ব্রয়লারে IB রোগে শ্বাসনালিতে মিউকাস প্লাগ তৈরি হয় কেন? কারণ, লক্ষণ ও করণীয়
ব্রয়লার মুরগির ইনফেকশাস ব্রংকাইটিস (Infectious Bronchitis বা IB) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এ রোগে শ্বাসনালিতে অতিরিক্ত মিউকাস বা শ্লেষ্মা জমে শ্বাসকষ্ট, ঘড়ঘড় শব্দ এবং কখনো শ্বাসনালি বন্ধ হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তবে মিউকাস সরাসরি ভাইরাস তৈরি করে না। মূলত ভাইরাসের আক্রমণে শ্বাসনালির স্বাভাবিক পরিষ্কারকরণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রদাহজনিত কারণে মিউকাস ও নিঃসরণ জমতে থাকে।
IB রোগে মিউকাস জমার প্রধান ৩টি কারণ
১. সিলিয়া ধ্বংস (Ciliary Damage)
মুরগির শ্বাসনালির ভেতরে অসংখ্য ক্ষুদ্র চুলের মতো গঠন থাকে, যাকে সিলিয়া (Cilia) বলা হয়।
এগুলো শ্বাসনালির মিউকাস, ধুলাবালি ও জীবাণু বাইরে বের করে দিতে সাহায্য করে। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় Mucociliary Clearance।
IB ভাইরাস শ্বাসনালির সিলিয়াযুক্ত কোষকে আক্রমণ করে। ফলে সিলিয়ার কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় এবং মিউকাস স্বাভাবিকভাবে বাইরে বের হতে পারে না।
ফলাফল: শ্বাসনালির ভেতরে মিউকাস জমতে শুরু করে।
২. অতিরিক্ত মিউকাস তৈরি (Mucus Hypersecretion)
শ্বাসনালির গবলেট সেল (Goblet Cell) মিউকাস উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
IB ভাইরাসের সংক্রমণে শ্বাসনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। প্রদাহজনিত পরিবর্তনের ফলে মিউকাস উৎপাদন ও নিঃসরণ বেড়ে যেতে পারে।
কিন্তু সিলিয়া ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় অতিরিক্ত মিউকাস সহজে বের হতে পারে না।
ফলাফল: জমে থাকা মিউকাস ধীরে ধীরে ঘন হয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
৩. শ্বাসনালির প্রদাহ ও তরল নিঃসরণ (Inflammation and Exudation)
IB ভাইরাসের কারণে শ্বাসনালির আবরণে প্রদাহ, রক্তনালির প্রসারণ এবং টিস্যুতে ফোলা দেখা দিতে পারে।
প্রদাহজনিত তরল, মিউকাস ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষের অবশিষ্টাংশ একত্রিত হয়ে শ্বাসনালিতে ঘন নিঃসরণ তৈরি করতে পারে।
মিউকাস প্লাগ তৈরির উপাদান:
অতিরিক্ত মিউকাস ও মিউসিন
ক্ষতিগ্রস্ত শ্বাসনালির এপিথেলিয়াল কোষ
প্রদাহজনিত তরল ও প্রোটিন
কোষীয় ধ্বংসাবশেষ
এই উপাদানগুলো একত্রে জমে শ্বাসনালির ভেতরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
ব্রয়লার মুরগিতে এটি কেন বেশি বিপজ্জনক?
ব্রয়লার মুরগির দ্রুত বৃদ্ধি, শ্বাসতন্ত্রের ওপর অক্সিজেনের চাহিদা এবং খামারের পরিবেশগত চাপের কারণে শ্বাসতন্ত্রের রোগে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
শ্বাসনালিতে ঘন মিউকাস জমলে বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এতে মুরগি হাঁ করে শ্বাস নেওয়া, ঘড়ঘড় শব্দ করা এবং খাবার গ্রহণ কমিয়ে দেওয়ার মতো লক্ষণ প্রকাশ করতে পারে।
এ ছাড়া সিলিয়ার কার্যক্ষমতা নষ্ট হলে E. coli ও Mycoplasmaসহ অন্যান্য জীবাণুর সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
ফলে জটিল অবস্থায় Airsacculitis, Colibacillosis বা জটিল শ্বাসতন্ত্রের রোগ দেখা দিতে পারে।
পোস্টমর্টেমে কী কী পরিবর্তন দেখা যায়?
IB আক্রান্ত মুরগির পোস্টমর্টেমে নিম্নলিখিত পরিবর্তন পাওয়া যেতে পারে:
শ্বাসনালির ভেতরে স্বচ্ছ বা ঘোলা মিউকাস
শ্বাসনালির আবরণ লাল ও প্রদাহযুক্ত হওয়া
শ্বাসনালিতে মিউকাস জমে থাকা
জটিল সংক্রমণে এয়ারস্যাকে ঘোলাটে ভাব বা প্রদাহ
সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে এয়ারস্যাকে ফাইব্রিনাস বা চিজের মতো পদার্থ জমা হওয়া
বিশেষ দ্রষ্টব্য: শ্বাসনালিতে শক্ত প্লাগ বা চিজের মতো পদার্থ পাওয়া গেলেই IB নিশ্চিত করা যায় না। Infectious Laryngotracheitis (ILT), Newcastle Disease এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগের সঙ্গেও পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে।
IB রোগে মিউকাস জমলে করণীয়
১. পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ: খামারে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন বজায় রাখতে হবে। অতিরিক্ত অ্যামোনিয়া, ধুলাবালি, ঠান্ডা বাতাসের সরাসরি প্রবাহ ও তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তন এড়াতে হবে।
২. তাপমাত্রা ব্যবস্থাপনা: বয়স, আবহাওয়া ও মুরগির আচরণ অনুযায়ী উপযুক্ত তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে। ঠান্ডাজনিত চাপ কমানো উপকারী হতে পারে, তবে অতিরিক্ত তাপমাত্রা শ্বাসকষ্ট বাড়াতে পারে।
৩. মিউকাস ব্যবস্থাপনা: Bromhexine বা Ambroxol জাতীয় মিউকোলাইটিকের ব্যবহার বিবেচনার ক্ষেত্রে পোল্ট্রিতে সংশ্লিষ্ট ওষুধের অনুমোদন, কার্যকারিতার প্রমাণ, প্রস্তুতির ঘনত্ব ও সঠিক ব্যবহারবিধি মূল্যায়ন করা জরুরি। এগুলো IB ভাইরাস ধ্বংস করে না।
৪. সেকেন্ডারি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ: IB একটি ভাইরাসজনিত রোগ। তাই অ্যান্টিবায়োটিক সরাসরি IB ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। তবে ব্যাকটেরিয়াজনিত জটিল সংক্রমণ শনাক্ত হলে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে।
৫. প্রতিরোধ: উপযুক্ত ভ্যাকসিনেশন, বায়োসিকিউরিটি, খামার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সঠিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা IB নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
উপসংহার
ব্রয়লারে IB রোগে শ্বাসনালিতে মিউকাস জমার প্রধান কারণ হলো সিলিয়ার ক্ষতি, মিউকাস নিঃসরণ বৃদ্ধি এবং প্রদাহজনিত পরিবর্তন।
এই তিনটি প্রক্রিয়ার সম্মিলিত প্রভাবে শ্বাসনালিতে মিউকাস জমে শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হলে রোগের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
তাই শুধু মিউকাস কমানোর দিকে গুরুত্ব না দিয়ে শ্বাসতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং সেকেন্ডারি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক: ডা. মোঃ শুহোরাব হোসাইন
Poultry Doctors BD
ওয়েবসাইট: https://www.poultrydoctorsbd.com/
