উদরাময় বা ডায়রিয়া (Diarrhoea)?

 
 
 
 
 

গবাদিপশুর উদরাময় বা ডায়রিয়া (Diarrhoea): কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

গবাদিপশু স্বাভাবিকের তুলনায় ঘন ঘন পাতলা পায়খানা করলে তাকে উদরাময় বা ডায়রিয়া (Diarrhoea) বলা হয়। ডায়রিয়া নিজে কোনো রোগ নয়; বরং এটি বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী বা খাদ্যজনিত সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

ডায়রিয়ার ফলে শরীরে পানিশূন্যতা, দুর্বলতা, ওজন কমে যাওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুও ঘটতে পারে। বিশেষ করে নবজাতক বাছুর ও অল্পবয়সী প্রাণীর জন্য ডায়রিয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ডায়রিয়ার জন্য দায়ী গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়া

গবাদিপশুর ডায়রিয়ার জন্য প্রধানত নিম্নলিখিত ব্যাকটেরিয়াগুলো দায়ী—

  • Escherichia coli (ইস্কেরিশিয়া কলাই)
  • Salmonella spp. (সালমোনেলা)
  • Mycobacterium spp. (মাইকোব্যাকটেরিয়াম)
  • Pseudomonas spp. (সিউডোমোনাস)
  • Proteus spp. (প্রোটিয়াস)
  • Pasteurella spp. (পাস্চুরেলা)

এর মধ্যে Escherichia coli, Salmonella এবং Mycobacterium সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


কলিব্যাসিলোসিস (Collibacillosis)

Escherichia coli ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে এ রোগ হয়। এটি “বাছুরের সাদা পায়খানা” বা White Scour নামেও পরিচিত।

এ রোগ প্রধানত নবজাতক বাছুরে দেখা যায় এবং আক্রান্ত বাছুরের মৃত্যুহার প্রায় ৫০% পর্যন্ত হতে পারে।

রোগ হওয়ার কারণ

জন্মের পর নাভিরজ্জু, শ্বাসনালি অথবা খাদ্যের মাধ্যমে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। জন্মের পরপর পর্যাপ্ত শালদুধ না পেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং বাছুর সহজেই আক্রান্ত হয়।


রোগের ধরন

১. সেপ্টিসেমিক টাইপ (Septicemic Type)

  • জন্মের প্রথম ৪ দিনের মধ্যে দেখা যায়।
  • জীবাণু দ্রুত রক্তে ছড়িয়ে পড়ে।
  • ক্ষুধামন্দা, দুর্বলতা ও ডায়রিয়া দেখা দেয়।
  • লক্ষণ প্রকাশের ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু হতে পারে।

২. এন্টারোটক্সিক টাইপ (Enterotoxic Type)

  • সাধারণত ৫ দিনের কম বয়সী বাছুর আক্রান্ত হয়।
  • শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়।
  • ঝিল্লি ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
  • শ্বাসকষ্ট ও মৃদু খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।
  • পেট ফুলে যায় এবং তীব্র ডায়রিয়া হয়।
  • ২-৬ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু হতে পারে।

কলিব্যাসিলোসিসের লক্ষণ

  • সাদাটে বা ফ্যাকাশে হলুদ রঙের পাতলা পায়খানা
  • মলে ফেনা দেখা যেতে পারে
  • দুর্গন্ধযুক্ত মল
  • মলের সাথে রক্ত থাকতে পারে
  • লেজ ও পশ্চাদদেশ ময়লাযুক্ত থাকে
  • বাছুর দুধ পান করতে চায় না
  • দুর্বল হয়ে পড়ে

রোগ নির্ণয়

  • রোগের লক্ষণ দেখে প্রাথমিক ধারণা করা যায়।
  • নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ের জন্য আক্রান্ত বাছুরের নমুনা পরীক্ষা করে Escherichia coli জীবাণু শনাক্ত করতে হয়।

চিকিৎসা

খাদ্য ব্যবস্থাপনা

  • সাময়িকভাবে দুধ পান বন্ধ রাখা।
  • ৫% ডেক্সট্রোজ স্যালাইন মুখে খাওয়ানো।

ফ্লুইড ও ইলেকট্রোলাইট

  • সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ও ডেক্সট্রোজ স্যালাইন প্রয়োগ।
  • তীব্র পানিশূন্যতায় প্রথম ৪-৬ ঘণ্টা প্রতি কেজি ওজনে ১০০ মি.লি. এবং পরবর্তী ২০ ঘণ্টায় ১৪০ মি.লি. হারে তরল সরবরাহ করা যায়।

জীবাণুনাশক ওষুধ

নিম্নোক্ত ওষুধগুলো কার্যকর হিসেবে উল্লেখ করা হয়—

  • সালফাডায়াজিন (Sulphadiazine)
  • সালফাডিমিডিন (Sulphadimidine)
  • সালফাপাইরিডিন (Sulphapyridine)
  • স্ট্রেপটোমাইসিন সালফেট (Streptomycin Sulphate)

বাজারে স্ট্রিনাসিন (Strinasin) ট্যাবলেট পাওয়া যায়।

প্রতি ৪০ কেজি ওজনের জন্য দৈনিক ৫ গ্রাম করে ৩ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়।


রোগ প্রতিরোধ

  • পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রসবস্থান ব্যবহার করতে হবে।
  • প্রসবের আগে ওলান ও পশ্চাদদেশ পরিষ্কার রাখতে হবে।
  • জন্মের পর নাভিরজ্জু ২% আয়োডিন দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
  • আক্রান্ত বাছুরকে আলাদা রাখতে হবে।
  • জন্মের পরপর পর্যাপ্ত শালদুধ খাওয়াতে হবে।
  • প্রয়োজন হলে প্রতিষেধক টিকা ব্যবহার করা যেতে পারে।

সালমোনেলোসিস (Salmonellosis)

Salmonella typhimurium, Salmonella dublin এবং Salmonella newport ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে এ রোগ হয়।

সাধারণত নবজাতক ও অল্পবয়সী বাছুর বেশি আক্রান্ত হয়।


রোগের লক্ষণ

  • জ্বর (১০৬°F পর্যন্ত)
  • তীব্র অন্ত্রপ্রদাহ
  • দুর্গন্ধযুক্ত ডায়রিয়া
  • মলে শ্লেষ্মা ও রক্ত
  • পানিশূন্যতা
  • দুর্বলতা

চিকিৎসা না করলে আক্রান্ত প্রাণীর প্রায় ৭৫% কয়েক দিনের মধ্যে মারা যেতে পারে।


চিকিৎসা

অ্যান্টিবায়োটিক

  • ক্লোরামফেনিকল (Chloramphenicol)

প্রতি কেজি ওজনে ২০ মি.গ্রা. করে ৬-১২ ঘণ্টা অন্তর ৩ দিন পর্যন্ত।

অন্ত্র প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে

  • নাইট্রোফিউরাজোন (Nitrofurazone)

প্রতি কেজি ওজনে ২০ মি.গ্রা. করে ৫ দিন পর্যন্ত।

অন্যান্য চিকিৎসা

  • অ্যাস্ট্রিনজেন্ট ওষুধ
  • সাধারণ স্যালাইন বা ডেক্সট্রোজ স্যালাইন
  • ৫% সোডিয়াম বাইকার্বোনেট

প্রতিরোধ

  • আক্রান্ত পশুকে পৃথক রাখতে হবে।
  • গোয়ালঘর পরিষ্কার রাখতে হবে।
  • পর্যাপ্ত শালদুধ খাওয়াতে হবে।
  • প্রয়োজনে টিকা ব্যবহার করা যেতে পারে।

জোনস ডিজিজ (Johne’s Disease)

Mycobacterium paratuberculosis ব্যাকটেরিয়ার কারণে এ রোগ হয়।

এটি দীর্ঘমেয়াদি অন্ত্রপ্রদাহ সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে পশুকে দুর্বল ও হাড্ডিসার করে ফেলে।


রোগের লক্ষণ

  • দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া
  • ওজন কমে যাওয়া
  • পানিশূন্যতা
  • দুর্বলতা
  • হাড্ডিসার হয়ে যাওয়া

চিকিৎসা

  • স্ট্রেপটোমাইসিন (Streptomycin)

প্রতি কেজি ওজনে ৫০ মি.গ্রা. করে ৬ ঘণ্টা অন্তর ব্যবহার করা যায়।

  • ডাই-হাইড্রোস্ট্রেপটোমাইসিন (Dihydrostreptomycin)

৫০০ মি.গ্রা. পেশিতে ইনজেকশন দেওয়া যেতে পারে।


উপসংহার

ডায়রিয়া গবাদিপশুর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, বিশেষ করে নবজাতক বাছুরের জন্য। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা, পর্যাপ্ত তরল ও ইলেকট্রোলাইট সরবরাহ, সঠিক চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাণীকে সুস্থ রাখা সম্ভব।

বিশেষ করে জন্মের পরপর পর্যাপ্ত শালদুধ খাওয়ানো এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ডায়রিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

FAQ

১। বাছুরের সাদা পায়খানা কেন হয়?
মূলত Escherichia coli ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে White Scour বা সাদা পায়খানা হয়।

২। শালদুধ খাওয়ানো কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শালদুধে প্রচুর অ্যান্টিবডি থাকে, যা নবজাতক বাছুরকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

৩। ডায়রিয়ায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী?
পানিশূন্যতা (Dehydration), যা দ্রুত মৃত্যু ঘটাতে পারে।

৪। সালমোনেলোসিস কি শুধু গরুতেই হয়?
না, মহিষসহ অন্যান্য গবাদিপশুতেও হতে পারে।

৫। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত পশুকে কী করা উচিত?
আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা, পর্যাপ্ত তরল সরবরাহ করা এবং দ্রুত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Scroll to Top