টিকা দেওয়ার পরও কেন রোগ হয়? – মুরগির শারীরিক সমস্যা, প্যারেন্ট ফার্ম ও হ্যাচারির প্রভাব (২য় পর্ব)
প্রথম পর্বে আমরা আলোচনা করেছি ভ্যাকসিনের গুণগত সমস্যা এবং ভ্যাকসিন প্রয়োগের কারিগরি ত্রুটি সম্পর্কে। কিন্তু অনেক সময় টিকা সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রয়োগ করার পরও প্রত্যাশিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না।
এর প্রধান কারণ হতে পারে মুরগির শারীরিক অবস্থা, প্যারেন্ট ফার্মের স্বাস্থ্য, হ্যাচারির ব্যবস্থাপনা এবং মাতৃপ্রদত্ত অ্যান্টিবডি (MDA)।
এই পর্বে এসব বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১। মুরগির শারীরিক অবস্থার কারণে টিকা ব্যর্থ হতে পারে
ক) আগে থেকেই রোগে আক্রান্ত থাকলে
মুরগি যদি টিকা দেওয়ার আগেই কোনো রোগে আক্রান্ত থাকে বা শরীরে রোগ সুপ্ত (Subclinical) অবস্থায় থাকে, তাহলে ভ্যাকসিন প্রত্যাশিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে না।
অসুস্থ ফ্লকে ভ্যাকসিন দেওয়ার আগে অবশ্যই ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
খ) অপুষ্টি
ভ্যাকসিন কার্যকর হওয়ার জন্য সুস্থ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
যদি খাদ্যে পর্যাপ্ত—
- প্রোটিন
- ভিটামিন
- মিনারেল
না থাকে, তাহলে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি নাও হতে পারে।
গ) স্ট্রেসের সময় ভ্যাকসিন
নিচের অবস্থায় টিকা দিলে ফলাফল খারাপ হতে পারে—
- দীর্ঘ পরিবহন
- অতিরিক্ত গরম
- অতিরিক্ত ঠান্ডা
- খাদ্য বা পানির অভাব
- অতিরিক্ত ঘনত্ব
স্ট্রেস কমিয়ে তারপর ভ্যাকসিন দেওয়া উত্তম।
ঘ) পরজীবী সংক্রমণ
মুরগি যদি—
- কৃমি
- কক্সিডিওসিস
ইত্যাদিতে আক্রান্ত থাকে, তাহলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা হ্রাস পেতে পারে।
ঙ) ইমিউনোসাপ্রেসিভ (Immunosuppressive) রোগ
কিছু রোগ সরাসরি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়।
যেমন—
- গাম্বোরো (IBD)
- মেরেকস
- রিও
- মাইকোটক্সিকোসিস
এসব রোগে আক্রান্ত ফ্লকে ভ্যাকসিনের ফল অনেক কমে যেতে পারে।
২। প্যারেন্ট ফার্ম ও হ্যাচারির সমস্যার প্রভাব
অনেক সময় সমস্যা শুরু হয় বাচ্চা খামারে আসার আগেই।
ক) প্যারেন্ট ফ্লকের স্বাস্থ্য
যদি প্যারেন্ট ফ্লকে সালমোনেলা বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে ডিমের মাধ্যমে জীবাণু বাচ্চায় যেতে পারে।
ফলে বাচ্চা জন্ম থেকেই দুর্বল অবস্থায় থাকে এবং পরবর্তীতে ভ্যাকসিনের সাড়া কম দিতে পারে।
খ) হ্যাচারির পরিচ্ছন্নতা
হ্যাচারির স্বাস্থ্যবিধি ভালো না হলে বাচ্চা বিভিন্ন জীবাণু নিয়ে খামারে আসে।
বিশেষ করে কুসুমের সংক্রমণ (Yolk Sac Infection) বা প্রাথমিক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
গ) মাতৃপ্রদত্ত অ্যান্টিবডি (MDA)
বাচ্চা ডিমের কুসুমের মাধ্যমে মায়ের কাছ থেকে কিছু রোগের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি পায়, যাকে Maternal Derived Antibody (MDA) বলা হয়।
এই MDA-এর মাত্রা খুব বেশি থাকলে কিছু লাইভ ভ্যাকসিন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না।
আবার MDA খুব কম থাকলে বাচ্চা অল্প বয়সেই ফিল্ড ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।
তাই MDA বিবেচনা করে ভ্যাকসিনের সময় নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
ঘ) বিভিন্ন প্যারেন্ট ফ্লকের বাচ্চা একসঙ্গে পালন
যদি একই ব্যাচে বিভিন্ন প্যারেন্ট ফ্লক থেকে আসা বাচ্চা থাকে, তাহলে তাদের MDA-এর মাত্রা একরকম নাও হতে পারে।
ফলে একই দিনে ভ্যাকসিন দিলেও সব বাচ্চা সমান সুরক্ষা নাও পেতে পারে।
ঙ) ভ্যাকসিনের সময় নির্বাচন
ভ্যাকসিনের সঠিক সময় নির্ভর করে—
- MDA
- রোগের ঝুঁকি
- ফার্মের ইতিহাস
- এলাকার রোগ পরিস্থিতি
এসব বিবেচনা করে ভেটেরিনারিয়ান ভ্যাকসিন প্রোগ্রাম নির্ধারণ করেন।
খামারিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- সবসময় সুস্থ ও মানসম্মত বাচ্চা সংগ্রহ করুন।
- নির্ভরযোগ্য হ্যাচারি নির্বাচন করুন।
- ব্রুডিং সঠিকভাবে করুন।
- অপুষ্টি ও স্ট্রেস কমান।
- কৃমি ও কক্সিডিওসিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- ইমিউনোসাপ্রেসিভ রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিন।
- ভ্যাকসিন সিডিউল নির্ধারণের সময় MDA বিবেচনা করুন।
উপসংহার
টিকা ব্যর্থ হওয়ার জন্য সবসময় ভ্যাকসিন দায়ী নয়। অনেক ক্ষেত্রে মুরগির শারীরিক অবস্থা, প্যারেন্ট ফার্ম, হ্যাচারির স্বাস্থ্যবিধি এবং মাতৃপ্রদত্ত অ্যান্টিবডি (MDA) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এসব বিষয় সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা অনেক বৃদ্ধি পায় এবং রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
FAQ
১। MDA কী?
MDA (Maternal Derived Antibody) হলো মায়ের কাছ থেকে ডিমের মাধ্যমে বাচ্চা যে অ্যান্টিবডি পায়, যা জীবনের প্রথম দিকে কিছু রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়।
২। MDA বেশি থাকলে কি ভ্যাকসিন কাজ নাও করতে পারে?
হ্যাঁ। কিছু লাইভ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে বেশি MDA ভ্যাকসিন ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে, ফলে প্রত্যাশিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি নাও হতে পারে।
৩। অপুষ্টি কি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমায়?
হ্যাঁ। প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি থাকলে অ্যান্টিবডি উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা হ্রাস পেতে পারে।
৪। কোন রোগগুলো ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়?
গাম্বোরো (IBD), মেরেকস, রিও, মাইকোটক্সিকোসিসসহ ইমিউনোসাপ্রেসিভ রোগগুলো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়, ফলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমতে পারে।
৫। ভালো হ্যাচারি থেকে বাচ্চা নেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সুস্থ প্যারেন্ট ফ্লক ও পরিচ্ছন্ন হ্যাচারি থেকে উৎপাদিত বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকে এবং ভ্যাকসিনের প্রতিক্রিয়াও সাধারণত ভালো হয়।




