মুরগির ঠোকরাঠুকরি(cannabolism) এবং প্রলাপ্স এর কারণ ও সমাধান

মুরগির ঠোকরাঠুকরি (Cannibalism) ও প্রলাপ্স: কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও কার্যকর সমাধান

মুরগির খামারে লাভ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো ক্যানাবলিজম (Cannibalism বা ঠোকরাঠুকরি) এবং প্রলাপ্স (Prolapse)। একবার এই সমস্যা শুরু হলে খুব দ্রুত পুরো ফ্লকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে রক্তক্ষরণ, ডিম উৎপাদন হ্রাস, ওজন কমে যাওয়া, ক্যালিং বৃদ্ধি এবং অনেক ক্ষেত্রে মুরগির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

বিশেষ করে লেয়ার খামারে ভেন্ট পিকিং ও প্রলাপ্সের কারণে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


ক্যানাবলিজম (Cannibalism) কী?

ক্যানাবলিজম হলো মুরগির এমন একটি খারাপ আচরণ যেখানে একটি মুরগি অন্য মুরগির পালক, চামড়া, ভেন্ট বা আঙুলে ঠোকর মারে। গুরুতর অবস্থায় রক্তক্ষরণ ও মৃত্যুও হতে পারে।

সাদা (White strain) লেয়ার মুরগিতে এই সমস্যা সাধারণত বাদামি (Brown strain) জাতের তুলনায় বেশি দেখা যায়।


ক্যানাবলিজমের ধরন

১. ভেন্ট পিকিং (Vent Picking)

সবচেয়ে মারাত্মক ধরনের ক্যানাবলিজম।

  • ডিম পাড়ার সময় ভেন্টের মিউকোসা বাইরে বের হয়ে আসে।
  • অন্য মুরগি লাল অংশ দেখে ঠোকরাতে শুরু করে।
  • রক্তক্ষরণ হয়।
  • পরে পুরো ফ্লকে অভ্যাসটি ছড়িয়ে পড়ে।
  • অনেক মুরগি মারা যায়।

২. ফেদার পিকিং (Feather Picking)

  • পালক টেনে খাওয়া
  • ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি
  • অতিরিক্ত ঘনত্ব
  • দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধার্ত থাকা
  • ফাইবারের ঘাটতি

৩. টো পিকিং (Toe Picking)

বিশেষ করে বাচ্চা মুরগিতে বেশি দেখা যায়।


ক্যানাবলিজম হওয়ার প্রধান কারণ

১. ব্যবস্থাপনাগত কারণ

  • অতিরিক্ত ঘনত্বে মুরগি পালন
  • পর্যাপ্ত খাবারের পাত্র না থাকা
  • পর্যাপ্ত পানির পাত্র না থাকা
  • দীর্ঘ সময় খাবার বন্ধ রাখা
  • বিভিন্ন বয়সের মুরগি একসাথে পালন
  • অসুস্থ বা মৃত মুরগি দ্রুত সরিয়ে না ফেলা
  • খামার পরিবর্তন বা স্থানান্তর
  • দুর্বল ইউনিফর্মিটি (৮০% এর কম)

২. পরিবেশগত কারণ

  • অতিরিক্ত আলো
  • অতিরিক্ত আলোর তীব্রতা
  • বাসায় বেশি আলো
  • অতিরিক্ত গরম
  • কম আর্দ্রতা
  • খারাপ বায়ু চলাচল
  • ব্রুডিং তাপমাত্রা বেশি হওয়া

৩. পুষ্টিগত কারণ

  • প্রোটিনের ঘাটতি
  • ক্যালসিয়ামের ঘাটতি
  • ক্লোরাইডের ঘাটতি
  • মিনারেলের ঘাটতি
  • ভিটামিনের ঘাটতি
  • উচ্চ এনার্জি খাদ্য
  • কম ফাইবারযুক্ত খাদ্য
  • অতিরিক্ত ভুট্টা
  • শুধুমাত্র পেলেট ফিড খাওয়ানো

৪. স্বাস্থ্যগত কারণ

  • উকুন
  • বাহ্যিক পরজীবী
  • আমাশয়
  • পেস্টি ডায়রিয়া
  • ইউরোপিজিয়াল (Oil gland) গ্রন্থির সংক্রমণ
  • যেকোনো ধরনের স্ট্রেস

৫. উৎপাদনজনিত কারণ

  • বড় ডিম
  • অল্প বয়সে ডিম পাড়া শুরু
  • ওভারওয়েট মুরগি
  • প্রলাপ্স হওয়া
  • ডিম পাড়ার বাসা কম থাকা

৬. জেনেটিক কারণ

কিছু কিছু লাইনে বংশগতভাবে ক্যানাবলিজমের প্রবণতা বেশি থাকে।


ক্যানাবলিজমের ক্ষতি

  • রক্তক্ষরণ
  • মৃত্যু
  • ডিম উৎপাদন কমে যায়
  • ওজন কমে
  • ক্যালিং বেড়ে যায়
  • সংক্রমণ বৃদ্ধি
  • খামারে অর্থনৈতিক ক্ষতি

ক্যানাবলিজম প্রতিরোধ

সঠিক ব্যবস্থাপনা

  • পর্যাপ্ত খাবারের পাত্র
  • পর্যাপ্ত পানির পাত্র
  • অতিরিক্ত ঘনত্ব কমানো
  • সঠিক ভেন্টিলেশন
  • নিয়মিত খাবার প্রদান
  • অসুস্থ মুরগি আলাদা করা

আলোর নিয়ন্ত্রণ

  • আলোর তীব্রতা কমানো
  • প্রয়োজনে লাল আলো ব্যবহার
  • হঠাৎ আলো বৃদ্ধি না করা

পুষ্টি ব্যবস্থাপনা

  • সুষম খাদ্য
  • পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম
  • পর্যাপ্ত প্রোটিন
  • পর্যাপ্ত মিনারেল
  • পর্যাপ্ত মিথিওনিন
  • পর্যাপ্ত ফাইবার

প্রয়োজনে নিমপাতা, লেটুস পাতা বা অন্যান্য নন-সলিউবল ফাইবার দেওয়া যেতে পারে।


ডিবিকিং (Debeaking)

লেয়ার খামারে সঠিক বয়সে দক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে ঠোঁট কাটা অত্যন্ত কার্যকর।


অন্যান্য ব্যবস্থা

  • ৫ দিন পানিতে লবণ (১ গ্রাম/লিটার) দেওয়া যেতে পারে (প্রয়োজনে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী)।
  • বাহ্যিক পরজীবী নিয়ন্ত্রণ।
  • মৃত মুরগি দ্রুত অপসারণ।

প্রলাপ্স (Prolapse) কী?

ডিম্বনালির (Oviduct) নিচের অংশ বা ভেন্টের টিস্যু পায়ুপথ দিয়ে বাইরে বের হয়ে আসাকে প্রলাপ্স বলে।

এটি লেয়ার খামারে একটি গুরুতর সমস্যা।


প্রলাপ্স হওয়ার কারণ

  • অতিরিক্ত মোটা (Overweight) মুরগি
  • বড় ডিম
  • অল্প বয়সে ডিম পাড়া শুরু
  • অতিরিক্ত আলো
  • অতিরিক্ত এনার্জিযুক্ত খাদ্য
  • ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের ঘাটতি
  • লবণের ঘাটতি
  • পেলভিক অঞ্চলের দুর্বল বিকাশ
  • এস্ট্রোজেনের ভারসাম্যহীনতা
  • অতিরিক্ত ঘনত্ব

প্রলাপ্সের লক্ষণ

  • ভেন্ট দিয়ে লাল মাংস বের হয়ে আসে
  • রক্তক্ষরণ
  • অন্য মুরগি ঠোকরাতে শুরু করে
  • সংক্রমণ
  • ডিম উৎপাদন কমে যায়

প্রলাপ্স প্রতিরোধ

  • ১৫–১৬ ঘণ্টার বেশি আলো না দেওয়া
  • ওপেন হাউজে প্রায় ৪০ লাক্স আলো
  • কন্ট্রোল হাউজে ২০–৩০ লাক্স আলো
  • খাবারের এনার্জি নিয়ন্ত্রণ
  • ভিটামিন C প্রদান
  • লবণ (১ গ্রাম/লিটার পানি) প্রয়োজনে ব্যবহার
  • সাইট্রিক অ্যাসিড ব্যবহার করে ক্যালসিয়াম শোষণ বৃদ্ধি
  • সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করা
  • অতিরিক্ত মোটা হওয়া প্রতিরোধ করা

ডিম খাওয়ার বদঅভ্যাস (Egg Eating)

কারণ

  • দীর্ঘক্ষণ ডিম সংগ্রহ না করা
  • পাতলা খোলস
  • ভাঙা ডিম
  • ক্যালসিয়ামের ঘাটতি
  • ভিটামিন D₃-এর ঘাটতি
  • প্রোটিনের ঘাটতি

প্রতিকার

  • দ্রুত ডিম সংগ্রহ
  • পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম
  • ভিটামিন D₃
  • ডিবিকিং
  • ঢালু নেস্ট বক্স
  • নেস্টে কম আলো

অন্যান্য বদঅভ্যাস

পালক খাওয়া (Feather Eating)

কারণ:

  • অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ
  • ফাইবারের ঘাটতি

সমাধান:

  • পরিষ্কার পরিবেশ
  • ম্যাশ ও পেলেটের সুষম ব্যবহার

পিকা (Pica)

অখাদ্য বস্তু যেমন লিটার বা পালক খাওয়া।

কারণ:

  • ফসফরাসের ঘাটতি
  • পরজীবী

কুচে হওয়া (Broodiness)

ডিম দেওয়া বন্ধ করে ডিমের উপর বসে থাকা।

সমাধান:

  • আলাদা রাখা
  • পর্যাপ্ত আলো
  • নিয়মিত ডিম সংগ্রহ

ডিম লুকানো

বিশেষ করে দেশি বা মুক্তভাবে পালন করা মুরগিতে বেশি দেখা যায়।

সমাধান:

  • নির্দিষ্ট নেস্ট বক্স ব্যবহার
  • মুক্ত বিচরণ নিয়ন্ত্রণ

খামারিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

  • অতিরিক্ত ঘনত্বে মুরগি পালন করবেন না।
  • সবসময় পর্যাপ্ত খাবার ও পানি নিশ্চিত করুন।
  • সুষম খাদ্য ও পর্যাপ্ত ফাইবার দিন।
  • সঠিক সময়ে ডিবিকিং করুন।
  • আলো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • বাহ্যিক পরজীবী দমন করুন।
  • অসুস্থ বা রক্তাক্ত মুরগি দ্রুত আলাদা করুন।
  • নিয়মিত খামার পর্যবেক্ষণ করুন।

উপসংহার

ক্যানাবলিজম ও প্রলাপ্স চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ অনেক বেশি কার্যকর। সঠিক ঘনত্ব, সুষম পুষ্টি, পর্যাপ্ত খাবার-পানি, আলো নিয়ন্ত্রণ, ডিবিকিং এবং উন্নত খামার ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সমস্যা এড়ানো সম্ভব। একটি সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা শুধু মৃত্যুহার কমায় না, বরং ডিম উৎপাদন, মুরগির কল্যাণ এবং খামারের সামগ্রিক লাভজনকতাও বৃদ্ধি করে।

 
Scroll to Top