Breaking News

শিশুদের জন্য গরুর দুধের প্রয়োজনীয়তা

শিশুদের জন্য গরুর দুধের প্রয়োজনীয়তা
———————————————ডাঃ সুখেন্দু শেখর গায়েন।(09/04/19)
এডি(এপি),যশোর।
ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে ,কতিপয় ব্যক্তি বা কোন কোন শিশু বিশেষজ্ঞ
এক বছরের নীচের শিশুদের সম্পূর্ণভাবে গরুর দুধ খাওয়া নিষেধ
উল্লেখ করে পত্রপত্রিকায় লিখছেন।
কেউ কেউ গরুর দুধে এটা বেশি, ওটা কম,
গরুর দুধ খেলে টাইপ ওয়ান ডাইবেটিস হবে,
এই দুধে কম প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিড আছে,
ফলে শিশুর ব্রেণের বৃদ্ধি ও বিকাশে অসুবিধা,
ভিটামিন এ,ই , সি কম তাই রাতকানা ও স্কার্ভি হবে,
লোহা কম তাই শিশুর রক্ত স্বল্পতা হবে,
গরুর দুধে অধিক কেজিন আছে তাই ক্ষতিকর,
বিটাল্যাক্টোগ্লোবিউলিন আছে বিধায় এলার্জির কারণে
চুলকানি,শ্বাসকষ্ট,পেটের সমস্যা, আন্ত্রিক প্রদাহ,মলে রক্ত আসে ,
ইত্যাদি ইত্যাদি নানান কথা বলছেন।

আমরা যদি এক কাপ মায়ের দুধ ও এক কাপ (244 গ্রাম বা 235.75 ml)
(One ml milk=1.035 gram)
গরুর দুধ নিয়ে তুলনা করি তবে দেখব উভয় দুধেই
শতকরা 87 ভাগের মত পানি আছে।
এক কাপ মায়ের ও এক কাপ গরুর দুধে দুই শত পনের গ্রাম করে পানি আছে,
মায়ের দুধে আমিষ এক কাপে দুই দশমিক পাঁচ গ্রাম ,
গরুর দুধে সাত দশমিক নয় গ্রাম,
শ্বেতসার আছে মায়ের দুধে সতের গ্রাম,গরুর দুধে এগার গ্রাম ।

চর্বি মায়ের দুধে দশ দশমিক আট গ্রাম,গাভী দুধে ঊনআশি গ্রাম,
প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিড ওমেগা তিন– মায়ের দুধের এক কাপে
এক শত আঠাশ মিলিগ্রাম,
ওমেগা ছয় আছে– নয় শত বিশ মিলিগ্রাম ।
এবং গরু দুধে ওমেগা তিন—একশত তিরাশি মিলিগ্রাম,
ওমেগা ছয় –দুই শত তিরানব্বই মিলিগ্রাম।

ভিটামিন এ মায়ের দুধে পাঁচ শত বার আই ইউ,গরুতে দুই শত ঊনপঞ্চাশ,
ভিটামিন ই মায়ের দুধে দশমিক দুই মিলিগ্রাম, গরু দুধে দশমিক এক।
ভিটামিন সি মায়ের দুধে আছে বার দশমিক তিন মিলিগ্রাম ,গরু দুধে নেই।

অবশ্য আমি মনে করি,গরু দুধে ভিটামিন সি ইচ্ছা করেই হয়ত সৃষ্টিকর্তা দেন নাই ,
কারণ গরু দুধ সকলে ফুটিয়ে খান ,আর ফুটালে ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায় ।
মায়ের দুধের অর্ধেক ভিটামিন এ রয়েছে গরুর দুধে( 522IU ও 249 IU) ,
ফলে শিশুরা গরুর দুধ খেলে ভিটামিন এ ঘাটতি তে রাতকানা রোগ হবে
এ নেহাতই অসম্ভব।

গরুর দুধে কম প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিড আছে উল্লেখিত তথ্যে সেকথা বলে না,
তাছাড়া ব্রেণের বৃদ্ধি ও বিকাশ শুধু মাত্র প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিড করে না,
মস্তিষ্কের ভিত্তিভূমি নিউরাল প্লেট ,পরে নিউরাল টিউব ,
যা থেকে পরবর্তীতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ ও স্পাইনাল কর্ড তৈরি হয়।
এই নিউরাল প্লেট গড়তে ফোলেট লাগে এবং সহায়ক হিসাবে বিটুয়েলভ ভিটামিন।
মায়ের ও গরুর দুধের এক কাপে বার মাইক্রো গ্রাম করে ফোলেট আছে।
বিটুয়েলভ মায়ের দুধে আছে দশমিক এক মাইক্রো গ্রাম,
গরুর দুধের এক কাপে আছে এক দশমিক এক মাইক্রোগ্রাম ।

মায়ের ও গরুর দুধে সমান সমান পরিমাণ লোহা অর্থাৎ দশমিক শুণ্যসাত
মিলিগ্রাম লোহা আছে তাই গরুর দুধ খেলে লোহার অভাবে শিশুদের রক্ত স্বল্পতা
হবে কথাটা মানা কঠিন।

দুধের সরের প্রধান উপাদান হল বিটাল্যাক্টোগ্লোবিউলিন,এটাকে দুধের ত্বক বলে।
যখন দুধ ফুটানো হয় তখন দ্রবিভূত কিছু আমিষ গুণ পরিবর্তন করে(dentured)ফ্যাটের
সাথে জমাট বাঁধে সরে ।

বিটাল্যাক্টোগ্লোবিউলিন গরু দুধে আছে সত্য কিন্তু
এলার্জির মূল কারণ আইজিই(IgE) এন্টিবডি দুধ ফুটিয়ে সর ছাড়া খাওয়ালে
শিশুদের ওই অসুবিধা কম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তাছাড়া সর রেখে খাওয়ালে অতিরিক্ত চর্বিও শিশু দেহে যাবে না।
অধিকন্তু সব খাদ্য সবার জন্যে এলার্জেন হিসাবে কাজ করে না।
একই জিনিস সবার জন্য এলার্জেন হিসাবে কাজ করলে
এলার্জিক সেনসিটিভিটি পরীক্ষার প্রয়োজন হত না।

গরুর দুধের এক কাপে শতকরা বিরাশি ভাগ কেজিন প্রোটিন ও
শতকরা আঠার ভাগ হোয়ে প্রোটিন আছে,
মায়ের দুধের এক কাপে শতকরা চল্লিশ ভাগ কেজিন প্রোটিন ও
শতকরা ষাট ভাগ হোয়ে বা ঘোল প্রোটিন আছে।
ফলে মায়ের দুধ শিশুদের সহজে হজম হয়।
গরুর দুধ শিশুদের দেওয়াই যাবে না ,এটা অবান্তর ভাবনা,
মায়ের দুধের ঘাটতিতে শিশুকে গরুর দুধ দিতে হবে
কতটা এবং কিভাবে খাওয়ালে শিশুর ক্ষতি হবে না সেটা জেনে।

মায়ের দুধের এক কাপে পটাসিয়াম আছে এক শত পঁচিশ মিলিগ্রাম,
গরুতে তিন শত ঊনপঞ্চাশ,
সোডিয়াম মায়ের দুধের এক কাপে বিয়াল্লিশ এমজি,
গরুর দুধের এক কাপে আটানব্বই এমজি।
বার মাস বয়সের নীচের শিশুর সোডিয়াম চাহিদা রোজ চার শত এমজি।
ফসফরাস মায়ের দুধের এক কাপে তৌত্রিশ দশমিক চার মিলিগ্রাম,
দু’শত বাইশ এমজি গরুর দুধে।
মায়ের দুধে ভিটামিন ডি নয় দশমিক আট , গরুর দুধে দুই আই ইউ ( ছাড়া গরুর)
ফর্টিফাইট (দেয়াল ঘেরা)গরুর সাতানব্বই দশমিক ছয় আই ইউ।
শিশুর রোজ ভিটামিন ডি চাহিদা চার শত আই ইউ।

শিশুর ছয় মাস পর্যন্ত পটাসিয়াম চাহিদা রোজ পাঁচ শত মিলিগ্রাম,
ছয় থেকে এক বছর পর্যন্ত চাহিদা রোজ সাতশত মিলিগ্রাম ।
সুতরাং কতটা দুধ খাওয়ালে চাহিধার বেশি
পটাসিয়াম রক্তে যাবে না খেয়াল রাখলে পটাসিয়ামে
কিডনি ক্ষতি করবে কেন?
হৃদপিন্ডের স্পন্দন বা বিট সঠিক রাখতে,
হার্ট ভাল রাখতে পটাসিয়াম অপরিহার্যও সে তো সবার জানা।

শিশুর ছয় মাস পর্যন্ত রোজ ফসফরাস চাহিদা এক শত এম জি,
সাত থেকে বার মাস পর্যন্ত দুই শত পঁচাত্তর এম জি।

মায়ের দুধের এক কাপে ঊনআশি এমজি ক্যালসিয়াম ,
গরুর দুধের এক কাপে দুইশত ছিহাত্তর এম জি ক্যালসিয়াম ।
ছয় মাস অবধি শিশুর রোজ ক্যালসিয়াম চাহিদা দুইশত এমজি ,
ছয় থেকে এগার মাস বয়সীর দুইশত ষাট এমজি।
শিশুর হাড় ও দাঁত গঠনে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের বিকল্প নেই।
তবে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি থাকলে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস
দেহে শোষণ হয় না,
বিশেষ করে ক্যলাসিয়াম ডি ভিটামিনের উপস্থিতি ছাড়া শোষণ হয় না।
স্মরণীয় ক্যালসিয়াম পরিমান বেশি থাকলে ফসফরাস শোষণ কম হয়।
একই ভাবে ফসফরাস পরিমান বেশি থাকলে ক্যালসিয়াম শোষণ কম হয়।

কেউ কেউ বলছেন ,টাইপ ওয়ান ডাইবেটিস নাকি গরুর দুধ খেলে হয়,
মূলত আজ অবধি এই ডাইবেটিসের সঠিক কারণ কেউ জানতে পারিনি।
এই ডাইবেটিস শিশুদেরও হয় সত্য কিন্তু গরুর দুধকে দায়ী করা অসমীচীন ।
অগ্নাশয় তার আইলেটস অব ল্যাংগার হ্যান্স
কোষ থেকে ইনসুলিন নিঃসরণ করতে পারে না । সঠিক কারণ জানা
না গেলেও ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা জেনেটিক কারণে ইনসুলিন
তৈরির কোষ ধ্বংস প্রাপ্ত হওয়ার ফলে রক্তে ইনসুলিনের অভাব হওয়ায়
দেহের কোষে কোষে শর্করা রক্ত থেকে শোষিত হয় না।
এটাই টাইপ ওয়ান ডাইবেটিস।

পরিশেষে বলি, শিশুকে মেধাবী করে কোলিন।
এক কাপ মায়ের দুধে কোলিন ঊনচল্লিশ দশমিক চার এমজি,
গরু দুধের এক কাপে তৌত্রিশ দশমিক নয় এমজি ।
তাই নানান ভয় ধরিয়ে গরুর দুধ খাওয়া বিরত
রাখলে আশু কিছু স্বার্থন্বেসী মহলের স্বার্থ পূরণ হলেও
পরিনামে জাতি পুষ্টি ও মেধাহীন হবে।
তাছাড়া শিশুকে এক বছর বয়স থেকে গরুর
দুধ খাওয়ানোর ভাবনা যাদের মাথায় তাঁদের নিশ্চয় জানা আছে,
দুধ না খেতে খেতে ক্ষুদ্রান্ত্রের ব্রাশ বোর্ডার ল্যাকটেজ এনজাইম তৈরিতে
সর্বতভাবে অক্ষম হতে পারে ।
ফলে তারা ভবিষ্যতে দুধ খেতে অসমর্থ হবে।
স্মরনীয় দুধ খেতে বন্ধ করা ব্যক্তিরা পুনরায় আস্তে আস্তে
দুধ,দধি বা ইয়োগার্ট খাওয়ার মাধ্যমে অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট,মোল্ড
সৃষ্টি করে ল্যাকটেজ এনজাইম তৈরি করার প্রচেষ্টা করলেও
সবার ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।
মায়ের দুধের ঘাটতিতে মাঝে মধ্যে শিশুকে গরুর দুধ না দিলে
শিশুরা ভবিষ্যতে ল্যাকটোজ পারসিস্ট্যান্ট জনগোষ্ঠী না হয়ে
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্ট জনগোষ্ঠীতে পরিনত হতে পারে।
উল্লেখ্য, ল্যাকটেজ এনজাইম দুধের ল্যাকটোজকে ভেঙে সরল চিনি
গ্যালাকটোজ ও গ্লুকোজ তৈরি করলে অন্ত্র তখন দেহে শোষণ করে।
সর্বশেষে বলতে চাই,মায়ের দুধের গুরুত্ব অনস্বীকার্য, তার কোন
বিকল্প নেই,
তাই বলে মায়ের দুধের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে গরুর দুধ বন্ধ রাখার
ব্যবস্থাপত্র আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছুই নয়।।

Please follow and like us:

About admin

Check Also

দুধের ল্যাক্টোফেরিন

ল্যাক্টোফেরিন হলো একটি আয়রন সমৃদ্ধ প্রোটিন। সর্বপ্রথম ১৯৩৯ সালে গরুর দুধে এই প্রোটিনের সন্ধান মেলে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Translate »
error: Content is protected !!