঠেকায় ব্যংক কে, ডিলার ঠেকায় ফিড মিল আর হ্যাচারী ওয়ালাকে, খামারী ঠেকায় ডিলার কে আর দিন শেষে ফাইনালী খামারী ঠেকে যায় তার উৎপাদিত পন্য ডিম আর মুরগী নিয়ে আড়তদার, ফড়িয়া, দাদন ব্যবসায়ী আর ডিম মুরগি ক্রয়ের সিন্ডিকেটের কাছে।
লাভ যা হয় খামারীর পরে যারা আছে তাদের, তাদের যেমন ক্রয় তেমন বেচা, লাভ তাদের হয় ই।
এখন পোল্ট্রি শিল্পের উপর থেকে নীচে যাঁরাই আছেন- (উপর থেকে নীচে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে যাঁরা) তাঁরা কেউ লাভের মুখ দেখেন না- যাঁর চালুনি যত বড় তাঁর ছিদ্র তত বেশি, এখন যা চলে তা হল নেড়েচেড়ে কোন রকমে উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখা।
কতদিন ঠিক থাকবে টিকে থাকার এই প্রক্রিয়া?
গুজব কিন্তু আমাদের পিছু ছাড়ে না, একটু গুছিয়ে আসতে লাগলেই ঠিক ঠিক কোন আজাব এসে পড়ে ,প্লাস্টিকের ডিম, অনিরাপদ মুরগী আর এখন করোনা গুজবের প্রভাব, এখানে শেষ হলে খুশি হতাম, হবে না কিছু না কিছু এসে তক্কে তক্কে হাজির হবেই।
তাহলে উপায় কি এই সর্বগ্রাসী পতনের হাত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের পেশাকে সুরক্ষিত করার, প্রায় পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের এই শিল্পকে সুরক্ষিত করে দেশের ১৮ কোটি মানুষকে স্বল্প মূল্যের প্রোটিনের যোগান দেওয়ার?
পথ নিশ্চয় খোলা আছে- তার জন্য এগিয়ে আসতে হবে বড় উৎপাদনকারীদের, পোল্ট্রির সকল ক্রিয়াশীল সংগঠন গুলোকে, প্রান্তিক খামারিদের জন্য সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে হবে, ডিম এবং মুরগির বিপনন ব্যবস্থায় মাফিয়া সিন্ডিকেট এড়িয়ে উৎপাদনকারীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষায়, তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের সহায়তায় নানামুখী উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে, চাইলে আমরা প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং নেপালের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারি।
অনেকেই ভাবতে পারেন আমি তো নিজেই এখন লক্ষ লক্ষ ব্রয়লার আর লেয়ার পালন করি, করেন সমস্যা নাই,ব্যবসা নানা ভাবে করতেই পারেন যে কেউ। কিন্তু ডিলারের মাধ্যমে যদি বাচ্চা খাদ্য বেচতে যান তাহলে নীচের দিকের যে মানুষগুলো আছে তাদের নিয়ে আপনি ভাবতে বাধ্য।
কারন তাঁরা সুখে নাই – তাঁরা হারিয়ে গেলে আপনার বাচ্চা খাদ্য ক্রয় করার লোকও কমে যাবে, গত এক বছরে সপ্তাহে ১ কোট ৮০ লক্ষ বাচ্চা উৎপাদন থেকে কমতে কমতে বর্তমানে সপ্তাহে ১ কোটি কাছাকাছি পরিমান ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদন করেও বাচ্চা বিক্রি করার জন্য খামারী পাওয়া যাচ্ছে না, ন্যাড়া বেল তলায় একবার যায় আমাদের প্রান্তিক খামারীরা বেল তলায় বার বার গিয়ে ঘাড়ে ন্যাড়া মাথাটাও নাই- আছে ঘাড় সহ দেহ টা।
অনেকেই শিল্পের সার্বজনীন চিন্তা করছেন না- তাঁরা ভাবছেন ছোটরা সব চলে গেলে খাদ্য বাচ্চা ব্রয়লার লেয়ার সব নিজেরাই উৎপাদন করবেন- সে স্বপ্নও পূরন হবে না- লাভ দেখলে আরো বেশি পুঁজি ওয়ালারা এখানে বিনিয়োগ করবে।
প্রতিযোগিতা আরো কঠিন হবে- স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে যাবে- তার থেকে পোল্ট্রি শিপ্লের বর্তমান সিস্টেমটা আরো উন্নত করুন- মিলে মিশে সবাই লাভ করুন টিকে থাকুন।
পোল্ট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদ এবং পোল্ট্রি প্রফেশনাল’স বাংলাদেশ-পিপিবি’র তথ্যমতে করোন ভাইরাসের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবে বিগত ছয় মাসে বাংলাদেশের পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিতে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোকশান হয়েছে, এই তথ্যের বাইরে প্রকৃতি লোকসানের পরিমান আরো বেশি হবে।
দিন যত গড়াবে করোনার প্রভাব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরো নাজুক করে তুলবে, নিন্ম আয়ের মানুষদের রুজি রোজগার আগের মত নেই, মধ্যবিত্ত শ্রেনীর অবস্থাও আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে, দলে দলে মানুষ চাকুরি হারিয়ে গ্রামমূখি হচ্ছেন। বিদেশ থেকে অনেক মানুষ চাকুরি হারিয়ে দেশে ফেরত আসার অপেক্ষায় দিন গুনছে।
পোল্ট্রির বাজার কবে পুরোপুরি ঠিক হবে বলা মুশকিল।
পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির এমন পরিস্থিতিতে সরকার কে এগিয়ে আসতে হবে, আমাদের পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির সংগঠনগুলো কে আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে, পত্র পত্রিকা আর টেলিভিশন টক শো তে সীমাবদ্ধ না থেকে করোনা উত্তর পরিস্থিতিতে সারাদেশের পোল্ট্রির সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে একটি শ্বেতপত্র তৈরি করতে হবে।
সরকারের সাথে এ নিয়ে যথাযত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশের পোল্ট্রির প্রকৃত অবস্থা এবং সরকারী বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে কি ভাবে ঘুরে দাঁড়ানো যায় তার একটি প্রস্তাব তুলে ধরা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে।
পোল্ট্রি শিল্প যদি মুখ থুবড়ে পড়ে দেশ ভয়বহ প্রোটিন এবং পুষ্টি সংকটের মধ্যে পড়বে, মাছ মাংস ডিম দুধ ইত্যাদির দাম সাধারনের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।
প্রান্তিক খামারিদের পক্ষে নিজের সামর্থের মধ্যে নতুন করে বিনিয়োগ করে পোল্ট্রি পালন করা একেবারেই অসম্ভব একটা বিষয় হবে। ডিলারের কাছে থেকে বাকিতে ক্রয় করা যাবে না কারন ডিলারেরা আর বাকি দেওয়ার সামর্থ থাকবে না।
এমন এক অনাগত পরিস্থিতিতে সার্বিকভাবে ইন্ডাস্ট্রির স্টেক হোল্ডারদের মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে- দেশের পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির নতুন প্রান সঞ্চার করার জন্য।
সরকারের কাছে দাবি থাকবে সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে প্রান্তিক খামারীদের বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করতে হবে অথবা ছাড় দিতে হবে, ঘুরে দাঁড়াতে নতুন পূঁজির যোগান পেতে, প্রতি হাজার মুরগী পালন করার জন্য নগদ হিসাবে এককালীন নগদ অর্থে ভর্তুকি বা প্রনোদনা দিতে হবে, বড় বড় বাচ্চা খাদ্য উৎপাদনকারীদের যার যার ডিলারের মাধ্যমে খামারী কল্যান মুখী উদ্যোগ নিতে হবে- কারন প্রান্তিক খামারীরাই পোল্ট্রি উৎপাদন এবং বিপননের লাভ এবং অর্থের যোগান দাতা।
পোল্ট্রির সকল সংগঠন কে নিজেদের মধ্যে নানা ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে এসে ঐক্য বদ্ধ হতে হবে, সরকারের কাছে নিজেদের সমস্যা এবং সম্ভাবনার কথা পরিস্কার ভাবে তুলে ধরতে হবে।
পোল্ট্রি সেক্টর আগামী দিনে জিডিপি তে কি পরিমান অবদান রাখতে পারে, নেট কি পরিমান কর্ম সৃজন করতে পারে, পোল্ট্রি পন্য বিদেশে যে রপ্তানি করার মত বর্তমানে বাংলাদেশের পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির সক্ষমতা ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে তা সরকারের নজরে আনতে হবে। কিন্ত এই রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট প্রাপ্তি যেন সহজতর তার উদ্যোগ নিতে হবে।
সব কিছু ছাপিয়ে পোল্ট্রির বর্তমান সংকট এবং করোনার প্রভাবে আগামী দিনে যে দূর্যোগের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে তা একদিকে যেমন ইন্ডাস্ট্রির নেতাদের বুঝতে হবে- কি ধরনের কর্মসূচি নিলে ইন্ডাস্ট্রির গ্রোথের নিন্মমুখী ধারা রোধ করা যাবে এবং এই পেশায় প্রকৃত গতিশীলতা আনা যাবে।
সবশেষে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই, নিজেদের স্বার্থে প্রান্তিক খামারিদের বাঁচাতে হবে- তার জন্য এখন থেকেই কার্য্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে সকলের সম্মিলিত প্রচেস্টায়।
লেখক
সমন্বয়ক
পোল্ট্রিপ্রফেশনাল’স বাংলাদেশ (পিপিবি)

Please follow and like us:

About admin

Check Also

পোল্ট্রি পণ্যের ভোক্তা উদ্ভুদ্ধকরণে মিডিয়ার ভূমিকা

পোল্ট্রি পণ্যের ভোক্তাউদ্ভুদ্ধকরণে মিডিয়ার ভূমিকা আমাদের দেশে  গত ২-৩মাস আগে  সপ্তাহে যেখানে পোল্ট্রি বাচ্চা উৎপাদন …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Translate »
error: Content is protected !!