২য় পর্ব: এন্টিবডি, ইমিউনিটির ধরন এবং ভ্যাক্সিন কীভাবে কাজ করে

রোগ অনাক্রম্যতা (ইমিউনিটি), শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, টিকা ও ভ্যাক্সিনেশন

২য় পর্ব: এন্টিবডি, ইমিউনিটির ধরন এবং ভ্যাক্সিন কীভাবে কাজ করে

আগের পর্বে আমরা ইমিউনিটি, টি (T) ও বি (B) লিম্ফোসাইট এবং কোষীয় ও হিউমোরাল ইমিউনিটি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এই পর্বে এন্টিবডি, প্যাসিভ ইমিউনিটি, ভ্যাক্সিনের কার্যপ্রণালী এবং টিকার ধরন সম্পর্কে জানব।


এন্টিবডি (Antibody) কী?

এন্টিবডি হলো শরীরের তৈরি বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক প্রোটিন, যা নির্দিষ্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে।

যখন কোনো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্য বহিরাগত পদার্থ (Antigen) শরীরে প্রবেশ করে, তখন বি-লিম্ফোসাইট প্লাজমা সেলে পরিণত হয়ে এন্টিবডি তৈরি করে।

এই এন্টিবডি—

  • জীবাণুকে নিষ্ক্রিয় করে।
  • জীবাণুর বিষ (Toxin) নিরপেক্ষ করে।
  • জীবাণুকে ম্যাক্রোফেজের মাধ্যমে ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
  • ভবিষ্যতে একই জীবাণু আক্রমণ করলে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

এন্টিবডির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য

  • প্রতিটি এন্টিবডি নির্দিষ্ট জীবাণুর নির্দিষ্ট স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে কাজ করে।
  • এক রোগের এন্টিবডি অন্য রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর হয় না।
  • একই রোগের সব স্ট্রেইনের বিরুদ্ধেও সব সময় সমানভাবে কাজ নাও করতে পারে।

এন্টিবডি উৎপাদনের উপর কী কী বিষয় প্রভাব ফেলে?

এন্টিবডি কত দ্রুত এবং কত বেশি তৈরি হবে তা নির্ভর করে—

  • শরীরে কত পরিমাণ এন্টিজেন প্রবেশ করেছে।
  • জীবাণুর রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা।
  • টিকার ধরন।
  • পাখির স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অবস্থা।
  • স্ট্রেস বা ধকলের মাত্রা।
  • ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারিতা।

এন্টিবডি টাইটার (Antibody Titer)

এন্টিবডির পরিমাণকে টাইটার বলা হয়।

  • টাইটার যত বেশি হবে, সাধারণত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তত ভালো হবে।
  • তবে শুধু বেশি টাইটার থাকলেই শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না।
  • কোষীয় (Cell-mediated) ইমিউনিটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাচ্চা ও বড় মুরগির ইমিউনিটির পার্থক্য

  • বাচ্চা মুরগির রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠে না।
  • তাই বাচ্চার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি এন্টিবডির প্রয়োজন হয়।
  • বয়স্ক মুরগিতে কিছু রোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ইমিউনিটি তৈরি হয়।

প্যাসিভ ইমিউনিটি (Passive Immunity)

যখন পিতামাতা থেকে বাচ্চা প্রস্তুত এন্টিবডি পায়, তখন তাকে প্যাসিভ ইমিউনিটি বলা হয়।

এটি কীভাবে হয়?

  • ব্রিডার মুরগির রক্তে থাকা এন্টিবডি ডিমের কুসুমে জমা হয়।
  • ডিমের ভ্রূণ সেই এন্টিবডি গ্রহণ করে।
  • ফলে বাচ্চা জন্মের পর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সুরক্ষা পায়।

এটিকে Maternal Derived Antibody (MDA) বলা হয়।


প্যাসিভ ইমিউনিটির গুরুত্ব

এর ফলে—

  • বাচ্চা জন্মের পরপরই অনেক ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পায়।
  • রোগের ঝুঁকি কমে।
  • মৃত্যুহার কমে।

তবে এই সুরক্ষা স্থায়ী নয়।


কখন সমস্যা হয়?

যদি—

  • প্যারেন্ট ফ্লকের এন্টিবডি কম থাকে,
  • প্যারেন্টে সঠিক টিকা না দেওয়া হয়,
  • বা ডিমের মাধ্যমে জীবাণু সংক্রমিত হয়,

তাহলে বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়।


ভ্যাক্সিন (Vaccine) কী?

ভ্যাক্সিন হলো এমন একটি জৈব প্রস্তুতি, যাতে জীবন্ত দুর্বল, মৃত অথবা জীবাণুর বিশেষ অংশ (Antigen) থাকে।

এটি শরীরে প্রবেশ করিয়ে রোগ না ঘটিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা হয়।


ভ্যাক্সিনেশন (Vaccination) কী?

যে প্রক্রিয়ায় ভ্যাক্সিন শরীরে প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে এন্টিবডি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা হয়, তাকে ভ্যাক্সিনেশন বলে।


ভ্যাক্সিন কীভাবে কাজ করে?

ভ্যাক্সিন শরীরে প্রবেশ করার পর—

  1. জীবাণুর এন্টিজেনকে ইমিউন সিস্টেম শনাক্ত করে।
  2. টি ও বি লিম্ফোসাইট সক্রিয় হয়।
  3. এন্টিবডি তৈরি হয়।
  4. মেমোরি সেল তৈরি হয়।
  5. ভবিষ্যতে একই জীবাণু আক্রমণ করলে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

ভ্যাক্সিনের প্রধান ধরন

১. জীবন্ত (Live Vaccine)

  • দুর্বল জীবন্ত জীবাণু থাকে।
  • দ্রুত ও শক্তিশালী ইমিউনিটি তৈরি করে।
  • দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম।

২. অ্যাটেনুয়েটেড (Attenuated Vaccine)

  • বিশেষ পদ্ধতিতে জীবাণুর রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা কমানো হয়।
  • নিরাপদভাবে ইমিউনিটি তৈরি করে।
  • অনেক ভাইরাল টিকায় এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।

৩. কিল্ড বা মৃত টিকা (Killed/Inactivated Vaccine)

  • মৃত জীবাণু দিয়ে তৈরি।
  • নিরাপদ হলেও তুলনামূলক কম ইমিউনিটি তৈরি করে।
  • অনেক ক্ষেত্রে বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হয়।

মনে রাখবেন

ভ্যাক্সিন রোগের চিকিৎসা নয়; এটি রোগ হওয়ার আগেই শরীরকে প্রস্তুত করে। তাই সঠিক সময়, সঠিক পদ্ধতি এবং সুস্থ পাখিকে টিকা দেওয়াই সফল ভ্যাক্সিনেশনের মূল চাবিকাঠি।

১। এন্টিবডি (Antibody) কী?

এন্টিবডি হলো শরীরের তৈরি বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক প্রোটিন, যা নির্দিষ্ট ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

২। প্যাসিভ ইমিউনিটি (Passive Immunity) কী?

পিতামাতা মুরগির শরীর থেকে ডিমের কুসুমের মাধ্যমে বাচ্চার শরীরে যে প্রস্তুত এন্টিবডি পৌঁছে যায়, তাকে প্যাসিভ ইমিউনিটি বা Maternal Derived Antibody (MDA) বলা হয়।

৩। ভ্যাক্সিন কীভাবে কাজ করে?

ভ্যাক্সিন শরীরে জীবাণুর অ্যান্টিজেন প্রবেশ করিয়ে ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে, ফলে এন্টিবডি ও মেমোরি সেল তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে একই জীবাণুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়।

৪। লাইভ ও কিল্ড ভ্যাক্সিনের মধ্যে পার্থক্য কী?

লাইভ ভ্যাক্সিন দুর্বল জীবন্ত জীবাণু দিয়ে তৈরি হওয়ায় দ্রুত ও শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। কিল্ড ভ্যাক্সিন মৃত জীবাণু দিয়ে তৈরি হওয়ায় তুলনামূলক নিরাপদ হলেও অনেক ক্ষেত্রে বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হয়।

৫। Maternal Derived Antibody (MDA) কেন গুরুত্বপূর্ণ?

MDA বাচ্চা মুরগিকে জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং সঠিক সময়ে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


Tags

Scroll to Top