কি কি কারণে ডিমের রং, খোসা ও আকার পরিবর্তন হয়? (A to Z গাইড) – পর্ব ১

কি কি কারণে ডিমের রং, খোসা ও আকার পরিবর্তন হয়? (A to Z গাইড) – পর্ব ১

মুরগির খামারে সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলোর একটি হলো ডিমের রং পরিবর্তন, খোসা পাতলা হয়ে যাওয়া, ছোট বা বিকৃত ডিম উৎপাদন। অনেক সময় বাজারে এসব ডিমের দাম ৫–১০% পর্যন্ত কমে যায়, ফলে খামারি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

ডিমের মান (Egg Quality) শুধু ডিমের আকারের ওপর নির্ভর করে না। বরং ডিমের খোসা, কুসুম (Yolk), অ্যালবুমিন (Albumen) এবং বাহ্যিক আকৃতি—সবকিছু মিলিয়েই ডিমের গুণগত মান নির্ধারিত হয়।

ডিমের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—

  • বংশগত বৈশিষ্ট্য (Genetics)
  • মুরগির বয়স
  • খাদ্য ও পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা
  • রোগ
  • স্ট্রেস
  • আলো ব্যবস্থাপনা
  • অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা
  • পানির মান
  • মাইকোটক্সিন
  • বিভিন্ন ওষুধ ও কেমিক্যালের প্রভাব

অনেক জাতের মুরগি স্বাভাবিকভাবেই মোটা খোসার ডিম দেয়, আবার কিছু জাত পাতলা খোসার ডিম দেয়। সাধারণত উৎপাদনের শুরুতে ডিমের খোসা শক্ত থাকে, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম বড় হয় এবং খোসা তুলনামূলক পাতলা হয়ে যায়।


ডিমের রং নষ্ট হওয়ার কারণ

বাদামি বা রঙিন ডিমের রং ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া লেয়ার খামারে একটি পরিচিত সমস্যা।

ডিমের রং নষ্ট হওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলো হলো—

  • বংশগত বৈশিষ্ট্য
  • মুরগির বয়স বৃদ্ধি
  • অতিরিক্ত ডিম উৎপাদন
  • দীর্ঘদিন স্ট্রেসে থাকা
  • শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি
  • জরায়ুর প্রদাহ
  • অ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রভাব
  • দীর্ঘদিন টেট্রাসাইক্লিন ব্যবহার
  • পাইপেরাজিন ব্যবহার
  • নিকারবাজিন বা মনেনসিন ব্যবহার
  • মাইকোটক্সিন
  • নিউক্যাসল (রানিক্ষেত) রোগ
  • ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB)
  • এগ ড্রপ সিনড্রোম (EDS)
  • মাইকোপ্লাজমোসিস
  • সালমোনেলোসিস
  • নিউক্যাসল রোগের টাইটার কমে যাওয়া

ডিমের খোসা পাতলা বা নরম হওয়ার কারণ

ডিমের খোসা উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হ্যাচিং ডিম নির্বাচনের ক্ষেত্রে শক্ত ও মানসম্মত খোসা অপরিহার্য।

একটি ভালো মানের ডিমের খোসা প্রায় ২.৫ কেজি চাপ সহ্য করতে পারে। নিম্নমানের খোসা ২.৩ কেজি চাপেই ভেঙে যেতে পারে।

১. পাতলা ও নরম খোসা (Thin or Soft Shell)

এর প্রধান কারণগুলো হলো—

  • ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB)
  • নিউক্যাসল ডিজিজ (ND)
  • এগ ড্রপ সিনড্রোম (EDS)
  • মাইকোটক্সিন
  • বয়স বেশি হওয়া
  • অতিরিক্ত স্ট্রেস
  • গরমে অতিরিক্ত হাঁপানো (Panting)
  • খাবার কম খাওয়া
  • ক্যালসিয়ামের ঘাটতি
  • জিংক, ম্যাঙ্গানিজ ও কপারের ঘাটতি
  • খাদ্যে ম্যাগনেসিয়াম বা ক্লোরিন বেশি থাকা
  • পানিতে ম্যালাথিয়ন দূষণ
  • ডিম গঠনের অনিয়ম

২. বিকৃত খোসা (Misshapen Egg)

ডিমের আকৃতি অস্বাভাবিক বা বেঁকে গেলে সাধারণত নিচের কারণগুলো দায়ী—

  • ভাইরাসজনিত রোগ
  • ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB)
  • নিউক্যাসল রোগ
  • ডিম্বনালির ক্ষতি
  • অ্যালবুমিনের মান খারাপ হওয়া
  • মুরগি স্থানান্তরের ধকল

৩. অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম জমা খোসা (Speckled/Splash Shell)

কখনও কখনও ডিমের খোসার ওপর অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম জমে খসখসে দাগ তৈরি হয়।

এটি সাধারণত দেখা যায় যখন—

  • ডিম দীর্ঘ সময় Shell Gland-এ থাকে
  • উৎপাদনের শুরুর দিকে
  • অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম জমা হয়

৪. খসখসে খোসা (Rough Shell)

নিচের কারণগুলোতে এমন ডিম দেখা যায়—

  • নির্ধারিত সময়ের আগেই ডিম উৎপাদন শুরু
  • স্ট্রেস
  • ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB)
  • নিউক্যাসল রোগ
  • এগ ড্রপ সিনড্রোম (EDS)
  • অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম
  • দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
  • পানির নিম্নমান

৫. ঢেউ খেলানো খোসা (Corrugated Shell)

এই ধরনের ডিমের খোসা অসমান ও ঢেউয়ের মতো হয়।

সম্ভাব্য কারণ—

  • কপারের ঘাটতি
  • ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB)
  • কিছু বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাব
  • খোসা তৈরির সময় জরায়ুর সমস্যা

৬. ফাটা ডিম (Cracked Egg)

খোসা দুর্বল হলে বা পরিবহনজনিত ধাক্কায় ডিম সহজেই ফেটে যায়।

এর কারণ—

  • ক্যালসিয়ামের ঘাটতি
  • ম্যাঙ্গানিজের ঘাটতি
  • জিংকের ঘাটতি
  • কপারের ঘাটতি
  • ভিটামিন D₃-এর ঘাটতি
  • সোডিয়াম বাইকার্বোনেটের অভাব
  • খাঁচার ত্রুটিপূর্ণ নকশা

৭. দাগযুক্ত খোসা (Mottled Shell)

এই সমস্যা দেখা দিতে পারে—

  • অতিরিক্ত আর্দ্রতা
  • বর্ষাকাল
  • পরিবেশগত স্ট্রেস

৮. বিবর্ণ বাদামি ডিম (Depigmented Brown Egg)

বাদামি ডিমের রং ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার কারণ—

  • অতিরিক্ত গরম
  • বেশি ডিম উৎপাদন
  • নিউক্যাসল রোগ
  • ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস
  • এগ ড্রপ সিনড্রোম
  • পাইপেরাজিন
  • নিকারবাজিন

কেন এসব সমস্যা গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত?

ডিমের খোসা ও রংয়ের পরিবর্তন শুধু বাজারমূল্য কমায় না, বরং অনেক সময় এটি রোগ, পুষ্টির ঘাটতি বা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।

তাই ডিমের মান খারাপ হলে শুধু ক্যালসিয়াম বাড়িয়ে দিলেই সমাধান হবে—এমনটি ভাবা ঠিক নয়। প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আই বি ও রানিক্ষেতবিভিন্ন রকমের ডিম

মুরগি স্থানান্তর করলে

 আই বি আক্রান্ত ডিম

ই ডি এস

 

 

 
 নরমাল ডিম
Scroll to Top