লেয়ার মুরগির লাইটিং প্রোগ্রাম: ওজন, প্রোডাকশন ও মিড-নাইট লাইটিং (পর্ব-২)

লেয়ার মুরগির লাইটিং প্রোগ্রাম: ওজন, প্রোডাকশন ও মিড-নাইট লাইটিং (পর্ব-২)

পূর্ববর্তী পর্বে আমরা লাইটিং প্রোগ্রামের গুরুত্ব এবং সিস্টেম-১ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এই পর্বে আলোচনা করা হবে সিস্টেম-২ ও সিস্টেম-৩, কখন আলো বাড়ানো উচিত, ওজন ও ডিম উৎপাদনের ভিত্তিতে লাইটিং প্রোগ্রাম নির্ধারণ এবং মিড-নাইট (Midnight) লাইটিং ব্যবস্থাপনা।

একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—লেয়ার মুরগির ক্ষেত্রে আলো বাড়ানো খুব সহজ, কিন্তু ভুল সময়ে আলো বাড়ালে তার ক্ষতি পুরো উৎপাদনকাল জুড়ে বহন করতে হতে পারে।


সিস্টেম-২: ডিম উৎপাদনের ভিত্তিতে আলো বৃদ্ধি

এই পদ্ধতিতে বয়সের পরিবর্তে ডিম উৎপাদনের হার (Production %) কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নিয়ম

  • শীতকালে যখন ফ্লকের ডিম উৎপাদন ৫% হবে, তখন প্রথমবার ১ ঘণ্টা কৃত্রিম আলো যোগ করতে হবে।
  • গ্রীষ্মকালে ডিম উৎপাদন ১০% হলে প্রথমবার ১ ঘণ্টা আলো বাড়ানো যায়।

এরপর প্রতি সপ্তাহে ৩০ মিনিট করে আলো বৃদ্ধি করতে হবে, যতক্ষণ না মোট আলো ১৫–১৬ ঘণ্টা হয়।

এই পদ্ধতি বিশেষ করে সেই খামারগুলোর জন্য কার্যকর, যেখানে সব মুরগির বডি ওয়েট প্রায় সমান এবং উৎপাদন স্বাভাবিক গতিতে শুরু হয়।


সিস্টেম-৩: সপ্তাহভিত্তিক আলো কমানোর পদ্ধতি

আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো সপ্তাহভিত্তিক লাইটিং নিয়ন্ত্রণ।

নিয়ম

  • প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১ ঘণ্টা করে আলো কমানো হয়।
  • ১২ সপ্তাহ বয়সে মোট আলো প্রায় ১৩ ঘণ্টা রাখা হয়।
  • এই আলো ১৮–১৯ সপ্তাহ পর্যন্ত বজায় রাখা হয়।

যখন ফ্লকের প্রায় ৮০% বাদামী লেয়ারের ওজন ১৫০০–১৫৫০ গ্রাম (সাদা লেয়ারের ক্ষেত্রে প্রায় ১৩৫০ গ্রাম) হবে, তখন প্রথমবার ১ ঘণ্টা আলো বাড়িয়ে মোট ১৪ ঘণ্টা করা হয়।

পরবর্তীতে প্রতি সপ্তাহে ৩০ মিনিট করে আলো বাড়িয়ে মোট ১৫–১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত নেওয়া হয়।


আলো বাড়ানোর সঠিক সময় নির্ধারণ

আলো বাড়ানোর ক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়।

পদ্ধতি-১: বডি ওয়েট দেখে

বাদামী লেয়ার

ফ্লকের কমপক্ষে ৮০% মুরগির ওজন ১৫০০–১৫৫০ গ্রাম হলে আলো বাড়ানো শুরু করা উচিত।

সাদা লেয়ার

ওজন প্রায় ১৩৫০ গ্রাম হলে আলো বাড়ানো যেতে পারে।

এই অবস্থায় প্রথমবার ১ ঘণ্টা আলো যোগ করা হয়।


পদ্ধতি-২: ডিম উৎপাদনের হার দেখে

যদি—

  • শীতকালে ৫%
  • গ্রীষ্মকালে ১০%

ডিম উৎপাদন শুরু হয়, তাহলে আলো বাড়ানো যেতে পারে।

এরপর প্রতি সপ্তাহে ৩০ মিনিট করে আলো বাড়িয়ে মোট ১৫–১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত নেওয়া হয়।

মনে রাখবেন: দুটি পদ্ধতির যেকোনো একটি অনুসরণ করলেই যথেষ্ট। একই সঙ্গে দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই।


এই ওজন বা প্রোডাকশন সাধারণত কত সপ্তাহে আসে?

বাদামী লেয়ার

সাধারণত ১৯–২১ সপ্তাহ বয়সে।

সাদা লেয়ার

সাধারণত ১৭–১৮ সপ্তাহ বয়সে।

তবে এটি নির্ভর করে—

  • জাত
  • পুষ্টি
  • ব্যবস্থাপনা
  • স্বাস্থ্য
  • পরিবেশ
  • বডি ওয়েট

এর উপর।


কখন মিড-নাইট (Midnight) লাইটিং প্রয়োজন হয়?

সব ফ্লকে মিড-নাইট লাইটিং প্রয়োজন হয় না।

নিচের পরিস্থিতিতে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে—

  • মুরগির ওজন কম হলে
  • খাবার গ্রহণ কম হলে
  • অতিরিক্ত গরম আবহাওয়ায়
  • ডিম পাড়ার শুরুতে খাদ্য গ্রহণ কম হলে
  • পিক প্রোডাকশনের সময় অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করতে

মিড-নাইট লাইটিং কীভাবে দেবেন?

রাতে মূল আলো বন্ধ হওয়ার প্রায় ৩ ঘণ্টা পরে আবার ১–১.৫ ঘণ্টা আলো জ্বালানো হয়।

এই সময় মুরগি উঠে খাবার ও পানি গ্রহণ করে।

অনেক ক্ষেত্রে প্রতি মুরগি অতিরিক্ত প্রায় ৫ গ্রাম পর্যন্ত খাদ্য গ্রহণ করতে পারে, যা বডি ওয়েট ও ডিম উৎপাদন ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

এটি সাধারণত ৭–৮ সপ্তাহ বয়সের পর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা যায়।


মিড-নাইট লাইটিংয়ের সুবিধা

সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে—

  • খাদ্য গ্রহণ বৃদ্ধি পায়।
  • কম ওজনের মুরগির বৃদ্ধি ভালো হয়।
  • পিক প্রোডাকশনে শক্তির ঘাটতি কমে।
  • গরম আবহাওয়ায় দিনের কম খাদ্য গ্রহণের ক্ষতি কিছুটা পূরণ করা যায়।

মিড-নাইট লাইটিং বন্ধ করার নিয়ম

অনেক খামারি একদিনেই এই অতিরিক্ত আলো বন্ধ করে দেন।

এটি ঠিক নয়।

বন্ধ করতে হবে ধীরে ধীরে।

নিয়ম

প্রতিদিন ১৫ মিনিট করে কমিয়ে মিড-নাইট লাইটিং বন্ধ করতে হবে।

তবে নতুন করে আলো বাড়ানোর সময় একবারেই বাড়ানো যায়।


একটি সাধারণ ভুল

অনেক খামারে প্রথম এক মাস ২৪ ঘণ্টা আলো দেওয়া হয়।

এটি দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যেমন—

  • অস্থিরতা বৃদ্ধি
  • ক্যানিবালিজম (Cannibalism)
  • অস্বাভাবিক আচরণ
  • অপ্রয়োজনীয় শক্তি অপচয়

তাই বয়সভিত্তিক সঠিক লাইটিং প্রোগ্রাম অনুসরণ করাই উত্তম।


গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

✔ শুধু বয়স দেখে আলো বাড়াবেন না।

✔ প্রথমে বডি ওয়েট মূল্যায়ন করুন।

✔ ওজন কম থাকলে লাইটিং বাড়াতে দেরি করাই ভালো।

✔ অকাল আলো বৃদ্ধি করলে প্রোলাপ্স, ছোট ডিম এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

✔ প্রতিটি ফ্লকের জন্য একই লাইটিং প্রোগ্রাম উপযুক্ত নাও হতে পারে। প্রয়োজন হলে প্রাণিচিকিৎসক বা পোল্ট্রি পরামর্শকের পরামর্শ নিন।


উপসংহার

লেয়ার ফার্মে সফল উৎপাদনের জন্য আলো বাড়ানোর সময় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়সের পাশাপাশি বডি ওয়েট, খাদ্য গ্রহণ এবং ডিম উৎপাদনের হার বিবেচনা করে লাইটিং প্রোগ্রাম পরিচালনা করলে অকাল যৌন পরিপক্বতা, প্রোলাপ্স এবং উৎপাদন হ্রাসের মতো সমস্যা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। প্রয়োজনে মিড-নাইট লাইটিং ব্যবহার করে খাদ্য গ্রহণও বাড়ানো যায়।

পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে—

  • লাক্স (Lux), লুমেন (Lumen) ও ফুট-ক্যান্ডেল (Foot Candle) কী?
  • আলোর তীব্রতা কীভাবে নির্ণয় করবেন?
  • কোন বয়সে কত লাক্স প্রয়োজন?
  • ওয়াট, লুমেন ও আলোর বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক

FAQ

১. আলো বাড়ানোর সবচেয়ে ভালো নির্দেশক কী?

বয়সের চেয়ে বডি ওয়েট এবং ডিম উৎপাদনের হার বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২. বাদামী লেয়ারের ক্ষেত্রে কখন আলো বাড়াতে হবে?

যখন ফ্লকের প্রায় ৮০% মুরগির ওজন ১৫০০–১৫৫০ গ্রাম হবে।

৩. সাদা লেয়ারের ক্ষেত্রে কখন আলো বাড়ানো যায়?

প্রায় ১৩৫০ গ্রাম বডি ওয়েট হলে।

৪. মিড-নাইট লাইটিং কী?

রাতে মূল আলো বন্ধ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে ১–১.৫ ঘণ্টা অতিরিক্ত আলো দিয়ে মুরগিকে খাবার খাওয়ানোর একটি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি।

৫. মিড-নাইট লাইটিং কখন প্রয়োজন হয়?

কম ওজন, কম খাদ্য গ্রহণ, গরম আবহাওয়া এবং পিক প্রোডাকশনের সময় প্রয়োজন হতে পারে।

৬. মিড-নাইট লাইটিং কীভাবে বন্ধ করবেন?

প্রতিদিন ১৫ মিনিট করে কমিয়ে ধীরে ধীরে বন্ধ করতে হবে।

৭. প্রথম মাস ২৪ ঘণ্টা আলো দেওয়া কি উচিত?

সাধারণভাবে না। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত আলো অস্বাভাবিক আচরণ ও ক্যানিবালিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৮. সর্বোচ্চ কত ঘণ্টা আলো দেওয়া উচিত?

সাধারণত দিনের আলো ও কৃত্রিম আলো মিলিয়ে মোট ১৫–১৬ ঘণ্টা।

Scroll to Top