মাল্টি কালার টেবিল চিকেন বা এমসিটিসি

দেশে নতুন জাতের মুরগি ‘মাল্টি কালার টেবিল চিকেন (MCTC)’ – দেশি মুরগির স্বাদ, দ্রুত বৃদ্ধি ও খামারিদের জন্য নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে মাল্টি কালার টেবিল চিকেন (Multi Color Table Chicken – MCTC)। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI) উদ্ভাবিত এই নতুন জাতের মুরগি দেখতে অনেকটা দেশি মুরগির মতো এবং এর মাংসের স্বাদও দেশি মুরগির কাছাকাছি। দ্রুত বৃদ্ধি, কম মৃত্যুহার এবং ভালো বাজারমূল্যের কারণে এটি ভবিষ্যতে খামারিদের জন্য লাভজনক একটি বিকল্প হতে পারে।

মাল্টি কালার টেবিল চিকেন (MCTC) কী?

মাল্টি কালার টেবিল চিকেন (MCTC) হলো বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI) উদ্ভাবিত একটি উন্নত মাংস উৎপাদনকারী মুরগির জাত। দেশীয় জার্মপ্লাজম ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচন (Selection) ও ব্রিডিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই জাতটি উন্নয়ন করা হয়েছে।

এই মুরগির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—

  • দেখতে দেশি মুরগির মতো।
  • মাংসের স্বাদ দেশি মুরগির কাছাকাছি।
  • দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
  • তুলনামূলক কম রোগে আক্রান্ত হয়।
  • কম খাদ্যে ভালো ওজন অর্জন করে।

কতদিনে বাজারজাত করা যায়?

বর্তমান গবেষণার তথ্য অনুযায়ী—

  • ৬ সপ্তাহ থেকেই বাজারজাত করা সম্ভব।
  • ৮ সপ্তাহে গড় ওজন প্রায় ১ কেজি।
  • মোরগের ওজন ১.১–১.২ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
  • ৮ সপ্তাহে খাদ্য গ্রহণ প্রায় ২.২–২.৩ কেজি।
  • গবেষণায় মৃত্যুহার মাত্র প্রায় ১.৫% পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

গবেষণার পেছনের গল্প

BLRI প্রায় ৮–৯ বছর ধরে এই জাতের ওপর গবেষণা পরিচালনা করেছে।

গবেষণায় যেসব বিষয় মূল্যায়ন করা হয়েছে—

  • উৎপাদন দক্ষতা
  • বিভিন্ন বয়সে পুষ্টির চাহিদা
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
  • ভ্যাকসিন কর্মসূচি
  • অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ
  • মাংসের গুণগত মান
  • ভোক্তার গ্রহণযোগ্যতা
  • মাঠ পর্যায়ে অভিযোজন ক্ষমতা

মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষার ফলাফল

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে এই মুরগি পালন করা হয়েছে।

পরীক্ষার স্থানসমূহ—

  • খুলনা (ডুমুরিয়া)
  • বরিশাল (বাবুগঞ্জ)
  • পাবনা (বেড়া)

প্রতিটি এলাকায় এক হাজার করে মুরগির ব্যাচ পালন করে আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গেছে।

খামারিদের অভিজ্ঞতা

পাবনার একজন খামারির অভিজ্ঞতা

পাবনার শিকদার অ্যাগ্রো ফার্মের একজন খামারি জানান—

  • ৫০০টি বাচ্চা পালন করেন।
  • ৮ সপ্তাহে ওজন প্রায় ১ কেজি হয়।
  • প্রতি কেজি ২৩৫ টাকায় বিক্রি করেছেন।
  • সোনালির তুলনায় রং ও স্বাদ ভালো হওয়ায় বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বেশি ছিল।

খুলনার একজন খামারির অভিজ্ঞতা

খুলনার একজন খামারি জানান—

  • ১,০০০টি মুরগি পালন করে প্রায় ৩২ হাজার টাকা লাভ করেছেন।
  • রোগবালাই তুলনামূলক কম হয়েছে।
  • প্রতি কেজি ১৯০ টাকায় বিক্রি করেছেন।

কেন এই জাতটি গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মাংস উৎপাদন ব্রয়লার নির্ভর।

কিন্তু—

  • দেশি মুরগির স্বাদের চাহিদা বাড়ছে।
  • ব্রয়লারের ওপর আমদানিনির্ভরতা কমানো জরুরি।
  • জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সহনশীল জাতের প্রয়োজন বাড়ছে।

এই বাস্তবতায় MCTC ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে।

MCTC-এর সম্ভাব্য সুবিধা

  • দেশি মুরগির মতো আকর্ষণীয় রং।
  • ভালো স্বাদের মাংস।
  • দ্রুত বাজারজাত করা যায়।
  • কম খাদ্যে ভালো ওজন।
  • কম মৃত্যুহার।
  • লাভজনক উৎপাদনের সম্ভাবনা।
  • ছোট ও মাঝারি খামারিদের জন্য উপযোগী।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

BLRI মাঠ পর্যায়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে জাতটির উৎপাদন দক্ষতা, বাজার চাহিদা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যাচাই করছে। প্রয়োজনীয় গবেষণা সম্পন্ন হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে এটি দেশব্যাপী সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

উপসংহার

মাল্টি কালার টেবিল চিকেন (MCTC) বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাতে একটি সম্ভাবনাময় নতুন সংযোজন। দেশি মুরগির স্বাদ, দ্রুত বৃদ্ধি, কম খাদ্যে ভালো উৎপাদন এবং তুলনামূলক কম মৃত্যুহারের কারণে ভবিষ্যতে এটি বাণিজ্যিক খামারিদের জন্য লাভজনক বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তবে ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে স্থানীয় পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে খামারিদের পরিকল্পনা করা উচিত।

FAQ

১. মাল্টি কালার টেবিল চিকেন (MCTC) কী?

এটি বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI) উদ্ভাবিত একটি নতুন মাংস উৎপাদনকারী মুরগির জাত, যা দেখতে ও স্বাদে দেশি মুরগির কাছাকাছি।

২. MCTC কত সপ্তাহে বাজারজাত করা যায়?

সাধারণত ৬ সপ্তাহ থেকে বাজারজাত করা সম্ভব এবং ৮ সপ্তাহে গড়ে প্রায় ১ কেজি ওজন হয়।

৩. MCTC কি ব্রয়লারের বিকল্প হতে পারে?

দেশি স্বাদের মাংস এবং দ্রুত বৃদ্ধির কারণে এটি ভবিষ্যতে ব্রয়লারের একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হতে পারে, তবে এর বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ আরও গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

৪. MCTC-এর খাদ্য গ্রহণ কত?

৮ সপ্তাহে একটি MCTC মুরগি গড়ে প্রায় ২.২–২.৩ কেজি খাদ্য গ্রহণ করে।

৫. MCTC পালনে মৃত্যুহার কেমন?

গবেষণায় এ পর্যন্ত গড় মৃত্যুহার প্রায় ১.৫% পাওয়া গেছে, যা তুলনামূলকভাবে কম।

মাল্টি কালার টেবিল চিকেন (MCTC) পালন পদ্ধতি, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও লাভের সম্ভাবনা

প্রথম পর্বে আমরা মাল্টি কালার টেবিল চিকেন (MCTC)-এর পরিচয়, বৈশিষ্ট্য এবং গবেষণার তথ্য জেনেছি। এবার আলোচনা করা হবে এই জাতের মুরগি পালনের সম্ভাবনা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, বাজারজাতকরণ এবং খামারিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ।

MCTC পালনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ

এই জাতটি আধা-নিবিড় (Semi-intensive) অথবা নিবিড় (Intensive) উভয় পদ্ধতিতেই পালন করা যায়। তবে সর্বোচ্চ উৎপাদনের জন্য সঠিক শেড, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং উন্নত বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করা জরুরি।

শেডে খেয়াল রাখতে হবে—

  • পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
  • লিটার সবসময় শুকনো ও ঝরঝরে রাখতে হবে।
  • বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক নিশ্চিত করতে হবে।
  • অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা থেকে মুরগিকে রক্ষা করতে হবে।
  • বন্য পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর প্রবেশ বন্ধ রাখতে হবে।

খাদ্য ব্যবস্থাপনা

বর্তমান গবেষণায় দেখা গেছে, ৮ সপ্তাহে একটি MCTC মুরগি গড়ে ২.২–২.৩ কেজি খাদ্য গ্রহণ করে প্রায় ১ কেজি ওজন অর্জন করতে পারে।

খাদ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে—

  • বয়সভিত্তিক সুষম ফিড ব্যবহার।
  • পরিষ্কার ও ঠান্ডা পানি সবসময় সরবরাহ।
  • ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি না রাখা।
  • হঠাৎ খাদ্য পরিবর্তন না করা।
  • ফিডে ছত্রাক বা বিষাক্ত উপাদান (Mycotoxin) যেন না থাকে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা

যদিও গবেষণায় রোগের প্রকোপ তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে, তবুও খামারে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অবহেলা করা যাবে না।

প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো হলো—

  • নির্ধারিত ভ্যাকসিন সময়মতো প্রয়োগ।
  • নিয়মিত কৃমিনাশক ব্যবহার (প্রয়োজন অনুযায়ী)।
  • অসুস্থ পাখি দ্রুত আলাদা করা।
  • নিয়মিত জীবাণুনাশক ব্যবহার।
  • খামারে প্রবেশে বায়োসিকিউরিটি অনুসরণ।

বাজারজাতকরণ

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী—

  • ৬ সপ্তাহ থেকেই বিক্রি করা সম্ভব।
  • ৮ সপ্তাহে বাজারমূল্য আরও ভালো পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • দেশি মুরগির মতো রং ও স্বাদের কারণে অনেক এলাকায় বেশি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতে পারে।

যেসব এলাকায় দেশি মুরগির চাহিদা বেশি, সেখানে এই জাতের বাজার সম্ভাবনাও বেশি হতে পারে।

MCTC কি খামারিদের জন্য লাভজনক?

গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

সম্ভাব্য সুবিধাগুলো হলো—

  • দ্রুত বৃদ্ধি।
  • কম মৃত্যুহার।
  • তুলনামূলক কম খাদ্যে ভালো ওজন।
  • দেশি মুরগির মতো আকর্ষণীয় রং।
  • ভালো বাজারমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা।
  • ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের জন্য উপযোগী।

তবে লাভ নির্ভর করবে—

  • বাচ্চার মান,
  • খাদ্যের দাম,
  • রোগ নিয়ন্ত্রণ,
  • ব্যবস্থাপনার দক্ষতা,
  • স্থানীয় বাজারদর এবং
  • সঠিক বিপণন ব্যবস্থার ওপর।

গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

  • শুধুমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করুন।
  • গবেষণালব্ধ বা সরকারি সুপারিশ অনুযায়ী পালন করুন।
  • বাজার যাচাই করে উৎপাদন পরিকল্পনা করুন।
  • নতুন জাত হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে বড় বিনিয়োগের আগে ছোট পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে পালন করা ভালো।
  • রোগ প্রতিরোধে বায়োসিকিউরিটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন।

উপসংহার

মাল্টি কালার টেবিল চিকেন (MCTC) বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে একটি সম্ভাবনাময় সংযোজন। দেশি মুরগির স্বাদ, দ্রুত বৃদ্ধি, ভালো উৎপাদন ক্ষমতা এবং তুলনামূলক কম মৃত্যুহারের কারণে এটি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক খামারিদের জন্য লাভজনক একটি বিকল্প হতে পারে। তবে সফলতা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, সঠিক খাদ্য, নিয়মিত টিকাদান এবং উন্নত বায়োসিকিউরিটি অপরিহার্য।

Scroll to Top