মুরগির ইনফেকশাস ব্রংকাইটিস (IB): কারণ, লক্ষণ, পোস্টমর্টেম, চিকিৎসা, প্রতিরোধ ও ভ্যাকসিন
ইনফেকশাস ব্রংকাইটিস (Infectious Bronchitis বা IB) মুরগির একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত শ্বাসতন্ত্র, কিডনি (নেফ্রোজেনিক স্ট্রেইন) এবং প্রজননতন্ত্র আক্রান্ত করে। এটি বিশেষ করে বাচ্চা ও গ্রোয়িং মুরগির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি রোগ এবং লেয়ার খামারে ডিম উৎপাদন ও ডিমের গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকে এটি পোল্ট্রি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রোগ।
ইতিহাস
১৯৩১ সালে Schalk এবং Hawn যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটায় প্রথম ইনফেকশাস ব্রংকাইটিসের বর্ণনা দেন। পরে ১৯৩৬ সালে Beach এবং Schalm রোগটি শনাক্ত করেন। ১৯৫৬ সালে একাধিক সেরোটাইপের অস্তিত্ব জানা যায় এবং ১৯৬০ সালে নেফ্রোপ্যাথোজেনিক (Nephropathogenic) IB শনাক্ত হয়।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
ইনফেকশাস ব্রংকাইটিস পোল্ট্রি শিল্পে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ।
- ডিম উৎপাদন সাধারণত ২০–৩০%, কখনও এরও বেশি কমে যেতে পারে।
- ডিমের খোসা, আকার, রঙ ও অভ্যন্তরীণ গুণগত মান নষ্ট হয়।
- ব্রয়লারে ওজন বৃদ্ধি কমে এবং FCR খারাপ হয়।
- নেফ্রোপ্যাথোজেনিক স্ট্রেইনে বাচ্চার মৃত্যুহার অনেক বেড়ে যেতে পারে।
- Mycoplasma, E. coli, Newcastle Disease বা Avian Influenza-এর সাথে মিক্স ইনফেকশন হলে ক্ষতি আরও বেড়ে যায়।
- অনেক লেয়ার আক্রান্ত হওয়ার পর আগের উৎপাদনে আর ফিরে যেতে পারে না বা স্বাভাবিক হতে ৩০–৬০ দিন পর্যন্ত সময় লাগে।
- দুই সপ্তাহের কম বয়সী বাচ্চা আক্রান্ত হলে ওভিডাক্ট স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভবিষ্যতে False Layer তৈরি হতে পারে।
রোগের কারণ (Etiology)
রোগটির কারণ Avian Infectious Bronchitis Virus (IBV), যা Coronaviridae পরিবারের Gammacoronavirus গণের একটি Single-stranded RNA virus।
ভাইরাসটির বৈশিষ্ট্য:
- অত্যন্ত দ্রুত মিউটেশন ঘটে।
- অসংখ্য সেরোটাইপ ও ভ্যারিয়েন্ট রয়েছে।
- এক স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে তৈরি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্য স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে সবসময় কার্যকর হয় না।
- ND ও AI ভাইরাসের মতো এটি সাধারণত মুরগির লোহিত রক্তকণিকা Agglutinate করে না।
ভাইরাসটি পরিবেশে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে, তবে অধিকাংশ জীবাণুনাশক দ্বারা সহজেই ধ্বংস হয়।
কার্যকর জীবাণুনাশক:
- ৭০% Alcohol
- ১% Formalin
- ০.০১% Potassium Permanganate
হোস্ট
- মুরগিই প্রধান ন্যাচারাল হোস্ট।
- সব বয়সের মুরগি আক্রান্ত হতে পারে।
- বাচ্চা ও গ্রোয়িং মুরগি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল।
- সাদা লেয়ার জাত তুলনামূলক বেশি আক্রান্ত হয়।
- সুস্থ হওয়া মুরগি প্রায় এক মাস পর্যন্ত ভাইরাস ছড়াতে পারে।
রোগ কীভাবে ছড়ায়?
সংক্রমণের প্রধান উৎস হলো আক্রান্ত মুরগির—
- নাকের স্রাব
- মুখের স্রাব
- মল
এছাড়া ছড়ায়—
- বাতাসের মাধ্যমে
- আক্রান্ত পাখির সংস্পর্শে
- লিটার
- খাদ্য ও পানি
- যন্ত্রপাতি
- কর্মচারী
- বন্য পাখি
রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া (Pathogenesis)
ভাইরাসটি নাক দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে।
প্রথমে শ্বাসনালির এপিথেলিয়াম আক্রান্ত করে, পরে বিভিন্ন স্ট্রেইনের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী—
- শ্বাসতন্ত্র
- কিডনি
- প্রজননতন্ত্র
আক্রান্ত হয়।
সংক্রমণের ১–৮ দিনের মধ্যে ভাইরাস দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে।
কিডনি আক্রান্ত হলে—
- অতিরিক্ত পানি পান করে
- সাদা পানির মতো পায়খানা হয়
- লিটার ভিজে যায়
- ইউরেট জমে কিডনি ফুলে যায়
লক্ষণ (Clinical Signs)
ইনকিউবেশন পিরিয়ড সাধারণত ১৮–৪৮ ঘণ্টা।
বাচ্চার ক্ষেত্রে
- হাঁচি
- কাশি
- Pump-handle breathing
- মুখ খুলে শ্বাস নেওয়া
- নাক ও মুখ দিয়ে পানি পড়া
- ঠান্ডায় লক্ষণ বেশি দেখা যায়
- তাপের দিকে জড়ো হয়
- খাবার কম খায়
- ওজন কমে যায়
- Morbidity প্রায় ১০০%
- Nephropathogenic strain হলে মৃত্যুহার অনেক বেশি হতে পারে।
লেয়ার ও ব্রিডারে
- ডিম উৎপাদন কমে যায়
- ডিমের খোসা পাতলা হয়
- ডিম বিকৃত হয়
- বাদামি ডিমের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে যেতে পারে
- Albumen পানির মতো পাতলা হয়
- উৎপাদন স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগে
- False Layer তৈরি হতে পারে
নেফ্রোজেনিক স্ট্রেইনে
- অতিরিক্ত পানি পান
- সাদা পানির মতো পায়খানা
- কিডনি ফোলা
- ইউরেট জমা
- ব্রয়লারে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে
পোস্টমর্টেম
শ্বাসতন্ত্র
- ট্রাকিয়া লাল ও প্রদাহযুক্ত
- প্রচুর মিউকাস
- Catarrhal exudate
- Hemorrhage
- নিচের ট্রাকিয়া বা ব্রংকাসে হলুদ Caseous plug
- Bronchial bifurcation-এ Cheesy exudate
- Air sac ঘোলাটে ও মোটা
- Air sac-এ Caseous material
কিডনি
- Kidney ফোলা
- বিবর্ণ
- Distended tubules
- Tubules-এ সাদা Urate জমা
প্রজননতন্ত্র
- Oviduct ক্ষুদ্র বা বিকৃত
- Oviduct cyst
- Internal layer
- Abnormal ovarian follicles
রোগ নির্ণয়
- ইতিহাস
- ক্লিনিক্যাল লক্ষণ
- পোস্টমর্টেম
- ELISA
- HI Test
- RT-PCR (সম্ভব হলে)
- ভাইরাস আইসোলেশন
যেসব রোগের সঙ্গে মিল হতে পারে
- Newcastle Disease
- Avian Influenza
- Mycoplasmosis
- Infectious Laryngotracheitis
- Infectious Coryza
- Colibacillosis
প্রয়োজনে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
চিকিৎসা
IB-এর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই।
চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য—
- Secondary bacterial infection নিয়ন্ত্রণ
- শ্বাসকষ্ট কমানো
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
- কিডনির উপর চাপ কমানো
ব্যবস্থা:
- ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক (সেকেন্ডারি সংক্রমণের জন্য)
- Expectorant বা Mucolytic
- Immunostimulant
- Vitamin A, D₃, E
- Electrolyte
- কিডনি আক্রান্ত হলে অতিরিক্ত প্রোটিন কমানো
- পরিষ্কার পানি সরবরাহ
কিছু ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে জরুরি অবস্থায় ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শে লাইভ IB ভ্যাকসিন ব্যবহার করে উপকার পাওয়া যেতে পারে, তবে এটি নিয়মিত চিকিৎসার বিকল্প নয়।
প্রতিরোধ
কারণ ভাইরাসটি দ্রুত মিউটেশন করে, তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বায়োসিকিউরিটি
- খামারে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ
- জীবাণুনাশক ব্যবহার
- লিটার পরিষ্কার রাখা
- বন্য পাখি নিয়ন্ত্রণ
- ভালো ভেন্টিলেশন
ভ্যাকসিন
খামারের ঝুঁকি অনুযায়ী ভ্যাকসিন প্রোগ্রাম নির্ধারণ করতে হবে।
সাধারণভাবে—
- ১–৫ দিন: IB + ND Live
- ১০–১২ দিন: Variant IB (যদি প্রয়োজন হয়)
- ৫৫–৫৬ দিন: IB + ND Live
- ১৬–১৮ সপ্তাহ: IB + ND + EDS Killed
স্থানীয় রোগ পরিস্থিতি অনুযায়ী ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শে ভ্যাকসিন নির্বাচন করা উচিত।
অর্থনৈতিক ক্ষতি
ইনফেকশাস ব্রংকাইটিসের ফলে—
- ডিম উৎপাদন কমে
- ডিমের মান নষ্ট হয়
- False Layer তৈরি হয়
- ওজন বৃদ্ধি কমে
- FCR বেড়ে যায়
- Airsacculitis হওয়ায় প্রসেসিংয়ে মাংসের মান কমে
- চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধি পায়
- লাভজনকতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়
উপসংহার
ইনফেকশাস ব্রংকাইটিস (IB) পোল্ট্রি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাসজনিত রোগ। এটি শুধু শ্বাসতন্ত্র নয়, কিডনি ও প্রজননতন্ত্রও আক্রান্ত করতে পারে। বিশেষ করে নেফ্রোপ্যাথোজেনিক স্ট্রেইন বাচ্চায় উচ্চ মৃত্যুহার সৃষ্টি করতে পারে এবং অল্প বয়সে আক্রান্ত লেয়ার ভবিষ্যতে False Layer হয়ে যেতে পারে। তাই সঠিক বায়োসিকিউরিটি, উপযুক্ত ভ্যাকসিনেশন এবং দ্রুত রোগ নির্ণয়ই এই রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।









