৪র্থ পর্ব: টিকা দেওয়ার পরও কেন রোগ হয়? ভ্যাক্সিন ব্যর্থ হওয়ার কারণ ও প্রতিকার

৪র্থ পর্ব দাও,সীও,মেটা ট্যাগ faq soh
 

রোগ অনাক্রম্যতা (ইমিউনিটি), শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, টিকা ও ভ্যাক্সিনেশন

৪র্থ পর্ব: টিকা দেওয়ার পরও কেন রোগ হয়? ভ্যাক্সিন ব্যর্থ হওয়ার কারণ ও প্রতিকার

অনেক খামারির একটি সাধারণ প্রশ্ন হলো—“টিকা দেওয়ার পরও মুরগি কেন রোগে আক্রান্ত হয়?” বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর কারণ টিকার গুণগত মান নয়; বরং টিকা সংরক্ষণ, প্রয়োগের ভুল, খামার ব্যবস্থাপনা, পাখির স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত বিভিন্ন কারণ এর জন্য দায়ী।


টিকা দেওয়ার পরও কেন রোগ হয়?

ভ্যাক্সিন ব্যর্থ হওয়ার কারণগুলোকে প্রধানত ৬টি ভাগে ভাগ করা যায়।

১। টিকার (Vaccine) সমস্যা

ভালো মানের টিকা না হলে বা টিকার কার্যক্ষমতা নষ্ট হলে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না।

যেমন—

  • কোল্ড চেইন (Cold Chain) ঠিকমতো বজায় না রাখা।
  • সূর্যের আলোতে টিকা রাখা।
  • মেয়াদোত্তীর্ণ টিকা ব্যবহার।
  • টিকার বোতলের ছিপি ঢিলা হওয়া।
  • ভুল pH-এর পানিতে টিকা গলানো।
  • নির্দিষ্ট স্ট্রেইনের পরিবর্তে ভিন্ন স্ট্রেইনের ভাইরাস মাঠে বিদ্যমান থাকা।
  • লাইভ টিকার ভাইরাস মারা যাওয়া।

২। টিকা প্রয়োগের ভুল

সঠিক টিকাও ভুলভাবে প্রয়োগ করলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না।

যেমন—

  • ভুল বয়সে টিকা দেওয়া।
  • ভুল ডোজ প্রয়োগ।
  • নির্ধারিত পথের পরিবর্তে অন্যভাবে টিকা দেওয়া।
  • টিকা গলানোর অনেক পরে ব্যবহার করা।
  • একই সিরিঞ্জে ভুলভাবে ব্যবহার।
  • পানিতে টিকা দেওয়ার সময় জীবাণুনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকা।

৩। মুরগির নিজস্ব সমস্যা

মুরগির শারীরিক অবস্থা খারাপ থাকলে টিকা ঠিকমতো কাজ করে না।

যেমন—

  • অপুষ্টি
  • প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি
  • কৃমি
  • কক্সিডিওসিস
  • মাইকোপ্লাজমোসিস
  • গাম্বোরো
  • মেরেক্স
  • রিও ভাইরাস
  • মাইকোটক্সিনের প্রভাব
  • অতিরিক্ত স্ট্রেস

৪। প্যারেন্ট ফার্ম ও হ্যাচারির সমস্যা

অনেক সময় সমস্যার শুরুই হয় ব্রিডার বা হ্যাচারি থেকে।

যেমন—

  • সালমোনেলা আক্রান্ত প্যারেন্ট ফ্লক
  • কুসুম পচা (Yolk Sac Infection)
  • অপর্যাপ্ত Maternal Antibody (MDA)
  • ভিন্ন ভিন্ন প্যারেন্ট ফ্লকের বাচ্চা একত্রে পালন
  • হ্যাচারির দুর্বল বায়োসিকিউরিটি

৫। খাদ্য ও পুষ্টির সমস্যা

সুষম খাদ্য ছাড়া শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না।

বিশেষ করে—

  • মাইকোটক্সিনযুক্ত খাদ্য
  • ছত্রাকযুক্ত খাদ্য
  • নিম্নমানের কাঁচামাল
  • ভিটামিন A, E ও Selenium-এর ঘাটতি
  • পর্যাপ্ত প্রোটিনের অভাব

এসব কারণে টিকার পর এন্টিবডির মাত্রা কম হতে পারে।


৬। খামার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি

ভালো টিকা দিয়েও বায়োসিকিউরিটি না মানলে রোগ প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

যেমন—

  • দর্শনার্থীর অবাধ প্রবেশ
  • অপরিষ্কার শেড
  • জীবাণুনাশক ব্যবহার না করা
  • ইঁদুর ও বন্য পাখির প্রবেশ
  • মৃত পাখি সঠিকভাবে অপসারণ না করা
  • একই সরঞ্জাম বিভিন্ন খামারে ব্যবহার

ভ্যাক্সিন টাইটার ও এন্টিবডি টাইটারের পার্থক্য

ভ্যাক্সিন টাইটার বলতে বোঝায় একটি টিকায় কত পরিমাণ কার্যকর জীবাণু বা এন্টিজেন রয়েছে।

অন্যদিকে এন্টিবডি টাইটার হলো টিকা দেওয়ার পর শরীরে কতটুকু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে তার পরিমাপ।

অর্থাৎ—

  • Vaccine Titer = টিকার ক্ষমতা
  • Antibody Titer = শরীরের প্রতিক্রিয়া

দুটো এক বিষয় নয়।


ভ্যাক্সিন ব্যর্থতা কমানোর উপায়

  • নির্ভরযোগ্য কোম্পানির টিকা ব্যবহার করুন।
  • কোল্ড চেইন বজায় রাখুন।
  • নির্ধারিত বয়সে টিকা দিন।
  • অসুস্থ পাখিকে টিকা দেবেন না।
  • সুষম খাদ্য নিশ্চিত করুন।
  • বায়োসিকিউরিটি কঠোরভাবে অনুসরণ করুন।
  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করুন।
  • প্রয়োজনে ELISA বা টাইটার পরীক্ষা করুন।

মনে রাখবেন

শুধু টিকা দিলেই রোগ প্রতিরোধ হয় না। টিকা, পুষ্টি, বায়োসিকিউরিটি, পরিবেশ, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং খামারির দক্ষতা—সবকিছু মিলেই একটি সফল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

১। টিকা দেওয়ার পরও মুরগি কেন রোগে আক্রান্ত হয়?

টিকার ভুল সংরক্ষণ, ভুল প্রয়োগ, স্ট্রেস, অপুষ্টি, ইমিউনোসাপ্রেসিভ রোগ, দুর্বল বায়োসিকিউরিটি এবং খামার ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে টিকা দেওয়ার পরও রোগ হতে পারে।

২। কোল্ড চেইন (Cold Chain) কেন গুরুত্বপূর্ণ?

কোল্ড চেইন বজায় না থাকলে টিকার কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, ফলে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না।

৩। ভ্যাক্সিন টাইটার ও এন্টিবডি টাইটারের পার্থক্য কী?

ভ্যাক্সিন টাইটার টিকার কার্যকর জীবাণু বা এন্টিজেনের পরিমাণ বোঝায়, আর এন্টিবডি টাইটার বোঝায় টিকা দেওয়ার পর শরীরে কতটুকু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

৪। অপুষ্টিতে টিকা কম কার্যকর হয় কেন?

প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতিতে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে পর্যাপ্ত এন্টিবডি তৈরি হয় না এবং টিকার কার্যকারিতা কমে যায়।

৫। মাইকোটক্সিন কীভাবে ভ্যাক্সিনের কার্যকারিতা কমায়?

মাইকোটক্সিন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দমন (Immunosuppression) করে, ফলে টিকার পর পর্যাপ্ত ইমিউন প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে না।

৬। ভ্যাক্সিন ব্যর্থতা কমাতে কী করা উচিত?

সঠিক বয়সে টিকা দেওয়া, কোল্ড চেইন বজায় রাখা, সুস্থ পাখিকে টিকা দেওয়া, সুষম খাদ্য প্রদান, বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে ELISA বা এন্টিবডি টাইটার পরীক্ষা করা উচিত।

Scroll to Top