মুরগির মেরেক্স রোগ (Marek’s Disease): কারণ, লক্ষণ, পোস্টমর্টেম ও প্রতিরোধ
মেরেক্স (Marek’s Disease) বা Neuromatosis হলো মুরগির একটি হারপিস ভাইরাসজনিত (Herpesvirus) লিম্ফোপ্রলিফারেটিভ (Lymphoproliferative) রোগ। এটি Fowl Paralysis নামেও পরিচিত। এই রোগে স্নায়ুতন্ত্র, ত্বক, চোখ এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গে টিউমার সৃষ্টি হয়। এটি পোলট্রি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক রোগ, কারণ আক্রান্ত মুরগির মৃত্যুহার, ওজন কমে যাওয়া, উৎপাদন হ্রাস এবং কুলিং (Culling) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
১৯০৭ সালে হাঙ্গেরির ভেটেরিনারিয়ান Joseph Marek প্রথম এ রোগের বর্ণনা দেন। পরবর্তীতে Churchill ও Biggs প্রমাণ করেন যে রোগটি Marek’s Disease Virus (MDV) দ্বারা সংঘটিত হয়।
রোগটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব
- অত্যন্ত সংক্রামক (Highly contagious)
- বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বিদ্যমান
- বাংলাদেশেও ব্যাপকভাবে দেখা যায়
- ১০–২০ সপ্তাহ বয়সী মুরগিতে বেশি হওয়ায় খামারির সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়
- মৃত্যুহার সাধারণত ১–৫০% হলেও মিশ্র সংক্রমণে (ND, AI ইত্যাদি) ১০০% পর্যন্ত হতে পারে
- ভ্যাকসিন দেওয়ার পরও রোগ হতে পারে, কারণ ভ্যাকসিন টিউমার প্রতিরোধ করে, কিন্তু ভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে না।
রোগের কারণ (Etiology)
রোগের কারণ Marek’s Disease Virus (MDV)।
- Family: Herpesviridae
- Genus: Mardivirus
- DNA Virus (Double stranded DNA)
- Gallid alphaherpesvirus-2
সেরোটাইপ
Serotype-1
- অনকোজেনিক (Tumor producing)
- খুব কম ভিরুলেন্ট থেকে অত্যন্ত ভিরুলেন্ট পর্যন্ত
- HPRS-16, HPRS-18, HPRS-19, HPRS-20, JM-GA
Serotype-2
- Non-oncogenic
- SB-1 strain
Serotype-3
- Turkey Herpes Virus (HVT)
- Non-oncogenic
- অধিকাংশ ভ্যাকসিনে ব্যবহৃত হয়।
কোন মুরগিতে বেশি হয়?
- মুরগি (Chicken) প্রাকৃতিক হোস্ট
- ৪–৫০ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত হতে পারে
- ১০–২০ সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি
- ২–৫ মাসে রোগের প্রকোপ বেশি
- ১ বছরের বেশি বয়সে খুব কম হয়
- বিদেশি জাত দেশি মুরগির তুলনায় বেশি আক্রান্ত হয়
- লাল জাতের লেয়ারে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়
- বাচ্চা সবচেয়ে সংবেদনশীল
রোগ কীভাবে ছড়ায়?
মেরেক্স ডিমের মাধ্যমে ছড়ায় না।
সংক্রমণের প্রধান উৎস হলো Feather follicle।
ছড়ানোর মাধ্যম—
- বাতাস
- ধুলাবালি
- লিটার
- আক্রান্ত পালকের গুঁড়া
- যন্ত্রপাতি
- পোশাক
- Darkling beetle
- খামারের দূষিত পরিবেশ
ভাইরাস লিটারে প্রায় ১২ মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
কোন বিষয়গুলো রোগের তীব্রতা বাড়ায়?
- উচ্চ ভিরুলেন্ট ভাইরাস
- অল্প বয়স
- স্ট্রেস
- কক্সিডিওসিস
- কৃমি
- দুর্বল ব্যবস্থাপনা
- পর্যাপ্ত বাতাস না থাকা
- অতিরিক্ত ধুলাবালি
- অন্যান্য রোগ (ND, AI)
- মাতৃ অ্যান্টিবডি কম থাকা
মেরেক্স রোগের বিভিন্ন ফর্ম
১. Classical (Chronic) Marek’s Disease
সবচেয়ে পরিচিত ফর্ম।
বৈশিষ্ট্য
- ১৬–২৪ সপ্তাহে বেশি
- Sciatic nerve আক্রান্ত
- Brachial nerve আক্রান্ত
- Vagus nerve আক্রান্ত
- Intercostal nerve আক্রান্ত
- পক্ষাঘাত (Paralysis)
- খুঁড়িয়ে হাঁটা
- এক পা সামনে, অন্য পা পেছনে প্রসারিত
- ডানা ঝুলে পড়া
- ক্রপ ফুলে যাওয়া
- Torticollis
২. Acute Marek’s Disease
- ৬–২০ সপ্তাহে বেশি
- হঠাৎ মৃত্যু
- Visceral organ-এ টিউমার
- লিভার
- স্প্লিন
- কিডনি
- ফুসফুস
- প্রোভেন্ট্রিকুলাস
- ডিম্বাশয়
৩. Transient Paralysis
- বিরল
- ৫–১৬ সপ্তাহ
- হঠাৎ প্যারালাইসিস
- ১–২ দিনের মধ্যে অনেক সময় ভালো হয়ে যায়।
৪. Neoplastic Form
- ত্বক
- চোখ
- অভ্যন্তরীণ অঙ্গ
- টিউমার সৃষ্টি করে।
রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া (Pathogenesis)
ভাইরাস ধুলাবালির মাধ্যমে শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে।
এরপর—
- ফুসফুসে প্রবেশ করে
- B lymphocyte আক্রান্ত করে
- Immunosuppression সৃষ্টি করে
- Viremia হয়
- Feather follicle-এ অবস্থান নেয়
- T lymphocyte পরিবর্তিত হয়ে Tumor cell তৈরি করে
- বিভিন্ন অঙ্গে টিউমার সৃষ্টি হয়
- Peripheral nerve আক্রান্ত হলে Paralysis হয়।
রোগের লক্ষণ
লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ৩–১২ সপ্তাহ পরে দেখা যায়।
প্রধান লক্ষণ
- একসাথে অনেক মুরগি আক্রান্ত
- দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যু
- ওজন কমে যাওয়া
- খাবার কম খাওয়া
- দুর্বলতা
- ডায়রিয়া
- পানিশূন্যতা
স্নায়বিক লক্ষণ
- এক পা অবশ
- দুই পা অবশ
- ডানা ঝুলে পড়া
- ঘাড় বাঁকা (Torticollis)
- খিঁচুনি
- ক্রপ ফুলে যাওয়া
- গ্যাস্পিং
চোখের লক্ষণ
- Iris-এর রং পরিবর্তন
- চোখ ধূসর হয়ে যাওয়া
- অন্ধত্ব
পোস্টমর্টেম (Postmortem Lesions)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন অঙ্গে টিউমার।
প্রধান লিশন
- লিভার বড়
- স্প্লিন বড়
- কিডনি বড়
- ফুসফুসে টিউমার
- হার্টে টিউমার
- প্রোভেন্ট্রিকুলাস মোটা
- ডিম্বাশয়ে টিউমার
- ত্বকে টিউমার
- মাংসে টিউমার
- ক্ষুদ্রান্তে টিউমার
- Thymus আক্রান্ত
- Feather follicle আক্রান্ত
Sciatic nerve ও Brachial nerve ২–৪ গুণ মোটা হতে পারে (যদিও বাংলাদেশে তুলনামূলক কম দেখা যায়)।
ডিফারেনশিয়াল ডায়াগনোসিস
নিচের রোগগুলোতে লিভার ও স্প্লিন বড় হতে পারে—
- মাইকোটক্সিকোসিস
- সালমোনেলোসিস
- কলেরা
- ক্লস্ট্রিডিয়াম সংক্রমণ
- স্ট্যাফাইলোকক্কোসিস
তবে হার্ট, ফুসফুস, ত্বক, মাংসপেশী এবং Peripheral nerve-এ টিউমার থাকলে মেরেক্স রোগের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
রোগ নির্ণয়
- রোগের ইতিহাস
- ক্লিনিক্যাল লক্ষণ
- পোস্টমর্টেম
- Histopathology
- PCR
- Virus isolation
- Immunohistochemistry
চিকিৎসা
মেরেক্স রোগের কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই।
আক্রান্ত মুরগিকে আলাদা করতে হবে এবং সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হবে।
প্রতিরোধ
- ১ দিন বয়সে Marek’s vaccine
- Hatchery vaccination নিশ্চিত করা
- Biosecurity বজায় রাখা
- লিটার পরিষ্কার রাখা
- ধুলাবালি কমানো
- স্ট্রেস কমানো
- ভালো ভেন্টিলেশন
- কৃমি ও কক্সিডিওসিস নিয়ন্ত্রণ
- All-in All-out পদ্ধতি অনুসরণ
- নিয়মিত জীবাণুনাশক ব্যবহার
- অসুস্থ মুরগি দ্রুত অপসারণ
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- ভ্যাকসিন ভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ করে না।
- ভ্যাকসিন মূলত টিউমার ও মৃত্যুহার কমায়।
- ডিমের মাধ্যমে রোগ ছড়ায় না।
- Feather follicle হলো ভাইরাস ছড়ানোর প্রধান উৎস।
- স্ট্রেস ও খারাপ ব্যবস্থাপনা রোগের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- ১০–২০ সপ্তাহ বয়সী মুরগিতে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
উপসংহার
মেরেক্স রোগ আধুনিক পোলট্রি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাসজনিত রোগ। যেহেতু এর নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তাই সময়মতো ভ্যাকসিন, কঠোর বায়োসিকিউরিটি, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। খামারে হঠাৎ পক্ষাঘাত, টিউমার বা দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যু হলে দ্রুত রোগ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।














