কালো ও জলার তিতির পরিচিতি

বাংলাদেশের তিতির পাখি: পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও কালো তিতিরের সম্পূর্ণ তথ্য (১ম পর্ব)

তিতির (Francolin) বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ভূচর বন্য পাখি। সুন্দর পালক, সুরেলা ডাক এবং লাজুক স্বভাবের কারণে তিতির প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। বাংলাদেশে কালো তিতির, জলার তিতির, মেটে তিতির এবং কিছু এলাকায় চিনা তিতিরের দেখা মেলে। এরা প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই সিরিজের প্রথম পর্বে তিতির পাখির সাধারণ পরিচিতি এবং কালো তিতির (Black Francolin) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


তিতির পাখির পরিচিতি

তিতির হলো Phasianidae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত মাঝারি আকারের মাটিতে বসবাসকারী (Ground Bird) পাখি। এরা সাধারণত বেশি উড়ে না; বরং দৌড়ে বা ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করে।

বাংলাদেশে তিতির প্রধানত দেখা যায়—

  • তৃণভূমিতে
  • ধানক্ষেতে
  • চা বাগানে
  • ঝোপঝাড়ে
  • নদী ও জলাশয়ের আশপাশে
  • বনসংলগ্ন খোলা এলাকায়

তিতির মূলত ভোর ও গোধূলিবেলায় বেশি সক্রিয় থাকে।


কালো তিতির (Black Francolin)

কালো তিতির বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ও পরিচিত তিতির প্রজাতি। এর বৈজ্ঞানিক নাম Francolinus francolinus

শারীরিক বৈশিষ্ট্য

কালো তিতির একটি মাঝারি আকারের ভূচর পাখি।

বৈশিষ্ট্যপরিমাপ
দৈর্ঘ্যপ্রায় ৩৪ সেমি
ওজনপ্রায় ৪৩০ গ্রাম
ডানার দৈর্ঘ্য১৫ সেমি
ঠোঁট২.৪ সেমি
পা৪.৮ সেমি
লেজ১০ সেমি

পুরুষ ও স্ত্রী কালো তিতিরের পার্থক্য

পুরুষ তিতির

পুরুষ কালো তিতির দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

এর বৈশিষ্ট্য—

  • ঘন কালো পিঠ
  • সাদা ও মেটে রঙের ছোট ছোট দাগ
  • কালো মুখ
  • সাদা গাল
  • গলায় লালচে-বাদামি কলারের মতো অংশ
  • কালো ঠোঁট
  • সূঁচালো লেজ
  • প্রজনন মৌসুমে গাঢ় লাল পা

স্ত্রী তিতির

স্ত্রী তিতিরের রঙ তুলনামূলক হালকা।

এর বৈশিষ্ট্য—

  • ফিকে বাদামি পিঠ
  • হালকা পীতাভ ভ্রুরেখা
  • সাদাটে থুতনি ও গলা
  • দেহের নিচে সাদা-কালো ডোরা
  • লেজের নিচে তামাটে আভা

অপ্রাপ্তবয়স্ক তিতির

ছোট তিতির দেখতে অনেকটা স্ত্রী তিতিরের মতো হলেও—

  • কালো ভ্রুরেখা থাকে।
  • বুকে সাদা তিলা দেখা যায়।

আবাসস্থল

কালো তিতির সাধারণত বসবাস করে—

  • উঁচু ঘাসে
  • ধানক্ষেতে
  • চা বাগানে
  • ঝোপঝাড়ে
  • জলাশয়ের আশপাশে
  • বনসংলগ্ন তৃণভূমিতে

এরা খোলা পরিবেশ পছন্দ করলেও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ঘন ঝোপ ব্যবহার করে।


স্বভাব ও আচরণ

কালো তিতির খুবই সতর্ক ও লাজুক স্বভাবের পাখি।

এদের কিছু বৈশিষ্ট্য—

  • একা অথবা জোড়ায় বিচরণ করে।
  • মাটিতে হেঁটে খাবার সংগ্রহ করে।
  • অপ্রয়োজনীয়ভাবে উড়ে না।
  • বিপদ বুঝলে দ্রুত ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে।
  • ভোর ও সন্ধ্যায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে।

কালো তিতিরের ডাক

কালো তিতিরের ডাক খুবই স্বতন্ত্র।

অনেকটা—

“চিক… চিক… চিক… ক্রেকেক…”

বাংলাদেশের তেঁতুলিয়া অঞ্চলের অনেক কৃষক ও রাখাল এই ছন্দময় ডাকের কারণে কালো তিতিরকে মজার ছলে “পান-বিড়ি-সিগারেট” নামেও ডেকে থাকেন।


খাদ্যাভ্যাস

কালো তিতির সর্বভুক (Omnivorous) স্বভাবের।

এদের খাদ্যের মধ্যে রয়েছে—

  • ঘাসের বীজ
  • আগাছার বীজ
  • ধানের দানা
  • বিভিন্ন শস্য
  • কচি ঘাস
  • ফল
  • উইপোকা
  • পিঁপড়া
  • বিভিন্ন পোকামাকড়

কৃষিজমিতে ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে এরা পরিবেশের জন্য উপকারী ভূমিকা পালন করে।


প্রজনন

বাংলাদেশে সাধারণত মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কালো তিতিরের প্রজনন মৌসুম।

প্রজননকালে—

  • পুরুষ তিতির জোরে জোরে ডাকতে থাকে।
  • লেজ ওঠা-নামা করে স্ত্রীকে আকর্ষণ করে।

বাসা তৈরি

কালো তিতির সাধারণত—

  • লম্বা ঘাসের গোড়ায়
  • অথবা ঘন ঝোপের নিচে

মাটিতে অগভীর গর্ত তৈরি করে শুকনো ঘাস দিয়ে বাসা বানায়।


ডিম

একটি স্ত্রী কালো তিতির সাধারণত—

  • ৬–৯টি ডিম দেয়।

ডিমের রঙ—

  • হালকা জলপাই
  • হলদে-জলপাই
  • হালকা জলপাই-বাদামি

ডিমের গড় মাপ—

৩.৮ × ৩.১ সেন্টিমিটার


ডিমে তা দেওয়া

শুধুমাত্র স্ত্রী তিতির ডিমে তা দেয়।

প্রায় ১৮–১৯ দিন পর ডিম ফুটে ছানা বের হয়।


সংরক্ষণের গুরুত্ব

বর্তমানে কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, আবাসস্থল ধ্বংস এবং অবৈধ শিকারের কারণে অনেক এলাকায় কালো তিতিরের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

তাই—

  • প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা
  • অবৈধ শিকার বন্ধ
  • সচেতনতা বৃদ্ধি

এসব উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।


উপসংহার

কালো তিতির শুধু একটি সুন্দর বন্য পাখিই নয়, এটি কৃষি ও পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে এদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তাই কালো তিতির ও অন্যান্য বন্য পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং অবৈধ শিকার প্রতিরোধ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

Scroll to Top