মুরগির কলিব্যাসিলোসিস (E. coli): কেন হয়, কীভাবে ছড়ায়, লক্ষণ, পোস্টমর্টেম, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
কলিব্যাসিলোসিস (Colibacillosis) পোলট্রি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। এটি Escherichia coli (E. coli) ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয় এবং একদিন বয়সী বাচ্চা থেকে শুরু করে পূর্ণবয়স্ক লেয়ার পর্যন্ত সব ধরনের মুরগিকে আক্রান্ত করতে পারে। ব্রয়লারে এটি সাধারণত ইয়োল্ক স্যাক ইনফেকশন, এয়ার স্যাক ডিজিজ ও সেপটিসেমিয়া এবং লেয়ারে এগ পেরিটোনাইটিস ও সালপিনজাইটিস সৃষ্টি করে।
এটি সারা বছরই দেখা যায় এবং খামারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে অন্য কোনো রোগ বা স্ট্রেস থাকলে E. coli দ্রুত সেকেন্ডারি সংক্রমণ সৃষ্টি করে।
রোগের ইতিহাস
- ১৮৯৪ সালে Lignieres প্রথম E. coli সম্পর্কে আলোচনা করেন।
- ১৯৫৪ সালে Edwards ও Wing বিভিন্ন সেরোটাইপ বর্ণনা করেন।
- ১৯৬৫ সালে Harry ও Hemsley দেখান যে ক্ষুদ্রান্ত্রে ১০–১৫% প্যাথোজেনিক E. coli থাকতে পারে।
- ১৯৬৬ সালে Savov ডিমে ০.৫–৬% পর্যন্ত E. coli থাকার তথ্য প্রকাশ করেন।
রোগের কারণ (Agent)
রোগটি Escherichia coli নামক গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়।
এর বৈশিষ্ট্যঃ
- গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া।
- অন্ত্রে স্বাভাবিকভাবেই থাকে।
- সুযোগ পেলে রোগ সৃষ্টি করে।
- ১৮–৪৪° সেলসিয়াসে বৃদ্ধি পায়।
- pH ৫–৭ এ ভালোভাবে বেঁচে থাকে।
- জীবাণুনাশকে সহজেই ধ্বংস হয়।
গুরুত্বপূর্ণ প্যাথোজেনিক সেরোটাইপঃ
- O1
- O2
- O78
কোন মুরগিতে বেশি হয়?
- ব্রয়লার
- লেয়ার
- ব্রিডার
- টার্কি
সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ব্রয়লারে।
বয়সঃ
- ১ দিন থেকে যেকোনো বয়সে হতে পারে।
- ৪–১২ সপ্তাহে সেপটিসেমিয়া বেশি।
- ১২–১৬ দিনে ব্রয়লারে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
কেন কলিব্যাসিলোসিস হয়?
কলিব্যাসিলোসিস সাধারণত তখনই হয় যখন মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
প্রধান কারণগুলো হলো—
- দূষিত খাদ্য
- দূষিত পানি
- ফিশমিল বা MBM-এ E. coli থাকা
- হ্যাচারির দূষণ
- নাভি শুকাতে দেরি হওয়া
- অতিরিক্ত ঘনত্ব
- খারাপ লিটার
- অতিরিক্ত অ্যামোনিয়া
- পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন না থাকা
- অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা
- স্ট্রেস
- দীর্ঘক্ষণ খাবার বা পানি না পাওয়া
- মাইকোটক্সিন
- গাম্বোরো
- নিউক্যাসল
- ইনফেকশাস ব্রংকাইটিস
- মাইকোপ্লাজমা
- করাইজা
- কক্সিডিওসিস
- কৃমি
- অপুষ্টি
রোগ কীভাবে ছড়ায়?
কলিব্যাসিলোসিস প্রধানত Horizontal Transmission হলেও Vertical Transmission-ও হতে পারে।
সংক্রমণের উৎস—
- আক্রান্ত মুরগির বিষ্ঠা
- দূষিত ডিম
- হ্যাচারি
- ইনকিউবেটর
- ধুলাবালি
- খাদ্য
- পানি
- লিটার
- পানির লাইন
- ড্রিংকার
- নিপল
- খামারের সরঞ্জাম
- কর্মচারীর জুতা ও পোশাক
রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া (Pathogenesis)
E. coli সাধারণত অন্ত্রে স্বাভাবিকভাবে অবস্থান করে।
স্ট্রেস বা অন্য রোগে আক্রান্ত হলে এটি—
- শ্বাসতন্ত্র
- অন্ত্র
- রক্ত
দিয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে সৃষ্টি হয়—
- Septicemia
- Air sacculitis
- Perihepatitis
- Pericarditis
- Peritonitis
- Salpingitis
- Omphalitis
- Cellulitis
রোগের লক্ষণ
সাধারণ লক্ষণ
- খাবার কম খাওয়া
- ঝিমিয়ে থাকা
- পালক উস্কোখুস্কো
- শ্বাসকষ্ট
- ওজন কমে যাওয়া
- ডিম কমে যাওয়া
- মৃত্যুহার বৃদ্ধি
রোগের প্রধান রূপ
১. Colisepticemia
সবচেয়ে সাধারণ রূপ।
লক্ষণ
- হঠাৎ মৃত্যু
- শ্বাসকষ্ট
- অবসাদ
- লিভারে সবুজ ক্ষত
- হার্ট ও লিভারে সাদা ফাইব্রিন
- Pericarditis
- Perihepatitis
- Peritonitis
২. Air Sac Disease
বিশেষ করে ব্রয়লারে দেখা যায়।
লক্ষণ
- এয়ার স্যাক ঘন হয়ে যায়।
- ভেতরে হলুদ/সাদা Caseous পদার্থ।
- শ্বাসকষ্ট।
- বৃদ্ধি কমে যায়।
৩. Egg Peritonitis
বিশেষ করে লেয়ারে।
লক্ষণ
- ডিম পেটে জমে যায়।
- ডিম্বনালীতে প্রদাহ।
- Salpingitis।
- Oviduct impaction।
৪. Omphalitis
নাভির সংক্রমণ।
একদিন বয়সী বাচ্চার মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
৫. Panophthalmitis
- চোখ ফুলে যায়।
- চোখে Caseous পদার্থ জমে।
- অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
৬. Swollen Head Syndrome
- চোখের চারপাশ ফুলে যায়।
- মাথা ঝাঁকায়।
- ঘাড় বাঁকা রাখে।
৭. Cellulitis (Dermatitis)
- চামড়ার নিচে প্রদাহ
- রক্তক্ষরণ
- মাংস বাতিল হয়ে যায়
পোস্টমর্টেমে যা দেখা যায়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য—
- হার্টের উপর সাদা ফাইব্রিন
- লিভারের উপর সাদা ফাইব্রিন
- Pericarditis
- Perihepatitis
- Peritonitis
- Air sacculitis
- Caseous পদার্থ
- লিভার বড়
- প্লীহা বড়
- ডিম পেটে জমে থাকা
- নাভিতে প্রদাহ
- অন্ত্রে প্রদাহ
রোগ নির্ণয়
- রোগের ইতিহাস
- ক্লিনিক্যাল লক্ষণ
- পোস্টমর্টেম
- ব্যাকটেরিয়াল কালচার
- Antibiotic Sensitivity Test (AST)
- PCR
চিকিৎসা
কলিব্যাসিলোসিসের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের আগে কালচার ও সেনসিটিভিটি টেস্ট করা সবচেয়ে ভালো। কারণ বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স দেখা যায়।
চিকিৎসার পাশাপাশি—
- পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানি দিন।
- ইলেক্ট্রোলাইট ও ভিটামিন সাপোর্ট দিন।
- লিভার ও কিডনি সাপোর্ট ব্যবহার করুন।
- ভেন্টিলেশন উন্নত করুন।
- লিটার শুকনা রাখুন।
- অ্যামোনিয়া নিয়ন্ত্রণ করুন।
প্রতিরোধ
কলিব্যাসিলোসিস প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো ব্যবস্থাপনা ও বায়োসিকিউরিটি।
প্রতিরোধের জন্য—
- বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করুন।
- নিয়মিত পানির লাইন পরিষ্কার করুন।
- ভালো মানের খাদ্য ব্যবহার করুন।
- অতিরিক্ত ঘনত্ব এড়িয়ে চলুন।
- পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন।
- অ্যামোনিয়া কম রাখুন।
- সঠিক ব্রুডিং করুন।
- হ্যাচারি পরিষ্কার রাখুন।
- দূষিত ডিম ব্যবহার করবেন না।
- মাইকোপ্লাজমামুক্ত বাচ্চা সংগ্রহ করুন।
- ইঁদুর ও বন্য পাখি নিয়ন্ত্রণ করুন।
- অন্যান্য রোগ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করুন।
গুরুত্বপূর্ণ কথা
অনেক খামারে দেখা যায় প্রতিদিন ১–৫টি লেয়ার মুরগি মারা যাচ্ছে, কিন্তু স্পষ্ট কোনো ভাইরাল রোগ নেই। এ ধরনের ক্ষেত্রে কলিব্যাসিলোসিস অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
আবার ব্রয়লারে ১২–১৬ দিনের মধ্যে হঠাৎ মৃত্যুহার বৃদ্ধি, শ্বাসকষ্ট এবং পোস্টমর্টেমে হার্ট ও লিভারের উপর সাদা পর্দা দেখা গেলে কলিব্যাসিলোসিসকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে।
মনে রাখবেন, E. coli স্বাভাবিকভাবে মুরগির অন্ত্রে থাকে। তাই শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়োটিক নয়, সঠিক ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার পানি, উন্নত বায়োসিকিউরিটি এবং স্ট্রেস কমানোই এই রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
FAQ: মুরগির কলিব্যাসিলোসিস (ই. কোলাই) – প্রশ্ন ও উত্তর
১. কলিব্যাসিলোসিস (Colibacillosis) কী?
কলিব্যাসিলোসিস হলো Escherichia coli (E. coli) ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট মুরগির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। এটি বাচ্চা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক সব বয়সের মুরগিতে হতে পারে।
২. কোন বয়সের মুরগিতে কলিব্যাসিলোসিস বেশি হয়?
১ দিন বয়সী বাচ্চা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক মুরগি পর্যন্ত যে কোনো বয়সে হতে পারে। তবে ব্রয়লারে বেশি দেখা যায় এবং ৪–১২ সপ্তাহে সেপটিসেমিয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
৩. কলিব্যাসিলোসিস কেন হয়?
দূষিত খাবার ও পানি, খারাপ লিটার, অতিরিক্ত অ্যামোনিয়া, দুর্বল বায়োসিকিউরিটি, ঘনবসতি, মাইকোপ্লাজমা, আইবি, নিউক্যাসল, গামবোরো, কক্সিডিওসিসসহ অন্যান্য রোগের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে E. coli রোগ সৃষ্টি করে।
৪. E. coli কীভাবে ছড়ায়?
- দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে
- বিষ্ঠা দ্বারা
- হ্যাচারিতে সংক্রমিত ডিম থেকে
- ধুলাবালি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে
- দূষিত যন্ত্রপাতি, লিটার, যানবাহন ও মানুষের মাধ্যমে
৫. কলিব্যাসিলোসিসের প্রধান লক্ষণ কী?
- খাবার কম খাওয়া
- ঝিমিয়ে থাকা
- শ্বাসকষ্ট
- ওজন কমে যাওয়া
- ডায়রিয়া
- মৃত্যুহার বৃদ্ধি
- লেয়ারে ডিম উৎপাদন কমে যাওয়া
৬. কলিব্যাসিলোসিসের সবচেয়ে সাধারণ পোস্টমর্টেম লক্ষণ কী?
হার্ট, লিভার ও এয়ারস্যাকের উপর সাদা ফাইব্রিনের পর্দা (White fibrin layer) দেখা যায়। এছাড়া পেরিকার্ডাইটিস, পেরিহেপাটাইটিস, পেরিটোনাইটিস এবং এয়ারস্যাকুলাইটিস দেখা যায়।
৭. কলিব্যাসিলোসিস কি সেকেন্ডারি রোগ?
হ্যাঁ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি একটি Opportunistic (Secondary) infection। অন্য রোগ বা স্ট্রেসের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে E. coli সক্রিয় হয়ে রোগ সৃষ্টি করে।
৮. কলিব্যাসিলোসিসে ডিম উৎপাদন কমে যায় কেন?
ডিম্বনালী ও ডিম্বাশয়ে প্রদাহ (Salpingitis, Egg Peritonitis) হওয়ায় ডিম উৎপাদন কমে যায় এবং ডিমের মানও খারাপ হতে পারে।
৯. কলিব্যাসিলোসিস প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা কী?
- বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ
- ভালো বায়োসিকিউরিটি
- উন্নত ভেন্টিলেশন
- শুকনো ও পরিষ্কার লিটার
- সঠিক ব্রুডিং
- অতিরিক্ত অ্যামোনিয়া নিয়ন্ত্রণ
- সুষম খাদ্য ও ভিটামিন সরবরাহ
- অন্যান্য রোগ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ
১০. কলিব্যাসিলোসিসের নির্দিষ্ট চিকিৎসা আছে কি?
উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন অবশ্যই কালচার ও অ্যান্টিবায়োগ্রাম (Culture & Sensitivity Test) অনুযায়ী করা উচিত। পাশাপাশি সাপোর্টিভ চিকিৎসা, লিভার ও কিডনি সাপোর্ট, পরিষ্কার পানি এবং ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি।
১১. ব্রয়লারে কলিব্যাসিলোসিস বেশি হওয়ার কারণ কী?
দ্রুত বৃদ্ধি, ঘনবসতি, ধুলাবালি, খারাপ ভেন্টিলেশন, স্ট্রেস এবং শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য রোগের কারণে ব্রয়লারে কলিব্যাসিলোসিসের ঝুঁকি বেশি থাকে।
১২. কলিব্যাসিলোসিস কি মানুষের মধ্যে ছড়ায়?
পোল্ট্রির Avian Pathogenic E. coli (APEC) মূলত পাখির রোগ সৃষ্টি করে। তবে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ।









