টিকা দেওয়ার পরও কেন রোগ হয়? – টিকার সমস্যা ও ভ্যাকসিন প্রয়োগের কারিগরি ত্রুটি (১ম পর্ব)
অনেক খামারীর একটি সাধারণ প্রশ্ন হলো—
“স্যার, সব টিকা ঠিকমতো দিয়েছি, তারপরও মুরগিতে রোগ হলো কেন?”
আসলে টিকা (Vaccine) কোনো জাদু নয়। টিকা কার্যকর হতে হলে টিকা তৈরির কারখানা থেকে শুরু করে মুরগির শরীরে প্রবেশ করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সঠিক নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। এর যেকোনো একটি ধাপে ভুল হলে টিকার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং রোগ দেখা দিতে পারে।
এছাড়া টিকার ধরন, সংরক্ষণ, প্রয়োগের পদ্ধতি, মুরগির স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং ব্যবস্থাপনাসহ অনেক বিষয় টিকার সফলতার ওপর প্রভাব ফেলে।
এই পর্বে আলোচনা করা হলো টিকার নিজস্ব সমস্যা এবং ভ্যাকসিন প্রয়োগের কারিগরি ত্রুটি সম্পর্কে।
টিকা দেওয়ার পরও রোগ হওয়ার কারণ
কারণগুলোকে মোটামুটি ছয়টি ভাগে ভাগ করা যায়—
- টিকার নিজস্ব সমস্যা
- ভ্যাকসিন প্রয়োগের কারিগরি ত্রুটি
- মুরগির শারীরিক সমস্যা
- প্যারেন্ট ফার্ম ও হ্যাচারির সমস্যা
- খাদ্য ও পুষ্টিগত সমস্যা
- খামার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি
আজ আলোচনা করা হবে প্রথম দুটি বিষয়।
১। টিকার (Vaccine) নিজস্ব সমস্যা
ক) কোল্ড চেইন (Cold Chain) ঠিকভাবে রক্ষা না করা
ভ্যাকসিন তৈরির পর থেকে মুরগির শরীরে প্রয়োগ করা পর্যন্ত নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি পরিবহন, সংরক্ষণ বা ব্যবহারকালে কোল্ড চেইন নষ্ট হয়, তাহলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা অনেক কমে যেতে পারে।
খ) ভ্যাকসিনের বোতল সঠিকভাবে বন্ধ না থাকা
ভ্যাকসিনের বোতলের ছিপি ঠিকভাবে আটকানো না থাকলে বাতাসের আর্দ্রতা ভেতরে প্রবেশ করে ভ্যাকসিনের গুণগত মান নষ্ট করতে পারে।
তাই ব্যবহারের আগে বোতল ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত।
গ) সূর্যের আলোতে ভ্যাকসিন রাখা
বিশেষ করে লাইভ ভ্যাকসিন আলো ও তাপের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
সূর্যের সরাসরি আলোতে দীর্ঘক্ষণ থাকলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
এ কারণে ভ্যাকসিন প্রস্তুত ও প্রয়োগের সময় ছায়াযুক্ত পরিবেশ ব্যবহার করা উচিত।
ঘ) ভ্যাকসিন মিশানোর পানির মান
লাইভ ভ্যাকসিন গলানোর জন্য ব্যবহৃত পানির মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি পানির pH খুব বেশি অম্লীয় বা ক্ষারীয় হয়, অথবা পানিতে ক্লোরিন বা জীবাণুনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকে, তাহলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
প্রয়োজনে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী পানি প্রস্তুত করতে হবে।
ঙ) ভ্যাকসিনে পর্যাপ্ত অ্যান্টিজেন না থাকা
একটি কার্যকর ভ্যাকসিনে পর্যাপ্ত অ্যান্টিজেন থাকা প্রয়োজন।
অ্যান্টিজেনের পরিমাণ বা কার্যক্ষমতা কমে গেলে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি নাও হতে পারে।
চ) ডোজের ভুল
ধরা যাক—
১০০০ ডোজের ভ্যাকসিন দিয়ে ১২০০টি মুরগিকে টিকা দেওয়া হলো।
এক্ষেত্রে প্রতিটি মুরগি নির্ধারিত ডোজ পাবে না এবং অনেক মুরগির শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে না।
ছ) ফিল্ড ভাইরাস ও ভ্যাকসিন স্ট্রেইনের পার্থক্য
সব ভ্যাকসিন সব ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে সমানভাবে কার্যকর নয়।
অনেক সময়—
- ফিল্ড ভাইরাসের ধরন ভিন্ন হয়।
- ভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট তৈরি হয়।
- ভাইরাসের আক্রমণক্ষমতা (Virulence) বেশি থাকে।
এসব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ভ্যাকসিনের সুরক্ষা আংশিক হতে পারে।
এ কারণে এলাকার রোগের ধরন অনুযায়ী ভ্যাকসিন নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ।
জ) ভাইরাসের পরিবর্তন (Mutation)
ভাইরাস সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে।
ফলে পূর্বে কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন নতুন ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে তুলনামূলক কম কার্যকর হতে পারে।
এজন্য নিয়মিত রোগ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্যাকসিন প্রোগ্রাম হালনাগাদ করা দরকার।
২। ভ্যাকসিন প্রয়োগের কারিগরি (Technical) ত্রুটি
শুধু ভালো ভ্যাকসিন কিনলেই হবে না, সঠিকভাবে প্রয়োগ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ক) ভুল পদ্ধতিতে টিকা দেওয়া
প্রতিটি ভ্যাকসিনের নির্দিষ্ট প্রয়োগ পদ্ধতি রয়েছে।
যে ভ্যাকসিন—
- চোখে দেওয়ার কথা,
- পানিতে দেওয়ার কথা,
- ইনজেকশনে দেওয়ার কথা,
তা অবশ্যই সেই পদ্ধতিতেই দিতে হবে।
খ) ভুল বয়সে ভ্যাকসিন দেওয়া
প্রতিটি ভ্যাকসিনের নির্দিষ্ট সময় রয়েছে।
অতিরিক্ত আগে বা অনেক দেরিতে দিলে প্রত্যাশিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নাও তৈরি হতে পারে।
ভ্যাকসিন সিডিউল নির্ধারণের সময় মুরগির বয়স, মাতৃপ্রদত্ত অ্যান্টিবডি (MDA) এবং এলাকার রোগ পরিস্থিতি বিবেচনা করা উচিত।
গ) গলানোর অনেক পরে ভ্যাকসিন ব্যবহার করা
অনেক লাইভ ভ্যাকসিন গলানোর পর সীমিত সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকে।
নির্মাতার নির্দেশিত সময়ের মধ্যে ব্যবহার না করলে কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
ঘ) ইনজেকশনের ডোজ সঠিকভাবে না দেওয়া
অনেক সময় ভ্যাকসিন গান বা সিরিঞ্জ সঠিকভাবে ক্যালিব্রেট করা থাকে না।
ফলে—
- কোনো মুরগি বেশি ডোজ পায়।
- কেউ কম ডোজ পায়।
উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা হতে পারে।
ঙ) ভ্যাকসিন ভালোভাবে মিশিয়ে ব্যবহার না করা
বিশেষ করে কিল্ড ভ্যাকসিন ব্যবহারের সময় প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী ভালোভাবে মিশিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
তা না হলে প্রতিটি মুরগি সমান পরিমাণ অ্যান্টিজেন নাও পেতে পারে।
চ) ভ্যাকসিনেটরের দক্ষতার অভাব
ভ্যাকসিন প্রয়োগকারী ব্যক্তি দক্ষ না হলে অনেক ভুল হতে পারে।
যেমন—
- ভুল স্থানে ইনজেকশন
- ডোজের ত্রুটি
- ভ্যাকসিন লিক হয়ে যাওয়া
- মুরগি বাদ পড়ে যাওয়া
এসব কারণে পুরো ফ্লকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
খামারিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- সবসময় নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে ভ্যাকসিন কিনুন।
- কোল্ড চেইন বজায় রাখুন।
- ভ্যাকসিন ব্যবহারের আগে মেয়াদ ও বোতল পরীক্ষা করুন।
- প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা মেনে ভ্যাকসিন প্রস্তুত করুন।
- নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন ব্যবহার করুন।
- প্রশিক্ষিত ব্যক্তি দিয়ে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করান।
- একই ভ্যাকসিন সব ফার্মে একইভাবে ব্যবহার করা সবসময় সঠিক নয়; প্রয়োজনে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নিন।
উপসংহার
টিকা দেওয়ার পরও রোগ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো টিকার গুণগত সমস্যা এবং প্রয়োগের কারিগরি ত্রুটি। একটি ছোট ভুলও পুরো ভ্যাকসিন কর্মসূচিকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।
তাই ভালো ভ্যাকসিন কেনার পাশাপাশি সঠিক সংরক্ষণ, সঠিক ডোজ, সঠিক পদ্ধতি এবং দক্ষতার সাথে ভ্যাকসিন প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
FAQ
১। টিকা দেওয়ার পরও মুরগিতে রোগ হয় কেন?
টিকা দেওয়ার পরও রোগ হতে পারে যদি কোল্ড চেইন নষ্ট হয়, ডোজ ভুল হয়, ভ্যাকসিন সঠিকভাবে সংরক্ষণ বা প্রয়োগ না করা হয়, অথবা ফিল্ড ভাইরাসের ধরন ব্যবহৃত ভ্যাকসিনের সঙ্গে পুরোপুরি না মিলে।
২। কোল্ড চেইন (Cold Chain) কী?
কোল্ড চেইন হলো ভ্যাকসিনকে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান থেকে মুরগির শরীরে প্রয়োগ পর্যন্ত নির্ধারিত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করার প্রক্রিয়া। এটি নষ্ট হলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
৩। সূর্যের আলোতে ভ্যাকসিন রাখা কি ক্ষতিকর?
হ্যাঁ। বিশেষ করে লাইভ ভ্যাকসিন সরাসরি সূর্যের আলো ও অতিরিক্ত তাপের প্রতি সংবেদনশীল। তাই ছায়াযুক্ত স্থানে ভ্যাকসিন প্রস্তুত ও প্রয়োগ করা উচিত।
৪। ভ্যাকসিনের ডোজ কম বা বেশি হলে কী সমস্যা হয়?
ডোজ কম হলে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি নাও হতে পারে, আর অতিরিক্ত ডোজ অপ্রয়োজনীয় স্ট্রেস সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিক ডোজ ব্যবহার করা জরুরি।
৫। সব ফার্মে কি একই ভ্যাকসিন ও একই সিডিউল ব্যবহার করা যায়?
না। ভ্যাকসিন নির্বাচন ও সিডিউল নির্ভর করে মুরগির বয়স, মাতৃপ্রদত্ত অ্যান্টিবডি (MDA), এলাকার রোগের ইতিহাস এবং ফার্মের ঝুঁকির ওপর। তাই ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী ভ্যাকসিন প্রোগ্রাম নির্ধারণ করা উচিত।




