কনজাঙ্কটিভাইটিস (পিংক আই/ড্রাই আই)

কনজাঙ্কটিভাইটিস (Conjunctivitis/Pink Eye) কী? কারণ, লক্ষণ, রোগসমূহ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

কনজাঙ্কটিভাইটিস (Conjunctivitis) হলো চোখের কনজাঙ্কটিভা (Conjunctiva)-এর প্রদাহ। কনজাঙ্কটিভা হলো চোখের সাদা অংশ এবং চোখের পাতার ভেতরের অংশকে আবৃত করে থাকা পাতলা স্বচ্ছ ঝিল্লি।

এ রোগ এক চোখে (Unilateral) অথবা উভয় চোখে (Bilateral) হতে পারে। পোল্ট্রিতে কনজাঙ্কটিভাইটিস নিজে একটি রোগ নয়; বরং এটি বিভিন্ন সংক্রামক, পরজীবী, পরিবেশগত ও ব্যবস্থাপনাজনিত সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল লক্ষণ।


কনজাঙ্কটিভাইটিসের কারণ

১. সংক্রামক কারণ (Infectious Causes)

  • ব্যাকটেরিয়া
  • ভাইরাস
  • ছত্রাক (Fungi)

২. পরজীবী (Parasitic Causes)

চোখের বিভিন্ন পরজীবী কনজাঙ্কটিভাইটিস সৃষ্টি করতে পারে। যেমন—

  • Oxyspirura mansoni
  • Thelazia spp.
  • Ceratospira spp.

এছাড়াও কিছু সিস্টেমিক পরজীবী সংক্রমণেও চোখ আক্রান্ত হতে পারে, যেমন—

  • Plasmodium spp.
  • Microsporidiosis
  • Cryptosporidiosis
  • Trichomoniasis

৩. ফরেন বডি (Foreign Body)

চোখে বাইরের কোনো বস্তু প্রবেশ করলে প্রদাহ হতে পারে। যেমন—

  • ধূলাবালি
  • বালুকণা
  • পালকের অংশ
  • খাদ্যের কণা
  • লিটারের সূক্ষ্ম কণা

৪. ফিজিক্যাল ও কেমিক্যাল ইরিট্যান্ট

চোখে দীর্ঘদিন জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে—

  • ধোঁয়া
  • রাসায়নিক গ্যাস
  • জীবাণুনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার
  • অ্যামোনিয়া গ্যাস
  • ধুলাবালিযুক্ত পরিবেশ

কনজাঙ্কটিভাইটিসের শ্রেণিবিভাগ

১. লোকাল (Local Conjunctivitis)

এটি সাধারণত স্থানীয় সংক্রমণ বা ফরেন বডির কারণে হয়।

বিশেষ করে যদি চোখের Nictitating membrane বা নিচের চোখের পাতার ভেতরে কোনো ফরেন বডি আটকে থাকে, তাহলে অনেক সময় শুধুমাত্র একটি চোখ আক্রান্ত হয়।


২. সেকেন্ডারি (Secondary Conjunctivitis)

চোখের আশেপাশের টিস্যুর রোগের কারণে কনজাঙ্কটিভাইটিস হতে পারে।

বিশেষ করে—

  • Chronic Rhinitis
  • Sinusitis
  • Periorbital infection
  • Orbital inflammation

৩. সিস্টেমিক (Systemic Conjunctivitis)

যখন সেপটিসেমিয়া বা শরীরব্যাপী সংক্রমণ হয়, তখন কনজাঙ্কটিভাইটিসও দেখা দিতে পারে।


যেসব রোগে কনজাঙ্কটিভাইটিস দেখা যায়

১. Infectious Coryza

মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং কনজাঙ্কটিভাইটিস খুবই সাধারণ লক্ষণ।


২. Mycoplasmosis

বিশেষ করে Mycoplasma gallisepticum (MG) সংক্রমণে চোখ ও শ্বাসতন্ত্র একসাথে আক্রান্ত হতে পারে।


৩. Infectious Laryngotracheitis (ILT)

শ্বাসতন্ত্রের পাশাপাশি চোখের প্রদাহও হতে পারে।


৪. Avian Influenza (AI)

কিছু ক্ষেত্রে চোখ ফুলে যাওয়া, পানি পড়া এবং কনজাঙ্কটিভাইটিস দেখা যায়।


৫. Infectious Bronchitis (IB)

বিশেষ করে তরুণ বাচ্চায় চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং হালকা কনজাঙ্কটিভাইটিস দেখা যেতে পারে।


৬. Newcastle Disease (ND)

রানীক্ষেত রোগে অনেক সময় চোখ আক্রান্ত হয়ে কনজাঙ্কটিভাইটিস দেখা যায়।


৭. Eye Worm (Oxyspiruriasis)

Oxyspirura spp. চোখে ডিম পাড়তে পারে।

আক্রান্ত পাখি—

  • চোখ চুলকায়
  • বিভিন্ন বস্তুর সাথে চোখ ঘষে
  • অতিরিক্ত পানি পড়ে
  • পরে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হতে পারে।

৮. Swollen Head Syndrome

Avian Metapneumovirus (AMPV) দ্বারা সৃষ্ট এ রোগে—

  • মাথা ফুলে যায়
  • চোখ ফুলে যায়
  • কনজাঙ্কটিভাইটিস হয়।

৯. Avian Chlamydiosis

এ রোগে দেখা যেতে পারে—

  • চোখ দিয়ে পানি পড়া
  • নাক দিয়ে স্রাব
  • শ্বাসকষ্ট
  • ডায়রিয়া
  • ওজন কমে যাওয়া
  • ডিম উৎপাদন কমে যাওয়া
  • জ্বর
  • অবসাদ

১০. Aspergillosis

Acute Form (Brooder Pneumonia)

  • সদ্য ফোটা বাচ্চায় বেশি হয়।

Chronic Form

  • বড় মুরগিতে বেশি দেখা যায়।
  • খারাপ ভেন্টিলেশন
  • ছত্রাকযুক্ত খাদ্য
  • ধুলাবালিযুক্ত পরিবেশ

এসব প্রধান ঝুঁকির কারণ।


১১. Ammonia Toxicity

পোল্ট্রি খামারে ২৫ ppm-এর বেশি অ্যামোনিয়া চোখের জন্য ক্ষতিকর।

লক্ষণ—

  • সাধারণত উভয় চোখ আক্রান্ত হয়।
  • চোখ দিয়ে অতিরিক্ত পানি পড়ে।
  • কনজাঙ্কটিভাইটিস হয়।
  • চোখ লাল হয়ে যায়।
  • কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অল্পবয়সী ও গ্রোয়ার মুরগি অ্যাডাল্ট মুরগির তুলনায় বেশি সংবেদনশীল।

শীতকালে পর্দা বন্ধ রেখে ভেন্টিলেশন কম হলে অ্যামোনিয়া টক্সিসিটি বেশি দেখা যায়।


রোগ নির্ণয় (Diagnosis)

রোগ নির্ণয়ের জন্য বিবেচনা করতে হবে—

  • আক্রান্ত চোখ এক নাকি দুইটি
  • শ্বাসতন্ত্রের লক্ষণ আছে কি না
  • মুখমণ্ডল ফুলেছে কি না
  • খামারে অ্যামোনিয়ার মাত্রা
  • ফরেন বডি আছে কি না
  • পোস্টমর্টেম ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষা (প্রয়োজন হলে)

চিকিৎসা (Treatment)

কনজাঙ্কটিভাইটিসের চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে কারণের ওপর নির্ভরশীল।

যদি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হয়, তাহলে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।

যদি ভাইরাসজনিত হয়, তাহলে মূলত সাপোর্টিভ চিকিৎসা দেওয়া হয়।

যদি অ্যামোনিয়া বা ধুলাবালির কারণে হয়, তাহলে পরিবেশের উন্নতি করতে হবে।

ফরেন বডি থাকলে কী করবেন?

যদি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরও চোখ ভালো না হয়, তাহলে অবশ্যই চোখের ভেতরে ফরেন বডি আছে কি না পরীক্ষা করতে হবে।

  • খালি চোখে দেখা গেলে Sterile Cotton Swab দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে বের করা যায়।
  • গভীরে আটকে থাকলে বা সহজে বের করা না গেলে প্রশিক্ষিত ভেটেরিনারিয়ান প্রয়োজনে General Anaesthesia দিয়ে Sterile Saline ব্যবহার করে চোখ ফ্লাশ করতে পারেন।

নিজে জোর করে ফরেন বডি বের করার চেষ্টা করা উচিত নয়, কারণ এতে কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


প্রতিরোধ (Prevention)

  • খামারে অ্যামোনিয়ার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করুন।
  • পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন নিশ্চিত করুন।
  • ধুলাবালি কম রাখুন।
  • পরিষ্কার ও শুকনো লিটার ব্যবহার করুন।
  • বায়োসিকিউরিটি মেনে চলুন।
  • অসুস্থ পাখিকে দ্রুত আলাদা করুন।
  • নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করুন।
  • প্রয়োজনে পরজীবী নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি অনুসরণ করুন।

উপসংহার

কনজাঙ্কটিভাইটিস নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়; বরং এটি বিভিন্ন সংক্রামক রোগ, পরজীবী, পরিবেশগত সমস্যা এবং ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল লক্ষণ। তাই শুধুমাত্র চোখের প্রদাহ দেখে ওষুধ না দিয়ে প্রথমে এর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা উচিত। সঠিক রোগ নির্ণয়, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাই কনজাঙ্কটিভাইটিস নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

Scroll to Top