হাজল পদ্ধতিতে দেশি মুরগি পালন: বাচ্চা উৎপাদন বাড়ানোর একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৌশল
দেশি মুরগি গ্রামীণ পরিবারের আয় ও পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি মা মুরগি ডিমে তা দেওয়া, বাচ্চা লালন-পালন এবং পুনরায় ডিম দেওয়ার মধ্যে দীর্ঘ বিরতি নেয়। ফলে বছরে বাচ্চা উৎপাদনের সংখ্যা কম হয়।
এই সমস্যা কমানোর জন্য গ্রামীণ পর্যায়ে “হাজল” পদ্ধতি একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে মা মুরগির শারীরিক অবস্থা ভালো থাকে, পুনরায় দ্রুত ডিমে আসে এবং বছরে বাচ্চা উৎপাদনের সংখ্যা বাড়তে পারে।
হাজল কী?
হাজল হলো কাদা ও খড় দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ ধরনের তা দেওয়ার বাসা, যেখানে মা মুরগির জন্য একই সঙ্গে খাবার ও পানির ব্যবস্থা থাকে। ফলে ডিমে তা দেওয়ার সময় খাদ্যের জন্য বারবার বাসা ছেড়ে বাইরে যেতে হয় না।
হাজল তৈরির নিয়ম
কাদা ও খড় ভালোভাবে মিশিয়ে হাজল তৈরি করতে হবে।
প্রস্তাবিত মাপ
- উপরের মুখ: ১৬ ইঞ্চি
- নিচের মুখ: ১০ ইঞ্চি
- উচ্চতা: ৯ ইঞ্চি
হাজলের উপরে দুটি ছোট পাত্র রাখতে হবে—
- একটি খাবারের জন্য
- একটি পরিষ্কার পানির জন্য
ডিম নির্বাচন
ভালো ফল পাওয়ার জন্য—
- সমান আকারের ডিম নির্বাচন করতে হবে।
- ৫–৭ দিনের বেশি পুরোনো ডিম ব্যবহার করা উচিত নয়।
- পরিষ্কার ও ফাটলবিহীন ডিম নির্বাচন করতে হবে।
হাজলের ভিতর প্রস্তুত করার নিয়ম
হাজলের নিচে—
- প্রায় ৩ ইঞ্চি ছাই দিতে হবে।
- ছাইয়ের মধ্যে সামান্য ন্যাফথালিন (প্রায় ১/৪ টুকরা) ব্যবহার করা যেতে পারে যাতে পোকামাকড়ের উপদ্রব কমে।
সতর্কতা: ন্যাফথালিন সরাসরি ডিম বা মুরগির সংস্পর্শে আসবে না। বর্তমানে অনেক বিশেষজ্ঞ ন্যাফথালিনের পরিবর্তে নিরাপদ ও অনুমোদিত কীটনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
এরপর নরম শুকনো খড় বিছিয়ে দিতে হবে।
কতটি ডিম দেওয়া উচিত?
সাধারণ নিয়ম হিসেবে—
মা মুরগির ওজনের প্রায় অর্ধেক ওজনের সমপরিমাণ ডিম দেওয়া যায়।
উদাহরণ:
- মুরগির ওজন ১ কেজি হলে প্রায় ৫০০ গ্রাম ওজনের ডিম (সাধারণত ১০–১২টি দেশি ডিম) দেওয়া যেতে পারে।
কেন হাজল পদ্ধতি কার্যকর?
প্রচলিত পদ্ধতিতে মা মুরগি খাবার ও পানির জন্য প্রতিদিন ১০–১৫ মিনিট বা তারও বেশি সময় বাসা ছেড়ে বাইরে যায়। এতে—
- ডিম ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে।
- তা দেওয়ার ধারাবাহিকতা কমে।
- ডিম ফোটার হার কমতে পারে।
- মা মুরগির ওজনও কমে যায়।
হাজল পদ্ধতিতে খাবার ও পানি হাতের কাছেই থাকায়—
- মা মুরগি কম সময়ের জন্য বাসা ছাড়ে।
- ডিমে নিয়মিত তা দিতে পারে।
- শরীরের ওজন ভালো থাকে।
- ডিম ফোটার হার উন্নত হতে পারে।
তা দেওয়ার সময়কাল
সাধারণত ডিমে তা দেওয়ার সময়কাল প্রায় ২১ দিন। কিছু ক্ষেত্রে ২০–২১ দিনের মধ্যে বাচ্চা ফুটতে শুরু করে।
বাচ্চা আলাদা করার নিয়ম
শীতকালে
বাচ্চা ফুটার ১০–১৫ দিন পর আলাদা করা যেতে পারে।
গরমকালে
বাচ্চা ফুটার ৭–১০ দিন পর আলাদা করা যেতে পারে।
বাচ্চা আলাদা করার সময় করণীয়
- মা মুরগিকে যথেষ্ট দূরে রাখতে হবে যাতে বাচ্চা তার ডাক না শুনতে পায়।
- বাচ্চাগুলোকে পরিষ্কার ও নিরাপদ ব্রুডিং ব্যবস্থায় রাখতে হবে।
- বাঁশের ঝুড়ি বা ব্রুডার ব্যবহার করা যেতে পারে।
- পর্যাপ্ত তাপ, আলো, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বাচ্চার খাবার
প্রথম দিকে উন্নত মানের চিক স্টার্টার (Broiler/Chick Starter Feed) খাওয়ানো সবচেয়ে ভালো।
প্রয়োজনে স্থানীয়ভাবে আটা, চালের গুঁড়া ও অন্যান্য উপাদান দিয়ে খাবার তৈরি করা গেলেও সুষম বাণিজ্যিক স্টার্টার ফিড ব্যবহার করলে বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার হার সাধারণত ভালো হয়।
মা মুরগি কতদিনে আবার ডিম দেয়?
বাচ্চা দ্রুত আলাদা করলে অনেক ক্ষেত্রে মা মুরগি ১৫–৩০ দিনের মধ্যে পুনরায় ডিম দেওয়া শুরু করতে পারে।
অন্যদিকে প্রচলিত পদ্ধতিতে বাচ্চা দীর্ঘদিন সঙ্গে থাকলে পুনরায় ডিম দিতে ৮০–৮৫ দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
টিকা
বাচ্চা ফুটার ৩–৫ দিনের মধ্যে স্থানীয় ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী BCRDV (Baby Chick Ranikhet Disease Vaccine) বা প্রযোজ্য নিউক্যাসল রোগের টিকা প্রদান করা উচিত।
হাজল পদ্ধতির সম্ভাব্য সুবিধা
- মা মুরগির শরীর ভালো থাকে।
- ডিমে তা দেওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
- ডিম ফোটার হার বাড়তে পারে।
- পুনরায় দ্রুত ডিমে আসতে পারে।
- বছরে ডিম ও বাচ্চা উৎপাদনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- পারিবারিক দেশি মুরগি পালনকে আরও লাভজনক করা সম্ভব।
উপসংহার
হাজল পদ্ধতি মূলত একটি উন্নত ব্যবস্থাপনা কৌশল। সঠিক ডিম নির্বাচন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সুষম খাদ্য, নিয়মিত টিকাদান এবং বাচ্চা সময়মতো আলাদা করার মাধ্যমে দেশি মুরগির উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব। তবে ফলাফল নির্ভর করবে জাত, পুষ্টি, স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত অবস্থার ওপর।
AQ
১। হাজল পদ্ধতি কী?
হাজল পদ্ধতি হলো দেশি মুরগির ডিমে তা দেওয়ার জন্য কাদা ও খড় দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ বাসা, যেখানে খাবার ও পানির ব্যবস্থা থাকে। এতে মা মুরগি কম সময় বাসা ছাড়ে এবং ডিমে নিয়মিত তা দিতে পারে।
২। হাজলের আদর্শ মাপ কত?
সাধারণভাবে উপরের মুখ ১৬ ইঞ্চি, নিচের মুখ ১০ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ৯ ইঞ্চি রাখা হয়।
৩। হাজলে কত দিনের ডিম ব্যবহার করা উচিত?
সর্বোত্তম ফলাফলের জন্য ৫–৭ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা পরিষ্কার ও সমান আকারের ডিম ব্যবহার করা উচিত।
৪। একটি মা মুরগির নিচে কতটি ডিম দেওয়া যায়?
মা মুরগির ওজন অনুযায়ী ডিম দিতে হয়। সাধারণত ১ কেজি ওজনের দেশি মুরগির নিচে ১০–১২টি ডিম দেওয়া যায়।
৫। হাজল পদ্ধতির প্রধান সুবিধা কী?
- ডিমে নিয়মিত তা দেওয়া যায়।
- মা মুরগির ওজন কমে না।
- ডিম ফোটার হার উন্নত হতে পারে।
- মা মুরগি তুলনামূলক দ্রুত পুনরায় ডিম দেওয়া শুরু করতে পারে।
৬। বাচ্চা কতদিন পর মা থেকে আলাদা করা উচিত?
গরমকালে সাধারণত ৭–১০ দিন এবং শীতকালে ১০–১৫ দিন পর আলাদা করা যেতে পারে। তবে আবহাওয়া ও বাচ্চার অবস্থার ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
৭। বাচ্চা ফুটার পর প্রথম কোন টিকা দিতে হয়?
স্থানীয় ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী ৩–৫ দিনের মধ্যে BCRDV বা নিউক্যাসল রোগের উপযোগী টিকা দেওয়া উচিত।
৮। হাজল পদ্ধতিতে কি বছরে বেশি ডিম পাওয়া যায়?
সঠিক ব্যবস্থাপনা, সুষম খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং সময়মতো বাচ্চা আলাদা করলে মা মুরগি দ্রুত পুনরায় ডিমে আসতে পারে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় বছরে বেশি উৎপাদন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।




