পারা ঘাস চাষ পদ্ধতি, ফলন, পুষ্টিগুণ ও গরুকে খাওয়ানোর নিয়ম
ভূমিকা
পারা ঘাস (Para Grass) বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় বহুবর্ষজীবী পশুখাদ্য ঘাস। এটি দ্রুত বৃদ্ধি পায়, বিভিন্ন ধরনের জমিতে জন্মাতে পারে এবং দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন দেয়। বিশেষ করে নিচু, জলাবদ্ধ ও লবণাক্ত এলাকায় অন্যান্য অনেক ঘাসের তুলনায় ভালো ফলন পাওয়া যায়। তাই ডেইরি ও গরু মোটাতাজাকরণ খামারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সবুজ খাদ্য।
পারা ঘাসের পরিচিতি
- উৎপত্তিস্থল: ব্রাজিল
- বৈজ্ঞানিক নাম: Urochloa mutica (Syn. Brachiaria mutica)
- বহুবর্ষজীবী (Perennial) ঘাস
- বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে চাষ হয়।
- একবার রোপণ করলে কয়েক বছর পর্যন্ত উৎপাদন দেয়।
কোথায় ভালো জন্মে?
পারা ঘাস বিভিন্ন ধরনের জমিতে ভালো জন্মাতে পারে।
উপযোগী জমি
- উঁচু জমি
- মাঝারি জমি
- নিচু জমি
- ঢালু জমি
- জলাবদ্ধ এলাকা
- লবণাক্ত মাটি
রোপণের উপযুক্ত সময়
সবচেয়ে ভালো সময়:
- বৈশাখ–আশ্বিন
সেচের ব্যবস্থা থাকলে:
- চৈত্র মাস থেকেও রোপণ করা যায়।
বংশবিস্তার
পারা ঘাস সাধারণত—
- শিকড়সহ চারা
- অথবা কান্ডের কাটিং
দিয়ে রোপণ করা হয়।
ভালো কাটিংয়ের বৈশিষ্ট্য
- ২–৩টি গিট (Node) থাকতে হবে।
- সুস্থ ও রোগমুক্ত হতে হবে।
কাটিংয়ের প্রয়োজন
২.৫ একর জমির জন্য
ছিটিয়ে রোপণ
- প্রায় ১,০০০ কেজি কাটিং
সারিবদ্ধ রোপণ
- প্রায় ১,২০০ কেজি কাটিং
জমি প্রস্তুতি
- ২–৩ বার চাষ দিতে হবে।
- মই দিয়ে মাটি সমান করতে হবে।
- আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
- পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে (যদিও জলাবদ্ধতাও সহ্য করতে পারে)।
সার ব্যবস্থাপনা
ভালো ফলনের জন্য—
জৈব সার
- গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করা ভালো।
রাসায়নিক সার
- ইউরিয়া
- টিএসপি
- এমওপি
প্রতিবার কাটার পরে ইউরিয়া প্রয়োগ করলে দ্রুত পুনরায় বৃদ্ধি পায়।
সেচ ব্যবস্থা
- বর্ষাকালে সাধারণত সেচের প্রয়োজন হয় না।
- শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনে সেচ দিতে হবে।
- পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকলে উৎপাদন অনেক বেড়ে যায়।
প্রথম কাটিং
ঘাসের উচ্চতা যখন—
- প্রায় ১.৫–২ হাত
তখন প্রথমবার কেটে গরুকে খাওয়ানো যায়।
পরবর্তী কাটিং
ভালো ব্যবস্থাপনায়—
- বছরে প্রায় ৮–১০ বার কাটিং নেওয়া যায়।
ফলন
সঠিক সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায়—
প্রতি ২.৫ একরে
- বছরে প্রায় ৯০–১০০ মেট্রিক টন সবুজ ঘাস উৎপাদন সম্ভব।
পুষ্টিগুণ (গড়)
- Dry Matter: ১৮–২২%
- Crude Protein: ৮–১২%
- Crude Fiber: ২৫–৩০%
- NDF: ৫৫–৬৫%
- হজমযোগ্যতা ভালো, বিশেষ করে কচি অবস্থায়।
গরুকে খাওয়ানোর নিয়ম
- ২–৩ ইঞ্চি করে কেটে খাওয়ানো ভালো।
- শুকনো খড় বা অন্যান্য ঘাসের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো যায়।
- মাঠে চরিয়েও খাওয়ানো সম্ভব।
- অতিবয়স্ক ঘাস না দেওয়াই ভালো।
পারা ঘাসের সুবিধা
- একবার লাগালে বহু বছর উৎপাদন দেয়।
- নিচু ও জলাবদ্ধ জমিতে ভালো জন্মে।
- লবণাক্ত মাটিও সহ্য করতে পারে।
- বছরে বহুবার কাটিং নেওয়া যায়।
- খাদ্য ব্যয় কমায়।
- গরু সহজে খায়।
- ডেইরি ও মোটাতাজাকরণ উভয়ের জন্য উপযোগী।
সতর্কতা
- অতিবয়স্ক ঘাসে আঁশ বেড়ে যায়।
- নিয়মিত কাটিং দিলে পুষ্টিমান ভালো থাকে।
- প্রতিবার কাটার পর সার দিলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
- আগাছা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ নিশ্চিত করলে ফলন আরও ভালো হয়।
উপসংহার
বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের জমিতে চাষযোগ্য, দীর্ঘদিন উৎপাদনক্ষম এবং উচ্চ ফলনশীল পশুখাদ্য হিসেবে পারা ঘাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নিচু, জলাবদ্ধ ও লবণাক্ত জমিকে কাজে লাগিয়ে কম খরচে সারা বছর সবুজ খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করতে পারা ঘাস একটি লাভজনক বিকল্প। সঠিক পরিচর্যা ও সময়মতো কাটিং করলে এটি ডেইরি ও গরু মোটাতাজাকরণ খামারের খাদ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করে।
FAQ
১. পারা ঘাসের উৎপত্তিস্থল কোথায়?
ব্রাজিল।
২. পারা ঘাস কোন ধরনের জমিতে সবচেয়ে ভালো জন্মে?
উঁচু, নিচু, ঢালু, জলাবদ্ধ ও লবণাক্ত—প্রায় সব ধরনের জমিতেই ভালো জন্মে।
৩. পারা ঘাস রোপণের উপযুক্ত সময় কখন?
বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস সবচেয়ে উপযুক্ত। সেচ থাকলে চৈত্র মাসেও রোপণ করা যায়।
৪. কীভাবে পারা ঘাসের বংশবিস্তার করা হয়?
শিকড়সহ চারা অথবা ২–৩ গিটযুক্ত কান্ডের কাটিং দিয়ে।
৫. বছরে কতবার পারা ঘাস কাটা যায়?
ভালো ব্যবস্থাপনায় বছরে প্রায় ৮–১০ বার।
৬. প্রতি ২.৫ একরে কত ফলন পাওয়া যায়?
প্রায় ৯০–১০০ মেট্রিক টন সবুজ ঘাস।
৭. গরুকে কীভাবে পারা ঘাস খাওয়ানো উচিত?
১.৫–২ হাত উচ্চতায় কেটে ২–৩ ইঞ্চি টুকরা করে খাওয়ানো ভালো। চরিয়েও খাওয়ানো যায়।
৮. পারা ঘাস কি দীর্ঘদিন উৎপাদন দেয়?
হ্যাঁ। একবার রোপণ করলে কয়েক বছর পর্যন্ত নিয়মিত ফলন দেয়।




