এভিয়ান লিউকোসিস,লক্ষণ,পোস্ট মর্টেম,মেরেক্সের সাথে পার্থক্য

মুরগির এভিয়ান লিউকোসিস (Avian Leukosis): কারণ, লক্ষণ, পোস্টমর্টেম, প্রতিরোধ ও মেরেক্স রোগের পার্থক্য

এভিয়ান লিউকোসিস (Avian Leukosis, AL) হলো মুরগির একটি রেট্রোভাইরাসজনিত (Retrovirus) টিউমার সৃষ্টিকারী রোগ। এটি প্রধানত ৫ মাস বা তার বেশি বয়সী মুরগিতে দেখা যায় এবং ধীরে ধীরে লিভার, প্লীহা, বার্সা, কিডনি ও ডিম্বাশয়ে টিউমার সৃষ্টি করে। রোগটি সাধারণত ডিম উৎপাদন কমিয়ে দেয়, শরীর শুকিয়ে যায় এবং খামারের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়।


রোগের ইতিহাস

  • ১৮৬৮ সালে বিজ্ঞানী Rolf প্রথম এ রোগের বর্ণনা দেন।
  • ১৯৪৭ সালে Burmester ও তাঁর সহকর্মীরা প্রমাণ করেন যে এ রোগের জন্য ভাইরাস দায়ী।
  • বর্তমানে জেনেটিকভাবে প্রতিরোধী (Leukosis-resistant) লেয়ার লাইনের উন্নয়নের কারণে অনেক দেশে রোগের প্রকোপ কমছে।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

  • ডিম উৎপাদন কমে যায়।
  • ডিমের গুণগত মান নষ্ট হয়।
  • আক্রান্ত মুরগি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়।
  • ব্রিডার ফ্লকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
  • অনেক ক্ষেত্রে সাবক্লিনিক্যাল সংক্রমণ থাকায় রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়।

রোগের কারণ (Etiology)

এভিয়ান লিউকোসিসের কারণ Avian Leukosis Virus (ALV)

  • Family: Retroviridae
  • Genus: Alpharetrovirus
  • RNA Virus (Enveloped)

প্রধান গ্রুপ অ্যান্টিজেন: p27

ভাইরাসের সাবগ্রুপ

ALV-এর ১০টি সাবগ্রুপ রয়েছে:

  • A
  • B
  • C
  • D
  • E
  • F
  • G
  • H
  • I
  • J

এর মধ্যে—

  • Subgroup J ব্রয়লার ব্রিডারে বেশি দেখা যায়।
  • Subgroup A ও B পশ্চিমা দেশগুলোতে বেশি প্রচলিত।
  • A ও E সাবগ্রুপ অতীতে কিছু Marek’s Disease Vaccine-এর সাথে দূষিত (Contaminated) হওয়ার ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে।

কোন মুরগিতে বেশি হয়?

  • মুরগি (Chicken) প্রাকৃতিক হোস্ট।
  • কোয়েলে হতে পারে।
  • সাধারণত ১৬ সপ্তাহ বা তার বেশি বয়সে রোগ বেশি দেখা যায়।
  • ৫ মাসের বেশি বয়সী মুরগিতে রোগের প্রকোপ বেশি।
  • ইনকিউবেশন পিরিয়ড সাধারণত ২–৮ সপ্তাহ

রোগ কীভাবে ছড়ায়?

এভিয়ান লিউকোসিস প্রধানত Vertical transmission এর মাধ্যমে ছড়ায়।

সংক্রমণের উৎস

  • আক্রান্ত ব্রিডারের ডিম
  • ডিমের কুসুম (Yolk)
  • ডিমের সাদা অংশ (Albumen)

Horizontal transmission

  • আক্রান্ত মুরগির বিষ্ঠা
  • লালা
  • দূষিত পরিবেশ
  • একই খামারের সংস্পর্শ

জন্মগত (Congenital) সংক্রমণে টিউমার হওয়ার ঝুঁকি বেশি হলেও বাস্তবে অধিক সংখ্যক মুরগি Horizontal transmission-এর মাধ্যমে আক্রান্ত হয়।


রোগের ধরন

১. Lymphoid Leukosis

সবচেয়ে সাধারণ ফর্ম।

বৈশিষ্ট্য

  • লিভার ও প্লীহা বড় ও নরম হয়।
  • বিভিন্ন অঙ্গে টিউমার তৈরি হয়।

২. Myeloid Leukosis

  • প্রধানত মাংস উৎপাদনকারী (Broiler) মুরগিতে দেখা যায়।
  • শ্বেত রক্তকণিকা বৃদ্ধি পায়।

৩. Erythroleukosis

  • লোহিত রক্তকণিকা কমে যায়।
  • রক্তশূন্যতা (Anemia) হয়।
  • শ্বেত রক্তকণিকা বেড়ে যায়।

রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া (Pathogenesis)

ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে রক্ত ও লিম্ফয়েড টিস্যুর মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর—

  • B lymphocyte আক্রান্ত হয়।
  • টিউমার সৃষ্টি হয়।
  • লিভার
  • প্লীহা
  • বার্সা
  • কিডনি
  • ডিম্বাশয় আক্রান্ত হয়।

রোগের লক্ষণ

এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ নেই।

সাধারণ লক্ষণ

  • ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাওয়া
  • ঝুঁটি ও ওয়াটল ফ্যাকাশে হওয়া
  • ঝুঁটি ছোট হয়ে যাওয়া
  • খাবার কম খাওয়া
  • অবসাদ
  • উস্কোখুস্কো পালক
  • ডিম উৎপাদন কমে যাওয়া
  • লিভার বড় হওয়ায় পেট ফোলা
  • টিউমার সাধারণত ১৪ সপ্তাহের আগে দেখা যায় না।
  • লক্ষণ প্রকাশের ৪–১০ দিনের মধ্যে মৃত্যু হতে পারে।

পোস্টমর্টেম (Postmortem Lesions)

প্রধান লিশনগুলো হলো—

  • লিভার বড়
  • প্লীহা বড়
  • বার্সা বড়
  • কিডনি বড়
  • ডিম্বাশয় বড়

লিভার ও প্লীহার উপর—

  • সাদা
  • ধূসর
  • বিভিন্ন আকারের নডিউল

দেখা যায়।

অনেক সময় লিভার ও প্লীহার ভেতরে গাঢ় লাল জমাট রক্তও দেখা যায়।

গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য

বার্সায় টিউমার (Bursal Tumor) এভিয়ান লিউকোসিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পোস্টমর্টেম লিশন।


রোগ নির্ণয়

  • ইতিহাস
  • ক্লিনিক্যাল লক্ষণ
  • পোস্টমর্টেম
  • হিস্টোপ্যাথলজি
  • PCR
  • ELISA
  • Virus isolation

চিকিৎসা

এ রোগের নির্দিষ্ট কার্যকর চিকিৎসা নেই।

সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে—

  • লিভার টনিক
  • কিডনি টনিক
  • ভিটামিন C
  • ইমিউন সাপোর্টিভ থেরাপি

দেওয়া যেতে পারে, তবে ফলাফল সাধারণত সন্তোষজনক হয় না।


প্রতিরোধ

  • Leukosis-মুক্ত ব্রিডার ব্যবহার
  • ব্রিডার পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি
  • কঠোর Biosecurity
  • আক্রান্ত মুরগি দ্রুত অপসারণ
  • রোগমুক্ত হ্যাচারি থেকে বাচ্চা সংগ্রহ
  • জেনেটিকভাবে প্রতিরোধী (Resistant) লাইন ব্যবহার

মেরেক্স রোগ ও লিউকোসিসের পার্থক্য

বৈশিষ্ট্যমেরেক্স রোগএভিয়ান লিউকোসিস
আক্রান্ত বয়স৬ সপ্তাহের পরসাধারণত ১৬ সপ্তাহের পর
ভাইরাসHerpesvirusAlpharetrovirus
পক্ষাঘাত (Paralysis)হয়হয় না
মৃত্যুহার৫–৫০% বা তার বেশিসাধারণত ৫%, কখনও ২৯%
রোগের লক্ষণতুলনামূলক নির্দিষ্টনির্দিষ্ট নয়
লিভার ও প্লীহার লিশনDiffuse বা PerivascularFocal nodular
আক্রান্ত কোষপ্রধানত T-cellপ্রধানত B-cell
বার্সায় টিউমারসাধারণত হয় নাহয় (Pathognomonic)
চোখ আক্রান্তহয়সাধারণত হয় না
ত্বকে টিউমারহয়সাধারণত হয় না
ডিমের মাধ্যমে সংক্রমণনাহয় (Vertical transmission)

উপসংহার

এভিয়ান লিউকোসিস একটি দীর্ঘস্থায়ী ভাইরাসজনিত টিউমার রোগ, যা বিশেষ করে ব্রিডার ও লেয়ার খামারে অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ। যেহেতু এ রোগের কার্যকর চিকিৎসা নেই, তাই রোগমুক্ত ব্রিডার নির্বাচন, কঠোর বায়োসিকিউরিটি, জেনেটিক প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন লাইন ব্যবহার এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণই এ রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। মেরেক্স রোগের সাথে এর মিল থাকলেও সংক্রমণের ধরন, টিউমারের অবস্থান এবং রোগের বৈশিষ্ট্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

১. এভিয়ান লিউকোসিস (Avian Leukosis) কী?

এভিয়ান লিউকোসিস (AL) হলো মুরগির একটি ধীরগতির ভাইরাসজনিত টিউমার রোগ, যা Avian Leukosis Virus (ALV) দ্বারা হয়। এটি প্রধানত ৫ মাস বা তার বেশি বয়সী মুরগিতে দেখা যায় এবং লিভার, প্লীহা, বার্সা, কিডনি ও ডিম্বাশয়ে টিউমার সৃষ্টি করতে পারে।


২. এভিয়ান লিউকোসিস কোন ভাইরাস দ্বারা হয়?

এ রোগের কারণ Avian Leukosis Virus (ALV), যা Retroviridae পরিবারের Alpharetrovirus গণের একটি RNA ভাইরাস।


৩. কোন বয়সের মুরগিতে এভিয়ান লিউকোসিস বেশি দেখা যায়?

সাধারণত ১৬ সপ্তাহের বেশি, বিশেষ করে ৫ মাস বা তার বেশি বয়সী লেয়ার ও ব্রিডার মুরগিতে এ রোগ বেশি দেখা যায়।


৪. এভিয়ান লিউকোসিস কীভাবে ছড়ায়?

রোগটি প্রধানত দুইভাবে ছড়ায়—

  • ভার্টিক্যাল ট্রান্সমিশন: আক্রান্ত ব্রিডার থেকে ডিমের মাধ্যমে বাচ্চায়।
  • হরিজন্টাল ট্রান্সমিশন: বিষ্ঠা, লালা, দূষিত খাদ্য, পানি ও সরঞ্জামের মাধ্যমে।

৫. এভিয়ান লিউকোসিসের প্রধান লক্ষণ কী?

  • ধীরে ধীরে ওজন কমে যাওয়া
  • ঝুঁটি ও ওয়াটল ফ্যাকাশে হওয়া
  • খাদ্য গ্রহণ কমে যাওয়া
  • ডিম উৎপাদন কমে যাওয়া
  • পেট বড় হয়ে যাওয়া (লিভার বড় হওয়ার কারণে)
  • পালক রুক্ষ ও এলোমেলো হওয়া

৬. এভিয়ান লিউকোসিসে কি পক্ষাঘাত (Paralysis) হয়?

না। এভিয়ান লিউকোসিসে সাধারণত পক্ষাঘাত হয় না। পক্ষাঘাত হলে মেরেক্স রোগের সম্ভাবনা বেশি বিবেচনা করা হয়।


৭. পোস্টমর্টেমে কী কী পরিবর্তন দেখা যায়?

  • লিভার, প্লীহা, বার্সা ও কিডনি বড় হয়ে যায়।
  • লিভার ও প্লীহার উপর সাদা বা ধূসর টিউমার (নডিউল) দেখা যায়।
  • বার্সায় টিউমার থাকলে তা এভিয়ান লিউকোসিসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

৮. এভিয়ান লিউকোসিস ও মেরেক্স রোগের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

মেরেক্স রোগে সাধারণত পক্ষাঘাত ও স্নায়ু আক্রান্ত হয়, কিন্তু এভিয়ান লিউকোসিসে তা হয় না। এছাড়া এভিয়ান লিউকোসিসে বার্সায় টিউমার বেশি দেখা যায়, যা মেরেক্সে সাধারণত থাকে না।


৯. এভিয়ান লিউকোসিসের কার্যকর চিকিৎসা আছে কি?

বর্তমানে এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই। শুধুমাত্র সহায়ক চিকিৎসা ও ভালো ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষতি কিছুটা কমানো যায়।


১০. এভিয়ান লিউকোসিস প্রতিরোধের উপায় কী?

  • রোগমুক্ত ব্রিডার ব্যবহার করা।
  • কঠোর বায়োসিকিউরিটি অনুসরণ করা।
  • আক্রান্ত মুরগি দ্রুত আলাদা করা।
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।
  • রোগমুক্ত হ্যাচারি থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করা।
  • প্রয়োজনে জাত উন্নয়ন ও রোগ-প্রতিরোধী লাইন ব্যবহার করা।

১১. এভিয়ান লিউকোসিস কি মানুষের মধ্যে ছড়ায়?

না। বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী এভিয়ান লিউকোসিস মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয় না।


১২. এভিয়ান লিউকোসিসে খামারির কী ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়?

  • ডিম উৎপাদন কমে যায়।
  • বৃদ্ধি ও ওজন কমে যায়।
  • টিউমারের কারণে মুরগি বাতিল করতে হয়।
  • ব্রিডার খামারে ভার্টিক্যাল সংক্রমণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

লিউকোসিস

 

Scroll to Top