কি কি কারণে ডিমের রং, খোসা ও আকার পরিবর্তন হয়? (A to Z গাইড) – পর্ব ২

কি কি কারণে ডিমের রং, খোসা ও আকার পরিবর্তন হয়? (A to Z গাইড) – পর্ব ২

প্রথম পর্বে আমরা ডিমের রং পরিবর্তন, পাতলা খোসা, নরম খোসা, ফাটা ও বিকৃত খোসার বিভিন্ন কারণ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই পর্বে আলোচনা করা হবে ডিমের আকার, কুসুম, অ্যালবুমিন এবং অন্যান্য অস্বাভাবিক ডিমের সমস্যা সম্পর্কে।


১. ডিম ছোট হওয়ার কারণ

ছোট ডিম উৎপাদনের পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। প্রধান কারণগুলো হলো—

  • নির্ধারিত ওজন হওয়ার আগেই ডিম উৎপাদন শুরু হলে
  • খাদ্যে প্রোটিন ও এনার্জির ঘাটতি
  • মেথিওনিনের ঘাটতি
  • লিনোলেইক অ্যাসিডের অভাব
  • অতিরিক্ত গরমে খাদ্য গ্রহণ কমে গেলে
  • পর্যাপ্ত পানি না খেলে
  • ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB)
  • অল্প বয়সে অতিরিক্ত আলো দিয়ে উৎপাদনে আনা
  • খাদ্যে মাইকোটক্সিন থাকলে

২. ডিম বড় হওয়ার কারণ

স্বাভাবিকের চেয়ে বড় ডিম সাধারণত দেখা যায়—

  • বংশগত বৈশিষ্ট্যের কারণে
  • মুরগির বয়স বেশি হলে
  • উৎপাদন দেরিতে শুরু হলে
  • মোল্টিং শেষে পুনরায় ডিম উৎপাদন শুরু হলে
  • শরীরের ওজন বেশি হলে

৩. দুই কুসুম (Double Yolk Egg) কেন হয়?

দুই কুসুমযুক্ত ডিম দেখতে আকর্ষণীয় হলেও এটি স্বাভাবিক ডিম নয়।

এর কারণ—

  • একসাথে দুটি ডিম্বাণু পরিপক্ক হওয়া
  • অতিরিক্ত ওজনের মুরগি
  • অতিরিক্ত পুষ্টিকর খাদ্য
  • অনিয়মিত ওভুলেশন
  • উৎপাদনের শুরুতে বেশি দেখা যায়

৪. মুরগির শরীরের ভিতরে ডিম ভেঙে যাওয়ার কারণ

কখনও কখনও ডিম শরীরের ভেতরেই ভেঙে যায়।

সম্ভাব্য কারণ—

  • ডিমের খোসা খুব পাতলা হওয়া
  • জরায়ুর কার্যক্রমে সমস্যা
  • ডিম দীর্ঘ সময় প্রজননতন্ত্রে আটকে থাকা
  • ডিম পাড়ার সময় অতিরিক্ত চাপ
  • অভ্যন্তরীণ আঘাত

৫. গোলাকার ডিম কেন হয়?

গোল বা প্রায় গোল ডিমের কারণ—

  • বংশগত বৈশিষ্ট্য
  • ব্রিডিং নির্বাচনে ত্রুটি
  • ডিম্বনালির স্বাভাবিক সংকোচনে সমস্যা

৬. চ্যাপ্টা বা চাপা ডিম কেন হয়?

চ্যাপ্টা ডিম সাধারণত দেখা যায়—

  • ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB)
  • জরায়ুর ওপর অতিরিক্ত চাপ
  • ডিম তৈরির সময় যান্ত্রিক সমস্যা

৭. কুসুমের রং কেন পরিবর্তন হয়?

ডিমের কুসুমের রং মূলত খাদ্যের ওপর নির্ভর করে।

গাঢ় হলুদ বা কমলা কুসুম

  • ভুট্টা (Maize)
  • কর্ন গ্লুটেন মিল
  • লুসার্ন মিল
  • মেরিগোল্ড পাপড়ি
  • জ্যান্থোফিল সমৃদ্ধ খাদ্য

হালকা কুসুম

  • জ্যান্থোফিলের অভাব
  • নিম্নমানের খাদ্য
  • কিছু শস্যভিত্তিক রেশন

অস্বাভাবিক কুসুমের রং

  • কটন সিড মিল
  • গসিপল বিষক্রিয়া
  • কিছু নিম্নমানের খাদ্য উপাদান

৮. চিজের মতো কুসুম (Cheesy Yolk)

এই সমস্যা দেখা দিতে পারে—

  • ডিম দীর্ঘদিন হিমায়িত থাকলে
  • তুলাবীজের তেলযুক্ত খাদ্য ব্যবহার করলে

৯. চ্যাপ্টা কুসুম

এর সম্ভাব্য কারণ—

  • নিকারবাজিন
  • দীর্ঘদিন উচ্চ তাপমাত্রায় ডিম সংরক্ষণ

১০. ডিমে রক্ত বা মাংসের দাগ কেন হয়?

ডিম ভাঙার পর কুসুমের মধ্যে ছোট রক্তের দাগ বা মাংসের মতো অংশ দেখা যেতে পারে।

সম্ভাব্য কারণ—

  • ডিম্বাশয়ের ক্ষুদ্র রক্তনালী ফেটে যাওয়া
  • হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তন
  • ঠান্ডাজনিত স্ট্রেস
  • ভিটামিনের ঘাটতি
  • মাইকোটক্সিন
  • ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB)
  • অতিরিক্ত ভয় বা স্ট্রেস

১১. ডিমের অ্যালবুমিন (সাদা অংশ) পাতলা হওয়ার কারণ

অ্যালবুমিনের মান খারাপ হলে ডিমের গুণগত মান কমে যায়।

কারণগুলো—

  • দীর্ঘদিন ডিম সংরক্ষণ
  • উচ্চ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ
  • ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB)
  • নিউক্যাসল রোগ (ND)
  • ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
  • ভিটামিন বি₂-এর ঘাটতি

১২. কেন একই খামারে বিভিন্ন ধরনের ডিম দেখা যায়?

একই খামারে একসঙ্গে পাতলা খোসা, ছোট ডিম, রংহীন ডিম বা বিকৃত ডিম পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এর কারণ হতে পারে—

  • একাধিক রোগ একসঙ্গে থাকা
  • খাদ্যের পুষ্টিগত ভারসাম্যহীনতা
  • গরম বা স্ট্রেস
  • আলো ব্যবস্থাপনার ত্রুটি
  • পানির সমস্যা
  • মাইকোটক্সিন
  • ক্যালসিয়াম, ফসফরাস বা ভিটামিন D₃-এর ঘাটতি

তাই শুধু ডিম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনে রোগ নির্ণয়, খাদ্য বিশ্লেষণ এবং ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।


  • ১. মুরগির ডিম ছোট হয় কেন?

    ডিম উৎপাদনের আগে পর্যাপ্ত ওজন না হওয়া, খাদ্যে প্রোটিন, এনার্জি, মেথিওনিন বা লিনোলেইক অ্যাসিডের ঘাটতি, অতিরিক্ত গরম, ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB), মাইকোটক্সিন এবং পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া ডিম ছোট হওয়ার প্রধান কারণ।

    ২. দুই কুসুমযুক্ত ডিম কেন হয়?

    একসাথে দুটি ডিম্বাণু পরিপক্ক হলে দুই কুসুমযুক্ত ডিম তৈরি হয়। এটি সাধারণত উৎপাদনের শুরুতে বা অতিরিক্ত ওজনের মুরগিতে বেশি দেখা যায়।

    ৩. বড় ডিম হওয়ার কারণ কী?

    বয়স বৃদ্ধি, বংশগত বৈশিষ্ট্য, মোল্টিংয়ের পর পুনরায় ডিম উৎপাদন শুরু এবং বেশি ওজনের মুরগিতে বড় ডিম বেশি দেখা যায়।

    ৪. ডিমের কুসুমের রং হালকা হয় কেন?

    খাদ্যে জ্যান্থোফিল (Xanthophyll), ভুট্টা, মেরিগোল্ড বা অন্যান্য প্রাকৃতিক রঞ্জক কম থাকলে কুসুমের রং হালকা হয়।

    ৫. ডিমে রক্তের দাগ কেন দেখা যায়?

    ডিম্বাশয়ের ক্ষুদ্র রক্তনালী ফেটে গেলে, স্ট্রেস, ভিটামিনের ঘাটতি, মাইকোটক্সিন বা কিছু রোগের কারণে ডিমে রক্তের দাগ দেখা যেতে পারে।

    ৬. ডিমের সাদা অংশ (Albumen) পাতলা হয় কেন?

    ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB), দীর্ঘদিন সংরক্ষণ, উচ্চ তাপমাত্রা, ভিটামিন বি₂-এর ঘাটতি এবং ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের কারণে অ্যালবুমিন পাতলা হতে পারে।

    ৭. গোলাকার বা চ্যাপ্টা ডিম কেন হয়?

    বংশগত কারণ, জরায়ুর সমস্যা, ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস (IB) এবং ডিম তৈরির সময় অতিরিক্ত চাপের কারণে গোলাকার বা চ্যাপ্টা ডিম হতে পারে।

    ৮. একই খামারে বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক ডিম কেন পাওয়া যায়?

    একাধিক রোগ, পুষ্টির ঘাটতি, মাইকোটক্সিন, স্ট্রেস, তাপমাত্রা, আলো ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে একই খামারে বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক ডিম দেখা যেতে পারে।

Scroll to Top