Breaking News
এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট
এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স: ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবমান পৃথিবী

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স: ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবমান পৃথিবী
================================================
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম আশীর্বাদ হলো অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার। এর ফলে এমন অনেক রোগের চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে, যেগুলোর কারণে একসময় মানুষ মারা পর্যন্ত যেত। কিন্তু এখন অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে মানুষ কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে, দিব্যি হেঁটে-চলে বেড়াতে পারছে। সুতরাং অ্যান্টিবায়োটিকের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তবে সম্প্রতি নতুন করে সামাজিক মাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক, এবং তা মোটেই ইতিবাচক কোনো কারণে নয়। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট একপ্রকার ব্যাকটেরিয়ার কথা শোনা যাচ্ছে, যা নাকি অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর বুক থেকে প্রাণের অস্তিত্ব বিলীন করে দিতে পারে। তাই আর দেরি না করে, চলুন এ বিষয়ে প্রাথমিক ধারণাটুকু নিয়ে আসি।
ব্যাকটেরিয়া কী?
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের জেনে নেয়া দরকার, ব্যাকটেরিয়া কী। এটি মূলত সংগঠিত নিউক্লিয়াসবিহীন এককোষী, আণুবীক্ষণিক একদল অণুজীব। এর প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ১৫,০০০। সব ব্যাকটেরিয়াই খারাপ নয়। বরং অনেক ব্যাকটেরিয়াই, এমনকি আমাদের অন্ত্রে বাস করা বেশিরভাগই, অত্যন্ত উপকারী। তবে ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতিকর দিকই সচরাচর আমাদের নজরে বেশি পড়ে।

অ্ন্টিবায়োটিক কী?
অ্যান্টিবায়োটিকের অপর নাম অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল ড্রাগ। এগুলো হলো এমন একধরনের ওষুধ যা মানুষ এবং পশু উভয়ের শরীরেই ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এক্ষেত্রে তারা হয় ব্যাকটেরিয়াদের মেরে ফেলে, নয়তো ব্যাকটেরিয়ার দৈহিক বৃদ্ধি ও বংশবিস্তার রোধ করে। তবে অ্যান্টিবায়োটিক কেবল নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়াঘটিত ইনফেকশনই প্রতিরোধ করে। ভাইরাসের উপর এরা কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কী?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হলো এমন একটি অবস্থা যা সংগঠিত হয়, যখন কতিপয় ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে। এসব ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। এরা অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে অভিযোজিত হয়ে যায় বলে, নিজেদের স্বাভাবিক গতিতে বেড়ে উঠতে ও বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে মানুষ বা পশুর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। আগে যে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে তাদের রোগ সেরে যেত, এখন আর সেই অ্যান্টিবায়োটিকে তা সারে না, বরং ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এবং এসব রোগাক্রান্ত মানুষ বা পশু অন্য কারো উপস্থিতিতে হাঁচি-কাশি প্রভৃতির মাধ্যমে তাদের শরীরের আভ্যন্তরীণ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দেয়, এবং তারাও একই রকম দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কেন ঘটে?
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ঘটে ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ-তে পরিবর্তন বা পরিব্যক্তির ফলে। এছাড়া জিন অপসারণের মাধ্যমেও এক প্রজাতির অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার জিন থেকে অন্য প্রজাতির সাধারণ ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স লাভ করতে পারে। এর ফলে ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে এমন সব পরিবর্তন আসে যে, ওই ব্যাকটেরিয়ার জন্য বিদ্যমান অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হলেও, সেটি কোনো ক্ষতি ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারে। বিষয়টি অনেকটা এমন যে, দশটি ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে আটটি হয়তো সাধারণ, কিন্তু দুটি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট। এখন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হলে, সাধারণ আটটি ব্যাকটেরিয়া মরে যাবে, কিন্তু বাকি দুটি ব্যাকটেরিয়া টিকে থাকবে, এবং তারা শারীরিক বৃদ্ধি ও বংশবিস্তারের মাধ্যমে অসুস্থ ব্যক্তির রোগকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে থাকবে।
একটি-দুটি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ায় পরবর্তীতে বংশবিস্তারের মাধ্যমে বৃহদাকার ধারণ করতে পারে;

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কেন বাড়ছে?
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স একটি বিশাল বড় চিন্তার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কেননা সময়ের সাথে সাথে ব্যাকটেরিয়াদের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা লাভের প্রবণতা কমছে না, বরং হু হু করে বেড়ে চলেছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো সাম্প্রতিক সময়ে অত্যধিক মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার। সামান্য কোনো অসুখ হলেই মানুষ অ্যান্টিবায়োটিকের দিকে ঝুঁকছে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ব্যতিক্রমী দুই-এক ক্ষেত্রে রোগীর দেহে এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া থেকে যাচ্ছে যাদের উপর অ্যান্টিবায়োটিক কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। এদিকে তারা অ্যান্টিবায়োটিকের সান্নিধ্যে আসার মাধ্যমে, অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল শিখে ফেলছে, এবং পরবর্তীতে তাদের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন ব্যাকটেরিয়ার মধ্যেও একই গুণাগুণ দেখা দিচ্ছে। এভাবে তারা নিজ হোস্টের (যার শরীরে বাসা বেঁধেছে) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তো কমিয়ে দিচ্ছেই, পাশাপাশি সেই হোস্ট অন্যদের কাছে গেলে, অন্যদের শরীরেও তারা ঢুকে পড়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। এভাবে একজনের শরীরে এক প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা লাভ করলে, পরবর্তীতে সেটি অন্য আরো অনেকের শরীরেও সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

কীভাবে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স দূর করা যায়?
যেমনটি আমরা আগেই জেনেছি, কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের পরও সব ব্যাকটেরিয়া মারা যাচ্ছে না বা নিষ্ক্রিয় হচ্ছে না, এবং তারাই পরবর্তীতে নতুন আরো অনেক অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার জন্ম দিচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো, অনেক রোগীই অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের পুরো কোর্স সম্পন্ন করে না। একজন রোগীকে হয়তো সাতদিনের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে দুদিন ওষুধ খেয়েই সুস্থ অনুভব করায় আর ওষুধ খাওয়া প্রয়োজন মনে করল না। এক্ষেত্রে যা হতে পারে তা হলো: ওই ব্যক্তির শরীরের অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়াই মারা গেছে, কিন্তু সামান্য কিছু ব্যাকটেরিয়া টিকে আছে। ওষুধের পুরো কোর্স সম্পন্ন করা হলে তারাও হয়তো মারা যেত। কিন্তু যেহেতু পুরো কোর্স সম্পন্ন করা হয়নি, তাই তারা বহাল তবিয়তে আছে, এবং অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে অভিযোজনের কৌশল রপ্ত করে ফেলেছে। তাই ভবিষ্যতে তারা আবারো বংশবিস্তারের মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে রোগাক্রান্ত করে তুলবে। কিন্তু এবার আর আগের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহারের পরও ওই ব্যক্তির রোগমুক্তি ঘটবে না। এজন্য একজন ব্যক্তিকে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মনে হলেও, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে নির্ধারিত কোর্স অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে।
এছাড়াও আরো যেসব ব্যাপার মেনে চলতে হবে:
কেবলমাত্র সার্টিফাইড চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হবে;
চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীকে জোর করা যাবে না অ্যান্টিবায়োটিক দিতে;
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর বলে দেয়া সকল নিয়মকানুন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে;
অন্যের বেঁচে যাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না, কিংবা নিজের অ্যান্টিবায়োটিক অন্যকে দেয়া যাবে না;
সংক্রমণ রোধে নিয়মিত হাত ধুতে হবে, স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করতে হবে, যেখানে-সেখানে কফ-থুতু ফেলা যাবে না, পরিষ্কার রুমাল বা টিস্যুতে নাক-মুখ চেপে হাঁচি দিতে হবে, রোগাক্রান্ত ব্যক্তির সংসর্গ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে, নিরাপদ শারীরিক মিলন করতে হবে, ভ্যাক্সিনেশন হালনাগাদ করতে হবে;
এছাড়াও দেশের ফার্মেসিগুলোকে মনিটরিংয়ের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি, যাতে কেউ বিনা প্রেসক্রিপশনে ক্রেতার কাছে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি না করে।
অতি সামান্য রোগেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা দূর করতে হবে।
শেষ কথা
মানুষ ও পশুর দ্রুত রোগমুক্তি ও গড় আয়ু বৃদ্ধিতে অ্যান্টিবায়োটিকের অবদানের শেষ নেই। কিন্তু কথায় আছে না, লেবু বেশি কচলালে তেতো হয়ে যায়, অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রেও ঠিক যেন তেমনটাই হচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অপেক্ষাকৃত দ্রুত রোগমুক্তি ঘটে বটে, কিন্তু তাই বলে এর যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদেরকে খুবই ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। সামান্য একটু অসুস্থ হলেই আজকাল আমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠি, চিকিৎসককে বলে অ্যান্টিবায়োটিক নিই। অনেকে তো আবার চিকিৎসকের তোয়াক্কা না করে নিজেরাই ফার্মেসিতে গিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে আনি। এর মাধ্যমে আমরা নিজেদের শরীরটাকে এমন বানিয়ে ফেলছি যে, অন্যান্য সমস্যা তো আছেই, এমনকি আমাদের শরীর অতি সাধারণ কোনো ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেও একা একা লড়াইয়ের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এভাবে নিজেদের অজান্তেই আমরা অ্যান্টিবায়োটিক-পরবর্তী যুগের দিকে এগিয়ে চলেছি, যখন অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না, ফলে নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস, স্ট্রেপ থ্রোট, টিউবারকুলোসিস, লাইম ডিজিজ, কানে পচন কিংবা দেহত্বকে ঘায়ের মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে আবারো মানুষ প্রাণ হারাতে শুরু করবে। অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রাতিরিক্ত ও যথেচ্ছ ব্যবহারে যদি লাগাম না টানি, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বড় কঠিন সময়ের মোকাবেলা করতে হবে।
-collected

আপনি চেয়ে চেয়ে দেখলেন- পৃথিবী থেকে ১ কোটি মানুষ হুট করে উধাও হয়ে গেল। আপনি চেষ্টা করেছেন কিন্তু এই ১ কোটি মানুষকে কোনোভাবেই বাঁচাতে পারলেন না।
এরা সবাই মারা গেল এমন কিছুর সংক্রমণে যে জিনিসগুলো আমরা চোখেই দেখতে পাই না।

প্রথম পোস্টের লেজের অংশ থেকেই আজকের টপিক।
কে সে?
#তার নাম- ব্যাকটেরিয়া।
এরা নিরীহ কোন ব্যাকটেরিয়া নয়। এদের আমরা ভয় পাই। ভয় পাই বলেই এদের নাম দিয়েছি- সুপারবাগ।
সুপারবাগ ব্যাপারটা ভবিষ্যতবানী নয়। বাংলাদেশের চিকিৎসার মহীরুহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (পিজি হাসপাতাল) আইসিইউতে ২৫% রোগী মারা যায় সুপারবাগে আক্রান্ত হয়ে।

#সুপারবাগ কী জিনিস?
এরা হল ব্যাকটেরিয়া। আমাদের শরীরেই থাকে। আমাদের ভালো করে,মন্দ করে। আমাদের ভুলে এরাই হয়ে যায় সুপারবাগ।

আমরা অসুখ হলে ঔষুধ খাই। ঔষুধ না খাবার মত অবস্থাতেও ঔষুধ খাই। যদি অ্যান্টিবায়োটিক সঠিক ডোজে না খাই, ডোজের চেয়ে কম খাই, তবে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শিখে ফেলে কীভাবে ঔষুধটি দ্বিতীয়বার আসলে তাকে প্রতিহত করতে হয়। মানুষ নিজের শরীরকে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারলেও এই আণুবীক্ষণিক ব্যাকটেরিয়াগুলো জানে কীভাবে টিকে থাকতে হয়। কীভাবে পরবর্তী আক্রমণ প্রতিহত করতে হয়।
এরা চুপচাপ নিজের জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল নিজের মত করে বদলে ফেলে। ফলে পরেরবার আরো বেশি ডোজেও ঔষুধ খেলেও তাদের মারা যায় না। হয়ে যায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী।

ব্যাপারটা এমন নয় যে একটামাত্র বা একদল ব্যাকটেরিয়া শিখে ফেলল কীভাবে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে হয়। বরং তারা অন্যদেরও শিখিয়ে দেয়। কিংবা পাশের ব্যাকটেরিয়ার কাছ থেকেও শিখে নেয়। ফলে চেইন রিয়েকশনের মত বাকী ব্যাকটেরিয়াগুলোও হয়ে যায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী। এভাবেই তারা একটা সময় হয়ে যায় সব ধরণের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী। তখন এরা হয়ে যায় ভয়ংকর। পৃথিবীর বাঘাবাঘা বিজ্ঞানী আর বটবৃক্ষের মত গবেষণা সংস্থাগুলো এই ভয়ংকর ব্যাকটেরিয়ার নাম দিয়েছে- সুপারবাগ।

সুপারবাগ আপনার শরীরে আসলে কী হবে?
সামান্য কাঁটাছেড়া হলে, সামান্য জ্বর হলে, অতি সামান্য ঘা হলেও আপনি মারা যাবেন। কারণ আপনি কোন অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েও সামান্য ব্যাকটেরিয়াগুলো মারতে পারবেন না।

#আপনি কী জানেন, বাংলাদেশে অলরেডি সুপারবাগ পাওয়া যাচ্ছে?
পিজি হাসপাতালের কথা তো বললাম। কিছুদিন আগে কলিস্টিন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে রাজধানীতেই। আপনি সেই ব্যাকটেরিয়ার নাম শুনলে ভড়কে যেতে পারেন। তার নাম- ইশরেশিয়া কোলাই (E. coli)।
আরেকটু ভড়কে দিই। এই ব্যাকটেরিয়া কী মাটিতে থাকে?
না। এই ব্যাকটেরিয়াটি হল মানুষের প্রাচীনতম বন্ধু। থাকে আমাদের পেটের ভেতর (কোলন)। তার কাজ হল- ভিটামিন- বি তৈরি করা।
ভাবা যায়, প্রাচীনতম এই বন্ধু ব্যাকটেরিয়াটি আজ আমাদের সবচাইতে বড় শত্রু?

আরেকটু ভড়কে দিই।
আপনি সাবান-অ্যান্টিসেপটিক-মাস্ক দিয়ে ব্যাকটেরিয়া থেকে দূরে থাকবেন?
পারবেন না। আপনার শরীরে যে জামাটা পরে আছেন, সেটা খুলে ফেললে আরেকটা অদৃশ্য জামা আছে আপনার শরীরের পুরোটা চামড়া জুড়ে। এই জামাটি হল বিলিয়ন বিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া দিয়ে তৈরি। এরা ভালো ব্যাকটেরিয়া। আমাদের শরীরকে অন্য ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করার জন্য ‘ভালো ব্যাকটেরিয়া’দের প্রলেপ। যদি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়-এরা কিন্তু আর ভালো থাকবে না। এরাও হয়ে যাবে প্রতিরোধী।
শুধু ত্বকে কেন?
নাকে, মুখে, মুত্রনালী, জনননালী সবটা জুড়েই আছে ভালো ভালো ব্যাকটেরিয়ার দল। অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে এরাও মারা যায়। এরাও রাগে-ক্ষোভে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে যায়।

#বাঁচার পথ আছে?

নেই।
সুপারবাগে সংক্রামিত হলে অবধারিত মৃত্যু। যুক্ত্রাষ্ট্রের মত দেশে বছরে ২৩ হাজার মানুষ মারা যায় অতি ক্ষমতাধর সুপারবাগে। বাংলাদেশে কতজন মারা যাচ্ছে?
ডাটা নেই।

আমাদের সবচেয়ে বড় আফসোস হল, আমরা জানিই না কোন ঔষুদ্গুলো অ্যান্টিবায়োটিক। কোনগুলো নয়। তাহলে সুপারবাগ ঠেকাতে যুদ্ধ করব কীভাবে? হাওয়ায় তরবারি চালিয়ে বাতাস কাঁটা যায়। পারমানবিক বোমায় পুরো মানবজাতিকে ধ্বংস করে ফেলা যায়। ব্যাকটেরিয়া মারবেন কীভাবে?

গত পোস্ট লেখার পর সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন পেয়েছি খুব সাধারণ একটা টপিক নিয়ে। ঘুমের ওষূধ (সিডাটিভ) নাপা, এইসপ্লাসও কী অ্যান্টিবায়োটিক?

এটা আমাদের দুর্ভাগ্য।
এরা অ্যান্টিবায়োটিক নয়। সামান্য পেট খারাপ হলেই যে ফিলমেট/ফ্লাজিল খাচ্ছি মুড়ির মত, সেটা কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক। সামান্য জ্বর হলেই যে জিম্যাক্স খাচ্ছি সেটাও অ্যান্টিবায়োটিক। উচ্চারণ করতে ভালো লাগে যে সিপ্রো, সেটাও অ্যান্টিবায়োটিক। ছোট্ট বাচ্চাটার একটু জ্বর হলেই যে সেফ-থ্রি সিরাপ নিয়ে যাচ্ছি, সেটা কিন্তু থার্ড জেনারেশন সেফালোস্পরিন। খুবই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক।

অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে কী হোমিওপ্যাথিক খাবেন?
স্টেরয়েড হল আরেক যম। খাবেন, সর্বোরোগের মহাঔষুধ হিশেবে কাজও করবে। কিন্তু শরীরের ভেতরে তৈরি করবে বিশাল বিশাল রোগের আখড়া। রেজিস্টার্ড ডাক্তাররা জানেন- শেষ মুহুর্তে আর কোন ঔষুধে কাজ না হলেই আমরা শুধু স্টেরয়েড ব্যবহার করি। কারণ মানুষটাকে বাঁচানোটা জরুরি। নতুন রোগ তৈরি হবে কি না সেটা তখন মূখ্য থাকে না।

আইসিডিডিআরবি থেকে ২০১৭ সালে একটা বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। চমকে যাবার মত প্রতিবেদন। সেখানে দেখানো হল- ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতিসমূহের মধ্যে ৯.৫% সেফিক্সিম, ১৪.৩% অ্যাজিথ্রোমাইসিন, ৯০% এর বেশি সিপ্রোফ্লক্সাসিন এবং ডক্সিসাইক্লিন, ১০০% মেট্রোনিডাজল অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি রেসিস্ট্যান্ট।
শেষের নামটা দেখেছেন?
মেট্রোনিডাজল। পেটে হালকা ব্যাথা হলেই, বাথরুমে সামান্য গন্ডগোল হলেই আমরা খাই মুড়ির মত। সেটাও এখন ১০০% রেজিস্ট্যান্ট।
ভয়ের জায়গাটা কোথায় দেখেছেন?
ভয়টা আমাদের চয়েসে।
এজন্য ডাক্তার কিংবা ফার্মেসীর লোক দায়ী নয়।

আমার গত পোস্টে একটা ছবি দিয়েছিলাম। সেখানে যে জীবানুটি ছিল তার নাম- ক্লেবশিয়েলা। যেটা সব ধরণের অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি রেজিস্ট্যান্সি শিখে ফেলেছে। হ্যা, সেটাই হল সুপারবাগ।
বাংলাদেশে এসেছে সুপারবাগ।

#সরকার কীভাবে ঠেকাবে?
সেটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতে পারে। আপনি কীভাবে আপনার মৃত্যুর শেষ সিড়িটায় এসেও আশার বাতি জ্বালাবেন?
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটা পদ্ধতি বলি, যেটা আজ থেকে ধর্মের বানীর মত ফলো করবেন।
#১। যখনই আপনার ব্যক্তিগত ডাক্তারের কাছে প্রেসক্রিপশন করে নিবেন, তাকে জিজ্ঞাসা করুন, অ্যান্টিবায়োটিক কোনগুলো। দাগ দিয়ে নিবেন।
২। আপনি সচারচর যে ঔষুধগুলো খাচ্ছেন, সেগুলোর নাম লিখে একজন ডাক্তারের শরাণাপন্ন হয়ে দাগিয়ে নিন, কোনগুলো অ্যান্টিবায়োটিক।
৩। যেকোন ঔষুধ শুরু করার আগে ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করুন। যদি কখনো রোগ ভালো হয়ে যায় কিংবা ঔষুধের সাইড ইফেক্টে খারাপ লাগে, বন্ধ করার আগে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে জিজ্ঞাসা করুন- এখন আপনার করনীয় কী!
৪। ফার্মেসী থেকে ঔষুধ নিলে অবশ্যই পুরো প্রেসক্রিপশনের ঔষুধ একবারেই নিন। ভুলেও, টাকার অভাব থাকলেও ভেঙ্গে ভেঙ্গে ঔষুধ নিবেন না। তাতে রোগ ভালো হবার আগেই যদি ভালো মনে হয়, আপনি হয়তো ডোজটি কমপ্লিট করার জন্য আরেকবার বাকী ঔষুধগুলো নাও কিনতে পারেন।
৫। আপনার বাবা-মা ভাই বোনের প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে আলাদা করুন, কোনগুলো অ্যান্টিবায়োটিক। তার সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে হলেও তাকে অ্যান্টিবায়োটিক এর ব্যাপারে সতর্ক করুন।
৬। অসুখ হলেই ঔষদ খেতে হবে এমন ধারণা পরিহার করুন। বরং অসুখ হলেই দৌড় দিন ডাক্তারের কাছে।
৭। ডাক্তাররা শুধু টেস্ট দেয়, এমন ধারণা অধিকাংশ সময়ই ভালো কিছু বয়ে আনে না। বরং তাকে সুযোগ দিন টেস্ট করে সঠিক রোগটি সনাক্ত করে তার মতো করে ঔষুধ লিখতে।
৮। ডাক্তাররা টেস্ট দেয়, সময় দেয় না, দীর্ঘ সিরিয়াল, কসাই ডায়াগনোস্টিক সেন্টার এমন ধারণা থাকলে, প্রতিটি সরকারী মেডিকেল কলেজে চলে যান। সেখানে এমডি-এমএস, এফসিপিএস করা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মাত্র ২০ টাকার একটা টোকেন দেখেই বিশ্বমানের চিকিৎসা দেন। যে জায়গাটায় তারা তারা বসেন তার নাম- বহির্বিভাগ (আউটডোর)। এটা খোলা থাকে শুক্রবার বাদে প্রত্যেকদিন সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত। এই তথ্যটা আপনি মাথায় সেট করে নিন। দেয়ালে লিখে রাখুন। আপনার পরিবারের সবাইকে জানিয়ে দিন।
৯। মোবাইল ফোনে, ফেসবুকে আগামী মিনিট থেকে কোন ডাক্তারকে নক করে চিকিৎসা চাইবেন না। না দেখে চিকিৎসা নেওয়া অপরাধ পর্যায়ের। এতে আপনি ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। ভুল চিকিৎসা কিংবা ভুল ডায়াগনোসিস হলে সবটা বর্তাবে আপনার শরীরের উপর। ডাক্তারের কিছুই হবে না।
১০। আপনি যদি ফার্মেসীর কর্মচারী কিংবা মালিক হয়ে থাকেন, কমন রোগগুলোর অ্যান্টিবায়োটিকের পূর্ণ ডোজ সম্পর্কে জানতে একজন ডাক্তারের সহায়তা নিন। বেঁচে থাকলে অনেক টাকা উপার্জন করতে পারবেন কিন্তু অসম্পুর্ণ ডোজ কিংবা ভুলভাল অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করে একজন যদি রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া তৈরি করে, এর ভুক্তভোগী আপনার পরিবারের মানুষগুলোও হবে। কথাটা খোঁদাই করে নিন আপনার মস্তিষ্কে।
১১। অসুখ কেমন? এই প্রশ্নটার পাশাপাশি আপনার নিকটাত্মীয়, বাবা মাকে জিজ্ঞাসা করুন- ঔষদের ডোজগুলো শেষ করেছে কী না!
১২। জ্বর হলেই ঔষুধ নিতে যাবেন না। আজ থেকে জেনে রাখুন- জ্বর মানে আপনার শরীর চেষ্টা করছে শরীরে আক্রমণ করা ব্যাকটেরিয়াগুলোকে মেরে ফেলতে। ব্যাকটেরিয়াগুলো যেন স্বাভাবিক বংশবিস্তার না করতে পারে এজন্য আপনার মস্তিষ্ক নিজ দায়িত্বে আপনার শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা বরং ভালো।
একটু সময় নিয়ে, ধীরে সুস্থে যান ডাক্তারের কাছে। উনি যদি ভেবে থাকেন, ঔষুধের দরকার, তাহলে অবশ্যই ফরজে আইন মনে করে সেটাকে ফলো করুন।
১৩। আপনি যদি ডাক্তার হয়ে থাকেন, চেষ্টা করুন আপনার প্রেসক্রিপশনের লেখাটা যেন হয় চমৎকার। কয়দিন, কয়বেলা খাবে সেটা যেন সাধারণ রোগী দেখেই ধরে ফেলে। যেন ফার্মসীর দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করতে না হয় প্রেসিক্রিপশনে আপনি কী লিখেছেন।
১৪। ফরেন কান্ট্রির মত চেষ্টা করুন সময় নিয়ে স্পেসিফিক অ্যান্টিবায়োটিক সাজেস্ট করতে। রোগীকে বোঝান- কালচার সেন্সিটিভিটি টেস্ট তার ভালোর জন্যই করছেন।

এক সময় মানুষ দলেদলে মারা যেত ব্যাকটেরিয়ার কারণে। কলেরা, প্লেগ ইত্যাদিতে। তখন আবিষ্কার হল- পেনিসিলিন। মিরাকল ড্রাগ নাম নিয়েই বাঁচিয়ে দিল বিশ্বযুদ্ধের লাখ লাখ সৈন্যের জীবন। তবুও আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং আবিষ্কারের সাথে সাথেই জানিয়ে দিলেন- সাবধান।
মাত্র ১০ বছরের মধ্যেই দেখা গেল- ব্যাকটেরিয়ারা শিখে ফেলেছে কীভাবে পেনিসিলিনকে প্রতিরোধ করতে হয়। ফলে যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেল পৃথিবী।
যে কুড়াল কাঠ কাঠে, সে কুড়াল হাত-পা’ও কাটে।
এরপর?
কয়েক বছরের মধ্যেই আবিষ্কৃত হল কয়েক শত অ্যান্টিবায়োটিক। মানুষ বাঁচল। আবার মানুষ চিকিৎসা পেয়েও মারাও গেল। অথচ আমাদের হাতে ছিল শত শত অ্যান্টিবায়োটিক। আমরা শুধু দেখলাম।
দেখাদেখির খেলাটা এখনো চলছে।
নিরীহরা নিরীহ নেই। হয়ে যাচ্ছে সুপারবাগ।
আপনার আমার আশেপাশে বসে আছে- উড়ে বেড়াচ্ছে।

সাবধান!

#43nd_article
#153_days_left
#200_days_challenge
#Large_Number_Bad

লেখক- রাজিব হেসাইন সরকার

Please follow and like us:

About admin

Check Also

এন্টিবায়োটিক এর জেনেরিক নাম এবং বডিওয়েট অনুযায়ী ডোজ

এন্টিবায়োটিক এর জেনেরিক নাম এবং বডিওয়েট অনুযায়ী ডোজ ক্রমিক নং এন্টিবায়োটিকস ডোজ (mg / Kg …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Translate »
error: Content is protected !!