পোল্ট্রির ডিম উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ (২য় পর্ব) পুষ্টিগত (Nutritional) কারণ: খাদ্যের ঘাটতি, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, ভিটামিন ও মাইকোটক্সিনের প্রভাব

পোল্ট্রির ডিম উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ (২য় পর্ব)

পুষ্টিগত (Nutritional) কারণ: খাদ্যের ঘাটতি, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, ভিটামিন ও মাইকোটক্সিনের প্রভাব

প্রথম পর্বে আমরা ব্যবস্থাপনাগত (Management) কারণ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই পর্বে আলোচনা করা হবে খাদ্য ও পুষ্টিগত (Nutritional) কারণ, যা বর্তমানে লেয়ার খামারে ডিম উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

বর্তমানে ভালো মানের খাদ্য উপাদানের সংকট, নিম্নমানের কাঁচামাল, মাইকোটক্সিন, ভুল ফর্মুলেশন এবং খনিজ ও ভিটামিনের ঘাটতির কারণে অনেক খামারেই প্রত্যাশার তুলনায় কম ডিম পাওয়া যাচ্ছে।


১. সুষম খাদ্যের অভাব

ডিম উৎপাদনের জন্য শুধু বেশি খাবার দিলেই হবে না, সুষম (Balanced) খাদ্য দিতে হবে।

খাদ্যে যদি এনার্জি, প্রোটিন, অ্যামাইনো অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন বা মিনারেলের ঘাটতি থাকে, তাহলে—

  • ডিম কমে যায়
  • ডিম ছোট হয়
  • খোসা পাতলা হয়
  • উৎপাদন দীর্ঘদিন কম থাকে

২. প্রোটিনের ঘাটতি

ডিমের প্রধান উপাদান প্রোটিন।

যদি খাদ্যে পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকে তাহলে—

  • ডিম উৎপাদন কমে যায়
  • ডিম ছোট হয়
  • ওভিডাক্ট দুর্বল হয়ে Prolapse হতে পারে
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়

সাধারণভাবে লেয়ার খাদ্যে ১৬-১৮% Crude Protein এবং প্রায় ১৪% Digestible Protein থাকা উচিত।


৩. মিথিওনিন ও অন্যান্য অ্যামাইনো অ্যাসিডের ঘাটতি

মিথিওনিন, লাইসিন, থ্রিওনিনসহ প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডের অভাবে—

  • Peak Production কমে যায়
  • ডিমের ওজন কমে
  • Feed Conversion খারাপ হয়
  • উৎপাদন দীর্ঘদিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়

৪. ক্যালসিয়ামের ঘাটতি

ডিমের খোসা তৈরিতে প্রতিদিন প্রচুর ক্যালসিয়াম প্রয়োজন।

প্রায় ৬০ গ্রাম ওজনের একটি ডিমে প্রায় ২.৫ গ্রাম খোসা থাকে।

তাই প্রোডাকশন শুরু হওয়ার পর ক্যালসিয়ামের চাহিদা গ্রোয়িং সময়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়।

ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতে—

  • পাতলা খোসার ডিম
  • Soft shell egg
  • Shell-less egg
  • ডিম কমে যায়
  • Brittle Bone
  • Cage Layer Fatigue দেখা দেয়

৫. ক্যালসিয়ামের মান ও পার্টিকেল সাইজ

সব ক্যালসিয়াম সমান নয়।

অনেক সময় বাজারের নিম্নমানের ক্যালসিয়াম ব্যবহার করলে ঘাটতি থেকেই যায়।

বড় পার্টিকেল সাইজের ক্যালসিয়াম ধীরে ধীরে দ্রবীভূত হয় এবং রাতে ডিমের খোসা তৈরিতে সাহায্য করে।


৬. ক্যালসিয়াম-ফসফরাসের ভারসাম্য

শুধু ক্যালসিয়াম বাড়ালেই হবে না।

ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের অনুপাত ঠিক না থাকলে ক্যালসিয়াম ঠিকমতো শোষিত হয় না।

ফলে—

  • ডিম কমে
  • খোসা পাতলা হয়
  • হাড় দুর্বল হয়

৭. ভিটামিন D₃-এর ঘাটতি

ভিটামিন D₃ ছাড়া ক্যালসিয়াম শোষণ সম্ভব নয়।

অভাবে—

  • ক্যালসিয়াম শোষণ কমে
  • পাতলা খোসা হয়
  • ডিম উৎপাদন কমে

৮. লবণ (Salt) ও সোডিয়ামের ঘাটতি

খাদ্যে সাধারণত ০.৫–১% লবণ প্রয়োজন।

সোডিয়াম—

  • শরীরের তরল ভারসাম্য রক্ষা করে
  • ক্ষুধা বাড়ায়
  • পুষ্টি শোষণে সাহায্য করে
  • ডিম উৎপাদন বজায় রাখে

ঘাটতি হলে—

  • খাবার কম খায়
  • Cannibalism হতে পারে
  • ডিম ৮-১০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে

আবার অতিরিক্ত লবণ দিলে—

  • পাতলা পায়খানা
  • লিটার ভিজে যাওয়া
  • খোসার মান খারাপ হওয়া

৯. ফ্যাট ও লিনোলেইক অ্যাসিডের ঘাটতি

ভালো মানের তেল শক্তির উৎস এবং ডিম উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ঘাটতি হলে—

  • ডিমের ওজন কমে
  • উৎপাদন কমে

সাধারণভাবে খাদ্যে ১-৩% উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করা উপকারী।


১০. ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি

Premix বা Multivitamin-Mineral-এর ঘাটতি হলে—

  • ক্ষুধা কমে
  • ডিম কমে
  • ডিমের খোসার মান খারাপ হয়
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়

১১. মাইকোটক্সিন

বর্তমানে ডিম কমে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ মাইকোটক্সিন

মাইকোটক্সিনের কারণে—

  • লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়
  • টাইটার কমে যায়
  • ভ্যাকসিন ঠিকমতো কাজ করে না
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে
  • ডিম উৎপাদন কমে
  • পাতলা খোসা হয়

বর্ষাকালে এর ঝুঁকি আরও বেশি থাকে।


১২. অ্যান্টিকক্সিডিয়াল ওষুধের প্রভাব

কিছু ওষুধ যেমন—

  • Nicarbazin
  • Monensin

প্রোডাকশন পিরিয়ডে ব্যবহার করলে—

  • ডিম কমে যেতে পারে
  • ডিমের খোসার রঙ পরিবর্তন হতে পারে
  • প্রজননতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে

তাই ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়।


খামারিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

✔ সব সময় ভালো মানের খাদ্য ব্যবহার করুন।

✔ নিয়মিত মাইকোটক্সিনের ঝুঁকি মূল্যায়ন করুন।

✔ ভালো মানের ক্যালসিয়াম ও Premix ব্যবহার করুন।

✔ খাদ্য হঠাৎ পরিবর্তন করবেন না।

✔ কাঁচামালের গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন।

✔ লিভার সুরক্ষায় প্রয়োজন অনুযায়ী টক্সিন বাইন্ডার ও লিভার সাপোর্ট ব্যবহার করুন।


উপসংহার

বর্তমানে লেয়ার খামারে ডিম উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পুষ্টিগত ঘাটতি ও নিম্নমানের খাদ্য। শুধুমাত্র ওষুধ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সঠিক খাদ্য ফর্মুলেশন, ভালো মানের কাঁচামাল, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল এবং মাইকোটক্সিন নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করলেই ডিম উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব।

Scroll to Top