Breaking News

মাখন(Butter) এর উপকারিতা ও কিছু কথা

মাখন(Butter) এর উপকারিতা ও কিছু কথা

লেঃ কর্নেল মোঃ তুহিন হাসান,পিএসসি
পরিচালক (ভেটেরিনারিয়ান),বিজিবি

প্রাথমিক কথা:
মাখন একটি দুগ্ধজাত বা দুধের পণ্য, যা সাধারণ দুধ বা দুধের প্রক্রিয়াজাত দুগ্ধ ক্রীম থেকে তৈরি করা হয়। মাখন সাধারণ গরুর দুধ দিয়ে তৈরি হয়। এছাড়া মাখন অন্য প্রাণী যেমন, ভেড়া, ছাগল,
মহিষের দুধ দিয়েও তৈরি করা হয়।
এতে কখনও কখনও লবণ, সুগন্ধি, প্রিজার্ভেটিবও ব্যবহার করা হয়। মাখন দেখতে হলুদ রঙের তবে এটির রঙ গাঢ় হলুদ থেকে সাদা রঙের হতে পারে। এর রঙ নির্ভর করে দুধের উপর এবং ঐ প্রাণীর খাদ্যাভ্যাসের উপর। অনেক সময় প্রস্তুতকারীরাও রঙ মিশিয়ে থাকে।

মাখনের উপকারিতা:
১। খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধঃ
মাখনে অ্যাক্টিভেটর এক্স নামক যৌগ থাকে যা দেহকে অত্যাবশ্যকীয় খনিজ উপাদান শোষণে সাহায্য করে। যখন আমাদের শরীর খনিজ উপাদান গ্রহণ করে তখন তা ক্ষুধা কমতে সাহায্য করে। মাখনে আয়োডিন, সেলেনিয়াম, লেসিথিন এবং লরিক এসিডের মত কার্যকরী খনিজ উপাদান থাকে।
২। মাখনে প্রয়োজনীয় ভিটামিন থাকেঃ
মাখন ভিটামিন সমৃদ্ধ। এতে ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি ও ভিটামিন ই থাকে যা ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে। আশ্চর্যজনকভাবে মাখনে অনন্য ভিটামিন কে২ থাকে যা চর্বিকে দ্রবণীয় করতে পারে। কে২ ভিটামিন প্রোস্টেট ক্যান্সার, হাড় ভাঙ্গা এবং করোনারি হার্ট ডিজিজের ঝুঁকি কমায়। মাখন খেলে নারীর উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।
৩। লিনোলেইক এসিড থাকেঃ
মাখনে লিনোলেইক এসিড নামক যৌগ থাকে। এটি শরীরের বিপাকের উপর প্রভাব বিস্তার করে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এছাড়াও মাখনে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা ফ্রি যার্ডিকেলের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
৪। স্বাস্থ্যকর স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকেঃ
বেশিরভাগ মানুষ মনে করে যে সব ধরণের স্যাচুরেটেড ফ্যাট খারাপ। কিন্তু অনেক গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, এদের মধ্যে কিছু আছে শুধুমাত্র অত্যাবশ্যকীয়ই না বরং অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। এই স্বাস্থ্যকর সম্পৃক্ত চর্বিগুলো ভালো কোলেস্টেরল HDL এর বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এই HDL কোলেস্টেরল ব্রেইন ও নার্ভাস সিস্টেমের ডেভেলপমেন্টে সহায়তা করে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।
৫। ওমেগা ৩ ও ওমেগা ৬ ফ্যাটি এসিডের ভারসাম্য রক্ষা করেঃ
মাখনে এরাকিডোনিক্স এসিড থাকে যা ব্রেইন ফাংশন, স্কিন হেলথ ও প্রোস্টাগ্লান্ডিনের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।
৬। উলজেন ফ্যাক্টর থাকেঃ
হরমোনের মতোই একটি কার্যকরী পদার্থ উলজেন ফ্যাক্টর। এটি জয়েন্টের শক্ত হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে, সেই সাথে আরথ্রাইটিস ও প্রতিরোধ করে। এছাড়াও এই উপাদানটি ক্যালসিয়ামকে জয়েন্টের চেয়ে হাড়ে জমা হতে সাহায্য করে। এটি শুধুমাত্র এ্যানিমেল ফ্যাট যেমন- ক্রিম বা দুধে পাওয়া যায়। তবে উলজেন ফ্যাক্টর কাঁচা মাখন এবং ননীতে পাওয়া যায়।
৭। বিটা ক্যারোটিনঃ
মাখনে উচ্চমাত্রার বিটা ক্যারোটিন থাকে যা চোখের জন্য ভালো। এটি চোখের সুরক্ষায় অবদান রাখে। এছাড়াও কোষের বৃদ্ধিকে উদ্দীপিত করে, ছানির গতিরোধ করে, মেকুলার ডিজেনারেশন হওয়ার সুযোগ কমায় এবং চোখের অন্যান্য সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে।

মাখন কিভাবে খাওয়া হয়:
১। সাধারণত কোন খাবারে মেখে খাওয়া হয়।
২। রান্না করে যেমন, কিছু ভাঁজতে, সস তৈরি খাওয়া হয়।
৩। খাবারে বিশেষ সুঘ্রান আনতে মাখ ব্যবহৃত হয়।
৪। মাখন সরাসরি পাউরুটির সাথে বা স্যান্ডউইচের সাথে খাওয়া যায়।

মাখনের দারুণ সব ব্যবহার:
১। আঠা দূর করতে:
আঠা দিয়ে কোনও কাজ করার সময় হাতে আঠা লেগে যায়। হাতে আঠা লেগে গেলে প্রথমে মাখন নিয়ে দুই হাতে ঘষুন। তারপর সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলুন। হাত থেকে আঠা দূর হয়ে যাবে।
২। দরজার শব্দ বন্ধ করতে:
দরজার কব্জা পুরোনো হয়ে গেলে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে যা খুবই বিরক্তিকর। । হাতের কাছে তেল বা অন্য কিছু না পেলে কব্জায় খানিকটা মাখন লাগিয়ে দিন। দেখবেন শব্দ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
৩। ক্যাপস্যুল গিলে নিন মাখনের সাহায্যে:
অনেকেই ক্যাপস্যুল গিলতে পারেন না। দেখা যায় পানি পান করলেও তা গলায় গিয়ে আটকে থাকে যা কিছুতেই গেলা যায় না। এই সমস্যায় পড়তে না চাইলে ক্যাপস্যুলে একটু মাখন লাগিয়ে নিন।
৪। ত্বকের সুরক্ষায়:
রুক্ষ শুষ্ক ত্বকের যত্নে মাখনের তুলনা নেই। ত্বক ফেটে যাওয়া ও শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যায় ত্বকে নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন মাখন। এছাড়াও ত্বকে মাখনের ব্যবহার ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে। পুরোনো কাটাছেড়ার দাগের উপর নিয়মিত মাখন ব্যবহার করলে দাগ দূর হয়।
৫। মাছের দুর্গন্ধ দূর করতে:
মাছ কাটার পর হাতে থেকে আঁশটে গন্ধ ছাড়ে। এই গন্ধ দূর করতে হাতে কিছুটা মাখন লাগিয়ে তারপর সাবান এবং গরম জল দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলুন। হাতের দুর্গন্ধ চলে যাবে।
৬। কাটা পেঁয়াজ সতেজ রাখতে:
কাটা পেঁয়াজ দীর্ঘক্ষণ সতেজ রাখতে মাখন খুব কার্যকরী। পেঁয়াজ কুচিতে ভালো করে মাখন লাগিয়ে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল মুড়ে ফ্রিজে রেখে দিন।
৭। চীজ সংরক্ষণ করতে:
চীজ ব্যবহারের পর ফ্রিজে রাখার আগে এতে মাখন লাগিয়ে ফ্রিজে সংরক্ষণ করুন। এতে করে চীজ অনেকটা সময় সংরক্ষণ করতে পারবেন।
৮। নুডলস বা পাস্তা ঝরঝরে করতে:
নুডলস বা পাস্তা সেদ্ধ করার সময় পানিতে সামান্য বাটার দিয়ে দিন। এতে করে নুডলস বা পাস্তা বেশি সেদ্ধ হয়ে গেলেও একসাথে লেগে থাকবে না। বেশ ঝরঝরে হবে।
৯। চুইংগাম দূর করতে:
যে স্থানে চুইংগাম লেগেছে সেখানে অল্প মাখন দিয়ে ঘষুন। চুইংগাম উঠে যাবে।
১০। আংটি বা চুড়ি খোলার সময়:
আঙুল বা হাত থেকে আংটি ও চুড়ি খুলতে অনেক সময় আংটি চুড়ি আঙুল বা হাতের কবজি থেকে টেনেও খোলা যায় না। টানাটানি বাদ দিয়ে আঙুলে ও কব্জিতে একটু মাখন মাখিয়ে নিন। খুব দ্রুতই খুলে ফেলতে পারবেন আংটি বা চুড়ি।
১১। গহনার জট খুলতে:
অনেক সময় একসঙ্গে অনেক গহনা রাখার ফলে একটি সঙ্গে আরেকটির জট লেগে যায়। সেক্ষেত্রে মাখন গহনার জট খুলতে সাহায্য করে। গয়নার জটের স্থানে মাখন লাগিয়ে নিন, খুব তাড়াতাড়ি জট খুলে যাবে। তারপর ডিটারজেন্ট দিয়ে গয়না ধুয়ে ফেলুন।
১২। কালির দাগ দূর করতে
জামা কাপড়ে কালির দাগ লাগলে তা সহজে ওঠানো যায়না। তাই দাগের উপর মাখন ঘষে নিন। তারপর মাখন শুকাতে দিন। তারপর ডিটারজেন্ট দিয়ে কাপড় ধুয়ে ফেলুন। কালির দাগ চলে যাবে।
১৩। কেক কাটার সময়:
কেক কাটার জন্য ছুরি বের করলেন, অথচ দেখলেন ছুরিতে আগের মতো ধার নেই। কেকের টুকরোগুলো সমান হয়নি। এ ক্ষেত্রে কেক কাটার সময় ছুরিতে সামান্য মাখন মেখে নিন। দেখবেন, ধার না থাকা ছুরি দিয়েও সুন্দরভাবে কেক কাটতে পারবেন।
১৪। সোনার জিনিস পরিষ্কারে:
নরম ব্রাশে মাখন মেখে সোনার জিনিসের ওপর ঘষুণ। এবার সাবান মেশানো পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। দেখবেন, সোনার জিনিস নতুনের মতো ঝকঝক করবে।

মাখন সংরক্ষণ:
0 ° সি কাছাকাছি একটি তাপমাত্রায় ফ্রিজে মাখন সংরক্ষণ করা ভাল। ফ্রিজে ক্রিম মাখন সংরক্ষণের জন্য সেরা প্যাকেজ ফয়েল বা চার্চমেন্ট। এছাড়াও সম্পূর্ণরূপে পলিসিনাল, স্টেইনলেস স্টীল, সিরামিক থেকে সিল পাত্রে বা oilers স্টোরেজ জন্য উপযুক্ত।

সতর্কতাঃ
১। মাখনের এত পুষ্টি উপকারিতা সত্ত্বেও ভুলে গেলে চলবেনা যে এটি মূলত চর্বি জাতীয় খাদ্য। অধিক পরিমাণে গ্রহণ করলে স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে। তাই সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করুন।
২। সম্প্রতি একটি গবেষণায় জানা গিয়েছে যে, মাখন আমাদের শরীরে টাইপ টু ডায়াবিটিসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। প্রত্যেকদিন মাত্র ১২ গ্রাম মাখন খেলেই আমাদের মধ্যে টাইপ টু ডায়াবিটিসের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। মাখনে স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। যা এই টাইপ টু ডায়াবিটিসের কারণ।

শেষ কথা:
মাখন অনেক খাবারের প্রস্তুতির জন্য ব্যবহৃত হয়।মাখনের এত পুষ্টি উপকারিতা সত্ত্বেও এটি মূলত চর্বি জাতীয় খাদ্য। অধিক পরিমাণে গ্রহণ করলে স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে।

Please follow and like us:

About admin

Check Also

দুধের ল্যাক্টোফেরিন

ল্যাক্টোফেরিন হলো একটি আয়রন সমৃদ্ধ প্রোটিন। সর্বপ্রথম ১৯৩৯ সালে গরুর দুধে এই প্রোটিনের সন্ধান মেলে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Translate »
error: Content is protected !!