পনিরের উপকারিতা ও কিছু কথা

পনিরের উপকারিতা ও কিছু কথা

লেঃ কর্নেল মোঃ তুহিন হাসান,পিএসসি
পরিচালক (ভেটেরিনারিয়ান),বিজিবি

প্রাথমিক কথা:
পনির একটি দুগ্ধজাত খাবার এবং মূল উপাদান হলো দুধ। গরু, মহিষ, ছাগল বা ভেড়ার দুধ দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। নানারকম খাবার তৈরিতে পনিরের ব্যবহার বেশ পুরানো। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় পনির রাখার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা। বিভিন্ন ধরনের পনিরের মধ্যে হলুদ রঙের পনির বেশি পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। এতে উচ্চমানের প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পনিরের উপকারিতা:
১। পনির ফলিক এসিডের ঘাটতি দূর করে।ফলিক এসিড হল ভিটামিন- বি৯ এর কৃত্রিম রূপ যা ফলেট (Folate) নামেও পরিচিত। শরীরের প্রত্যেকটি কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং গঠনের জন্য এ ভিটামিন প্রয়োজন। এটি আমাদের শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করে যা শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গে অক্সিজেন পরিবহনে সাহায্য করে।গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড নিউরাল টিউব ডিফেক্ট (NTD) যেমন- স্পাইনাল কর্ড (Spina Bifida) ও ব্রেইনের (anencephaly) জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সাহায্য করে। নিউরাল টিউব হলো ভ্রুনের একটি অংশ যা থেকে মেরুদণ্ড ও মস্তিষ্কের গঠন হয়।নিউরাল টিউব ডিফেক্ট সাধারণত ভ্রুনের বিকাশের একেবারে প্রথম দিকে শুরু হয় যখন অধিকাংশ মহিলা বুঝতে পারেনা যে তারা গর্ভবতী। তাই গরভধারনের পরিকল্পনা করার সাথে সাথেই পর্যাপ্ত পরিমানে ফলিক এসিড সমৃদ্ধ খাবার গ্রহন শুরু করা উচিত।
গবেষণায় দেখা গেছে ফলিক এসিড গর্ভের শিশুর কিছু জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধ করে, যেমন- ঠোঁট কাটা (cleft lip), তালু কাটা (cleft palate) এবং হৃদপিণ্ড সংক্রান্ত জটিলতা। ফলিক এসিড গর্ভাবস্থায় মায়েদের প্রি-এক্লাম্পশিয়ার ঝুঁকি কমায়।
গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা এবং বেড়ে ওঠা শিশুর কোষের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত ফলিক এসিড গ্রহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পনিরে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় ফলেট , যা শরীরের চাহিদা মেটাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।
২। পনিরে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় ক্যালসিয়াম, যা হাঁড়কে শক্ত করে এবং দাঁতের স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।
৩। পনিরে উপস্থিত ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি ব্রেস্টে ক্যান্সার প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।
৩। পনিরে রয়েছে পটাশিয়াম যা ব্লাড প্রেসারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ফলে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের আশঙ্কা অনেকাংশে হ্রাস পায়।
৪। শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিলে একদিকে যেমন হাড় দুর্বল হতে শুরু করে, সেই সঙ্গে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনও বৃদ্ধি পায়। তাই তো প্রতিদিন এক গ্লাস করে দুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু যাদের দুধ খেলে সমস্যা হয় তাঁরা পনির খেতে পারেন। পনিরেও রয়েছে প্রচুর মাত্রায় ক্যালসিয়াম ( দুধের চেয়ে কম), যা শরীরে এই খনিজটির ঘাটতি মেটাতে দারুনভাবে সাহায্য করে থাকে।
৫। পনির খেলে বহুক্ষণ পেট ভরা থাকে। ফলে বারে বারে খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। পনিরে লাইনোলেইক অ্যাসিড নামে একটি উপাদানও রয়েছে, যা শরীরে জমে থাকা মেদকে দ্রুত গলিয়ে ফেলতে বিশেষ ভাবে সাহায্য করে।
৬। পনিরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফসফরাস, যা হজমে সহায়ক এবং কোষের কর্মক্ষমতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
৭। পনিরে রয়েছে প্রোটিন যা পেশীর উন্নতিতে কাজে লাগে।১০০ গ্রাম পনিরের মধ্যে থাকে ১১ গ্রাম প্রোটিন।
৮। পনিরে থাকা ভিটামিন বি কমপ্লেক্স এবং রাইবোফ্লেবিন ব্রেন পাওয়ার বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।
৯। পনিরে লাইনোলিক এসিড ও স্পাইনগোলিপিডস নামে এক ধরনের উপাদান রয়েছে যা ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।
১০। আমেরিকান জার্নাল অব নিউট্রিশন নামের সাময়িকীতে বলা হয়েছে, যারা দিনে ৫৫ গ্রাম অর্থাৎ প্রায় দুই টুকরা পনির খায়, তাদের টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা ১২ শতাংশ হ্রাস পায়। ইন্সুলিনের উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে পনির, ফলে ডায়বেটিস হলেও নিয়ন্ত্রনে থাকে।
১১। পরিমান মত পনির খেলে আমাদের শরীরের খারাপ কোলেস্টরেলকে দূর করে। পনিরে প্রোবাইওটিক ব্যাকটেরিয়া আছে যা দেহে কোলেস্টরেল বাড়তে দেয় না। তবে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে পরিমান বা প্রয়োজন অনুযায়ী খাওয়া উচিত পনির।

পনির ব্যবহারের পদ্ধতি:
১। পনির বাইরে রাখলে বেশ কয়েক সপ্তাহ ভালো থাকে। তবে ফ্রিজে রাখলে তা বাইরের তুলনায় বেশিদিন ভালো থাকবে।
২। পনির কেনার সময় তা প্লাস্টিক র‌্যাপ দিয়ে মোড়া থাকলেও এভাবে রাখা উচিত নয়। অমসৃণ কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে সংরক্ষণ করাই উত্তম। কারণ আবদ্ধ করে রাখলে পনিরে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে।
৩। পনির ফ্রিজে রাখলেও তা খাওয়ার আগে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় নিয়ে নেওয়া উচিত। অন্যথায় তার সঠিক স্বাদ পাওয়া যায় না।
৪। পনিরের গায়ে সামান্য ছত্রাক জন্মালেই তা যে বাতিল করতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। সাধারণ পনিরের ক্ষেত্রে ছত্রাক জন্মানো অংশটি বাদ দিলেই চলে।
৫। স্বাস্থ্যগত কারণে দুধ খাওয়া নিষেধ থাকলেও সাধারণত পনির খাওয়া যায়। তবে চেষ্টা করবেন যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে তারা কম লবন দেওয়া বা লবন ছাড়া পনির খাবেন।
৬। অনেক ধরনের পনির রয়েছে। আর প্রত্যেক পনিরেরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আয়ু। এগুলো ব্যবহারের নিয়মও আলাদা।
৭। বাজারে বহু ধরনের পনির পাওয়া যায়। এগুলোর স্বাদও ভিন্ন ভিন্ন হয়। কোনো একটি স্বাদ পছন্দ না হলে ভিন্ন কোনো পনিরের স্বাদ পরীক্ষা করে দেখতে পারো।

পনিরের প্রচলিত রেসিপি:
১। চিজ-স্যান্ডউইচ, চিজ-বার্গার, চিজ-পিত্জা, চিজ-ম্যাকারনি/নুডুলস।
২। পনির-পালংক (পালংশাক বা অন্য সবুজ সাক ও পনিরের সবজি তরকারী)।
৩। পনির-পুরি, পনির-লবঙ্গ, পনির-লুচি।

পনিরের পানির ব্যবহার:
১। রুটি বানানোর সময় ময়দার যে ডো তৈরি করা হয় তাতে সাধারণ পানির পরিবর্তে পনিরের পানি ব্যবহার করলে রুটির স্বাদ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
২। যেকোনো ফলের সঙ্গে পানির পরিবর্তে পনিরের পানি ব্যবহার করলে স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারী।
৩। যদি তরকারির স্বাদ কিছুটা ঝাল, কিছুটা টক করতে চান তাহলে সাধারণ পানির পরিবর্তে পনিরের পানি ব্যবহার করতে পারেন।
৪। যদি একটু টক ও স্বাস্থ্যকর ভাত রান্না করতে চান তাহলে অবশ্যই ভাত রান্না করার সময় পনিরের পানি ব্যবহার করবেন। এটি ভাতে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় এবং ক্যালোরির পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
৫। কেক, রুটি অথবা বিস্কুট বেক করার সময় পানির পরিবর্তে পনিরের পানি ব্যবহার করলে খাবারের স্বাদ কয়েকগুণ বেড়ে যায় দেয় এবং স্বাস্থ্যকরও বটে।
৬। অনেক সময় মাংস মেরিনেটের জন্য আমরা ভিনেগার ব্যবহার করি। এক্ষেত্রে আপনি পনিরের পানি ব্যবহার করতে পারেন। এটি মাংসকে মেরিনেট করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারি।

শেষ কথা:
যাদের দুধ বা দুগ্ধ জাতীয় খাবারে এলারজি তাদের ক্ষেত্রে পনির না খাওয়া উচিত।পনির একদম টাটকা খাওয়া বেশি উপকারী। পনির যদি ফ্রিজে থাকে তাহলে তা নর্মাল টেম্পারেচারে এনে তারপর তা খাওয়া উচিত।

“পুষ্টি সচেতনে এগিয়ে আসুন
রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করুন।”

Please follow and like us:

About admin

Check Also

দুধের ল্যাক্টোফেরিন

ল্যাক্টোফেরিন হলো একটি আয়রন সমৃদ্ধ প্রোটিন। সর্বপ্রথম ১৯৩৯ সালে গরুর দুধে এই প্রোটিনের সন্ধান মেলে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »